ডা. জামান অ্যালেক্স

ডা. জামান অ্যালেক্স

বিসিএস মেডিকেল অফিসার


২৮ অগাস্ট, ২০১৮ ০২:৪০ পিএম

একটি পাপ ও তার প্রায়শ্চিত্ত

একটি পাপ ও তার প্রায়শ্চিত্ত

পড়ন্ত বিকেল। অজপাড়াগায়ের এক সরকারি হাসপাতালের ইমার্জেন্সী রুম। আমার চোখের সামনে এক পেট ফোলা রোগী শুয়ে আছে, সাথে জন্ডিসও আছে। ক্লিনিক্যালি রোগীটা Chronic Liver Disease (CLD) এর একটা রোগী।

চোখ বন্ধ করে CLD এর আন্ডারলায়িং কারণ মনে করার চেষ্টা করলাম। একসময় আঙ্গুল গুণে গুণে ১১ টা কারণ একনাগারে বলতে পারতাম, সেইমুহূর্তে ৮ টার বেশি মনে করতে পারলাম না। অবশ্য তিন বছরেরও অধিক সময় একটানা যখন আমাকে গ্রামে ফেলে রাখা হয় তখন CLD এর ৮ টা আন্ডারলায়িং কারণ যে মনে আছে সেটাই তো অনেক।

দুই.
আমি তখন DMC-তে পোস্টগ্র্যাজুয়েট ট্রেনিং করি। গলা ব্যথা নিয়ে এক ইয়াং রোগী হাসপাতালে আসলে Palatal petechie আর Spleenomegaly পেয়ে ডায়াগনসিস করেছিলাম Infectious mononucleosis. PBF এ আগ্রহ নিয়ে Atypical lymphocyte খুঁজতাম।

স্মৃতিগুলো ছিল মধুময় কিন্তু সেসব দিন এখন প্রায় চলে গেছে। গলা ব্যথার রোগী এখনও ডিল করি, তবে এখন আর টর্চ দিয়ে মুখ হাঁ করিয়ে Palatal petechie দেখা হয় না। সে সুযোগও এখন পাই না, দেখার উৎসাহও এখন আর কেউ দেয় না।

একটা একাডেমিক চিকিৎসককে নন-একাডেমিক কোয়াক বানানোতে এই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা ইউনিয়ন সাবসেন্টারগুলোর জুড়ি নেই। এসব জায়গাগুলোতে অকাজে উৎসাহ দেবার লোক আছে, আসল কাজের উৎসাহ দেয়ার কেউ নেই।

গ্রামের এই হাসপাতালের আউটডোরের বাইরে জনা ত্রিশেক লোক লাইনে দাঁড়িয়ে তারস্বরে চেঁচাতে থাকে। বোকা এই লোকদের বোঝানো হয়েছে এখানে ফ্রি ওষুধ পাওয়া যায়, রোগ ধরা গুরুত্বপূর্ণ না, ফ্রি ওষুধটাই বড় কথা। ফ্রি ওষুধ পেয়ে এরা আবার হিসেবে বসে যে ফ্রি ওষুধের মূল্য রিকশা ভাড়ার থেকে বেশি হলো কিনা, তবেই না হাসপাতালে আসা স্বার্থক হবে। জ্বর আর গলা ব্যথায় তাই এখন P/C (প্যারাসিটামল) আর H/C (হিস্ট্রাসিন) আমার নিত্যসঙ্গী, দুর্বলতা বললে B/C (ভিটামিন-বি কমপ্লেক্স) তো আছেই। 

তিন.
আমার কথা বাদ থাকুক, এক ব্রিলিয়ান্ট বড় ভাইয়ের গল্প বলি। জয়েন্ট পেইনের রোগী পেলে যে ভাই Seronegetive নাকি Seropositive সেটা নিয়ে মেতে উঠতো। Spondyloarthropathy ডায়াগনসিস করার জন্য যে ভাই গ্রামের এই সেটিংয়ে Oblique view of SI joint এর এক্সরে করে সেই এক্সরের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতো। সেই ভাইকে ৬ বছর গ্রামে পড়ে থাকতে থাকতে এখন এসব বাদ দিয়ে জয়েন্ট পেইনের রোগী এলে অ্যানালাইসিস বাদ দিয়ে ধুন্দুমার স্টেরয়েড প্রেসক্রাইব করতে দেখি।

যে ভাইকে আগে Aspiration pneumonia-তে Cephalosporin এর সাথে Metronidazole নাকি Clindamycin এর কম্বিনেশন ভালো হবে সেটা নিয়ে কথা কাটাকাটি করতে দেখেছি, সে ভাই এখন গ্রামে বসে দেদারসে যেকোন জ্বরের রোগীকে Ceftriaxone মেরে দেন। কথাবার্তাতেও এখন অনেক পরিবর্তন, ডাক্তার ডাক্তার ভাব বাদ দিয়ে কেমন যেন এখন একটা গ্রাম্য নেতার ভাবসাবও চলে এসেছে। ভাই এখন কতটুকু করাপটেড, সেটা আর নাই বা বলি। উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সে দীর্ঘদিন পড়ে থাকবেন আর করাপটেড হবেন না সেটা আনইউজুয়াল।

চার.
এবার একটু ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে কয়েকটা কথা বলি। উপজেলা লেভেল ও ইউনিয়ন সাবসেন্টারগুলো চিকিৎসকদের জন্য সম্পূর্ণভাবে অরক্ষিত একটি জায়গা। অশিক্ষিত ও অপশিক্ষিত লোকদের যদি আপনি বুঝে চলতে না পারেন তবে আপনার কপালে খারাপী আছে, মোরালিটি এখানে তিলে তিলে নষ্ট হবে। এহেন জায়গায় একটানা ২ বছর কষ্টকর, একটানা ৪ বছর অনেকটা অসম্ভব।

লজিস্টিক সাপোর্টের কথা আর নাই বা বলি। নলেজ আছে কিন্তু প্রয়োগ করতে পারছেন না, এর চেয়ে হতাশাজনক আর কিছু কী হতে পারে? আমার এক কার্ডিওলজিস্ট বন্ধু তো ৩৩তম বিসিএস আর কন্টিনিউই করলো না তার পোস্টিং প্লেসে লজিস্টিক সাপোর্ট না পেয়ে।

পাঁচ.
আমার বক্তব্য কি আপনাদের কাছে পরিষ্কার হয়েছে? আপনারা কি বুঝতে পারছেন যে প্রতিটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো নবীন, কর্মোদ্যম চিকিৎসকদের জন্য একেকটা Death Trap? আপনারা কি জানেন, যেকোনো চিকিৎসক তার জীবনের দীর্ঘ সময় উপজেলা লেভেলে থাকলে তার চিকিৎসক জীবনের মানসিক মৃত্যু ঘটে?

কথাগুলো কেন বললাম? যারা জানেন না তাদের জন্য বলি- বিসিএসে (স্বাস্থ্যে) নতুন নিয়ম তৈরি করা হয়েছে যে প্রতিটি চিকিৎসককে তার স্বর্ণালী জীবনের প্রথম ৪টি বছর গ্রামে থেকে চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে হবে। আগের বাধ্যবাধকতা ছিল ২ বছর।

ছয়.
এবার একটা ছোট ক্যালকুলেশনে আসেন। ইন্টার্নীসহ এমবিবিএস শেষ করতে করতে যদি বয়স হয় ২৪, তারপরে বিসিএসের নিয়োগ ঝামেলা আরো ন্যূনতম ২ বছর, প্লাস গ্রামে চিকিৎসা সেবা ৪ বছর। ইতোমধ্যে কিন্তু ৩০ বছর গত হয়ে গেছে। ট্রেনিং পোস্ট কিন্তু হাতের মোয়া না, আরো ১ বছর ধরলাম। তারপর ট্রেনিং প্লাস কোর্স পিরিয়ডের ঝক্কিতে আরো ৪ থেকে ৫ বছর। এবার বলুন পোস্টগ্রাজুয়েশন শেষ করতে করতে বয়স কত হবে?

এদেশে চিকিৎসক হওয়াটা কি পাপ? আমাদেরকে কী এখন তার জন্য একটার পর একটা প্রায়শ্চিত্ত করে যেতে হবে?

প্রতিবার একেকটা সমস্যা হয় আর চিকিৎসক নেতৃবৃন্দ সমস্যা সমাধানে তৎপর হন। ডেপুটেশন সংক্রান্ত একটা সমস্যা হলো, তখনও একই ঘটনা দেখা গেলো, এবারো নিশ্চয়ই সেটাই হবে। সমস্যা তৈরি হবার পূর্বেই আপনারা অ্যাকশনে যান না কেন? আপনাদের সাথে পরামর্শ ছাড়া এসব ডিসিশন কিভাবে পাশ হয়?

একটা তুর্কি প্রবাদ বলি, ‘জঙ্গল ছোট হয়ে আসছিলো, তারপরও গাছেরা কুঠারকে ভোট দিচ্ছিলো। কারণ, কুঠারের হাতল কাঠের তৈরি আর গাছেরা ভেবেছিলো কুঠার বুঝি তাদেরই একজন।’ প্রিয় নেতৃবৃন্দ, জঙ্গল বেশি ছোট হবার পূর্বেই ব্যবস্থা নিন।

প্রমোশনের পথ রুদ্ধ হচ্ছে, দেশের কারেন্সীগুলো কিন্তু দেশের বাইরে চলে যাবে। এর ফলাফল আমার বা আপনার কারো জন্যই কিন্তু সুখকর কিছু হবে না।

সাত.
আমি কী এদেশের প্রান্তিক পর্যায়ের জনগণের চিকিৎসা সেবা প্রাপ্তিকে বাধাগ্রস্ত করছি? ব্যাপারটা কিন্তু তা না। আমি প্রান্তিক পর্যায়ে ৪ বছর চিকিৎসা সেবার পক্ষপাতী, তবে সেটা হতে হবে মেধাকে ধ্বংস না করে। ৪ বছর গ্রামাঞ্চলে চিকিৎসা সেবা দেয়াটা হতে হবে প্ল্যানড এন্ড সিস্টেমেটিক।

৪ বছর একটানা গ্রামে চিকিৎসা না দিয়ে ২ বছর আগের মত গ্রামে চিকিৎসা দিয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হোক। প্রশিক্ষণ শেষে আবার ২ বছর গ্রামে সেবা দিতে হবে। এতে করে পোস্টগ্র্যাজুয়েশন করার বাধাও থাকলো না আবার পরবর্তী ২ বছরে গ্রামের মানুষগুলো অনেকটা কনসালট্যান্ট পর্যায়ের সেবা পাবে। বিষয় কিন্তু একই, অথচ এই সিদ্ধান্তটা নিঃসন্দেহে অনেক পরিপক্ক।

আচ্ছা, যারা এরকম উদ্ভট ডিসিশনগুলো নেন, তারা কি একবারও কারো সাথে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেন? যদি করে থাকেন তবে এধরণের ডিসিশনগুলো কিভাবে আসে? আসলে ডিসিশনগুলো উদ্ভট নাকি আমার চিন্তাধারাই উদ্ভট? থমাস গ্রে অবশ্য বলেছিলেন, ‘Where ignorance is bliss, it's folly to be wise.’ বোকার রাজ্যে ভালো কিছু চিন্তা করা তো উদ্ভট বিষয়ই হবে।

আট.
ফিজিক্সের Second Law of Thermodynamics-কে বিশ্লেষণ করলে আমরা এনট্রপির ধারণা পাই। এনট্রপি মূলত বিশৃঙ্খলতার পরিমাপক। মহাবিশ্বে এনট্রপি বাড়ছে, এর অর্থ- মহাবিশ্ব চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। দিনের পর দিন যেভাবে সুচারুভাবে এদেশে চিকিৎসা বিজ্ঞানের উচ্চশিক্ষার পথকে রুদ্ধ করা হচ্ছে তাতে বোঝা যাচ্ছে এনট্রপি বৃদ্ধি শুধুমাত্র ফিজিক্সের টপিক না, একই কনসেপ্ট এদেশের চিকিৎসা বিজ্ঞানেও খাটে।

মেডিকেল সিস্টেমে এনট্রপির এই বৃদ্ধি বা বিশৃঙ্খলতা কিন্তু একটি অশনিসংকেত। অসংখ্য চিকিৎসক উচ্চশিক্ষার পথ থেকে সরে যাবে। এটি কি একটি দেশের জন্য মঙ্গলময় কিছু? চিকিৎসা বিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষার পথকে কণ্টকাকীর্ণ করে একটার পর একটা যে আদেশগুলো তৈরি হচ্ছে তা একসময় আমাদের দেশের জনগণের জন্যই ব্যাকফায়ার হিসেবে কাজ করবে। সত্যিকার অর্থে যারা দেশমাতৃকাকে তার নিজের অন্তরে ধারণ করেন, তারা কিভাবে এমন আদেশ জারি করেন?

যেকোন দেশ যখন তাদের মেধাবী প্রজন্মকে সময়ের সাথে সাথে আরো শাণিত করে সেখানে আমরা এদেশে এই চিকিৎসক শ্রেণিটিকে একটার পর একটা বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে দিনের পর দিন গলা টিপে হত্যা করছি। আচ্ছা, আমরা এমন কেন? আমরা কেন সবসময় অন্যের উন্নতিতে বাঁধার সৃষ্টি করি? অন্যের উন্নতিতে বাঁধা দেয়া যে নিজের দেশের উন্নতিতে বাঁধা দেয়া, এটা কেন আমরা বুঝতে চাই না? আমরা কেন আমাদের পরিবর্তন করতে পারি না?

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত