ডা. গুলজার হোসেন উজ্জল

ডা. গুলজার হোসেন উজ্জল

হেমাটোলজি বিশেষজ্ঞ।


১৯ অগাস্ট, ২০১৮ ০৮:২১ পিএম

ডেঙ্গু রোগে প্লেইটলেট কাউন্ট নিয়ে অযথা আতংক নয়

ডেঙ্গু রোগে প্লেইটলেট কাউন্ট নিয়ে অযথা আতংক নয়

ডেঙ্গু রোগে প্লেইটলেট কাউন্ট ও এর ট্রান্সফিউশন নিয়ে রোগীরা আতংক ও নানারকম বিভ্রান্তিতে ভুগতে থাকে। সমস্যা হচ্ছে শুধু রোগী না বড় বড় ডাক্তাররাও এই প্লেইটলেট কমে যাওয়া নিয়ে বিরাট আতংক ভুগতে থাকেন। রোগীদেরও আতংকিত করেন। প্লেইটলেট কী, তার কাজ কী, কিভাবে কাজ করে সেটা নিয়ে ঠিক মত মাথা খাটালে এই আতংকটা থাকার কথা ছিল না।

কেউ কেউ প্রোফাইলেকটিক (আগাম সতর্কতামূলক) প্লেইটলেট দেয়ার জন্য অস্থির হয়ে পড়েন। এজন্য তারা কিছু নিজস্ব যুক্তিও তৈরি করেন।

যেমন :
১. রোগী খারাপ হয়ে গেল তারপর প্লেইটলেট দিব?

২. যখন প্রয়োজন পড়বে তখন তো রেডি করতে করতে দেরি হয়ে যাবে। রোগী যদি খারাপ হয়ে যায় ততক্ষণে!

৩. বাড়ায়ে রাখলাম, ক্ষতি তো নাই।

এগুলো মূলত মন গড়া, আতংকপ্রসূত এবং স্যরি টু সে, বিষয়টি অনেকখানি অজ্ঞতাপ্রসূত।

ছোট্ট একটি উদাহরণ দেই বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) আউটডোর চেম্বারে একজন এপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়ার রোগীকে দেখলাম। তার প্লেইটলেট ৫ হাজার এবং তিন দিন ধরে তার রক্তক্ষরণ হচ্ছে থেকে থেকে দাঁতের মাড়ি, প্রস্রাবের পথ দিয়ে।

এটা বলার অর্থ হল প্লেইটলেট কমে গেলেই রোগী ঠাস করে মরে যাবে এমন ভাবার কারণ নেই। সময় পাবেন।

৩ নম্বর পয়েন্টটা ছিল বাড়ায়ে রাখলাম ক্ষতি তো নাই।

উত্তর, অবশ্যই ক্ষতি আছে। আপনি অগ্নিতে ঘৃতাহুতি দিলেন। একেতো ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোমের আশংকা, তার ওপর এই ট্রান্সফিউশন দিয়ে আপনি রোগীর কম্পলিমেন্ট সিস্টেমকে আরো উত্তেজিত করে তুললেন। সুতরাং বুঝতেই পারছেন খুব প্রয়োজন ছাড়া এই জিনিস দেয়া মূলত বাড়তি কিছু ঝুঁকি নেয়া।

কথা আরো আছে, আপনি এই এক ইউনিট প্লেইটলেইট দিয়ে কী এমন উদ্ধার করবেন?

ভরা পেটের মানুষকে এক বাটি মুড়ি দিলে যেমন কোন কাজে লাগে না সেরকম হবে বিষয়টা। প্লেইটলেট উৎপাদন একটি চলমান প্রক্রিয়া। এটা প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে এবং ভাঙছে। আপনার এই আগাম পাঁচ দশ হাজার প্লেইটলেট যোগ করা আর না করা সমান কথা।

ইনফেকশন হতে পারে এই ভেবে আগাম এন্টিবায়োটিক ইঞ্জেকশন দেয়াটা যেই মাপের অপচিকিৎসা এটাও সেই মাপের অপচিকিৎসা।

তবে প্লেইটলেট কেন দেই? ভরা পেটে একবাটি মুড়ির মূল্য না থাকলেও সত্যিকারের ক্ষুধার্ত লোকের কাছে এর মূল্য আছে। সত্যিকারের ক্ষুধার্ত রোগিটি কে তা বোঝাই ভাল ডাক্তারের কাজ।

কখন দেবেন?

প্লেইটলেট তখনই দেবেন যখন রক্তক্ষরণের চিহ্ন দেখা দেবে শরীরে। র‍্যাশ হবে, রক্তক্ষরণ হবে কেবল তখনই দেবেন প্লেইটলেট। এইটুকু রক্তক্ষরণে কিছু হবে না। এগুলা মাইনর ক্যাপিলারি ব্লিডিং। তিন চার দিনেও কিছু হবেনা।

ডেঙ্গুতে তাহলে মানুষ মারা যায় কেন?

ডেঙ্গুতে প্লেইটলেট কমে রক্তক্ষরণ হয়ে রোগী মারা যায় না। রোগী মারা যায় ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোমে। সেটা ভিন্ন বিষয়। এর ম্যানেজমেন্ট ভিন্ন। বিস্তারিত কথা আছে। সব বলতে গেলে সেমিনার হয়ে যাবে।

এটা ঠেকাতে রোগীকে ফ্লুইড বা তরল দিতে হবে প্রচুর। মুখে খাওয়ান, শিরাতে দিন। ফ্লুইড, ফ্লুইড এন্ড ফ্লুইড। ঘন ঘন প্লেইটলেট না দেখে ব্লাড প্রেসার কমছে কিনা দেখুন। ডিহাইড্রেশন আছে কিনা দেখুন, রক্তের পিসিভি দেখুন।

হতাশার কথা- এমনকি বড় বড় ডাক্তাররাও এসব গোনায় না ধরে ত্রিশ হাজার প্লেইটলেট দেখে ভয়ে আতংকে ছয় ঘন্টা পরপর প্লেইটলেট চেক করে রোগীকে আরো আতংকগ্রস্ত করেন, নিজের চোখে দেখেছি, প্রেসারের খোঁজও নেন না। ভাবটা এমন যেন প্লেইটলেট নিরবে নিভৃতে কমে গিয়ে রোগীর হঠাৎ করে হার্ট বন্ধ হয়ে যাবে!

পরামর্শ

ডেঙ্গুতে প্লেইটলেটের পেছনে অহেতুক সময় নষ্ট না করে রোগীর ফ্লুইড কারেকশন করুন। প্রেসার দেখুন। প্যারাসিটামল খাওয়ান। অযথা এন্টিবায়োটিক আর প্লেইটলেট দেবেন না।

প্লেইটলেট কাউন্ট কমে গেলে যদি রোগী মারা যেত তাহলে ITP এর রোগীরা সব মরে ভূত হয়ে যেত।

পরিশিষ্টঃ

ডেঙ্গুর ন্যাশনাল গাইডলাইনে শত শত লাইন লেখা আছে। সেখানে প্লেইটলেট নিয়ে লেখা একটা লাইনই আছে

platelet is rarely given but may be warranted in patients with severe thrombocytopenia ( <10,000/mm3) and active bleeding.

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে