১৮ অগাস্ট, ২০১৮ ১২:০৯ পিএম
মেডিভয়েসকে অন্যতম সেরা বিজ্ঞানী

যে দেশে গবেষণা থাকে না সে দেশের ভবিষ্যত নেই: ডা. আরিফ

যে দেশে গবেষণা থাকে না সে দেশের ভবিষ্যত নেই: ডা. আরিফ

ন্যাচার গ্রুপের জার্নাল “জার্নাল অব হিউম্যান জেনেটিক্স” এ পৃথিবীর সেরা তিন তরুণ বিজ্ঞানীর মধ্য জায়গা করে নিয়েছেন বাংলাদেশের চিকিৎসক ও গবেষক মোহাম্মদ আরিফ হোসেন।  এছাড়া ২০১৭ সালে তিনি আন্তর্জাতিক আরো দুটি সম্মাননা পেয়েছেন।  বিজ্ঞানী মোহাম্মদ আরিফ হোসেন এ মুহূর্তে গবেষণার কাজে অবস্থান করছেন জাপানে।  মেডিভয়েসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এ তরুণ  চিকিৎসাবিজ্ঞানী বলেছেন নানা গুরুত্বপূর্ণ কথা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মামুন ওবায়দুল্লাহ 

মেডিভয়েস: জার্নাল অব হিউম্যান জেনিটিক্সের কাজ কী?

মোহাম্মদ আরিফ হোসেন: পৃথিবীতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কিছু জার্নাল আছে এর মধ্যে একটা হচ্ছে Journal of Human Genetics. সেখানে হিউম্যান জেনেটিক্সের ওপর নতুন রিসার্চগুলো যাচাই বাছাইয়ের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়।

মেডিভয়েস: গতানুগতিক চিকিৎসা পেশায় না গিয়ে গবেষণায় কেন?

মোহাম্মদ আরিফ হোসেন: আমি একজন গতানুগতিক চিকিৎসকই বটে। উন্নত বিশ্বে প্রায় প্রত্যেক চিকিৎসকেরই নিজস্ব গবেষণা থাকে, বলতে পারেন ফিজিশিয়ান কাম রিসার্চার।  আমি আসলে একজন শিশু নিউরো-মেটাবলিক রোগ বিশেষজ্ঞ।

নিউরো-মেটাবলিক রোগ সাধারণত জেনেটিক কারণে হয়।  তার মানে, মায়ের পেট থেকে জিন Defect নিয়ে বের হয়, পরবর্তীতে ব্রেন, লিভার, কিডনি, হার্টসহ নানা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে বিভিন্ন ধরণের সমস্যা দেখা দেয়। এই রোগীদের সংখ্যা নেহাত কম নয়, কিন্তু এদের নিয়ে গবেষণা খুব কম হয়েছে। তাই আমি সেগুলো নিয়ে গবেষণা করে আনন্দবোধ করি।

মেডিভয়েস: আপনি যে গবেষণায় অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন (সেরা তিন বিজ্ঞানীর একজন নির্বাচিত হয়েছেন) সে সম্পর্কে জানতে চাই?

মোহাম্মদ আরিফ হোসেন: আমি যে নিউরো-মেটাবলিক রোগ নিয়ে কাজ করে এই অ্যাওয়ার্ডটা পেয়েছি তার নাম হল Krabbe disease. এই রোগে শিশু সাধারণত মায়ের পেট থেকে জিন Defect নিয়ে বের হয়, পরবর্তীতে ব্রেইন মারাত্মকভাবে Affected হয়।  যেমন বাচ্চা প্রচণ্ড কান্নাকাটি করে, খিচুনি হয়, হাত-পা প্যারালাইজড হয় ইত্যাদি।  এই রোগের ডায়াগনোসিস খুবই কঠিন।

আমার গবেষণার বিষয় ছিল, সহজেই কীভাবে রোগটা ডায়াগনোসিস করা যায়।  এটা ছিল আমার প্রথম প্রজেক্ট। ওই প্রজেক্টে আমি সফল হয়েছি।  সফল হওয়ার পরে এটা আমি Gene জার্নালে পাবলিশ করেছি ২০১৪ সালে।  সেটা ছিল আমার পিএইচডির থিসিস।  পরবর্তীতে এই রোগের চিকিৎসার সহজলভ্য উপায় খুঁজছিলাম, কেননা এখন পর্যন্ত পৃথিবীতে Krabbe disease চিকিৎসার একটাই উপায় আছে, আর তা হল Stem cell transplantation. এটা খুবই ব্যয় সাপেক্ষ এবং ঝুঁকিপূর্ণ চিকিৎসা।  বলতে পারেন আমাদের দেশে বোনম্যারু ট্রান্সপ্লান্টেশনের মতো।  

আমি যেটা করেছি, কিছু ড্রাগ আছে যেগুলোকে বলে Chemical chaperone (ছোট সাইজের প্রোটিন), এই Chemical chaperone  এর নাম হচ্ছে NOEV. আমি এই  NOEV দিয়ে Krabbe disease এর চিকিৎসা Laboratory তে করে আলহামদুলিল্লাহ্‌ সফল হয়েছি।  যেটা Journal of Human Genetics-এ পাবলিশ হয়েছিল ২০১৫ সালে।

আমিই হলাম পৃথিবীতে প্রথম ব্যক্তি যে এই সফলতা অর্জন করেছে।  পরবর্তীতে আমার গবেষণা বিজ্ঞানীদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভে করে। যার ফলশ্রুতিতে Journal of Human Genetics এর বিশেষজ্ঞ প্যানেল আমাকে ২০১৭ সালের সেরা বিজ্ঞানী নির্বাচিত করেছে।

মেডিভয়েস: আপনার সফলতার পেছনে কার অবদান উল্লেখযোগ্য, আপনার জীবনের গল্প শুনতে চাই।

মোহাম্মদ আরিফ হোসেন: অবশ্যই, এটা আল্লাহ্‌র দয়া। আমি গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীর ভাটিয়াপাড়াতে খুব সাধারণ পরিবারে জন্মেছি। আমরা ১১ জন ভাই বোন ছিলাম। সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মগ্রহণ করিনি। বাবা ছিলেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। আমার মা খুব শিক্ষিত ছিলেন না; তবে তিনি অসম্ভব আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। সবসময়ের জন্য তিনি আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতেন।

নিজের সবটুকু শক্তি দিয়ে তাঁর সন্তানদের মানুষ করার চেষ্টা করেছেন। আমি হলাম সবার ছোট।  স্বাভাবিকভাবেই মায়ের সাথে আমার কানেকশানটা সবার থেকে একটু আলাদা। মা চাইতেন আমি যেন বিশ্ববিখ্যাত ডাক্তার হতে পারি। 

আমার মা আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। তারপর হলেন আমার তিন নম্বর ভাই মকবুল হোসেন, যিনি সবচেয়ে বেশি ত্যাগ স্বীকার করেছেন আমার সফলতার পেছনে।  এছাড়া আমার অন্যান্য ভাইবোন ও স্ত্রীর অবদান অনস্বীকার্য।

মেডিভয়েস: আপনার শিক্ষাজীবন সম্পর্কে জানতে চাই?

মোহাম্মদ আরিফ হোসেন: আমি দশম শ্রেণি গ্রামে পর্যন্ত পড়াশুনা করেছি, তারপর ঢাকার মিরপুর বাঙলা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজে ভর্তি হই। সেখান থেকেই শিশুতে পোস্ট গ্রাজুয়েশন করেছি।  জাপানের ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেছি।  শিশু নিউরো-মেটাবলিক রোগে ক্লিনিক্যাল ফেলোশিপও করেছি সেখান থেকেই।

মেডিভয়েস: তরুণ চিকিৎসকদের উদ্দেশে কিছু বলুন। যারা গবেষক হতে চায় তাদের বিষয়ে আপনার পরামর্শ কী?

মোহাম্মদ আরিফ হোসেন:  আমি শুধু তরুণ ডাক্তারদের উদ্দেশে বলবো না।  আমি বাংলাদেশের সব ডাক্তারদের উদ্দেশেই বলবো-গবেষণার কোনো বিকল্প নেই।  একজন ডাক্তার যখন গবেষণায় যুক্ত থাকবে না তখন তার জন্য যে চিকিৎসা দিচ্ছে, রোগী আসছে, প্রেসক্রিপশন দিচ্ছে, রোগ ভালো হচ্ছে অথবা ভালো হচ্ছে না, কারণ কী? এগুলো বুঝতেও অসুবিধা হবে।

সারাজীবনই কি অন্যের গবেষণার ওপর নির্ভর করবেন? যে রোগগুলি ডায়াগনোসিস হচ্ছে না, রোগীকে বাইরের দেশে পাঠিয়ে দিচ্ছেন, তাদের ডায়াগনোসিসের দায়িত্ব কি আমরা কোনদিনও নেব না?

মেডিভয়েস: দেশের স্বাস্থ্যখাত নিয়ে আপনার ভাবনা বা পরামর্শ আছে কি না?

মোহাম্মদ আরিফ হোসেন: আমাদের দেশ কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভালো করছে। বিশেষ করে বিগত দশ-পনেরো বছর সার্জিক্যাল লাইনে বাংলাদেশ অনেক বেশি উন্নতি করেছে।  অগ্রগতির সাথে স্বাভাবিকভাবেই কিছু ব্যাকওয়ার্ড বিষয় তো থাকেই।  এর একটা হল গবেষণা, একটা দেশে যখন গবেষণা থাকে না তখন সেদেশের ভবিষ্যত থাকে না। সেটা মেডিকেল লাইনে হোক অথবা প্রকৌশল লাইনে হোক।  যেকোনো ক্ষেত্রে যদি গবেষণা না থাকে সে জ্ঞানের কোন ভবিষ্যত নেই।

মেডিভয়েস: স্বাস্থ্যখাত নিয়ে আপনার পরিকল্পনা বা আপনি দশ বছর পরে নিজেকে কোন জায়গায় দেখতে চান?

মোহাম্মদ আরিফ হোসেন: আমার ভবিষ্যত পরিকল্পনা শুধু আমাকে নিয়ে।  শুনতে একটু স্বার্থপর শোনায়।  কারণ আমার অর্জিত জ্ঞান আমি বাংলাদেশের কোন কাজে লাগাতে পারছি না।  আমার এই গবেষণা কাজে লাগাতে আমি দেশের নামকরা কয়েকজন অধ্যাপকের সাথে যোগাযোগ করেছি, বিশেষ করে বিএসএমএমইউ এবং শিশু হাসপাতালে। দুঃখের বিষয় সেভাবে রেসপন্স পাইনি।  আমার জ্ঞান দেশের জন্য কাজে লাগাতে পারলে খুব ভালো লাগবে। 

আমি বর্তমান যেখানে কর্মরত আছি সেখানে আমরা এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সাথে Collaborative কাজ করি, বিনামূল্যে নিউরো-মেটাবলিক রোগ ডায়াগনেসিস করে দিই।  কিন্তু দুঃখের বিষয় আমার দেশের জন্য কিছুই করতে পারছি না।

দেশে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি আমার সহযোগিতা চান, সেক্ষেত্রে আমি সহযোগিতা করবো।  অথবা কোনো ধরণের কোলাবোরেশন করতে চাইলে আমি সহযোগিতা করবো।  আর যদি সেটা না হয় তাহলে আমি তো থেমে থাকবো না।  আমি আমার কাজ চালিয়ে যাব।

মেডিভয়েস: দেশে মেডিকেলে সেক্টরে গবেষণার অবস্থা ও ভবিষ্যত কী? 

মোহাম্মদ আরিফ হোসেন: আমাদের দেশে আইসিডিডিআরবিতে মাইক্রোবায়োলজির ওপর কিছু গবেষণা হয়। ইনফেকশাস রোগ নিয়ে তাঁরা কাজ করেন।  তাঁরা খুব ভালো কাজ করছেন।  তাদের কিছু প্রকাশনাও অনলাইনে দেখেছি।  এটা মন্দের ভালো বলতে পারেন।  কারণ আমাদের দেশে তো ইনফেকশানস রোগগুলোই মেইন।

তবে যে পরিমাণ গবেষণা হওয়া উচিত সে তুলানায় খুবই সামান্য। এর জন্য আমি ডাক্তারদের এককভাবে দোষ দেব না। এজন্য দায়ী পরিবেশ ও অবকাঠামো। যদি ডাক্তারদের ওপর রোগীর চাপ কমিয়ে দেয়া হয়, তাহলে কিছুটা সম্ভব।

মেডিভয়েস: পুরস্কার পেয়ে কেমন লাগছে?

মোহাম্মদ আরিফ হোসেন: স্বীকৃতি সবারই ভালো লাগে।  যখন কেউ আপনার কাজের জন্য প্রশংসা করবে তখন নতুন কিছু করার জন্য আগ্রহ জাগবে।  আমি যে অ্যাওয়ার্ড পেয়েছি সেটা আমি কাউকেই জানাইনি।  এমনকি ফেসবুকের ওয়ালেও প্রকাশ করিনি।  আমার এক রিলেটিভ এটা প্রকাশ করে দিয়েছে।

আমি গত বছরে তিনটা পুরষ্কার পেয়েছি।  এরমধ্যে একটা হাইলাইটেড হয়েছে।  জাপান সোসাইটিতে জাপানের গবেষকদের মধ্যে একটা গবেষণা প্রতিযোগিতা ছিল। সেখানে শুধুই আমাকে পুরস্কৃত করা হয়।আরেকটা ছিল এশিয়ার বিজ্ঞানীদের মধ্যে। সেখানে যৌথভাবে পুরস্কার পেয়েছিলাম। 

মেডিভয়েস: মেডিভয়েস সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন ও পরামর্শ কী ?

মোহাম্মদ আরিফ হোসেন: আপনাদের কার্যক্রম সম্পর্কে খুব বেশি জানতাম না।  পরে আমি অনলাইনে আপনাদের পোর্টালটা দেখেছি।  খুব ভালো লেগেছে। ডাক্তাররা ভুলত্রুটির উর্ধ্বে নয়।  ডাক্তাররা একই সাথে যেমন অনেক ভালো কাজ করে তেমনি ভুলও করে।  তবে কোন ডাক্তারই কিন্তু ইচ্ছে করে রোগীর ক্ষতি করেন না। ডাক্তারদের যেসব বিষয় গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার করা হয়।  প্রচার করার আগে বিষয়টা জানা দরকার।

পৃথিবীতে চিকিৎসা সম্পর্কে সাধারণ মানুষ খুব কমই জানে।  আমাদের দেশে যারা মেডিকেল সায়েন্স পড়ে না তারা মেডিকেল সায়েন্স সম্পর্কে খুব কম ধারণা রাখে।  সাংবাদিকদের উচিত, নিউজ প্রকাশ করার আগে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের সাথে আলাপ করা।

মেডিভয়েস: সময় দেয়ার জন্য ধন্যবাদ।

মোহাম্মদ আরিফ হোসেন: আপনাকেও ধন্যবাদ।

আরও পড়ুন

►বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে প্রথম হওয়া উর্মিতার গল্প

► পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম হওয়া নারী চিকিৎসকের গল্প

►বিসিএসে প্রশাসনে তৃতীয় হওয়া ডা. তাহমিদের জীবনের গল্প

থাইরয়েড চিকিৎসায় নতুন কিছু নিয়ে আসব: ডা. ফজলুল বারী

ক্লাস ফাইভে পড়ার সময়ই বাবা আমার হাতে মাস্টার্সের বই তুলে দেন: ডা. ঈশিতা

► নিরাপদ মাতৃত্ব নিয়ে মেডিভয়েসের মুখোমুখী ডা. মারিয়াম সাবাবি

►রেডিও জকি ডা. নিতুলের জীবনের গল্প

►হাত-পা ঘামা নিয়ে যন্ত্র তৈরি: ড. খন্দকার সিদ্দিক-ই-রব্বানীর বিশেষ সাক্ষাৎকার

►দেশের কার্ডিয়াক সার্জারি এখন বিশ্বমানের: ডা. সাবরিনা আরিফ

►নরমাল ভেজাইনাল ডেলিভারি অবশ্যই সিজারের চেয়ে উত্তম- প্রফেসর ডা. রাশিদা বেগম

►দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম নারী চিকিৎসক

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
আন্তর্জাতিক এওয়ার্ড পেলেন রাজশাহী মেডিকেলের নার্স
জীবাণু সংক্রমণ প্রতিরোধে অসামান্য অর্জন

আন্তর্জাতিক এওয়ার্ড পেলেন রাজশাহী মেডিকেলের নার্স