ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৯, ৮ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ৬ ঘন্টা আগে
ডা. সাবিকুন নাহার

ডা. সাবিকুন নাহার

এমবিবিএস, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ। 


২৪ অগাস্ট, ২০১৮ ২১:১৯

হাসি কান্নার স্মৃতি বিজড়িত জরুরি বিভাগ

হাসি কান্নার স্মৃতি বিজড়িত জরুরি বিভাগ

অপারেশন থিয়েটারের বারান্দা থেকে ইমার্জেন্সী বিল্ডিংয়ের এন্ট্রি পথটা স্পষ্ট দেখা যায়। মাঝে মাঝে বারান্দায় এসে দাঁড়ালে জীবনের অনেক জটিল সমীকরণের সহজ সমাধান পেয়ে যাই। সমাধানটা হচ্ছে, আমি ভালো আছি।

মরণাপন্ন রোগী নিয়ে বিষন্ন সুর তুলে এম্বুলেন্সের আসা-যাওয়া চলছেই। কিছু এম্বুলেন্স রোগী দিয়েই চলে যায়। আর 'কিছু' যাকে নিয়ে এসেছিলো তাকে নিয়েই চলে যায় অথবা ফিরে যায়। হয়তো একটা ডিক্লেয়ার্ড হওয়া ডেডবডি নিয়ে, যাকে এতদূর বয়ে নিয়ে আসার একটাই প্রাপ্তি হলো সে যে আর বেঁচে নেই এই নিশ্চিতকরণটুকু হওয়া। অথচ এরকম নির্মম নিশ্চিত আমরা কখনোই হতে চাই না। স্বজনদের মনে আশার টিমটিমে প্রদীপটা ধুপ করে নিভে যেতেই, ইমার্জেন্সীর বাতাসটা কেমন চাপা কান্নায় ভারী হয়ে যায়।

কিছু কিছু এম্বুলেন্স রেফারেলের কাগজ নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমায়। শুধু জীবনের স্পন্দনটা এখনো টিকে আছে বলে বাঁচানোর আরেকটু প্রাণপণ চেষ্টা, বেঁচে থাকার আরো কিছু আকুলতা। স্বজনদের স্বপ্ন দেখার আরো কিছু সময় এবং সুযোগ প্রাপ্তি। বুকের হাহাকার কিংবা আনন্দের ঘনীভূত হওয়ার আরো কিছুটা উপলক্ষের অপেক্ষা।

কিছু কিছু রোগী আসে সহজলভ্য যানবাহন কিংবা পায়ে হেঁটে স্বজনদের বাহুডোরে আবদ্ধ হয়ে। তারপর ভর্তির হলুদাভ কাগজটা নিয়ে ট্রলির ক্যাটক্যাট আওয়াজ তুলে রেস্পেক্টিভ ওয়ার্ডের দিকে চলে যায়। কেউ আছে আউটডোর চিকিৎসার প্রেস্ক্রিপশন হাতে যেই পথে এসেছিল সেই পথেই ফিরে যায়।

কারো কারো সাথে বিশ-তিরিশ জনের তাগড়া বাহিনী আসে। পেশী শক্তিই যাদের মূল চালিকাশক্তি। যারা দুম করে ডাক্তারের কলার চেপে ধরাটাকে বাহাদুরির বিষয় মনে করে। ইমার্জেন্সীতে একবার হট্টগোল করে গিয়ে রেস্পেক্টিভ ওয়ার্ডের ইন্টার্নদের লাইফকেও দুর্বিষহ করে দিয়ে যারা পিশাচের মত হাসে। যাদের মুখের ভাষা এবং সুরকে ওয়ার্ডের অন্য রোগীরাও ভীতির চোখে দেখে। যারা হুটহাট এমপি, ডিরেক্টর, প্রভাবশালী কিংবা পাতি নেতার ফোন হাতে ধরিয়ে দিয়ে বুক ফুলিয়ে হাঁটে। যারা আসার সময় একজন পেইড সাংবাদিককে সাথে করে নিয়ে আসতে ভুলে না। নিজের পাপ যারা নিরপরাধ ডাক্তারের ওপর চাপিয়ে দিয়ে জনগণের বাহবা কুড়ায়।

এই ইমার্জেন্সীতেই অহরহ কনভার্সন ডিসঅর্ডারের রোগীরা আসে। ট্রলির বিভীষিকাময় আওয়াজ তুলে মেডিসিনের করিডোর দিয়ে যখন এডমিশন ডেস্কের দিকে যায়, ইন্টার্নরা তখন প্রথমে চিন্তিত হয়, পরে মুচকি হাসে। প্রিয়জনদের ভয় দেখিয়ে যারা কোন হিডেন স্বার্থ আদায় কিংবা একটু বাড়তি এটেনশন পাওয়ার জন্য এসব জটিল অভিনয়গুলো করে, তাতে তাদের কতটুকু লাভ হয় জানি না। তবে আত্মীয়দের হার্টের কিন্তু বারোটা বাজে।

পয়জনিংয়ের রোগীদের কেউ বাঁচে, কেউ বাঁচে না। তবে স্টোমাক ওয়াশের তীব্র যন্ত্রণা অন্যদের জন্যও একটা শিক্ষা হয়ে রয়। নিজেকে মারতে চাওয়া মানুষগুলোর দু:খ বোঝার কেউ থাকে কিনা জানি না, তবে বেঁচে যাওয়া মানুষগুলো পরবর্তীতে যেন মানসিকভাবেও বেঁচে থাকে এই কামনাই করি। বেঁচে থাকার মত আনন্দ আর কিছুতে নেই।

ইমার্জেন্সী ডিপার্টমেন্ট সহস্র আকুলতার নিরব সাক্ষী হয়ে এভাবেই টিকে রবে বহুকাল। কত কান্না, কত চাপা দীর্ঘশ্বাস, কত রোগমুক্তির প্রবেশদ্বার এই জরুরি বিভাগ, তা আর কেউ না জানুক, কোথাও লেখা না থাকুক কিন্তু এটাই ধ্রুব সত্য। কে হাসবে, কে কাঁদবে তার সমীকরণটা আমরা কেউ জানি না। সমীকরণটা লেখা আছে উপরে। আমরা চেষ্টা করে যাই। কিন্তু সমাধান মিলবে কী মিলবেনা জানা নেই। সব অংকের সূত্র আমাদের জানা থাকেনা যে...।

আগের নিউজ
পরের নিউজ
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত