ড. মোহাম্মদ আরিফুর রহমান

ড. মোহাম্মদ আরিফুর রহমান

সহকারী অধ্যাপক

ফার্মেসী বিভাগ

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি


২০ অগাস্ট, ২০১৮ ০৫:২৭ পিএম

রঙ ফর্সাকারী ক্রিম ও ওষুধ

রঙ ফর্সাকারী ক্রিম ও ওষুধ

ফর্সা কে না হতে চায়? একটু ফর্সা হওয়ার জন্য মানুষ যুগ যুগ ধরে কত কিছুই না করছে। আদিম যুগে মানুষ ত্বকে মাটি মেখেছে, বিভিন্ন গাছপালা দিয়ে ভেষজ ঔষধ তৈরি করে ব্যবহার করেছে। নিজেকে আকর্ষণীয় করে সাঁজাতে তরুণী থেকে শুরু করে বয়স্করা ব্যবহার করেন নানান প্রসাধনী।

অনেক প্রসাধন কোম্পানি দেদার বিক্রি করে যাচ্ছে এসব রঙ ফর্সাকারী প্রসাধনী। আর ক্রেতারা চোখ বন্ধ করে কিনে নিচ্ছেন। অথচ জানতে পারছেন না যে এসব ক্রিমে মেশানো আছে ভয়ঙ্কর রাসায়নিক পদার্থ, যা ত্বকের মারাত্মক ক্ষতি করে থাকে। মানুষ দেদারে ব্যবহার করে যাচ্ছে রঙ ফর্সাকারী ক্রিম। তবু কি রঙ ফর্সা হচ্ছে? হচ্ছেনা। আমরা কি থেমে আছি? না। আর সে কারণে মানুষ এখনও লেগে আছে রঙ ফর্সা করার আরও উন্নত তরিকা আবিষ্কার করার জন্য। এরই ধারাবাহিকতায় ভিয়েতনামের এক বিউটিশিয়ান উদ্ভাবন করেছেন স্বর্ণ দিয়ে রঙ ফর্সা করার এক অভিনব পদ্ধতি। ২৪ ক্যারেটের বিশুদ্ধ স্বর্ণ ব্যবহার করে তিনি ফেসওয়াস করে দেন।

প্রসাধন নিয়ে প্রতারণা পশ্চাৎপদ দেশগুলোতে অহরহই ঘটে থাকে। রঙ ফর্সার নামে প্রতারণার মাত্রাটি সম্ভবত একটু বেশি। এশিয়া ও ইউরোপে রঙ ফর্সাকারী প্রসাধনের নামে হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়। ভারতে যেন সবাই ফর্সা হওয়ার রোগে ভুগছে। রঙ ফর্সাকারী ক্রিমের বিশাল বাজারের দিকে চোখ বুলালেই এর বাস্তব প্রমাণ পাওয়া যায়। সম্প্রতি জানা যায়, রঙ সাদা করার ক্রিম এখন কোকাকোলা বা চায়ের চেয়েও বেশি বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু কেন ভারতে রঙ ফর্সাকারী ক্রিমের জনপ্রিয়তা বাড়ছে?

দেশটির একটি জনপ্রিয় টিভি শো তে দেখানো হচ্ছে, ফর্সা সুন্দর আর হ্যান্ডসাম হলে আপনি একজন সেলিব্রেটি হতে পারবেন। আর এর প্রভাবে বছরে প্রায় ১৮ শতাংশ হারে বাড়ছে রঙ ফর্সাকারী ক্রিমের বাজার। দেশটির বৃহৎ গবেষণা প্রতিষ্ঠান এসি নেলসনের মতে, ২০২৫ সাল নাগাদ ভারতীয় মধ্যবিত্তদের মধ্যে প্রায় ৫৮.৩ কোটি মানুষ এই রঙ ফর্সাকারী ক্রিম ব্যবহার করবে। যার ফলে রীতিমতো ফুলে-ফেঁপে উঠবে ক্রিম প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলো। ১৯৭৮ সালে হিন্দুস্তান ইউনিলিভার প্রতিষ্ঠার পর থেকে রঙ ফর্সাকারী ক্রিমের মধ্যে ফেয়ার এন্ড লাভলী নারীদের পছন্দের শীর্ষে, অার কলকাতার ইমামী গ্রুপের ফেয়ার এন্ড হ্যান্ডসাম পুরুষদের কাছে জনপ্রিয়। ২০০৫ সালে উৎপাদন শুরু হওয়া ফেয়ার এন্ড হ্যান্ডসাম ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ১৩ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে এবং এর ব্র‌্যান্ড এ্যাম্বাসেডর হিসেবে রয়েছেন বলিউড সুপারস্টার শাহরুখ খান। নারীদের কাছে রঙ ফর্সাকারী ক্রিম আরও আকর্ষনীয় হয়ে উঠেছে বলিউড নায়িকা ক্যাটরিনা কাইফ, দিপীকা, সোনম কাপুর কিংবা প্রীতি জিনতার কল্যাণে।

এবার আসি বাংলাদেশ প্রসঙ্গে, ভারতে যা জনপ্রিয় হয় বাংলাদেশে তা আরও জনপ্রিয় হবে, তাই নয় কি? বিজ্ঞাপনগুলোতে দেখা যায় কালো মেয়ের বিয়ে হচ্ছেনা, চাকরি জুটছেনা, পরিবারে ছেলের অভাব সে পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। সে রঙ ফর্সাকারী ক্রিম মাখলো, মাত্র ৪ থেকে ৬ সপ্তাহে ফর্সা হয়ে উঠলো। ব্যস, বিয়ে হয়ে গেল, মোটা বেতনে চাকরি জুটলো, ছেলের অভাব পূরণ হয়ে গেল। নারীর চাকরি হচ্ছে তার যোগ্যতায় নয়, তার সাদা রঙয়ের কারণে। ফর্সা হওয়া আর সুন্দর হওয়াকে এক করে ফেলা হচ্ছে। তাহলে অশেতাঙ্গদের এই দেশে যে কালো মেয়ের সংখ্যাই বেশি। এত এত মেয়ের চাকরি, বিয়ে হবে না?

২০০৬ সালের মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহে দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকায় বাংলাদেশের একটি রঙ ফর্সাকারী ক্রিমের মূলত স্বাস্থ্যগত দিকটি ফোকাস করে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনগুলোতে রঙ ফর্সাকারী ক্রিমের স্বাস্থ্যগত দিকটি বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে। ডার্মাটোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট, চর্ম বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সবাই বলেছেন মানুষের গায়ের রঙ ফর্সা করতে পারে এমন কোনো কিছুই পৃথিবীতে আবিষ্কৃত হয়নি।

চিকিৎসকরা অনেক সময় মেছতা বা অন্যান্য শারীরিক দাগের স্থানে অস্থায়ীভাবে ব্যবহারের জন্য অয়েন্টমেন্ট দিয়ে থাকেন, যা ঐ স্থানের কালো ভাবটি দূর করে। কিন্তু স্বাভাবিক ত্বকে দীর্ঘ সময় যাবত এরকম কেমিক্যাল সমৃদ্ধ ক্রিম মাখলে ত্বকের স্বাভাবিকত্ব নষ্ট হবে এবং অতিবেগুনীসহ অন্যান্য ক্ষতিকর রশ্মি প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাবে। ফলে ত্বকে ক্যান্সারসহ অন্যান্য অনেক চর্মরোগ এবং কিডনীর সমস্যা দেখা দেবে।

রঙ ফর্সাকারী ক্রিম ত্বকে মেলানিন ছড়িয়ে পড়া রোধ করে, ফলে এটা নিয়মিত ব্যবহার করলে ত্বক ফর্সা হয়ে ওঠে বলে এর উৎপাদকরা এতদিন দাবি করতো। কিন্তু এই মেলানিন ছড়িয়ে পড়া রোধ হলে ত্বকে কি প্রতিক্রিয়া হয় সে সম্পর্কিত তথ্য তারা দেয় না। সত্য এই যে, মেলানিন বেশি থাকলে ত্বকের রঙ কালো হয় এবং কম থাকলে ফর্সা হয়। এটা একেবারে জৈবিক ব্যাপার, জিনগত ব্যাপার। এও সত্য যে, কালো মানুষদের চর্মরোগ ফর্সাদের তুলনায় কম হয়ে থাকে। অথচ এই মেলানিনের বিকাশ রোধ করা অর্থ হলো চর্মরোগকে সেধে ডেকে আনা।

অন্যদিকে একাধারে দীর্ঘসময় সানস্ক্রিন ক্রিম ব্যবহারে ত্বকের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। ফলে মেলানোমা জাতীয় মারাত্মক স্কিন ক্যান্সার হতে পারে। রঙ ফর্সাকারী ক্রিমে অপরিকল্পিতভাবে হাইড্রোকুইনন জাতীয় উপাদান ব্যবহার করা হয়। ফলে ব্যবহারকারীদের কিডনীর নানান জটিল রোগ দেখা দিচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা দাবী করেছেন।

পত্রিকায় প্রকাশিত সুত্র অনুযায়ী, দেশে বর্তমান রঙ ফর্সাকারী ক্রিমের শতাধিক পণ্যের বড় বাজার আছে। এতে বিনিয়োগ করা হয়েছে ৬০০ কোটি টাকারও বেশি। আর এর মধ্যে অধিকাংশ কোম্পানিই স্বল্প সময়ে রঙ ফর্সা করার কথা বলে পণ্যে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করছে। 

সম্প্রতি মোবাইল কোর্ট কেরানীগঞ্জে বোটানিক এ্যরোমার কারখানায় হানা দেয়। এ অভিযানে যেসব তথ্য উদঘাটিত হয়েছে তা উদ্বিগ্ন হওয়ার জন্য যথেষ্ট। মাত্র দুই-তিন বছরে বোটানিক এ্যারোমা রঙ ফর্সাকারী ক্রিম বাজারজাত করে শত শত কোটি টাকার মালিক বনেছে। দৈনিক সমকালে ‘বোটানিক এ্যারোমার প্রতারণার জাল’ শিরোনামে ১৯ নভেম্বর ২০১২ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়, অলোচিত বোটানিক এ্যারোমায় র‌্যাবের অভিযানে পারদ ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানের মালিকসহ ৯ জনকে গ্রেফতার করা হয় এবং কারখানাটি সিলগালা করে দেয়। গেফতারকৃত বোটানিক এ্যারোমার মালিক সাংবাদিকদের জানান, বিএসটিআইয়ের অনুমোদন থাকলেও ক্রিমে মার্কারি ব্যবহারের অনুমোদন ছিলোনা। অল্প সময়ে অধিক লাভের আশায় এ পন্থা অবলম্বন করা হয়।

র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এএইচএম আনোয়ার পাশা সমকালকে জানান, সারাদেশে রঙ ফর্সাকারী ক্রিমের বিশাল বাজার তৈরি হয়েছে। অল্প সময়ে ম্যাজিকের মত কালো ত্বককে ফর্সা করার বিষয়টি নজরে এনে র‌্যাব অনুসন্ধানে নামে। বাজার থেকে এসব পণ্যের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য এটোমিক এনার্জি সেন্টার, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেম পরমানু শক্তি কেন্দ্রে পাঠানো হয়। বোটানিক এ্যারোমার জেন্টস স্পট আউট ক্রিমে ৪৬.৫৭ পিপিএম, নাইট কুইন ক্রিমে ২৮.৬৩ পিপিএম ও ব্ল্যাক ডায়মন্ড ক্রিমে ১১.১৪ পিপিএম মাত্রায় মার্কারি পাওয়া যায়। 

ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে ইতোমধ্যে মার্কারিযুক্ত ক্রিম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতেও প্রসাধনীতে মারকারি ব্যবহারে রয়েছে নিষেধাজ্ঞা। একইভাবে বাংলাদেশেও ত্বকে ব্যবহারের জন্য ক্রিমে মার্কারি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে বিএসটিআই। মার্কারি ব্যবহারের ফলে অল্প সময়ে গায়র ত্বকের পরিবর্তন ঘটলেও ব্যবহারকারীরা আক্রান্ত হচ্ছেন কিডনি রোগে, হাত পা অবশ, গর্ভবতীদের গর্ভের সন্তানের মস্তিষ্ক গঠন বাধাগ্রস্থ হয়ে প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্ম, চর্মসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়।

বিশেষজ্ঞরা জানান, মার্কারির মাত্রারিক্ত ব্যবহারের কারণে কিডনি নষ্ট, গর্ভবতী নারীদের গর্ভের সন্তানের মস্তিষ্ক গঠন বাধাগ্রস্থ হওয়া, হাত পা অবশ হওয়া, স্নায়ুবিক সমস্যা, চামড়ায় র‌্যাশ সৃষ্টি হওয়া, ত্বকে ব্যাক্টেরিয়া ও ফাংগাসের আক্রমণ হয়।  আসলের মতো দেখতে কিন্তু নকল বা ভেজাল প্রসাধনী পণ্য তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন কায়দায়। নকল পারফিউমে সোডা ফিটকিরির সঙ্গে নানাধরণের সুগন্ধি মিশিয়ে বাজারে বিক্রি হচ্ছে। নকল শ্যাম্পুতে ব্যবহৃত হচ্ছে নিম্মমানের সাবান পানি ও সুগন্ধিযুক্ত ডিশ ওয়াটার পাউডার।নিচুমানের টুথ পাউডারের মন্ড তৈরি করে তা ঢুকানো হচ্ছে নামিদামি ব্রান্ডের টুথপেস্ট টিউবে। মোম নামক রং ও সেন্টযুক্ত বিশেষ ক্যামিকেলে হাতেই তৈরি হচ্ছে নকল লিপিস্টিক।

শহীদ সোহরাওয়াদী হাসপাতালের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আজিজুল হক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, ভেজাল প্রসাধন ব্যবহারে ত্বকের সাধারণ লাবণ্য নষ্ট হয়ে যায়।  প্রাথমিকভাবে ডার্মাটাইটিস হয়। এতে চামড়া লাল হয়ে যায়। পরে অ্যালার্জিক রিঅ্যাকশান তৈরি করে। ভেজাল প্রসাধন ব্যবহারে ত্বকে ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনেষ্ট্রেশন (এফডিএ) ক্রেতাদের এসব ক্রিম এবং সৌন্দর্য  সাবান ও জীবাণু নাশক সাবান অনেক আগেই ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন। কারণ পরীক্ষা- নিরীক্ষা করে দেখা গেছে এসব প্রসাধনীতে পারদ মেশানো হয়। যেসব রং ফর্সাকারী ও বয়সের ছাপ কমানোর ক্রিমে দাগ, ফ্যাকাশে ভাব ও বলি রেখা দূর হয়, সেসব প্রসাধনী ব্যবহার না করার পরামর্শ দিয়েছেন স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রতারণার ব্যাপারে সচেতনতা বিষয়ক প্রতিষ্ঠান  এফএডির কর্মকর্তা গ্যারি কোডি। তিনি এ জাতীয় প্রসাধনীর গায়ে যদি মারকিউরাস ক্লোরাইড, ক্যালোম্যাল মারকিউরিক, মারকিউরিও অথবা মার্কারি জাতীয় কোন শব্দ লেখা থাকে তাহলে  ঔসব প্রসাধনী ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন।

এছাড়া প্রসাধনীতে ব্যবহৃত কোন উপকরণের নাম যদি লেখা না থাকে এবং লেবেলটি যদি ইংরেজিতে লেখা না থাকে তবে তা কিনতে নিষেধ করেছেন। 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে