ডা. সাবিকুন নাহার

ডা. সাবিকুন নাহার

এমবিবিএস, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ। 


১৯ অগাস্ট, ২০১৮ ০৯:০৩ এএম

শেষ সময়ে হাসপাতালে গেলে ডাক্তারের কী করার থাকে?

শেষ সময়ে হাসপাতালে গেলে ডাক্তারের কী করার থাকে?

প্রেগন্যান্সির আগেও মেয়েটাকে ঠিকমত খাইতে দেন নাই। পুষ্টিকর খাবার তো বহু দূরের কথা। মেয়েটা এনিমিয়া নিয়ে বহু কষ্টে সংসারের কাজ করে গেছে। তারপর কোন পরিকল্পনা ছাড়াই প্রেগন্যান্ট হয়ে গেলো। প্রেগন্যান্সির নয়টা মাস একটাবারের জন্যও তারে ডাক্তারের কাছে নিয়া যান নাই। একবারের জন্যও নিদেনপক্ষে একটা আল্ট্রাসনোও করান নাই। হাইপারএমেসিস গ্র্যাভিডেরাম নিয়ে বমি করতে করতে তার অবস্থা কাহিল। সেটাও কোনরকমভাবে কাটিয়ে উঠলো।

পায়ে পানি এসেছে। আপনার বিকার নাই। খিঁচুনি শুরু হলো একদিন। আপনি বাড়িতে নেই। কিংবা রক্তপাত শুরু হলো। কিংবা লেবার পেইন উঠার পর বাচ্চার এবং জরায়ুর কন্ডিশন না জেনেই দাই দিয়ে ট্রাই করালেন। দাই ইচ্ছামত টেনে-হিচড়ে বের করার চেষ্টা করলো। ফলাফল হলো ভয়াবহ। শেষ সময়ে দয়া করে হাসপাতালে নিয়ে এলেন। ডাক্তাররা তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করলো। ইন্টার্নরা রক্ত দিলো। ওটি টেবিলে জমের সাথে লড়াই চললো। জম জিতে গেলো।

ডাক্তারের চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো দু'ফোঁটা অশ্রু। তারপর আপনি কী করলেন? ডাক্তারের গায়ে তুললেন পুরুষালি হাত। সাথে অকথ্য গালাগালি। ঘুরঘুর করছিলো সাংবাদিক। নিজের দোষগুলো চেপে গিয়ে সমস্ত দোষ চাপিয়ে দিলেন ডাক্তারের ওপর। আর যায় কই? দিনের পর দিন আপনি যেই অন্যায়গুলো করে গেলেন, তার কোন দায় নেই। এক পা কবরে দেওয়ার পর ডাক্তারের কাছে নিয়ে এসে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও ডাক্তার বাঁচাতে না পারায় সব দোষ হয়ে গেলো ডাক্তারের! বাহ বাহ, ভালো তো ভালো না?

দুই.
আপনার বয়স্ক পিতার বুকে ব্যথা হয়েছে সকাল থেকে। আপনাকে একবার বলার চেষ্টা করেছিলো। আপনি গুরুত্ব না দিয়ে অফিসে চলে গেলেন। দিন গড়িয়ে রাতে নিয়ে গেলেন ডাক্তারের কাছে। এতক্ষণে যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও ডাক্তার হতাশ হলেন। আপনার মুষ্টিবদ্ধ হাত চলে গেলে ডাক্তারের গন্ডদেশে। অবহেলা করলেন আপনি, আর দায় চাপালেন ডাক্তারের ওপর। বাহ, সুন্দর তো!

তিন.
ছোট্ট মেয়েটার ছোট বয়স থেকেই এপিলেপসি। গর্ভাবস্থায় মাকে নিয়মিত চেক আপ করাননি। দাই দিয়ে চেষ্টা করে অবস্ট্রাক্টেড লেবার বানিয়ে ফেলেছিলেন। দীর্ঘসময় বাচ্চার মাথা বার্থ ক্যানেলে আটকে থাকায় মাথায় প্রচন্ড আঘাত পায়। ডেলিভারির পর দেরিতে কান্না করে। সেই যাত্রায় জানে বেঁচে গেলেও সমস্যা পিছু ছাড়ে না। সেই মেয়েটার একদিন ভয়াবহ খিঁচুনি শুরু হয়। ঠিকমত দেখে রাখেননি। জানতে পারেন বেশ কিছুটা সময় পার হওয়ার পর। ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান ঠিকই কিন্তু ততক্ষণে সবকিছু আওতার বাইরে। ডাক্তার প্রটোকল অনুযায়ী সর্বোচ্চ চেষ্টা করে। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার নির্দেশ ডাক্তারের পক্ষে তো চেঞ্জ করা সম্ভব না। কিন্তু এটা কে কাকে বোঝাবে? যত দোষ তা তো নন্দঘোষেরই।

চার.
অনেকদিন থেকে আপনার মা খুব অসুস্থ। আপনার এত সময় কই? বউ-বাচ্চাকে নিয়ে অমুক-তমুক জায়গায় যাওয়ার সময় হয়, মায়ের জন্য ডাক্তারের কাছে সিরিয়াল দিয়ে লাইনে দাঁড়ানোর সময় হয় না। কিছু ইনভেস্টিগেশন করানোর টাকা নাই আপনার। অসুস্থটা যখন ভয়াবহ কিছুতে রূপ নিলো, আপনার বিকার হলো কিছুটা। হাসপাতালে নিয়ে গেলেন। দরদ উপচে পড়ছে এতদিন পর। ডাক্তারের কিইবা করার থাকে একমাত্র চেষ্টা ছাড়া, যদি আল্লাহ না চায়? কিন্তু আপনি তো শিরককে মনে-প্রাণে ধারণ করা মানুষ, আপনাকে কে বোঝাতে যাবে এসব?

প্রাইভেট হাসপাতালে নিয়ে গেছেন। সরকারি হাসপাতালের নাম শুনলে নাক ছিটকান। প্রেস্টিজ বলে একটা ব্যাপার আছে না? প্রাইভেট হাসপাতালে ডাক্তার একজন এমপ্লয়ি মাত্র। মাস শেষে আপনার মতই জাস্ট বেতনটুকু পান। আর কিচ্ছু না। হাসপাতালে আপনার যত টাকা খরচ হলো তার কিছুই ডাক্তার পান না। সমস্ত কিছুই যায় মালিকপক্ষের পকেটে। কই মালিকদের সেচ্ছাচারিতা নিয়ে তো কোনদিন একটা টু শব্দও করলেন না! সমস্ত এলার্জি ডাক্তারদের নিয়েই, না? হায় হায় হায়, কসাইগুলা কত টাকা কামাই করে ফেলতেছে!

এই কামাইয়ের পর্যায়ে যাইতে যে কী পরিমাণ কষ্ট করতে হইছে, কী কী স্যাক্রিফাইস করতে হইছে তা একটাদিন সিম্প্যাথী সহকারে জানতে চাইছেন? যেই দিনগুলাতে তাদের পেটে ভাত ছিলো না, একটাদিন ডেকে ভাত খাওয়াইছেন? এত এত বই কিনতে হয়, কোনদিন একটা বই কিনে দিছেন?

হাজার হাজার টাকা খরচ করে জাস্ট একটু ফ্রেশ দেখানোর জন্য পারসোনাতে যান। তাতে কিন্তু কোন সমস্যা নাই। এত টাকা ইনকাম করায় তাদের প্রতি আপনার কিন্তু কোন জিলাসি নাই। দুইদিন পরপরই রেস্টুরেন্টে যান। দশগুণ বেশি টাকা দিয়ে খান। এটাও কোন সমস্যা না। করুক না তারা একটু ইনকাম। আড়ং, কে ক্রাফট, সেইলরের জামা না পড়লে কি জাতে উঠা যায়? একদমই না... কিন্তু কিন্তু কিন্তু, অসুস্থতার মত একটা সামান্য জিনিসের জন্য ডাক্তাররা কেন এত টাকা নিবে? কসাইগুলা কত টাকা কামায় ফেলতেছে, দেখছেননি কারবার!

চেম্বার প্র্যাক্টিস করলেও দোষ, না করলেও দোষ। আপনাদের সমস্যাটা কী ভাই? পিছে লাগছেন কেন এভাবে? মূল্যায়নও করবেন না, আবার অন্য ক্যাডারে চলে গেলেও গালি দিয়ে বংশের পরিচয় দিবেন। আচ্ছা ভাই, যান কেন এই ডাক্তারদের কাছে? না গেলে হয় না? শোনেন, ডাক্তাররা ডাক্তারি না করলেও অন্যকিছু করে জীবিকা নির্বাহের ক্ষমতা তাদের আছে। আপনারা যাইয়েন না তাদের কাছে। বাংলাদেশ ডাক্তারদের ডিজার্ভ করে না।

ডেথ সার্টিফিকেট কয়টা লিখেছি? হাত-পায়ে যতটা আঙুল আছে বড়জোর ততটা। অথচ ডিসচার্জ পেপার লিখেছি হাজার হাজার। এর মানে বোঝেন পন্ডিতেরা?

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না