ঢাকা      মঙ্গলবার ২৩, অক্টোবর ২০১৮ - ৮, কার্তিক, ১৪২৫ - হিজরী



ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

বিভাগীয় প্রধান, প্যাথলজি,

শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ।


বাসা থেকে জেলখানা পর্যন্ত

আর্মি শাসিত তত্বাবধায়ক সরকারের অধীন দেশ চলছিল। রাস্তার ধারের স্থাপনার অবৈধ অংশগুলি অনবরত হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে ভাঙা হচ্ছিল। সেই হাতুড়ির আঘাত অনেকের মাথায় লাগছিল। তাদের ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছিল। 

বড় বড় নেতাদেরকে ধরে ধরে জেলখানায় ঢুকাচ্ছিল। সবার চোখ খবরের কাগজে জানতে আজকে কাকে ধরলো। কারো কোন প্রতিবাদ করার ক্ষমতা নেই। এসময় একদিন দুপুরের পর একঝাক আর্মি এসে শহরের একাংশের ৫০/৬০ টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিক ঘিরে ফেললো। একজন ম্যাজিস্ট্রেটের অধীনে অভিযান শুরু হলো। এক্সপার্ট প্রতিনিধি হিসাবে সিভিল সার্জনের স্থলে একজন মেডিকেল অফিসার উপস্থিত ছিলেন। 

নানা অনিয়মের অজুহাতে ডাক্তার, টেকনোলজিস্ট, ম্যানেজার গ্রেপ্তার করে করে আর্মি ভ্যানে উঠানো শুরু করলো। আর্মি পার্সনগণ আসামী ধরে ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের নিকট নিয়ে আসেন। ম্যাজিস্ট্রেট গ্রেপ্তারের পরওয়ানা দিয়ে ভ্যানে থানায় নেয়ার নির্দেশ দেন।

ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে অনেক কর্মচারী কর্মক্ষেত্র থেকে পালিয়ে গিয়েছিল। এক ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ম্যানেজার দুপুরের আহার করার জন্য বাসায় গিয়েছিলেন। প্রস্রাবের বেগ ছিল তলা পেটে। কিন্তু বেগ নিয়েই তিনি খেতে বসলেন। কারণ, তার প্রচন্ড ক্ষুধা পেয়েছিল। তিনি ভেবেছিলেন খাওয়া দাওয়া শেষ করে বাথরুমের কাজটা করবেন। খাওয়া শেষ করার সাথে সাথে টেলিফোন পেলেন তাড়াতাড়ি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চলে যাওয়ার জন্য, কারণ সেখানে আর্মি ঢুকে লাইসেন্স চাচ্ছে। প্রস্রাব না করেই তিনি রিক্সা নিয়ে চলে এলেন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। ঢুকেই দেখেন ইয়া বড় বড় আর্মির লোক রক্ত চক্ষু করে তাকিয়ে আছে।
- আপনি কে?
- আমি এই সেন্টারের ম্যানেজার।
- লাইসেন্স আছে?
- আছে।
- লাইসেন্স দেখান।

ম্যানেজার ভয়ে সব কিছু ভুলে গেলেন। লাইসেন্স কোন সেল্ফে কোন ফাইলে রেখেছিলেন তা মনে করতে পারলেন না। না পাওয়াতে তাকে গ্রেফতার করা হল।
- আমি একটু টয়লেটে যাব।
- রাখেন টয়লেট। পরে যাবেন। আগে ভ্যানে উঠে বসেন।

ম্যানেজার দেখলেন তার অনেক বন্ধুও সারিবদ্ধভাবে বসে আছে ভ্যানে থানায় যাবার অপেক্ষায়। একে অপরের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছু করার ছিল না। মাগরিবের নামাজের আজানের পর সবাইকে নিয়ে আর্মির ভ্যান রওয়ানা হল থানার দিকে। ম্যানেজার বললেন,
- আমি একটু টয়লেটে যাব। প্রস্রাব করব।
- রাখেন আপনার প্রস্রাব। প্রস্রাব থানায় গিয়ে করবেন।

থানায় নিয়ে সব আসামী একটি কক্ষে গাদাগাদি করে রাখা হলো। প্রায় ৫৩ জনের মত হবে। এদিকে সন্ধ্যায় একজন মন্ত্রী মহোদয়কেও রাজনৈতিক আসামী হিসাবে থানায় আনা হয়েছে। থানার পুলিশগণ তাকে নিয়েই ব্যস্ত। কেউ এই ৫৩ জনের খোজ নিলেন না। রাত ১২ টার দিকে একজন সেন্ট্রি এসে ‘কে কে প্রস্রাব করবেন এই দিকে আসেন’ বলে রুমের পিছনের দরজা খুলে দিলেন। ম্যানেজার প্রস্রাব করার জন্য দরজা দিয়ে প্রবেশ করে দেখলেন একটি রুম। তার মেজে পিছনের দিকে ঢালু। ৬/৭ জন আসামী, তারই পরিচিত, একজন পরিচিত ডাক্তারও আছেন, এক যোগে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করছেন, কেউ কাউকে না দেখে, উপরের দিকে চোখ তুলে, অথবা চোখ বন্ধ করে অথবা মাথা নিচু করে বিনয়ের সাথে। এই দৃশ্য দেখে ম্যানেজার লজ্জায় প্রস্রাব না করেই ফিরে আসলেন।

সারারাত তাদের দাড়িয়েই কাটাতে হলো। সকাল দশটায় তাদেরকে কোর্টে উঠানোর জন্য কোর্ট চত্তরে আনা হলো। সেখানেও একটি রুমে সবাইকে রাখা হল। ম্যানেজার সেন্ট্রিকে বললেন, আমি একটু টয়লেটে যাব।
- এখন না। একটু পরে আপনাদেরকে জেল খানায় নেয়া হবে। ওখানে গিয়ে করতে পারবেন।

দুপুর দুইটার দিকে কোর্টের পেশকার এসে সবার সই নিলেন।
- এখানে কী লিখা আছে?
- লিখা আছে, ‘আমি আমার অপরাধ স্বীকার করিলাম।’

সন্ধ্যার দিকে সবাইকে নিয়ে পুলিশের ভ্যান জেলখানার দিকে রওয়ানা হলো। ম্যানেজারের মনে আশা জাগলো এবার জেলখানায় গিয়ে টয়লেট করা যাবে। রাস্তা ভাঙা ভাঙা ছিল। ভ্যানের ঝাকুনিতে মানেজারের প্রস্রাবের বেগে বাধ ভেঙে যেতে চায়। অসহ্য যন্ত্রণা অনুভূত হয়।

অবশেষে সবাই জেলখানায় পৌঁছলেন। সেখানে গিয়ে ম্যানেজার সেখানকার পুলিশকে গিয়ে বললেন, আমি একটু প্রস্রাব করব।
- এসেই প্রস্রাব? এখন না। আগে রুমে ঢুকুন। তারপর।

৫৩ জন আসামীর সবারই ১৫ দিনের সশ্রম কারাদণ্ড হয়েছে। জেলখানার ফর্মালিটি শেষ করতে অনেক সময় লাগলো। রাত ১১টার দিকে ম্যানেজারের ডাক পড়লো। সই স্বাক্ষর করে কয়েদীর পোশাক পরে ম্যানেজার কয়েদখানায় প্রবেশ করলেন। রাত ১২ টার দিকে তিনি টয়লেটে প্রবেশ করলেন। প্রস্রাব করবার চেষ্টা করলেন। কিন্তু হায়! প্রস্রাব হল না। অনেক্ষণ প্রস্রাবের বেগ ধরে রাখতে রাখতে প্রস্রাব বেড় করার সিস্টেম প্যারালাইসিস হয়ে গেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

মুলারিয়ান এজেনেসিস: প্রকৃতির অবিবেচক খেয়াল ও প্রমিতির কান্না

মুলারিয়ান এজেনেসিস: প্রকৃতির অবিবেচক খেয়াল ও প্রমিতির কান্না

প্রমিতি, বয়স- ১৬। এইচএসসি ১ম বর্ষে পড়ে। প্রাণবন্ত, উচ্ছ্বল প্রজাপতির মতো। যখন কথা…

ইন্টার্ন ডাক্তারদের আবার কষ্ট আছে নাকি?

ইন্টার্ন ডাক্তারদের আবার কষ্ট আছে নাকি?

আপনার বেতন কত? ছোটবেলায় শুনেছিলাম এ প্রশ্ন করা নাকি বেয়াদবি! সেই ভয়ে…

সব মৃত্যুই দুঃখের, সুখের কোন মৃত্যু নেই!

সব মৃত্যুই দুঃখের, সুখের কোন মৃত্যু নেই!

তখন আমি সিওমেক হাসপাতালের ইন্টার্ন। মেডিসিন ওয়ার্ডে রাউন্ড দিচ্ছেন প্রফেসর ইসমাইল পাটোয়ারি…

‘কেটা ফের জানতোক যে, পিঁপিয়া খাল্যে ছ্যালা ধলো হয়?’

‘কেটা ফের জানতোক যে, পিঁপিয়া খাল্যে ছ্যালা ধলো হয়?’

এক সদ্য গর্ভবতী রোগীকে কাঁচা পেঁপে খেতে নিষেধ করলাম। - আনারস আর কাঁচা…

ইন্টার্ন চিকিৎসকদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা

ইন্টার্ন চিকিৎসকদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা

ফাঁকিবাজির মহান ব্রত নিয়ে ইন্টার্নি শুরু করেছিলাম। আমি জন্মগত ভাবেই ফাঁকিবাজ। সবাই…

‘বুকের ভিত্রে চ্যাংনা চ্যাঁও চ্যাঁও করে’

‘বুকের ভিত্রে চ্যাংনা চ্যাঁও চ্যাঁও করে’

ডাক্তার- আপনার সমস্যা কী? রোগী- বুকের ভিত্রে চ্যাংনা চ্যাঁও চ্যাঁও করে। ডাক্তার-…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর