ঢাকা শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ৩ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ৩ ঘন্টা আগে
কামারুজ্জামান নাবিল

কামারুজ্জামান নাবিল

ছাত্র, ডক্টর অব মেডিসিন, ইস্পাহান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ইরান


০৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ১৩:০৯

আপনার ধূমপানে যেভাবে জটিল রোগে আক্রান্ত হতে পারে শিশু!

আপনার ধূমপানে যেভাবে জটিল রোগে আক্রান্ত হতে পারে শিশু!

ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, এই বদ অভ্যাসের কারণে শরীরে ক্যান্সারের মত মরণব্যাধি সৃষ্টি হতে পারে-এটা আমাদের সবারই জানা। কিন্তু ধূমপান না করেও আপনি বা আপনার শিশুটি ধূমপায়ীদের মত স্বাস্থ্যের ঝুঁকিতে এবং জটিল রোগে আক্রান্ত হতে পারে তা কয়জন জানি? 

যারা ধূমপান না করেও পরোক্ষভাবে ধূমপায়ীদের সিগারেটের ধোঁয়ার সংস্পর্শে আছেন সেটাকে আমরা ‘সেকেন্ডহ্যান্ড ধূমপায়ী’ হিসেবে আখ্যায়িত করতে পারি।  নিঃশ্বাসের সঙ্গে আমরা সেকেন্ডহ্যান্ড ধূমপায়ী হতে পারি। এমন হলে প্রতিনিয়ত নিজেদের অজান্তেই প্রায় ৪০০ রাসায়নিক যৌগ ধূমপায়ীদের মত আমাদের শরীরে প্রবেশ করছে। যে রাসায়নিক যৌগগুলোর মাঝে প্রায় ৫০টি মরণব্যধি ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে। 

আমেরিকার পেডিএট্রিক্স একাডেমি এক গবেষণায় জানায়, থার্ডহ্যান্ড ধূমপায়ীও আমাদের মাঝে রয়েছেন। সেটা কেমন উত্তরে জানা যায়, সরাসরি ধূমপায়ীদের সংস্পর্শে না থাকলেও এমন কিছু স্থানে তারা অবস্থান করছেন বা যাচ্ছেন যেখানে কিছুক্ষণ আগে কেউ ধূমপান করেছেন। এসব স্থানে ধূমপানের টক্সিন পাওয়া যেতে পারে। যেমন তা হতে পারে গাড়ির সিটে, গৃহসজ্জার সামগ্রীতে, ধূমপায়ীর জামাকাপড়ে, ধূমপায়ীর শরীরে, এমনকি চুলেও ধূমপানের বিষাক্ত রাসায়ানিক থেকে যায় কমপক্ষে তিন-চার ঘণ্টা।

যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড থেকে প্রকাশিত  ‘নিকোটিন অ্যান্ড টোব্যাকো রিসার্চ’ সাময়িকীতে প্রকাশিত বাংলাদেশকে নিয়ে করা এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ঢাকা সিটি করপোরেশন ও আশেপাশের এলাকার ৯৫ শতাংশ শিশুর শরীরে ক্ষতিকর নিকোটিন রয়েছে। যার কারণ হচ্ছে, সেকেন্ডহ্যান্ড ধূমপায়ী বা পরোক্ষভাবে ধূমপায়ীর সংস্পর্শে থাকা। 
এছাড়াও রাজধানীর মিরপুর এলাকার ছয়টি ও সাভার এলাকার ছয়টি প্রাথমিক স্কুলের শিশুদের মাঝে লালা পরীক্ষা করা হয় যার মাঝে ৪৭৯টি শিশুর লালায় ক্ষতিকর নিকোটিন পাওয়া যায়। 

ধূমপানের বিপজ্জনক দিকগুলো
সাধারণত পরামর্শ দেওয়া হয় পারতপক্ষে গর্ভকালীন সময়ে ধূমপান থেকে বিরত থাকার জন্য। এক গবেষণায় দেখা গেছে, গর্ভধারিণী নিজে ধূমপান থেকে বিরত থাকলেও পাশের বা পরিবারের কোন সদস্য যদি ধূমপান করেন তবে তিনিও ‘সেকেন্ডহ্যান্ড ধূমপায়ী’ হিসেবে ঝুঁকির মাঝে রয়েছেন। যেটা আপনার নিজের জন্য ও আপনার শিশুর জন্য ক্ষতি বয়ে আনতে পারে। 
এই ক্ষেত্রে যে সমস্যাগুলো তৈরি হতে পারে-
১, মিসক্যারেজ হতে পারে (ডিম্বাণু নিষিক্ত হওয়ার পর পরবর্তী পাঁচ মাসের (২০ সপ্তাহ) মধ্যে যে কোন সময়ে প্রসবের রাস্তা দিয়ে বের হয়ে যাওয়াকেই মিসক্যারেজ বলে)। 
২, অপরিপূর্ণ শিশু জন্ম দেয়া।
৩, শিশু স্বাভাবিক ওজনের চেয়ে কম ওজনের হতে পারে। 
৪, Sudden infant death syndrome (SIDS) বা 'অকাল মৃত্যু' সিন্ড্রোমে আক্রান্ত হতে পারে।
৫, শিশুর বিভিন্ন বিষয় শেখার ক্ষেত্রে অথবা মনযোগে সমস্যা দেখা দিতে পারে। 
৬, শিশুরা খুব দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়। তাছাড়া শিশুদের শ্বাসনালীর আকারও অনেক ছোট। সেক্ষেত্রে ধূমপায়ীর ধোঁয়ায় শিশুদের শ্বাসনালী আর ফুসফুস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে তাদের সর্দিকাশি, ব্রঙ্কাইটিস, হাঁপানি ও নিউমোনিয়ার ঝুঁকি অনেকটাই বেড়ে যায়। 
৬, দাঁতের ক্ষয়রোগ দেখা দিতে পারে। 

দীর্ঘমেয়াদী যে প্রভাবগুলো পড়তে পারে
১, ধূমপায়ী অভিভাবকদের দেখে বড় হওয়া শিশুরা ধূমপায়ী হবার সম্ভাবনা অনেকগুণ বেশি। 
২, ফুসফুসের সঠিক গঠন না হওয়া ( ফুসফুসের কাজ হ্রাস পায় )।  
৩, ফুসফুসের ক্যান্সার। 
৪, হৃদরোগ। 
৫, Cataracts  (চোখের ছানি)। 
রক্ষা পেতে আমরা যা করতে পারিঃ প্রথমত, ধূমপান থেকে পুরোপুরি দূরে থাকার চেষ্টা করাই হলো রক্ষার উত্তম পথ। আর তা সম্ভব না হলে বাসার বাইরে ধূমপান করা যেতে পারে। আর বাসায় একান্তই ধূমপান করতে চাইলে আলাদা একটা জায়গা ধূমপানের জন্য নির্ধারণ করা যেতে পারে, যে জায়গায় ধূমপানের সময় বা অন্য সময়ে অন্যদের প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত রাখা।

দ্বিতীয়ত, অনেককেই দেখা যায় কারে অথবা বাসে জানালার গ্লাস নামিয়ে ধূমপান করে থাকেন এটা ধূমপানের ধোঁয়ার বের হবার জন্য যথেষ্ট না। অন্যদিকে চলন্ত অবস্থায় বাইরের বাতাস ভেতরে আসায় ধোঁয়া আবারো যানবাহনের ভেতরেই চলে আসে। তাই যানবাহনে ধূমপান করা থেকে বিরত থাকা উচিত। 

তৃতীয়ত, স্কুলে আপনার শিশুকে ভর্তি করার পূর্বে জেনে নিতে পারেন সেই স্কুলে অবস্থানকালীন সময়ে কেউ ধূমপান করেন কিনা। যে স্কুলকে বলা যেতে পারে টোবাকে ফ্রি স্কুল বা কেয়ার সেন্টার। 
চতূর্থত, বাচ্চারা যেখানে খেলাধূলা করে তাদের আশেপাশে কেউ ধূমপান করেন কিনা তাও খেয়াল রাখতে পারেন।
পঞ্চমত, রাস্তা বা পাব্লিক জায়গায় কেউ ধূমপান করলে তাকে সচেতন করতে পারেন। 

লেখক: কামরুজ্জামান নাবিল
ছাত্র, ডক্টর অব মেডিসিন, ইস্পাহান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ইরান
ই-মেইল: [email protected]  

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত