ডা. মুহাম্মাদ সাঈদ এনাম ওয়ালিদ

ডা. মুহাম্মাদ সাঈদ এনাম ওয়ালিদ

চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট, জনস্বাস্থ্য গবেষক।


৩০ অগাস্ট, ২০১৮ ০১:০০ পিএম

স্যার কথা রেখেছিলাম

স্যার কথা রেখেছিলাম

মামা স্ল্যামালাইকুম'

ওয়ালাইকুম-সালাম, আরে মামা আপ্নেরা...! সূর্য মামা আইজ কুন দিকে উঠছেন? তয় কী মনে কইরা মামারা?

'না... মামা। কিছু না। এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম, ভাবলাম আপনার সাথে দেখা করে যাই। আপনি কত উপকার করেছেন। খুব কস্ট করে প্র্যাকটিকেল ক্লাসে সব কিছু হাতে ধরে শিখিয়েছেন..."

'আরে কন কি, প্র্যাকটিকেল ক্লাসেতো হাতে ধরেই শিখানো হয়। তয় ক্যান আইছেন কইয়ালান'

'না মামা, এমনি। সামনে পরীক্ষা, জানি না আপনার সাথে আর দেখা হবে কিনা, ভাবলাম আপনার দোয়া নিয়ে যাই'

'ও এইডা, হে হে যান যান মামা। লেটার নিশ্চিত। তয় আপ্নেগো দুইজনরে ক্লাসে খুব কম পাওয়া যাইতো, হেদিন সারেরা আলাপ করতেছিলো, কয়ডা ছাত্র খুব ভালো, কিন্তু খুব ফাঁকিবাজ '

'না মামা, তওবা তওবা আস্তাগফিরুল্লাহ। ফাঁকি না মানে, সারা বছর একটু সর্দি কাশি, এটা সেটা লেগেই থাকে, তাই ক্লাসে মাঝেমধ্যে আসতে পারি না'

'হয় হয় বুঝি বুঝি। তয় মাঠেতো একদিন যাওয়া মিস হয় না আপ্নেগো, যাউগ্যা আইছেন যখন, বহেন। চা তা দিমুনি?'

'আরে না মামা, আপনি চায়ের কথা বলছেন, আমাদের খাওয়া হয়ে গেছে। আচ্ছা মামা আপনি খুব ভাল, আপনার দেশের বাড়ি কই?'

'আমার? আমার বাড়ি দিয়া কী আর করবেন, তয় জিগাইলেন যখন, এই বরিশাল আরকি.'

'তাইতো বলি মামা, আপনি কী সুন্দর করে কথা বলেন, একেবারে বরিশালি আমড়ার মতো মিস্টি কথা গুলো।

'হে হে মামা। আপনি যে কি কন। আপনারাও খুব সুন্দর করে কতা কন'। আমার দিকে ঈংগিত করলেন।

কেমেস্ট্রির প্র্যাকটিকেল ক্লাসে সহকারী ছিলেন রফিক সাহেব। উনাকে আমরা মামা ডাকতাম। মামার মাথায় ঈষৎ টাক ছিলো। টাক মাথায় মরা দুর্বা ঘাসের মতো দু একটা চুল খুব সুন্দর করে সযত্নে তিনি আঁচড়িয়ে রাখতেন। এতে চুল কম যে সেটা বুঝা যেতো না। আর সেই চুলগুলোতে কলপ দিয়ে কোন মতে তিনি তালুটাকে ঢেকে রাখতেন।

কিন্তু এতে খুব একটা লাভ হতো না। মেঘে ঢাকা সূর্য যখন হঠাৎ হঠাৎ চক চক করে উঠে তেমনি মাঝেসাজে জাপটা বাতাসে চুল দুখানি সরে গিয়ে মামার চিক চিক তালুটা বেরিয়ে আসতো। মামা তখন হাত দিয়ে আবার সেই চুল গুলো ঠিকঠাক করে তালুটা ডেকে দিতেন। মামা তাই ফ্যানের ঝাপ্টা বাতাস সব সময় এড়িয়ে চলতেন। আসলে অল্প বয়সে মামার মাথায় টাক পড়ে যায়। এতে যা হয় আরকি।

আমি মামার চুলের দিকে ইংগিত করে বললাম,

'মামার চুল গুলো খুবই সুন্দর। এ বয়সেও কুচকুচে কালো আর ঘনো। দ্যাখেন দ্যাখেন আমার মাথার চুলে এখনি পাক ধরেছে, লজ্জায় বাঁচি না'

মামা খুশিতে বাকুম বাকুম। তিনি লজ্জায় লাল হয়ে ষোড়শীর মতো বললেন, 'যাহ, কি যে বলেন..'

'আরে না না মামা। সত্যি। মামি কিছু বলেন টলেন না নাকি? তাছাড়া আপনি কি স্মার্ট থাকেন, আমাদের দেখে হিংসে হয়', আমি আরো এগ্রেসিভ হয়ে বললাম।

'হ্যা। মামা। আপনাদের মামি মাঝেমধ্যে তাই বলেন' মামা বললেন।

'জ্বী মামা, ইউ আর রেয়েলী ড্যাম স্মার্ট। আচ্ছা আপনি যখন মামা ছাত্র ছিলেন, তখন সমস্যায় পড়তেন না? এই যেমন ধরুন সহপার্টিনীরা টুকটাক ক্রাস ট্রাস খেতো না?'

এইবার মাম হাসতে হাসতে মাটিতে লুটায়া পড়ার মতো অবস্থা। আমাকে সহপাঠী ও বন্ধু টিংকু চোখে ঈশারা দিয়ে বললো, 'চালায়া যা। কাম হয়ে গেছে।

আমি ভাবলাম এখনই মোক্ষম সুযোগ। কথাটি তবে পাড়া যায়।

'আচ্ছা মামা। তবে যাই দোয়া করবেন'

'হ্যা হ্যা মামারা যান। দোয়া আছে দোয়া আছে... লেটার নিশ্চিত', উল্লসিত মামা তার সুন্দর দাত গুলো বের করে হেসে হেসে বললেন।

যাবার আগে ফের তার দিকে তাকয়ে আসল কথা পাড়লাম, 

'মামা..ওম..'

মামা বললেন, 'কী ব্যাপার আমতা আমতা করছেন ক্যান, কী কইবেন কন, মামা আছি না..'

'মামা, একটু পানি খাবো, বাথরুমেও যাবো'

'ওহ হ এই ব্যাপার । তয় মামা খুব সমস্যা হয়ে গেলো যে, প্যাকটিকেল রুমতো লাগিয়ে ফেলেছি... কি যে করি...'

আমি বললাম, 'না থাক। আপনাকে আর কস্ট না দেই। ক'দিন পরতো চলেই যাবো। হোস্টেলেই গিয়েই হবেনে...'

মামা বললেন, 'আরে না থাক। আসেন। আমি স্যারের রুম খুলে দেই। প্রয়োজন সেরে আসেন'

আমি আর টিংকু পরস্পর মুখ চাওয়া চাওয়ি করলাম। আমাদের কাজ হয়ে গেছে।

দুই.

স্যারের রুমে ঢুকেই টেবিলের দিকে তাকিয়ে কাংখিত জিনিষটা খুঁজতে লাগলাম। ওটা স্যার টেবিলে এক কোনে রাখতেন। হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। না ওটা জায়গাতেই বসে বসে ঝিমুচ্ছে। কিন্তু মামা যে চোখের সামনে দরজায় দাঁড়িয়ে। নট নড়ন চড়ন। নো ধুনুমুনু। ঘুরে বললাম, 

'মামা বাথরুমে পানিটানি আছেতো?', সাথে সাথে টিংকুকে ঈশারা দিলাম, মামাকে একটু আড়ালে নিতে।

টিংকু, 'আচ্ছা মামা' বলে পুনরায় গ্যাস পাম আলু পাম পৃথিবীর যত পাম আছে সব প্রয়োগ করে মামাকে প্রায় অবচেতন করে ফেললো। আর আমি সে সুযোগে টপাটপ স্যারের টেবিলে রাখা হাজিরা খাতাটা নিয়ে দুমসে আমার ও টিংকুর উপস্থিতির কলামে 'পি' মানে প্রেসেন্ট (Present) বসাতে থাকলাম। তারপর টেবিলে রাখা জগ থেকে দুই গ্লাস পানি খেলাম। গলাটা প্রায় শুকিয়ে গিয়েছিলো।

গলা শুকাবে না? 'পার্সেন্টেজ খুব কম' বলে গত সপ্তাহে স্যার আমাদের আল্টিমেটাম দিয়েছেন, 

'এবার আপনাদের পরীক্ষায় বসা মনে হয় হবে না। যে ক্লাস বাকি আছে সেগুলোতে হান্ড্রেড পার্সেন্ট উপস্থিত থাকলেও বোধহয় আর কাজ হবে না'।

স্যারের আল্টিমেটাম এর ভয়ে চারপাঁচ দিন ঠিকমতো ঘুমাতে পারিনি, দুইজনে।

রুম থেকে বের হয়ে মামা কে আবার লম্বা একটা সালাম দিলাম। 'গ্যাস পাম' 'আলু পামে' বিকশিত ও প্রস্ফুটিত মামা 'ওয়ালাইকুম সালাম' বলে আমাদের বিদায় দিলেন।

বাদবাকি সব ক্লাসে হান্ড্রেড পার্সেন্ট উপস্থিত থেকে সিরিয়াস মনোযোগী থাকার চেষ্টা করলাম। সেই সাথে লেকচার নিয়ে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে দুজনেই স্যারের সুনজরে আসার প্রাণপন চেষ্টা চালাতে থাকলাম।

সে যাত্রায় আমাদের ক্লাস পার্সেন্টেজ ফুলফিল হয়ে গেলো। ফুলফিল বললে ভুল হবে, প্রয়োজনের তুলনায় বরং একটু বেশি হয়ে গেছে বলা যায়।

তিন.

পরীক্ষা দেবার দুদিন আগে হঠাৎ স্যার আমাদের দুজনকে ডেকে পাঠালেন। কি ব্যাপার। একটু ভয় পেয়ে গেলাম। উপস্থিতির কলামে 'পি' -P মানে প্রেসেন্ট, সবতো ঠিকমতো বসিয়েছিলাম। কোন ভুলভাল করিনিতো তাড়াহুড়ো করে...!?

দুরু দুরু বুকে স্যার রুমে গেলাম। স্যার বসতে বললেন। স্যার কে বললাম, 

'স্যার দু'গ্লাস পানি খাবো'

স্যার বেত একটা কাঠি দিয়ে জগ আর গ্লাস এগিয়ে দিয়ে, বললেন 'নেন'।

সুনসান নীরবতা। মাথার উপর কেবল ফ্যান ঘুরার ভন ভন আওয়াজ হচ্ছে। স্যার আমাদের দুজনের দিকে তাকিয়ে খানিকক্ষণ পর বললেন, 

'শুক্রবারেতো আমি লেকচার নেই না বাবারা, আপনারা কেমনে এতো গুলো শুক্রবার ক্লাস করলেন...? ফ্রাইডে হলিডে সব ডেতে আপনারা পি, মানে প্রেসেন্ট। কেমনে কি? মাথা নীচু করে দুজনে বসে থাকলাম। ভয়ে অস্থির।

আসলে ভুল হয়েছিলো আমারই। তাড়াহুড়ো করতে যেয়ে ফ্রাই ডে, সান ডে, মান ডে হলি ডে কিছুই বাদ রাখিনি। সব গুলোতে দেদারসে পি- মানে প্রেসেন্ট (Present) বসিয়েছি। ভুলটা সেখানেই হয়েছে। একেবারে রাম ধরা।

যাহোক স্যার কিছু ধমক টমক কিছু দিলেন না। শুধু বললেন, 

'ব্যাঘের মুখ থেকে শিকার যখন নিয়েই নিয়েছো, কিছু আর বলছি না। তোমাদের বুদ্ধি আছে বটে। যাও ক'দিন মাত্র বাকি পরীক্ষার। ভালো করে পড়ো। যদি আমার সাবজেক্টে লেটার মার্ক পাও তবে আমার পক্ষ থেকে তোমাদের জন্যে ক্ষমা আর ভালোবাসা'।

চার.

স্যার জানিনা আপনি কোথায় আছেন, আমি কিন্তু আপনার কথা রেখেছিলাম।

সিন্ডিকেট মিটিংয়ে প্রস্তাব গৃহীত

ভাতা পাবেন ডিপ্লোমা-এমফিল কোর্সের চিকিৎসকরা

প্রস্তুতির নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

অক্টোবর-নভেম্বরে ২য় ধাপে করোনা সংক্রমণের শঙ্কা

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না