ডা. নাসিমন নাহার

ডা. নাসিমন নাহার

চিকিৎসক ও লেখক


৩০ অগাস্ট, ২০১৮ ০১:৩০ পিএম

জীবনের টুকরো গল্প

জীবনের টুকরো গল্প

আমাদের বোর্ডিং স্কুলে একজন খুব স্পেশাল বাচ্চা আছে। যে খানিকটা Hyperactive ( ডিটেইলস বলতে চাচ্ছি না। যখন এখানকার জব ছেড়ে দিব তখন ইচ্ছে আছে ওকে নিয়ে লিখব আমি )।

ধরা যাক ওর নাম প্রবাল। 

আমাদের এখানে স্কুলে এডমিশন টেষ্ট হবার পরে বোর্ডিং স্টুডেন্টদের মেডিকেল ফাইল তৈরি করতে হয় আমাকে। আমি যখন প্রবালের মেডিকেল টেষ্ট করছিলাম তখন বুঝতে পারছিলাম সে একজন স্পেশাল বাচ্চা। একজন এন্জেল সে। আমার সাথে সে আই কন্ট্রাক্ট করতে পারছিল না। মেডিকেল ডেস্কে রাখা তার জন্য নির্দিষ্ট চেয়ারে সে বসছিল না। সমানে ছুটোছুটি করছিল। যখন ওয়েট মাপতে গেলাম তখন তো সে আর নামবে না ওয়েট মেশিন থেকে। বার বার ই ওয়েট মাপবে। আর তাকে বার বার ওয়েটও বলতে হবে নার্সকে।

চোখের কোনে জল জমছিল আমার। গলার কাছে দলা পাকিয়ে যাচ্ছিল । ভীষন অভিমান হচ্ছিল সৃষ্টিকর্তার উপর। প্রবালের পরিবারের উপরেও।

মনে মনে বলছিলাম--- কেন কেন কেন ওকে বোর্ডিং স্কুলে দিতে হবে ? আই কান্ট একসেপ্ট ইট।

এত চমৎকার করে ইংরেজি, বাংলা বলে আমাদের প্রবাল মুগ্ধ হয়ে শুনবেন আপনি। শুধু ম্যাথ ভালো লাগে না তার। প্রবালের মায়ের সাথে লম্বা সময় নিয়ে কথা বলতে হলো আমাকে। জানলাম বাসায় প্রবালকে সার্বক্ষণিক দেখাশোনা করার জন্য দুজন লোক আছে। ওর মা হাইলি এডুকেটেড হবার পরেও জব ছেড়ে দিয়েছেন ছেলের বয়স যখন চার তখন। এখন আবার শুরু করবেন পিএইচডির জন্য লেখাপড়া। দুজন কাজের মানুষ, পিয়ন, ড্রাইভারসহ প্রবালের মা এসেছেন প্রবালকে বোর্ডিং স্কুলে রেখে যেতে।

আমাকে বোর্ডিং এ থাকা প্রতিটি বাচ্চার ফ্যামিলি হিস্ট্রি খুব ভালো মতো স্টাডি করতে হয় ওদেরকে বোঝার জন্য, জানার জন্য। সেখান থেকে জেনেছিলাম প্রবালের সমস্যা প্রকট হবার পরে তার বাবা মায়ের সেপারেশন হয়ে যায়। সেই সময় থেকে মায়ের সাথেই আছে প্রবাল। তখন তার বয়স ছিল পাঁচ/ছয়। এখন চৌদ্দ চলছে। রিসেন্টলি প্রবালের মা বিয়ে করেছেন। বাবা সেপারেশনের পরেই করেছিলেন বিয়ে। খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রবালের এখন কি হবে ? এই জটিলতাতে পড়তে হয়েছিল সম্ভবতঃ। যেহেতু প্রবালের পরিবারের টাকা পয়সার সমস্যা নেই সেহেতু একটা ইন্টারন্যাশনাল বোর্ডিং স্কুলে গ্রেড টুয়েলভ পর্যন্ত লেখাপড়া এবং থাকার সুযোগটি ওনারা লুফে নিয়েছিলেন। 
Definitely it's a good choice, 'ঘর কা না ঘাটকা' হবার থেকে বোর্ডিং স্কুল যথেষ্ট ভালো হবে প্রবালের জন্য।’

ছোট থেকে প্রবালের চিকিৎসা করছেন যে স্যার ( নাম বললে সবাই চিনবেন ) তার সমস্ত প্রেসক্রিপশনের ফাইলটা আমার হাতে তুলে দিলেন প্রবালের মা। আমার হাত চেপে ধরে খুব শান্ত ভাবলেশহীন গলায় বললেন----- আমার ছেলেটাকে প্লিজ দেখে রাখবেন ডক্টর। আপনি ক্যাম্পাসেই থাকেন এটা জেনে খুব নিশ্চিন্ত হয়েছি আমি। আপনাদের ভরসাতে রেখে যাচ্ছি ছেলেকে।

প্রবালের মায়ের চোখে কি জল ছিল ? 

নাকি চৌদ্দ বছর ধরে একজন স্পেশাল বাচ্চাকে, যাকে দশটা বছর সিঙ্গেল মা হিসেবে দেখাশোনা করে এই সমাজের সাথে যুদ্ধটা করেছেন তার থেকে মুক্তি প্রাপ্তির স্বস্তি ছিল ?

জানি না আমি...

শুভ কামনা রইলো প্রবালের মায়ের নতুন জীবনের জন্য। অবশ্যই তারও অধিকার আছে নিজের জীবনটাকে যাপন করার । বাবা তো চার বছরেই ফেলে চলে গেছে। এখন নাহয় মা ......... প্রবালেরা নাহয় আমাদের কর্তব্যে, জব ডেসক্রিপশনে, কাজের মাঝেই বেড়ে উঠুক।

দিনে বারোটা ওষুধ খেতে হয় যে বাচ্চাটাকে , 

যে বাচ্চাটা তার শারীরিক সব কষ্টের কথা তার চিকিৎসককে শব্দ দিয়ে বুঝিয়ে বলতে পারে না,

সে বাচ্চাটাকে যখন বোর্ডিং স্কুলে ভর্তি করা হয় তখন ঐ স্কুলে কর্তব্যরত আবাসিক চিকিৎসক হিসেবে আমার পাঁচ বেলার প্রার্থনাতে থাকে সে । যদিও জানা নেই সৃষ্টিকর্তা একজন চিকিৎসকের তার রোগীর জন্য করা দোয়া শোনেন কিনা...

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না