ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৯, ৯ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ৬ ঘন্টা আগে
ডা. সাবিকুন নাহার

ডা. সাবিকুন নাহার

এমবিবিএস, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ। 


২৯ অগাস্ট, ২০১৮ ১০:৩২

আমরা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হলে লাভটা আল্টিমেটলি দেশেরই হতো!

আমরা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হলে লাভটা আল্টিমেটলি দেশেরই হতো!

হঠাৎ করেই বুকের গহীনে কেমন একটা চাপ অনুভব করছি। চোখে-মুখে অন্ধকার দেখছি। একসময় আমার স্বপ্নালু চোখে রোজরোজ স্বপ্ন নামতো। ঘুমিয়ে থাকলে যে স্বপ্ন দেখা যায় সে স্বপ্ন নয়। আমার স্বপ্ন ছিল জেগে থাকার স্বপ্ন। একদিন খুব বড় একজন শিশু বিশেষজ্ঞ কিংবা একজন স্বনামধন্য এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট হবো। টাকার প্রতি আমার মোহ কম। আমার এই স্বপ্নটা মূলত মানুষের জন্যই ছিলো।

একজন জেনারেল প্র‍্যাক্টিশনারের সিম্পটোম্যাটিক ট্রিটমেন্ট দেওয়ার চেয়ে জেনে বুঝে কারণ নির্ণয় করে উপযুক্ত ওষুধ দেওয়াটাকে আমি আইডিয়াল মনে করতাম। আমি বিশ্বাস করতাম তার জন্য আমাকে পোস্ট গ্র‍্যাজুয়েশন করতে হবে। সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সারাদিন পড়ে থেকে, ট্রেইনিং করে, প্রচুর পড়াশোনা করে, প্রতিযোগিতামূলক বড় বড় পরীক্ষা দিয়ে অতপর আমাকে এই যোগ্যতা অর্জন করতে হবে।

কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ডিগ্রী আমাদেরকে অর্জন করতে হবে। এই ডিগ্রী শুধু আমাদের নিজেদের জন্য নয়। যাতে আমরা ঠিকভাবে রোগ নির্ণয় করে ঠিকভাবে চিকিৎসা দিতে পারি, এই ডিগ্রী তার জন্য। অর্থাৎ এসব ডিগ্রী মানুষের জন্য। আমরা বিশেষজ্ঞ হলে লাভটা আল্টিমেটলি দেশেরই হতো।

কিন্তু আমাদের যোগ্য হওয়ার পথে বিশাল একটা কালো থাবা গ্রাস করে নিতে চাইছে সবকিছু। বিসিএসে আগে গ্রামে পোস্টিং ছিল ২ বছর। এরই মধ্যে পোস্ট গ্র‍্যাজুয়েশনে অংশগ্রহনেরও সুযোগ ছিলো। বিসিএসের পোস্টিং শেষে পোস্ট গ্র‍্যাজুয়েশনের ইনট্র‍্যান্স পরীক্ষায় কৃতকার্য হলে ট্রেনিংয়ে ঢুকে যাওয়া যেত। যদিও এফসিপিএস, রেসিডেন্সিতে চান্স পাওয়া খুবই টাফ, কিন্তু সুযোগ তো ছিলো। কিন্তু এখন বিসিএসে পোস্টিং ৪ বছর করে দিয়ে পোস্টিং শেষে মাত্র ১০% কে শূণ্য পোস্ট সাপেক্ষে পোস্ট গ্র‍্যাজুয়েশনের সুযোগ দেওয়া হবে। চার বছর পরও মাত্র ১০% কে, ভাবা যায়! 

আমার বয়স ছাব্বিশ ছুইছুই। যদি এবারই বিসিএস হয়ে যায়, যেহেতু স্পেশাল বিসিএস সেই সাপেক্ষে ছয় মাসের মধ্যে পোস্টিং হয়ে যাওয়ার কথা। যদি এবার না হয়, পরেরবারের কোন একটা সাধারণ বিসিএসে হলে নিয়োগ হতে হতে তিন বছর লেগে যাবে। তখন বয়স হয়ে যাবে তিরিশ। চারবছর গ্রামে থেকে, (যার মধ্যে দুই বছর প্রত্যন্ত অঞ্চল যেমন পাহাড় অথবা দ্বীপে) থেকে যখন ফিরে আসবো তখন বয়স হয়ে যাবে চৌত্রিশ। যথাযথ কর্তৃপক্ষ ভুলে গেলেও খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপারও মানুষের জীবনে ঘটে। 

বিয়ে এবং সন্তান জন্মদান। এই অধ্যায়টা মেয়েদেরকে আরো কয়েক বছর পিছিয়ে দেয়। এইটা না হয় আমি গোনার বাইরেই রাখলাম। মধ্য বয়সে এসে যখন আমি সিম্পল এমবিবিএস থেকে কমপ্লেক্স এমবিবিএস হওয়ার একটু ফুরসত খুঁজবো, সেই সময়ে আমার সাথে পোস্টগ্র‍্যাজুয়েশনে সুযোগ প্রাপ্তির পরীক্ষা দিবে এত বছরে আমার মতই থেকে যাওয়া লক্ষাধিক ডাক্তার। পাশের হার মাত্র ২-৩% তাহলে কবে আমার পোস্টগ্র‍্যাজুয়েশন কমপ্লিট হবে। আদৌ হবে কী? 

সারাজীবন কি জ্বর আর ডায়রিয়ারই ট্রিটমেন্ট দিয়ে যাবো? জটিল কেইস আসলে নিজের অযোগ্যতার কারণে শুধু রেফারই করে যাবো? কার কাছে রেফার করবো? একসময় তো কোন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারই থাকবে না। আজকের প্রবীণ বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা একসময় থাকবে না। আমরা বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হতে না পারলে প্রবীণদের রেখে যাওয়া শূণ্য পদগুলো কারা পূরণ করবে? ভারতীয় চিকিৎসকরা? মূল উদ্দেশ্য কি তাহলে এটাই?

একসময় বাংলাদেশে কোন মেডিসিন স্পেশালিষ্ট থাকবে না। গাইনোকোলজিস্ট থাকবে না। সার্জন থাকবে না। শিশু বিশেষজ্ঞ থাকবে না। কার্ডিওলজিস্ট থাকবে না। শুধু থাকবে গ্রামে পড়ে থাকা হাজার হাজার জেনারেল প্র‍্যাক্টিশনার। যারা নরমাল ভ্যাজাইনাল ডেলিভারি করতে পারলেও সিজারিয়ান সেকশন করতে পারবে না। এন্টিপার্টাম হিমোরেজ নিয়ে পেশেন্ট চোখের সামনে মারা যাবে।

ট্রেইনিংয়ের অভাবে আফসোস করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না। ইন্টেস্টিনাল অবস্ট্রাকশন নিয়ে পেশেন্ট আসবে। কিন্তু একজন সিম্পল এমবিবিএসের তখন কিছুই করার থাকবে না। কার্ডিয়াক ডিজিজে পেশেন্ট ছটফট করে মারা যাবে। লিভার সিরোসিস, ক্যান্সারসহ শত শত রোগ আন্ডারডায়াগনোজড থেকে যাবে।

গ্রামে অবশ্যই ডাক্তার পাঠানোর প্রয়োজন আছে। ৮০% মানুষ গ্রামে বাস করে। সেই সাপেক্ষে ডাক্তারদের বৃহৎ একটা অংশেরই গ্রামে থেকে চিকিৎসা দিতে হবে। কিন্তু তার জন্য এট্রাকশন তৈরি করতে হবে যাতে মানুষ গ্রামে যেতে আগ্রহী হয়। ডাক্তার এবং বিসিএস ক্যাডার তারা। তাদেরকে সেই মর্যাদাটা তো দিতে হবে। তাদেরকে যদি ভাঙা চেয়ারে বসে পোকামাকড়ের ঘরবসতিতে বসে চিকিৎসা দিতে হয়, তাদেরকে যদি গ্রামের প্রভাবশালীদের দ্বারা নিগৃহীত হয়ে চিকিৎসা দিতে হয়, সর্বক্ষণ প্রাণের ভয়ে অস্থির থাকতে হয়, বিনিময়ে সেলারী দেওয়া হয় শ্রমিকের চেয়েও কম তাহলে তারা ঠিক কী কারণে গ্রামে থাকতে চাইবে?

গ্রামে থাকাটাকে লোভনীয় করুন। সবাই গ্রামে থাকতে চাইবে। চার বছর যদি সত্যিই থাকতে হয় সেটাকে দুইটা ধাপে করুন। এমবিবিএস কমপ্লিট করে দুই বছর। কনসালটেন্ট হিসেবে দুই বছর। তাহলে গ্রামের মানুষ যথার্থ চিকিৎসাটাই পাবে। ডাক্তারদের অধিকতর যোগ্য হওয়ার জন্য পোস্ট গ্র‍্যাজুয়েশনেও সুযোগ বাড়ান।

আমার এত কথা কে শুনবে? কী হবে এই দেশটার? ভারতীয় চিকিৎসক আমদানী করাটা খুব কি জরুরি হয়ে গিয়েছিলো? কেন এই আত্মবিধ্বংশী সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হচ্ছে? দেশের কথা ভাবার মত কি কেউই নেই? আমাদের কথা আমরা বলবো কাকে?

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত