ডা. কামরুজ্জামান চৌধুরী

ডা. কামরুজ্জামান চৌধুরী

লেকচারার, উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ


১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ১০:৪৩ এএম

‘এন্টিবায়োটিক ছাড়া আমার জ্বর যায় না’

‘এন্টিবায়োটিক ছাড়া আমার জ্বর যায় না’

কানা ডাক্তার। এক চোখে দেখেন না। এই কোয়াকের কাছে রোগী গেলে বলে পকেটে যদি ৫০০ টাকা থাকে তাহলে সে কথা শুনবে না হলে নাই। কারণ ৫০০ টাকার নিচে ওষুধ খেলে নাকি রোগী ভালো হবে না। তার কাছে নাকি রোগীরা ভালো হয় তাই সিরিয়াল থাকে বেশ।

এক রোগী গেল ফোড়া নিয়ে। এন্টিবায়োটিক দিয়েছে ৪ ধরনের! সাথে আরো বহু ওষুধ। অবস্থাটা দেখে মনে হল ‘খাইসি তোরে যাইবি কই?’ 

ভদ্রমহিলা আমার পুরানো রোগী। ৬ দিন আগে এসেছিল ১০৪ জ্বর নিয়ে। ভাইরাস জ্বর (ডেঙ্গুর সম্ভাবনা বেশি) বলে কোন এন্টিবায়োটিক দেইনি। আজকে এসে বললেন, ‘আপনাকে তো বলছিলাম এন্টিবায়োটিক দিতে, আপনি তো দিলেন না। এন্টিবায়োটিক ছাড়া আমার জ্বর যায় না। গতকাল ডা. এক্স-কে দেখিয়েছি। উনি এন্টিবায়োটিক দিয়েছেন। রাতে একটা খেয়েই জ্বর নাই।’

ডা. এক্স এর প্রেস্ক্রিপশান হাতে নিলাম। দেখতে চাইলাম কী এমন এন্টিবায়োটিক যেটা এক ডোজ খেয়েই জ্বর ভাল। কিছুই না, জাস্ট একটা Tab. Zimax (500mg)। মজার বিষয় হচ্ছে ডায়াগনসিস লেখা Viral Fever। আমি আমার স্বজাতিকে কামড়াই না। তাই রোগীকে বললাম, যা দিছে খান। 

প্র্যক্টিসের শুরুর দিকে কোন রোগী ভাইরাস জ্বর নিয়ে আসলে আগে জ্বরের কাউন্সিলিং করতাম কিন্তু এখন করি না, এখন কাউন্সিলিং করি তার এন্টিবায়োটিক কেন লাগবে না সেটা। অপ্রয়োজনীয় এন্টিবায়োটিক খেলে নিজের এবং জাতির কী কী ক্ষতি হতে পারে সেটা বলি। কারণ আমি জানি জ্বর ২ দিন পরে জ্বর ভালো না হলে রোগী নিজেই বুজর্গী দেখাবে। কোন ফার্মেসি থেকে এন্টিবায়োটিক কিনে খেয়ে ১ দিন পরে জ্বর ভালো হয়ে গেলে সে সবাইকে বলে বেড়াবে- ডাক্তার হুদাই দেখালাম, নিজের চিকিৎসা নিজে করে ভালো হলাম! 

এই চিকুনগুনিয়া আর পুর্বের ডেঙ্গুর সিজনে বহু প্রেস্ক্রিপশান পেয়েছি যেখানে অপ্রয়োজনীয় এন্টিবায়োটিক। আমরা গালাগালি করি ফার্মেসিম্যান আর কোয়াকদের। তারা নষ্ট করেছে zimax, cipro, levo, cotrim. এখন করছে সেকেন্ড আর থার্ড জেনারেশন সেফালোস্পরিন। আর আমরা ডাক্তাররা নষ্ট করে ফেলছি বড় বড় হাতিয়ারগুলো। কিছুটা জ্ঞানের সল্পতায় আর কিছুটা হীন চরিত্র চরিতার্থ করার জন্য। 

২০০৮ সালে ভারতে একজন রোগী হাসপাতালে পা ভাঙা নিয়ে ভর্তি হওয়ার পরে তার নিউমোনিয়া ধরা পড়ে (Hospital acquired pneumonia)। সব ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স পাওয়া যায় সেই জিবাণুতে (klebsiella pneumoniae)। সেটা ছিল আসলে একটা সুপার বাগ।

আমরা তো গ্রিনিস বুক অফ অয়ার্ল্ড রেকর্ড করা জাতি। গান গেয়ে, পতাকা উড়িয়ে, সাইকেল চালিয়ে রেকর্ড করেছি। এখন আসেন সুপার বাগ তৈরিতেও রেকর্ড করি।

আমাদের জন্য আসল খবরটা হচ্ছে যে এঞ্জাইমের জন্য এই সুপার বাগ তৈরি হয়েছে সেটার নাম দেওয়া হয়েছে- ‘New Delhi’ Metallo-beta-lactamase-1 (NDM-1)। ঢাকাবাসি দিল্লি কিন্তু বেশি দূরে নয়! 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত