ঢাকা শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ৩ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ৬ ঘন্টা আগে
হাফিজ উদ্দিন নাঈম

হাফিজ উদ্দিন নাঈম

শিক্ষার্থী, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ, ঢাকা। 


১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০১:৪৪

লাশকাটা ঘরে যেদিন প্রথম গেলাম!

লাশকাটা ঘরে যেদিন প্রথম গেলাম!

ঘুম ঘুম চোখ। এপ্রনটা গায়ে দিয়ে পত্রিকার পাতা উল্টাচ্ছিলাম। দূর থেকে বন্ধুদের চিৎকার তাড়াতাড়ি কর, গাড়ি ছেড়ে দিচ্ছে। এটাই শেষ ট্রিপ। 

কিরে লাশ কাটবি না? 

লাশ? 

সেকি, আজ ফরেনসিক মেডিসিন ডিপার্টমেন্ট থেকে লাশ কাটতে নিয়ে যাবে। 

ও, পোস্ট মর্টেম। বাহ! ভালোই তো মর্গের গন্ধ যেন নাকে আসছে.... 

চল তাড়াতাড়ি.. 

ওহ বিমুগ্ধ সূর্যের আলোর মাঝেও চারদিক যেন অন্ধকার হয়ে আসছে, ভয়াল অন্ধকার। 

গাড়িতে উঠে দেখি সেকি একটা সিটও নেই সব ব্লক। 

ধুর, যা তোর জন্য এখন আমাকেও দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। 

হঠাৎ চারদিকটা ভয়ানক অন্ধকার হয়ে গেল। ইয়া আল্লাহ! এমন হচ্ছে কেন? 

বাস চলছে, বাসের ভেতরে সবার চোখগুলো যেন লাল রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। ওহ মাথাটা ধরে আসছে...... 

হঠাৎ ফরেনসিকের মামার চিৎকার। সবাই নামেন মর্গ চলে আসছে। মর্গ! বুকটা কেঁপে উঠলো! 

না চারদিকটা যেন আবার আলোকিত হয়ে গেছে। আমি বুঝতে পারছি না কী হচ্ছে আমার সাথে। সবকিছু এমন লাগছে কেন? 

চিৎকার করে চোখ মুছতে মুছতে উঠে বসলাম, কিন্তু কেউ আমার দিকে চাইলো না। ধীরে ধীরে একটা অন্ধকার কামরায় চলে যাচ্ছে সবাই। মনে হচ্ছে নভো থিয়েটারের কৃত্রিম মহাকাশ।

ধীরে ধীরে সবাই অন্ধকারে মিশে যাচ্ছে... 

বললাম, মামা সবাই কোথায় যাচ্ছে? 

আপনে বসে আছেন ক্যান দ্রুত যান ঐডাই তো লাশ কাটা ঘর। দ্যাখেন স্যার আসছে। তাড়াতাড়ি যান নাইলে ঢুকতে দিব না। 

ঠিক আছে মামা যাচ্ছি। 

হাত পা কাঁপছে, ঘুটঘুটে অন্ধকার অথচ কিছুক্ষণ আগেই আলো ছিল। কী ভয়ার্ত সময়। রুমে ঢুকে হতবাক, সেকি আমার বন্ধুরা কোথায়? কারোও চেহারা দেখা যাচ্ছে না শুধু চোখ দুটো লালচে হয়ে জ্বল জ্বল করছে। কোন সাড়া শব্দ নেই, মৃত আত্মারা জেগে উঠছে ঘুর ঘুর করছে চারদিকে। গায়ের রোমগুলো খাড়া হয়ে গেছে। বিকট একটা শব্দ দিয়ে স্যার এলেন। 

ভয়ানক কণ্ঠে বলছেন কেমন আছো সবাই? 

স্যারের চোখ দুটো থেকে অনবরত রক্ত ঝরছে। হঠাৎ ঘুরাঘুরি করতে থাকা একটা আত্মাকে ধরে স্যার স্টিলের লাশকাটা চকিতে শোয়ালেন । গা ছম ছম করছে।

মনে হচ্ছে এইতো আমি শেষ, নিজেকে আর সামলাতে পারছি না। মাথা ঝিমঝিম করছে। মস্ত বড় একটা ছুরি নিয়ে স্যার বসিয়ে দিলেন। অমনি ফিনকি দিয়ে রক্ত এসে পড়লো। সেকি লাশ থেকে এভাবে রক্ত বের হয় তো শুনিনি। ওহ সাদা এপ্রনটা লাল হয়ে গেল! 

ফিনকি রক্ত এবার চোখে এসে পড়লো, চিৎকার করে চোখ উঠে বসলাম, চোখ খুলে ফেললাম। দেখলাম রক্ত নয় আসলে ঘুম ভাঙাতে রুমমেট চোখে পানি মারছে..., রুমমেট আমার চিৎকারে ভয়ই পেয়ে গেল।

কী হল? আজ না অটোপসি। যাবি না?

সবকিছু অদ্ভুত লাগছে। এতক্ষণে বুঝতে পারলাম আসলে আমি এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিলাম। কী অদ্ভুত স্বপ্ন!

সারা রাত লাশ কাটার কথা ভাবতে ভাবতে অদ্ভুত জগতে হারিয়ে গেলাম। আটটায় বাস ছেড়ে যাবে ঢাকা মেডিকেলে। সময় নেই। দ্রুত রেডি হয়ে নিলাম। 

জীবনে প্রথম পোস্ট মর্টেম দেখবো। অন্যরকম এক অনুভূতি। দৌঁড়ে গেলাম। একটা সিটও ফাঁকা নেই। সব সিট দখল হয়ে গেছে। অগত্যা ইঞ্জিনের উপরে বসে পড়লাম। মাথাটা সত্যি ঝিমঝিম করছে, এমন আজব স্বপ্ন আর দেখিনি। 

গাড়ি চলছে। চিরচেনা জ্যামের নগরী, সাইন্সল্যাব পেরিয়ে বুয়েটের পাশ দিয়ে সোজা ঢাকা মেডিকেলে এসে থামলো বাস। 

হুড়হুড় করে নেমে পড়লাম। দৌঁড় দিলাম সামনে লাশকাটা ঘরের দিকে। দেখলাম কত মানুষ বসে আছে আপনজনের লাশের জন্য অথচ আমরা অপেক্ষা করছি সেই লাশ কাটা দেখার জন্য। 

কী অদ্ভুত মানুষের জীবন!অপেক্ষমান মানুষদের চোখে কত ক্লেশ, নিরাবেগ অনুভূতি নিয়ে বসে আছে। 

মেডিকেলের ছেলেমেয়েরা সাদা এপ্রন গায়ে জড়িয়ে চলছে পথ, নতুন স্বপ্ন বাঁধার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। আর ওদিকে লাশগুলো পড়ে আছে কেউ বেয়ারিশ আর কেউ পরিচিত হয়েও নির্মম বাস্তবতার মুখে ঠেকে গেছে। নাহ! সব ভাবনা বাদ দিয়ে হেঁটে চললাম। 

লেকচার ক্লাসে নির্মোহ চিত্তে শুনলাম স্যারের কথা। 

লেকচার শেষ, এবার সেই কাঙ্ক্ষিত সময়। লাশকাটা দেখতে আর বেশি দেরি নেই। 

পোস্টমর্টেম শুনে এসেছি ছোটবেলা থেকে আজ প্রত্যক্ষ করবো ইনশাআল্লাহ।

অদ্ভূত অনুভূতি। বুঝতে পারছি না কেমন লাগছে। বুকটা দুর দুর করে কাঁপছে। 

পারবো তো সহ্য করতে নাকি অচেতন হয়ে যাব। 

লাশের গন্ধ আসছে। সবাই মুখে মাস্ক লাগালো আর আমি মাস্ক আসতেই ভুলে গেছি!

বিদঘুটে গন্ধ! 

ঢুকে পড়লাম সেই রুমে। দেখলাম, পর পর তিনটি লাশ পড়ে আছে। 

এক বয়োবৃদ্ধ মানুষের লাশ পড়ে আছে, যিনি প্রিজন সেলে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেন। 

অন্য লাশটি ষাটের কাছাকাছি বয়সের এক ব্যক্তির যিনি গলায় ফাঁস দিয়েছেন অভিমান করে কিংবা অন্য কিছু। আর যার লাশটি কাটার জন্য তৈরি করা হচ্ছে সে ঝগড়া করতে গিয়ে মাথায় আঘাত খেয়ে মারা যায়। 

কীভাবে মৃত্যু চলে আসলো মানুষ বলতেই পারেনি অথচ ছোট্টবেলায় দেখা তার সুন্দর অসাধারণ স্বপ্নগুলো এখনো পূর্ণ হয়নি।

স্যারের অপেক্ষায় বসে আছি আমরা আর ডোম। 

ধীরে ধীরে বুকের ধুপধুপিটা বাড়ছে। সাহস সঞ্চার করতে লাগলাম। আর আল্লাহকে ডাকলাম হে আল্লাহ সাহস দিন। 

স্যার এসে গেছেন। শরীরে কিছুটা ঘাম ঝরছে। ভয়টা যেন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। 

স্যার ডাকলেন সবাইকে, লাশকে ঘিরে গোল হয়ে দাঁড়াতে বললেন। 

গোল হয়ে সবাই দাঁড়ালাম। ভয়ই চারদিক বন্ধ হয়ে আসছে, অথচ ডোম দাঁত বের কিছুটা খিলখিল করে হাসছেন। তার মাঝে কোনো ভয় নেই। 

স্যার তো টিচার মানুষ, ভয়ের চোটে জীবন যায় আর স্যার সেখানে পড়া ধরা শুরু করলেন। কিসের কি একদিকে লাশের ভয় অন্যদিকে স্যারের ভয়। সবার পেছনে গিয়ে মাথা লুকাতে শুরু করলাম। 

ডোম ছুরিটা হাতে নিলেন। 

লাশ সাধারণত তিনভাবে কাটা হয়। I, Y, এবং মোডিফাইড Y ইনসিশ এই তিনভাবে কাটা হয়। 

ডোমের ছুরি প্রস্তুত, কাটা শুরু করবেন। চোখটা হাফ বন্ধ করছি আর খুলছি। ভয়ংকর লাগছে। মনে হচ্ছে যেন এই বুঝি পড়ে যাব। 

বসিয়ে দিলেন ছুরি, ছ্যাত করে উঠলো। কী ভয়ানক, ওহ মনেও বুঝি শান্তি নেই। প্রথমে গলার নিচ থেকে চির চির করে ছুরি দিয়ে টান দিচ্ছেন, তাকিয়ে আছি। 
সবার অবস্থা কমবেশি বেহাল। 

যতক্ষণে লাশের উপরের দিকটা কাটা হল ততক্ষণে এক ফ্রেন্ডের মাথা ঘোরা শুরু করছে। 

ডিউটিতে আসা স্যার এগিয়ে গেলেন। 

ওকে বের করে নিলেন, বসালেন দূরে। 

আপাতত কেউ অজ্ঞান হয়নি। 

মাথা ঝিমঝিম করছে। চারদিক থেমে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, যেন শরীরটা ভারি হয়ে গেছে, পা চলছে না। 
স্যার অভয় দিলেন।

শরীর উপরের অংশ কাটা হল। মধ্যখানটা বিদীর্ণ করে হৃৎপিণ্ড ফুসফুস লিভার সব বের করা হল। তাকিয়ে শুধু দেখছিলাম আর দেখছিলাম। 

আল্লাহর কাছে দোয়া করলাম, হে আল্লাহ এমন মৃত্যু থেকে আমাকে মুক্তি দাও। এবার মাথা খণ্ড করা পালা।

কী অদ্ভুত সব, ঠক ঠক করে ততক্ষণে মাথাটাও খুলে ফেলা হল।

সবকিছু অন্যরকম লাগছে। 

ধীরে ধীরে নিজেকে সামলে নিলাম, আলহামদুলিল্লাহ নিজেকে কন্ট্রোল করতে পেরেছি। 

ভয়ংকর অভিজ্ঞতা পেলাম জীবনে। লাশকাটা ঘরে ভূত থাকা নিয়ে অনেক প্রচলিত গল্প আছে। ভৌতিক কাহিনীও কম হয় না, কেউ বলে হ্যালুসিনেশন কেউ বলে সত্যি। ভূত থাকুক না থাকুক লাশকাটা ঘর ভয়ানক। এখানে বৈধপন্থায় মানুষ কাটা হয়। না আর আসতে চাই না এ প্রান্তরে। এভাবে মানুষের অস্বাভাবিক মৃত্যু দেখতে চাই না। এমন মৃত্যু থেকে রক্ষা করুন। আমিন।

[সম্মানিত চিকিৎসক ও প্রিয় মেডিকেল শিক্ষার্থী, আপনিও মেডিভয়েসের অংশ হয়ে উঠুন। মেডিকেল লাইফ, রোগব্যাধি, রোগের কেস স্টাডি, স্বাস্থ্য,চিকিৎসক সংগঠন ও মেডিকেল শিক্ষার্থীদের ভ্রমণ সংবাদ,অভিজ্ঞতা, সায়েন্স ফিকশন, গল্প, কবিতা, নারী স্বাস্থ্য, যৌন স্বাস্থ্য, ক্যারিয়ার, পরামর্শ ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- [email protected]-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নাম ও ছবিসহ প্রকাশ করা হবে।]

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত