ডা. কাওসার উদ্দিন

ডা. কাওসার উদ্দিন

সহকারী সার্জন

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।


১৮ অগাস্ট, ২০১৮ ১১:১৪ এএম

অ্যাজমা হলে কী করবেন?

অ্যাজমা হলে কী করবেন?

টোনা-টুনির সংসার। বিয়ে হয়েছে কিছুদিন হলো। ঘরে বাইরে দুজন মাত্র। ঘরের সব কাজ টুনির তাই একারই করতে হয়। টুনির আবার একটু শ্বাসের দোষ আছে। ধুলাবালি ঝাড়ু দিতে গেলে টুনির শ্বাসের টান ওঠে, শ্বাস ছাড়তে বেশ কষ্ট হয়, বুকটা কেমন ধরে আসে, সাথে অল্প কাশি হয়। 

একটু পরিশ্রমের কাজ করলে, আর নাকে ধুলাবালি গেলেই (dust allergy, airborne allergens, pollutants, mite) টুনির এ সমস্যটা বেশি হয়। এমনকি একটু ঠান্ডা পানিতে গোসল করলেই শ্বাসকষ্ট শুরু হয় (cold exoposure), সকাল ও সন্ধ্যায় যখন ঠান্ডা একটু বেশি থাকে তখন শ্বাসে কষ্ট হয় (diurnal pattern)। 

টুনি আবার বেশ বেছে বেছে খায়, কারণ কিছু খাবারে টুনির সারা শরীরে র‍্যাশ ওঠে, শুরু হয় চুলকানি। টুনির আবার বুক ধড়ফড়ও করে। কয়েকদিন আগে এক গ্রাম্য চিকিৎসক তাকে propanol (non selective beta blocker- causes bronchoconstriction) নামের কী একটা ওষুধ দিয়েছিলো, খেয়ে তো তার অবস্থা কাহিল, শ্বাসকষ্টে যায় যায় অবস্থা! এমনকি ব্যথার ট্যাবলেট (Aspirin, NSAID) খেলেও তার এই কষ্ট বাড়ে।

টুনির স্বামী গো-বেচারা টোনা সারাদিনই কাজে বাইরে থাকে। সেদিন সন্ধ্যায় টুনি পাশের বাসার ভাবীর বাসায় বেড়াতে গিয়ে একটা পান দেয় মুখে (betel nuts contains methacholine), আর তার কিছুক্ষণ পর থেকেই টুনির প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। টোনা কাজ শেষে রাত্রে বাড়িতে এসে দেখে টুনির কষ্টে কাতরাচ্ছে। সে আর দেরী না করে টুনিকে নিয়ে পাশের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। সেখানে ডা. বকুল গরমে কুলকুল করে ঘেমে ইমার্জেন্সি ডিউটি করছিলো আর চেয়ারে বসে ঝিমাচ্ছিলো। রোগী আসতে সে তন্দ্রা ভেঙে রোগীর কাছে যায়, শোনে উপরের সমস্ত হিস্ট্রি। তারপর স্টেথোটা রোগীর বুকে ধরে পরীক্ষা নিরীক্ষা শুরু করে।

টুনি ঘনঘন শ্বাস নিচ্ছে মিনিটে ৩০ বার (Tachypnoea), আর শ্বাস ছাড়ার সময় বাঁশির মত একটা শব্দ হচ্ছে (expiratory wheeze), পালসও বেশি - 110/min (tachycardia)। টুনির নাম জিজ্ঞেস করতেই সে বহু কষ্টে ভেঙে ভেঙে কয়েক শ্বাসে নিজের নামটা বলতে পারলো (inability to complete sentence in 1 breath)। সবকিছু মিলিয়ে ডা. বকুলের কাছে এটাকে Asthma মনে হলো। Spirometre নাই, তবে একটা Peak flow metre আছে, সেটা দিয়ে FEV1 দেখলো কম - 40%।

মনে মনে চিন্তা করলো কাল সকাল আর দুপুরেও সে এটা দেখবে কারণ asthma-তে FEV1 এর diurnal variation হয়। যদি সকালে ও সন্ধ্যায় দিনের অন্য সময় অপেক্ষা FEV1 20% কমে হয় তবে এ রোগের ব্যাপারে অনেকটা নিশ্চিত হওয়া যাবে। অন্যভাবেও নিশ্চিত হওয়া যায়, রোগীকে যদি bronchodilator বা glucocorticoid দেওয়ার পর তার শ্বাসকষ্টের উন্নতি হয়। 

টুনি যেহেতু তার এলার্জির সমস্যা বলেছে, সেহেতু asthma হওয়ার চান্সই অনেক বেশি। আর তার এলার্জির ব্যাপারে নিশ্চিত হতে কাল Skin Prick টেস্ট এবং সাথে CBC (eosinophilia থাকতে পারে) ও একটা S.IgE করবে (এলার্জিক কন্ডিশনে বাড়ে)। যেহেতু শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, তাই একটা বুকের এক্সরেও করা উচিত। যদিও asthma এর এক্সরেতে তেমন কিছু পাওয়া যায় না, তবে asthma ছাড়া অন্য কোন সমস্যা আছে কিনা সেটা আলাদা করা যাবে। পাশাপাশি একটা ABG করতে পারলে ভাল হত কিন্তু সেটা এখানে সম্ভব না। ওটি থেকে পালস অক্সিমিটারটা এনে দেখলো SpO2 কম, 92%!

সবকিছু দেখেশুনে বকুল এটাকে আপাতত acute exacerbation of bronchial asthma ডায়াগনসিস করলো, আর সে অনুযায়ী চিকিৎসা শুরু করলো। (টুনির শ্বাসকষ্ট বেশি, কাশি অল্প। যদি উল্টোটা হত, অর্থাৎ কাশি বেশি আর কাশতে কাশতে অল্প শ্বাসকষ্ট, তবে তাকে বলে cough variant asthma).

> SpO2 কম, তাই অক্সিজেন দিল।
> নেবুলাইজার মেশিন দিয়ে bronchodilator SABA (Salbutamol) + LAMA (Ipratropium bromide) দিল হাই ডোজে। এতে শ্বাসনালী প্রসারিত হয়ে শ্বাস নিতে সুবিধা হবে। নেবুলাইজার না থাকলে ইনহেলার দিয়েও এ ওষুধগুলো দেওয়া যায়।
> ইনজেকশন Hydrocortisone দিলো যা শ্বাসনালীর প্রদাহ কমিয়ে তাকে সংকুচিত হতে বাঁধা দিবে, এতে বাতাস চলাচলে সুবিধা হবে৷ রোগীর মুখে খেতে কোন অসুবিধা না হলে ইনজেকশনের পরিবর্তে ট্যাবলেট prednisolone দেওয়া যায়।

এতেও রোগীর উন্নতি না হলে এবং FEV1 30% এর নিচে থাকলে ইনজেকশন magnesium salt বা ইনজেকশন aminophylline দেওয়া যায়। aminophylline দিলে একটু সাবধানে, কারণ এটা cardiac arrhythmia করে।

acute asthma এর চিকিৎসা ওই উপরের টুকুই। অনেক সময় রোগীর dehydration থাকে, কারণ ঘনঘন শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য insensible water loss হয়, সেক্ষেত্রে আইভি ফ্লুইড দেয়া যায়।

সাথে সাথে মনে রাখতে হবে, salbutamol হাই ডোজে বা দীর্ঘ সময় ব্যবহার করলে প্লাজমার পটাশিয়াম বেশি বেশি ব্লাড সেলের মধ্যে ঢুকে যেয়ে হতে পারে hypokalemia, সেক্ষেত্রে পটাশিয়াম সাপ্লিমেন্টেশন দিতে হতে পারে।

উপরের চিকিৎসা চলার পাশাপাশি আঁধা ঘন্টা পরপর রোগীর FEV1 (PEF) টেস্ট ও SpO2 দেখা চলতে লাগলো। দেখা গেলো আগের থেকে রোগীর উন্নতি হচ্ছে, অবস্থা ভালর দিকে (FEV1 >50%, SpO2 >92%)। 

দু'দিন সকালে রোগী মোটামুটি সুস্থ। ইতোমধ্যে উপরের পরীক্ষাগুলো শেষে এটা নিশ্চিত হওয়া গেল টুনির Asthma আছে। acute exacerbation এখন নিয়ন্ত্রণে, রোগীকে ওষুধ লিখে ছুটি দেওয়া যায়।

চিকিৎসা:
Asthma এর সাধারণ চিকিৎসা Step up হিসেবে দিতে হয়, অনেকটা ডায়বেটিস প্রেশারের চিকিৎসার মত add on করে করে। যত কিছু দিয়েই চিকিৎসা দেই না কেন, আমাদের উদ্দেশ্য একটাই, শ্বাসনালী প্রসারিত রেখে সুষ্ঠু বাতাস চলাচল অব্যাহত রাখা।

Step1: 
inhaled SABA (Salbutamol /Terbutaline) রোগীকে বলতে হবে প্রয়োজনমত নিবেন, যখন শ্বাসকষ্ট বেশি হবে বা যখন কোন ভারী কাজ করতে যাবেন যে কাজ করার পর শ্বাসকষ্ট শুরু হতে পারে। 

এতে ভাল কাজ না হলে উপরের সাথে-
Step2: 
লো ডোজে (400 microgram) inhaled Glucocorticoid (Beclomethasone / Budesonide /Fluticasone/ Mometasone/ Ciclesonide) দিতে হবে। এটা উপরের মত প্রয়োজনমত না, কয়েকমাস বা দীর্ঘদিন চালিয়ে যেতে হবে। অনেক রোগী আছে যাদের ক্ষেত্রে steroid contraindicated, বা রোগী ইনহেলার নিতে চায় না, বা শ্বাসের কষ্ট অতটা বেশি না, তাদের ক্ষেত্রে inhaled Glucocorticoid এর পরিবর্তে oral Leukotriene receptor inhibitor (Montelukast) বা Phosphodiesterase inhibitor (Theophylline/Doxophylline) দেওয়া যায়।

এতে কাজ না হলে,
Step 3: 
Step 2 এর inhaled Glucocorticoid এর ডোজ বাড়িয়ে (400 থেকে 800) দিতে হবে। এতে কাজ না হলে এর সাথে inhaled LABA (Salmeterol /Formoterol) দিতে হিবে। এই ওষুধ inhaled Glucocorticoid এর সাথে কম্বিনেশন হিসেবে পাওয়া যায় (Salmeterol+Fluticasone), তখন সেটাই দেওয়া হয়, রোগীর নিতে সুবিধা হয়।

এতেও কাজ না হলে,
Step 4: 
inhaled Glucocorticoid এর ডোজ আরো বাড়িয়ে (800 থেকে 2000) দিতে হবে। সাথে উপরের Step 3 এর মত inhaled LABA (Salmeterol /Formoterol) থাকবে। এখানে সাথে আরো দেওয়া যায় Leukotriene receptor inhibitor (Montelukast) বা Phosphodiesterase inhibitor (Theophylline/Doxophylline)।

এত কিছুতেও কাজ না হলে,
Step 5: 
প্রতিদিন সকালে oral Glucocorticoid (Prednisolone) দেওয়া হয় (যত কম দেওয়া যায় ততই ভাল)। oral Glucocorticoid এটাও কাজ না হলে একটা নতুন ওষুধ monoclonal antibody (Omalizumab/Mepolizumab) দেওয়া যায় যা S. IgE ও Eosinophil এর বিরুদ্ধে কাজ করে।

এই 5 step এ Asthma এর চিকিৎসা শেষে রোগী ভাল বোঁধ করলে উপরের যে inhaled অথবা oral Glucocorticoid দেওয়া হচ্ছে তার ডোজ আস্তে আস্তে কমাতে হবে কারণ, কারণ Glucocorticoid গুলো iatrogenic Cushing Syndrome করে, করে osteoporosis. osteoporosis প্রিভেন্ট করতে oral Bisphosphonate (Ibandronic acid) দেওয়া হয়।

নিয়মিত ওষুধ সেবন আর যেসব কারণে শ্বাসকষ্ট বাড়ে সেসব পরিহার করে টুনি এখন অনেক সুস্থ। টোনাটুনির সুখের সংসার। দেখতে দেখতে অনেকগুলো দিন পার হয়৷ হঠাৎ একদিন টুনির মাসিক বন্ধ হয়ে যায়, কাঠি পরীক্ষায় দেখা যায় টোনা বাবা হতে চলেছে। সেই খুশিতে টোনা মিষ্টি নিয়ে ডা. বকুলের চেম্বারে এসে হাজির। টুনির মা হওয়ার খবর শুনে ডা. বকুল টোনাকে টুনির Asthma এর ব্যাপারে কিছু পরামর্শ দেয়।

পরামর্শ:
- Asthma পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে, তা না হলে বাচ্চার ক্ষতি হবে।

- আগের ওষুধ সব চলবে। এসব ওষুধে বাচ্চার কোন ক্ষতি হয় না। এমনকি বুকের দুধ খাওয়াতেও কোন সমস্যা হয় না।

- রোগী oral Glucocorticoid (prednisolone) প্রতিদিন 7.5mg এর বেশে খেলে, ডেলিভারীর দিনে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করে injection Glucocorticoid (Hydrocortisone 100 mg) দিতে হবে দিনে ৩ থেকে ৪ বার, এটা ফিটাল ডিসট্রেস কমাবে।

- বাচ্চা ডেলিভারীর সময় মা'কে Misoprostol (Cytomis) ট্যাবলেট দেওয়া হয়, যা bronchospasm করতে পারে। তাই এটা ব্যবহারের পর Asthma আক্রান্ত মায়ের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে।

উপদেশ দিয়ে ডা. বকুল টুনিকে একদিন নিয়ে আসতে বলে গর্ভকালীন চেকআপের জন্য। শেষে টোনাকে আবারো নিচের কথাটি স্মরণ করিয়ে বিদায় দেয়, 'ও টোনা আমার কথা মন দিয়ে সব শোনো, তোমার টুনি ওষুধ খেতে ভুলে যায় না যেনো!' 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে