ঢাকা      সোমবার ১৯, নভেম্বর ২০১৮ - ৪, অগ্রাহায়ণ, ১৪২৫ - হিজরী



মো: গোলাম মোস্তফা

চিকিৎসক ও লেখক


যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করলে রোগীরা বিদেশে যাবে না

কিছুদিন আগে দাদাদের দেশে অর্থাৎ ভারতবর্ষে গমন করেছিলাম টেনিং ও পোস্ট গ্রাজুয়েশন ডিগ্রীর বিষয়ে তথ্য নিতে। আমার যাত্রা সঙ্গী যারা ছিলেন তারা ৯০% ভারতে যাচ্ছেন চিকিৎসার জন্য।

প্রতিদিন গড়ে হাইওয়ে রোড বা আকাশ পথে কমপক্ষে একহাজার মানুষ ভারতে যায়। এরা সবাই একসাথে রথও দেখে আবার কলাও বেঁচে। অর্থাৎ বেড়াতে গিয়ে স্বাস্থ্যগত চিকিৎসা নেন।

আমি প্রায় বাংলাদেশ হতে ১০০ জন রোগীর সাথে কথা বলেছিলাম, আপনারা বাংলাদেশ চিকিৎসা না নিয়ে ভারতে কেন আসলেন? তাদের উওর বাংলাদেশে সঠিক রোগ নির্ণয় হয় না, বাংলাদেশের ডাক্তাররা রোগীদের সময় দেয় না, কসাই শুধু ট্যাহা চেনে তারা রোগী দেহে না। বাংলাদেশের ডাক্তাররা ভাল না ইত্যাদি।

আমি কয়েকজন রোগীকে বললাম, আপনারা এখানে এসেছেন তাতে আপনার রোগ কি একবারে ভাল হয়ে যাবে? তাদের উওর ভারতে চিকিৎসা নিয়ে আমরা এখন আগের চেয়ে ভাল আছি।

প্রিয় চিকিৎসক সমাজ রোগীদের ভাষ্যমতে আপনাদের মেধা নেই, আপনারা লোভী কসাই, আপনারা রোগীদের সঠিক রোগ নির্ণয় করতে পারেন না, আপনাদের চিকিৎসা ভাল না!

বাস্তবিক ভাবে আমাদের দেশের চিকিৎসক সমাজ অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক মেধাবী ও আমাদের দেশের চিকিৎসা ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক এগিয়ে।

প্রশ্ন হলো, তাহলে আমাদের দেশের মানুষ কেন বিদেশে চিকিৎসা নিতে যায়? আর দেশের টাকা চিকিৎসার নামে কেন পাচার হচ্ছে?

হ্যাঁ। আপনারা চাইলে রোগীদের এসব খারাপ মন্তব্য ও রোগীদের আস্থা অর্জন করতে পারেন। কিভাবে?

১. আপনারা রোগীদের সময় দেন তারা কী বলতে চায় সব কিছু শুনুন, তাদের সকল হিস্টরি নেন, সিস্টেমিক এক্সামেনেশন জেনারেল এক্সামেনেশন করুন।

২. সঠিক রোগ নির্ণয়ের জন্য ল্যাবরেটরি পরীক্ষা প্রয়োজন যেখানে ইনভেস্টিগেশন করতে দিচ্ছেন সেই হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের রিপোর্ট কি আসলে মান সম্মত? নাকি বালতির ধরে স্যাম্পল কালেকশন করে সব নরমাল রেঞ্জে রিপোর্ট দেয়। বিশেষ করে যারা পেরিফেরিতে প্রাইভেট চেম্বার করেন তাদের খুবই বিড়ম্বিত হতে হয়।

৩. সঠিক রোগ নির্ণয় না হওয়ার কারণ বা রিপোর্ট ভুল হওয়ার কারণ আমাদের দেশের যারা মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ল্যাবরেটরি ও এক্সরে, এদের শিক্ষার ধরণ দুই ধরণের বাংলাদেশ হেলথ সাইন্স অনুষদের অধীনে যেটা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে, যেটার জন্য বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পরীক্ষার মাধ্যমে চান্স পেতে হয়। এখান থেকে দক্ষ জনবল পাশ করে বের হয়।

আর দ্বিতীয় শিক্ষার মাধ্যম হচ্ছে, বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এখানে বিজ্ঞান বিভাগ লাগে না, মানবিক, কমার্স, মাদ্রাসা, দাখিল যেকোন বয়সে পড়াশুনা করা যায় এবং এখান থেকে ক্লাশ না করেও সার্টিফিকেট পাওয়া যায়। এবং এরা কিভাবে দক্ষ টেকনোলজিস্ট তৈরি হবে, এবার আপনারাই বলুন? আর এদের রিপোর্ট কি ১০০% সঠিক হবে? Never Ever!

আবার অনেক টেকনোলজিস্ট আছে তারা নিজেরা রিপোর্ট প্রদান না করে, তাদের সহযোগী বা হেল্পার দিয়ে রিপোর্ট দিয়ে থাকে।

৪. নিয়ম অনুসারে সকল প্যাথলজী রিপোর্টে একজন এমবিবিএসসহ প্যাথলজিস্ট পাশকৃত ডাক্তার রিপোর্ট দেখে তারপর সাইন করবে কিন্তু আমাদের দেশের প্যাথলজিস্ট আগেই রিপোর্টের সাদা পেইজে সাইন করে রাখেন, সেই পেইজে টেকনোলজিস্টরা রিপোর্ট প্রিন্ট দিয়ে থাকেন।

৫. যারা এক্সরে টেকনোলজিস্ট থাকেন, আপনি এক্সরে লিখে দিলেন, X-ray Abdomen E/P view,x-ray mastoid townes view, অনেকেই আছেন এসব এক্সরের জীবনে নামই শুনেনি, সেক্ষেত্রে কোন পজিশিনে করতে হবে এক্সরে সেটা তো জানার কথাই না, সেক্ষেত্রে আপনি কিভাবে সঠিক রিপোর্ট আশা করেন। সেক্ষেত্রে সঠিক ডায়াগনোসিস কিভাবে আশা করেন? ঠিক তেমনি সিটি স্কেন, এমআরআই সকল ক্ষেত্রে একই অবস্থা।

৬. সঠিক রোগ নির্ণয়ের জন্য আল্ট্রাসনোগ্রাম আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কিন্তু আমাদের দেশে আল্টা করতে সনোলজিস্ট লাগে না, আবার যারা সনোলজিস্ট একমিনিটে দুইটা আল্ট্রাসনোগ্রাম করা শেষ হয়ে যায়। তাহলে আপনি কিভাবে সঠিক রোগ ডায়াগনোসিস করবেন?

৭. এখন আবার আমাদের দেশে নতুন সেবা চালু হয়েছে এক্সরে বা সিটি স্কেন, এমআরআই রিপোর্ট অনালাইনে দিয়ে থাকেন। আমি কিছুদিন আগে একটা অনলাইন রিপোর্ট দেখলাম, রেডিওলজিস্ট X-ray Chest P/A এর রিপোর্ট প্রদান করেছেন সবকিছু নরমাল। আর আমি বাস্তবে ফ্লিমটা দেখিলাম Right side এর Chest ribs 6,7,8 ক্লিয়ার দেখা যাচ্ছে Fracture, অথচ রিপোর্ট এসেছে নরমাল। তাহলে আপনি কিভাবে সঠিক রোগ নির্ণয় করবেন?

৮. যাহোক যাও আপনি রোগ ডায়াগনোসিস করলেন কিন্তু কিছু চিকিৎসক ঔষধ কোম্পানির কমিশনের লোভে মানহীন ঔষধ ব্যবস্থাপত্র দিয়েছে, কিন্তু সেই মেডিসিন খেয়ে রোগীর রোগ তো নিরাময় হবেই না বরং কন্টাইন্ডিকেশন হওয়ার সম্ভবানাই বেশি। তাহলে তো রোগীরা ভারতে চিকিৎসা নিতে যাবেই।

৯. উন্নত মেশিন আছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য। কিন্তু দক্ষ জনবল নাই সঠিক রোগ নির্ণয়ের যারা জন্য আজ চিকিৎসক সমাজ সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়।

১০. অনেক চিকিৎসক আছেন সরকারি কর্মজীবী, তাদের ৯ টা থেকে দুপুর ২ টার মধ্য ১০০-২০০ রোগী আউটডোরে সেবা দিতে হয়, সেক্ষেত্রে একটা রোগী কতটুকু সময় পাবে? যাদের প্রতিনিয়ত এমন সমস্যার সসম্মুখীন হতে হয় তাদের উদ্দেশ্য বলছি, আপনারা সময় নিয়ে প্রয়োজনে ২০জন রোগী দেখুন আর বাকি রোগীদের পরের দিন আসতে বলুন দেখবেন, রোগীরা সোজা রাস্তায় চলে এসেছে।

১১. সরকারি হাসপাতালে যেসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয় সেগুলো হাসপাতালেই করাতে বলুন, দেখুন রোগীদের আস্থা ফিরে এসেছে।

১২. প্রাইভেট ক্লিনিকে যারা প্রাক্টিস করেন, তারা যেখানে মানহীন রিপোর্ট মনে হয়, সেখানে ইনভেস্টিগেশন করতে নিষেধ করুন রোগীদের।

যাই হোক দাদাদের কথা তো হলো, জানি না দাদা কাজ কতটুকু হবে, সেটা আপনাদের উপর নির্ভর করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


সম্পাদকীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

মেধাবীদের রাজনীতিতে আসা উচিত

মেধাবীদের রাজনীতিতে আসা উচিত

  অষ্টম শ্রেণীতে ভিত্তি পরীক্ষার জন্য গ্রাম থেকে চাঁদপুর মফস্বল শহরে যাই।বাংলা পরীক্ষায় রচনা…

পৃথিবীর রহস্যময় বিজ্ঞানী কারা?

পৃথিবীর রহস্যময় বিজ্ঞানী কারা?

পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত অসম্ভব বলে যা কিছু আছে, তার মধ্যে একটি হল…

রক্তের ভিতরেই যখন সুস্থতা

রক্তের ভিতরেই যখন সুস্থতা

বাচ্চাগুলোর শরীরের রক্তগুলো কিছুদিন পরপরই কে যেন খেয়ে ফেলে। আসলে ওদের শরীরে…

গালি নিয়ে কিছু কথা

গালি নিয়ে কিছু কথা

গালাগালি আর শপথ নিয়ে মনোবিদ্যার একটা শাখা আছে।এটাকে Maledictology বলে। রেইনহোল্ড আম্যান…

সুপারবাগ ও আমাদের পুরনো ব্রহ্মাস্ত্র

সুপারবাগ ও আমাদের পুরনো ব্রহ্মাস্ত্র

মানুষ বনাম ব্যাকটেরিয়া যুদ্ধের শুরু সেই হাজার বছর আগে থেকেই। হাজার বছর…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর