ঢাকা      সোমবার ১৯, নভেম্বর ২০১৮ - ৪, অগ্রাহায়ণ, ১৪২৫ - হিজরী



ডা. সাবিকুন নাহার

এমবিবিএস, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ। 


ডাক্তারদের ছাত্রজীবন কোনকালেই শেষ হয় না!

গতিশীল এই পৃথিবী আমাদেরকে নিয়েই যেন গতিশীল। পৃথিবী যেমন তার কক্ষপথে এক মুহুর্তও থেমে নেই, আমরাও থেমে নেই। ছুটে চলেছি। কখনো উদ্দেশ্যহীনভাবে, কখনো আবার লক্ষ্যবস্তু ঠিক করে।

২০১২ সালের জানুয়ারি মাসে একটা যাত্রা শুরু করেছিলাম আমরা, 'একুশ' নামের একটা ব্যাচ। সম্পূর্ণ একটা নতুন জীবন তখন। যা দেখি তা-ই ভালো লাগে। শুধু পরিবারকে ছেড়ে আসার কষ্টটা মনে তীব্র বিষাদের বিউগল বাজানো ছাড়া। একসাথে থাকা, একই শূণ্যতার অনুভূতিতে থাকা মানুষগুলো ক্রমশ যেন একটা পরিবার হয়ে উঠতে লাগলাম। অবশ্য, অনেকেই এই নতুন গড়ে ওঠা পরিবার থেকেই ভবিষ্যতের জন্যও পরিবার গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতে লাগলো। 

এনাটমি ক্লাসে কত মজার মজার, কত ভয়ঙ্গকর স্মৃতি ছিলো আমাদের। ফরমালিনে ডুবিয়ে রাখা লাশ নিজের হাতে ব্যবচ্ছেদ করা, মৃত মানুষের হাড়গোড় বালিশের পাশে রেখে ঘুমিয়ে পড়া, ভিসেরা ধরতে ধরতে হাতের তালু শক্ত হয়ে যাওয়া একসময় জীবনের অভ্যস্ত কিছু ব্যাপার হয়ে গিয়েছিল।

এডমিশন কোচিং করার সময় প্রথম জেনেছিলাম ফার্স্ট ইয়ারেই নাকি লাশ কাটাকুটি ব্যাপারগুলো থাকে। ভয়ে আত্মা শুকিয়ে গিয়েছিল। একবার মনে হলো- সবকিছু ছেড়েছুড়ে না হয় ভার্সিটি কোচিংই করি। সেই আমিই ডিসেকশন রুমের ছিন্নবিচ্ছিন্ন পুরনো ক্যাডাভারটা দেখে একদম ভয় পেলাম না। হাতে নিয়ে ভিসেরাগুলো উল্টিয়ে পাল্টিয়ে দেখলাম। রুমমেটের সাথে শেয়ারে বোনস কিনলাম। 

ড্যামো, আইটেম, পেন্ডিং, সাপ্লি শব্দগুলো নতুন থেকে হুট করেই একদিন পুরনো হয়ে গেলো। আইটেমের জন্য ময়-মুরুব্বিদের কাছ থেকে দোয়া নেওয়া পোলাপাইনগুলা একদিন প্রথম প্রফেশনাল পরীক্ষাতেও বসে গেলাম। যেই স্টেথোস্কোপ, বিপি মেশিন চান্স পাওয়ার পরই কিনে ফেলেছিলাম, একদিন সেগুলো ব্যবহার করারও সুযোগ পেলাম। স্টেথোস্কোপ গলায় ঝুলিয়ে ভাব নিয়ে ওয়ার্ডে যাওয়ার সুযোগ হলো। ওয়ার্ড পুরনো হতে লাগলো। স্টেথোস্কোপ গলা থেকে পড়ার টেবিলের ড্রয়ারে নেমে গেছে ততদিনে। সেকেণ্ড প্রফ শুরু হলো, শেষও হলো। কেউ হাসলাম, কেউ কাঁদলাম। ঘড়ির কাঁটা ঘুরতেই থাকলো, জীবন চাকা চলতেই লাগলো। আমরা যদি হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়ে উঠে না দাঁড়াই, কেউ তো টেনে তুলবে না। তাই কেউ হাসতে হাসতে এগিয়ে চললাম, কেউ কাঁদতে কাঁদতে উঠে দাড়ালাম। 

মেঘে মেঘে অনেক বেলা হলো। ক্লাসরুমে একসাথে একশো আঠারো জন বসে ক্লাস করার দিন ফুরলো। দিন ফুরলো 'কালকে সাতটার ক্লাস হবে না' শোনার অতি আকাঙ্খিত নোটিশটার। সমবেত কণ্ঠে 'স্যার, আজকে আর না' বলার শিশুসুলভতারও দিন ফুরলো। কোনদিন সামনে, কোনদিন মাঝে আর বেশিরভাগ দিন পিছনে বসা অন্যমনস্কতার স্মৃতিময় দিনগুলো বেলা শেষের জানালা দিয়ে পালিয়ে গেলো। স্যার পড়া ধরতে গেলে পেছনে বেঞ্চের নিচে লুকিয়ে যাওয়া, কোন কোন ক্লাসে ব্যাগকে বালিশ বানিয়ে ঘুমিয়ে যাওয়া, একে ওকে পচানো, শেয়ার ইটে মুভি দেওয়া-নেওয়া অনেক সিরিয়াস স্মৃতির সাথে সাথে এই ধরণের ফাঁকিবাজি স্মৃতিও কম নেই।

পুরনোরা চলে গিয়েই তো নতুনদের জায়গা করে দেয়। কেউ যাবে, কেউ আসবে। থাকবে ক্লাসরুম, থাকবে চক। থাকবে টিচারের বকবক। শুধু বছর বছর স্টডেন্টরা বদলাবে।

স্টুডেন্টরা বদলালো। গল্পের স্টুডেন্টরা ডাক্তার হলো। শিক্ষানবীশের দায়িত্ব শেষ করলো। ছাত্রজীবন কি আসলেই শেষ হয়েছে? হয় কোনদিন? কই না তো? গল্পের চরিত্ররা বিসিএসের জন্য পড়েছে, দুইদিন পর পোস্ট গ্র‍্যাজুয়েশনের জন্য পড়বে, চান্স পেলে ওয়ার্ড ম্যানেজমেন্টের জন্য পড়বে, পরীক্ষায় পাশ করার জন্য পড়বে, প্রমোশনের জন্য পড়বে, আপটুডেট থাকার জন্য পড়বে। আজকের স্টুডেন্ট তারপর একদিন আগামীদিনের স্টুডেন্টকে পড়ানোর জন্য পড়বে।

আপাতদৃষ্টিতে ছাত্রজীবন শেষ হয়ে গেলেও ডাক্তারদের ছাত্রজীবন কোনকালেই শেষ হয় না।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

‘হে ঈশ্বর এটাই শেষ কেইস, আর ডেলিভারি রোগীর দায়িত্ব নেব না!’

‘হে ঈশ্বর এটাই শেষ কেইস, আর ডেলিভারি রোগীর দায়িত্ব নেব না!’

প্রতিবছর রেসিডেন্সির রেজাল্ট দিলে আমি দেখতে চেষ্টা করি কোন ছেলে চান্স পেলো…

চাতক চাতকী

চাতক চাতকী

গাইনী আউটডোরে দেখতাম প্রায়ই রোগী আসে এবরশন করানোর জন্য। কখনও আসে কিভাবে…

মেয়ের বাবা ও ডাক্তারের গল্প

মেয়ের বাবা ও ডাক্তারের গল্প

ফ্ল্যাটের এক আঙ্কেল সরকারি এক ব্যাংকের রিটায়ার্ড উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। ভদ্রলোককে আমি বেশ…

ভালোবাসার এপিঠ-ওপিঠ

ভালোবাসার এপিঠ-ওপিঠ

তরুণী শাওনের মাঝবয়সী হুমায়ুন আহমেদ এর প্রেমে পড়ার কথা শুনে অনেকেই ভ্রু…

ইভিডেন্স বেসড মেডিসিন

ইভিডেন্স বেসড মেডিসিন

আমি তখন মেডিকেল কলেজে ৫ম বর্ষের ছাত্র। হঠাৎ খেয়াল করলাম চান্দি খালি…

বব ভাই

বব ভাই

বব ভাইকে চিনি প্রায় আঠার বছর। যখন আমি NITOR (পঙ্গু হাসপাতাল) এ…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর