ঢাকা      সোমবার ১৯, নভেম্বর ২০১৮ - ৪, অগ্রাহায়ণ, ১৪২৫ - হিজরী



ডা. কাওসার উদ্দিন

সহকারী সার্জন

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।


আত্মহত্যা না খুন!

ঘটনার সূত্রপাত চার মাস আগে। আমার ইমারজেন্সি ডিউটি চলছে। সন্ধ্যার একটু পরেই এক ভদ্রমহিলার আগমন। তার স্বামী তাকে মেরেছে। পুরো গলায় নখের অসংখ্য আচর ও বেশ কিছু ক্ষত, সাথে গলা চেপে ধরলে ও থাপ্পড় দিলে যেমন লাল লাল দাগ পরে তেমন আঘাতের চিহ্ন। যথারীতি রোগী দেখে ফিজিক্যাল এসল্ট হিসেবে ইনজুরি নোট লিখলাম। 

রোগী হাসপাতালে ভর্তি হবে, তাই ভর্তিও করে দিলাম। কয়েকদিন থেকে রোগী ছুটি নিয়ে চলে গেল। তার কিছুদিন পর থানা থেকে ইনজুরি সার্টিফিকেট দেওয়ার জন্য চিঠি আসলো৷ তো নিয়ম মাফিক আমি একজন মেম্বারসহ সার্টিফিকেট দিয়ে দিলাম। বলে রাখা ভাল এটা সিম্পল ইনজুরি।

ঘটনার সূত্রপাত তার পর থেকেই। হঠাৎ একদিন সিকিউরিটি গার্ড এসে বলে, ‘স্যার আপনি রফিকের (ছদ্মনাম) বউরে কোন সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন? আপনারে নিয়ে ওরা কথা বলতেছে, সাথে অমুক অমুক নেতাও আছে, আপনারে হেনস্থা করতে চায়! একটু সাবধানে থাইকেন!’

কে এই রফিককে আমি চিনতাম না। যারা উপজেলায় কাজ করেন, তারা হয়তো জানেন যে সেখানের ফার্মেসি দোকানদারদের অনেকেই একটু অন্যরকম। তো জানলাম রফিক একজন ফার্মেসি মালিক। তারা কেমন অন্যরকম তার কিছু নমুনা দেই। তারা শুধু ওষুধই বেঁচে না, এক একজন বেশ বড় মাপের ডাক্তারও বটে।

সরল রোগীকে প্রাথমিক চিকিৎসা তারাই দেয়, পরে অসুবিধা হলে পাঠায় হাসপাতালে। ডাক্তার যে ওষুধ লেখে তারা তা ইচ্ছেমত পরিবর্তন করে তাদের লাভ অনুযায়ী। আর গ্রামের অধিকাংশ রোগীই পড়তে জানে না। যা দেয় তাই নির্দ্বিধায় খেয়ে নেয়৷ কিছু দোকানদার চেঞ্জ করতে যেয়ে মাঝে মাঝে জেনেরিক সহই চেঞ্জ করে ফেলে। তো এরকমই একজন ফার্মেসিওয়ালা এই রফিক। অনেকের ভাষ্যমতে এলাকার খারাপ কিছু লোকের অন্যতম একজন। বিয়ে করেছে ৬টি!

তো এই রফিকের প্রথম বউ বিবাহের ১৫ বছরের মাথায় মিলনের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের মামলা করে। আর তারপর থেকেই রফিক মরিয়া হয়ে ওঠে কোন ডাক্তার সার্টিফিকেট দিয়েছে তাকে হেনস্থা করতে। সে হাসপাতালে এসে সিস্টারদের ঝাড়ি দেয়, স্যাকমোদের ঝাড়ি দেয়, আরএমওর কাছে কমপ্লেইন করে আমি সার্টিফিকেট কেন দিলাম, আমার কত বড় সাহস। বাইরে বিভিন্ন লোকের কাছে আমাকে দেখে নেওয়ার কথা বলে বেড়ায়।

ওষুধ কোম্পানির প্রত্যেকটা লোকের কাছে হুমকি দিয়ে বলে যে আমি কাজটা ভাল করিনি। যাই হোক আমি এসব শুধু শুনে যাই, কারণ তখনও সে সরাসরি এ ব্যাপারে আমাকে কিছু বলেনি। আর আমি এসব কিছু ভয় পাই না, আমার দায়িত্ব আমি পালন করেছি।

একদিন সে হঠাৎ ইমারজেন্সিতে আসে। আমি সেখানে বসে তখন। এসে সে কোন কারণ ছাড়াই আমার সামনে দাঁড়িয়ে অন্য দিকে মুখ করে বেশ কিছু খারাপ কথা বলতে থাকে। টাকা দিলে সার্টিফিকেট পাওয়া যায়, দেখে নিবো, হ্যান ত্যান বিভিন্ন কিছু। আমি শুনছি আর অন্য রোগীর ট্রিটমেন্ট লিখছি। কিন্তু কিছু বলছি না। কিছুক্ষণ পর সে চলে যায়।

এভাবে প্রায়শই সে ইমারজেন্সিতে আসে, রাস্তায় তার ফার্মেসির সামনে দিয়ে হেঁটে গেলে, হোটেলে খেতে গেলে, সব জায়গায়ই সে অদৃশ্য কাউকে উদ্দেশ্য করে বিভিন্ন অশালীন শব্দে কথা বলে, কিন্তু কখনোই আমার দিকে তাকায় না। আমি চুপচাপ, কিচ্ছু বলি না, শুধু শুনে যাই। মেজাজ খারাপ হয়, বিরক্ত লাগে, মনে হয় চাকরি ছেড়ে চলে যাই।

গত তিনদিন আগের ঘটনা। আমার সেদিন ডিউটি ছিল না। রাতে রফিকের স্ত্রী হসপিটালে ভর্তি হয় প্রচন্ড শারীরিক দুর্বলতা নিয়ে। পরিবারের সদস্যরা তখন পর্যন্ত কিছু বলতে পারে না, তারা জানায় রফিক তখন ঢাকায়। বলে রাখা ভাল এই সংসার ১৫ বছরের, যেখানে ১৩ বছরের একটি মেয়ে ও ৭ বছরের একটি ছেলে আছে৷ তারপরে রফিক একে একে আরো ৫ টি বিয়ে করে। তার প্রথম শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের দেওয়া তথ্যমতে প্রতিবার বিয়ের আগে সেই এই স্ত্রীকে বাড়ি থেকে টাকা আনতে বলতো, না হয় হুমকি দিতো যৌতুক নিয়ে নতুন বিয়ে করার। 

মহিলা সময়ে অসময়ে বাবার বাড়ি থেকে টাকা এনে দিত, এমনকি যে ফার্মেসি সে চালায় সেটিও তার বাবার টাকায় করা। দীর্ঘ ১৫টি বছর একের পর এক প্রচন্ড শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের এক পর্যায়ে রফিক যখন সর্বশেষ বিয়েটা করে তখন এই মহিলা তার প্রতিবাদ করে, এতে তাকে ভীষণ নির্যাতন করলে সে তার স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করে। মামলা করায় রফিক খুব ক্ষীপ্ত হয় এবং তার এই প্রথম স্ত্রীকে তালাক দিয়ে সর্বশেষ বিয়ে করা বউয়ের সাথে ঢাকায় গিয়ে থাকতে শুরু করে।

তার পরদিন সকালে এই মহিলা মারা যান। ধারণা করা হয় সিডেটিভ পয়জনিং। পরে তার পরিবারের সদস্যরা ঘুমের ওষুধ খাওয়ার বিষয়টা নিশ্চিত করে। আর এভাবেই শেষ হয় একটি জীবন!

এ সমাজে এহেন অসংখ্য কুলাঙ্গার আছে, যাদেরকে আমাদের ভয় করে চলতে হয়। তারা যে সংখ্যায় খুব বেশি তাও না। তারপরও তারা ক্ষমতার বলে ধরাকে সরা জ্ঞান করে একের পর এক অপরাধ করে, কষ্ট দিয়ে যায় নিরুপায় মানুষগুলোকে।

এ সমাজ পচে গেছে! কবে হবে সেই সমাজ যেখানে এই নিকৃষ্ট কীটগুলো আর থাকবে না, মানবিক সৎ মানুষগুলো বেঁচে থাকবে নিশ্চিন্তে নির্ভাবনায়...

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

‘হে ঈশ্বর এটাই শেষ কেইস, আর ডেলিভারি রোগীর দায়িত্ব নেব না!’

‘হে ঈশ্বর এটাই শেষ কেইস, আর ডেলিভারি রোগীর দায়িত্ব নেব না!’

প্রতিবছর রেসিডেন্সির রেজাল্ট দিলে আমি দেখতে চেষ্টা করি কোন ছেলে চান্স পেলো…

চাতক চাতকী

চাতক চাতকী

গাইনী আউটডোরে দেখতাম প্রায়ই রোগী আসে এবরশন করানোর জন্য। কখনও আসে কিভাবে…

মেয়ের বাবা ও ডাক্তারের গল্প

মেয়ের বাবা ও ডাক্তারের গল্প

ফ্ল্যাটের এক আঙ্কেল সরকারি এক ব্যাংকের রিটায়ার্ড উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। ভদ্রলোককে আমি বেশ…

ভালোবাসার এপিঠ-ওপিঠ

ভালোবাসার এপিঠ-ওপিঠ

তরুণী শাওনের মাঝবয়সী হুমায়ুন আহমেদ এর প্রেমে পড়ার কথা শুনে অনেকেই ভ্রু…

ইভিডেন্স বেসড মেডিসিন

ইভিডেন্স বেসড মেডিসিন

আমি তখন মেডিকেল কলেজে ৫ম বর্ষের ছাত্র। হঠাৎ খেয়াল করলাম চান্দি খালি…

বব ভাই

বব ভাই

বব ভাইকে চিনি প্রায় আঠার বছর। যখন আমি NITOR (পঙ্গু হাসপাতাল) এ…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর