ডা. ফাহমিদা শিরীন নীলা

ডা. ফাহমিদা শিরীন নীলা

এমবিবিএস, এফসিপিএস (গাইনী)

ফিগো ফেলো (ইতালি)

গাইনী কনসালট্যান্ট, বগুড়া।


০৯ অগাস্ট, ২০১৮ ১১:২২ এএম

‘হামার প্যাটে এক্ষণি ছোল চাই’

‘হামার প্যাটে এক্ষণি ছোল চাই’

মোটামুটি চ্যাংদোলা করে নিয়ে এসে তাকে আমার সামনে বসাল তার এক ভাই আর ভাবী। সে একটানা কেঁদেই চলেছে, উঁ উঁ উঁ..., তাল-লয়ের কোন ওঠা-নামা নেই। 

আমি চেম্বারে বসেই তাকে খেয়াল করছিলাম। তার কান্নার সুরটা বড় অদ্ভুত, অনেকটা শাঁকচুন্নির মত, উঁ উঁ উঁ...
- বসানোর পর তার দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলাম, কী হয়েছে? কান্নাকাটি কেন?

তার কান্নার মাত্রা বাড়ল। সে কোন কথা না বলে শাঁকচুন্নির কান্না অব্যাহত রাখল। এ দেখি ভারী বিপদ! রোগীর লোকদের দিকে তাকাতেই তারা বলা শুরু করল,
- ম্যাডাম, মুনে করেন যে আপনের অক্ত ভাঙিচ্চে। আর....
- হৈ হৈ করে উঠল রোগী। ও তোরাই কব্যা আচ্চু। তো তোরাই ক। তোরাই ক। হামি আর দেকামু না। ব্যস, বলেই সে উঠে পড়ল চেয়ার থেকে। 
- আমি রোগীর লোকদের দিকে তাকিয়ে কপট রাগ দেখালাম। এই চুপ, তোমরা কোন কথা বলবা না। রোগীর কথা শুনব আমি আর কারো কথা শুনব না।

সে আমার কথায় আশ্বস্ত হয়ে বসে আবার শাঁকচুন্নি কান্না জুড়ে দিল। অনেক কষ্টে মা-ধন বলে তার মুখ খুলালাম।
- শোনেন কী হছে। হামি মুনে করেন যে, ওইদিন আখার গোড়ত বস থ্যাকে আন্ধছুনু। আগের দিনের এনা গোস্ত আছল, ওই গোস্ত দিয়্যা আলু ঘাটি আর ভাত। মুনে করেন যে, তখন সকাল ১১ডা বাজে। আন্ধেবাড়ে হামি খাবা বচ্চি গামলা লিয়্যা। খালি হামি লই, মুনে করেন যে হামার জাও বচ্চে। 
- তো হামার শাউড় আস্যে কচ্চে, 'চ, তোক অ্যাজ কবর‍্যাজের গোড়ত নিয়া যামু। মাসিক ঠিক হবি না ক্যা, কবর‍্যাজের দুই ডোজ ওষধ খালি সব কুঠে যাবি!' 
- হামি কনু, 'আচ্চা। থামো ভাত খায়্যে লিই।' 
- হামার শাউড় কল্যো, 'তাল্যে ভাত খায়্যে কাপড় বদল্যে লে'।
- হামার জাও আবার কল্যো যে, 'হামিও যামু তোগেরে সাতে।'

ধৈর্য্য সীমার দ্বারপ্রান্তে এসে আমি এ পর্যায়ে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার কি রক্ত এখনও ভাঙছে?
- আর যাই কই! সে তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠল।
- ল্যান, আপনেই কন। হামি আর কিচু কমু না। আপনেই কতা কন। হামার কতা কওয়া লাগবি না! হামি আর চিকিৎসা হমু না।

আবার শুরু হয়ে গেল তাল-লয় বিহীন কান্না। আবারও অনেক কষ্টে তাকে বুঝিয়ে বসালাম। এক হাতে কান ধরে বললাম, 'বাবা ভুল হয়ে গেছে আমার, আর কথা বলব না'।

মনে মনে পুঁথি শোনার মনস্থির করলাম। তার দিকে মনোযোগ দিয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলাম, সে বলতে শুরু করল। চোখের পলক ফেলতেও ভয় করছে। উল্লেখ্য, একটু এদিক ওদিক তাকালেই সে কথা বন্ধ করে অধিক জোরে কান্নাকাটি শুরু করছিল আর সেইসাথে চিকিৎসা না হওয়ার ভয় দেখান তো আছেই।

- হামি কাপড় বদল্যে এডা লাল-লিল ছাপা তোলানা শাড়ী পিন্দনু... ওরা হামাক এডা পুরিয়া খিলালো... হামার ছোলডা ওরা লিয়্যা চল্যে গেল। উঁ উঁ উঁ...।
- আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে। চল, দেখি বিছানায় শোও। আমি তোমাকে একবার পরীক্ষা করে দেখি।

সে আবারও শাঁকচুন্নি স্টাইলে কাঁদতে কাঁদতে গিয়ে বেডে শুলো। তার লোকেরা আগের রিপোর্টের কাগজ বের করতেই সে হৈ হৈ করে আবারও চিকিৎসা না করানোর হুমকি দিল বিধায় টেবিলের নীচ দিয়ে চুপ করে কাগজ নিলাম। অতীত কোন রেকর্ডে প্রেগন্যান্সীর কোন আলামত নেই। 

ইতোমধ্যে তার জামাই একবার ভেতরে ঢুকার চেষ্টা করতেই সে তেড়ে গেল,
- ওই হারামজাদাক হামি মার‍্যেই ফেলমু। ওই হামার ছোল লিয়্যা গেছে।

তার পেটে হাত রাখতেই সে কান্নার রেশ বাড়িয়ে দিয়ে আমার সাথে জিদ করা শুরু করল,
- হামার ছোল তুমি আন্যে দাও।
- দিব তো। এখন চুপ করো।
- না, তুমি এক্ষণি আন্যে দাও।
- আচ্ছা, দিব তো। সেজন্য আমার ছ'মাস সময় লাগবে। এই ছ'মাসের মধ্যেই তোমার প্যাটে ছোল চল্যে আসবে।
- না, তুমি হামাক এক্ষণি আন্যে দাও। হামার প্যাটে এক্ষণি ছোল চাই।
- আচ্ছা, সে জন্য তো তোমার স্বামীকেও দরকার। ওই যে ওরা বলছে, তুমি স্বামীকে দেখলেই দা-বোটি নিয়ে তাড়ে যাচ্ছো। তাল্যে ছোল আসবে কী করে?
- না, তুমি হামার কতা বোঝছিন না। তুমি হামার হার‍্যে যাওয়া ছোল আন্যে দ্যাও।

আচ্ছা শোন, তোমার তো আরও দুইটা ছোল আছে তাই না?
- না, তুমি হামার ছোল আন্যে দাও।
- এই ছোল যেতে যেমন সময় লেগেছে, আসতেও তো লাগবে। ঠিক না?
- না, তুমি এক্ষণি আন্যে দ্যাও।
- সেটা এনে দিতে হলে তোমার স্বামীকে দরকার। সে যদি আর ছ'মাসের মধ্যে তোমার প্যাটে ছোল না দেয়, তাহলে তার প্যাটই হামি কাটমু আগে। আমার কাছে চকচকা ছুরি-কাঁচি আছে।
- না, ওগল্যা কিচ্চু জানি না, তুমি এক্ষণি হামার প্যাটত ছোল আন্যে দ্যাও। হামার ওই ছোলই চাই। এক্ষণি দ্যাও... হুঁ উঁ উঁ উঁ...।

পাদটিকাঃ তলপেটের একটা ক্রনিক ইনফ্লামেশনে ভুগতে ভুগতে তার সাইকোসিস ডেভেলপ করেছিল। অনেক ঝামেলা করে তাকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে, ওষুধ খাওয়াতে রাজী করিয়ে সাইকিয়াট্রিষ্টের কাছে রেফার্ড করেছিলাম। পরের ভিজিটে সে পুরো সময় আমার কথা শুনে মুচকি মুচকি হেসেছে...।

- কি, তোমার স্বামীকে মারতে হবে? ছুরি কাঁচি বের করব?

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না