ঢাকা      মঙ্গলবার ২৩, অক্টোবর ২০১৮ - ৮, কার্তিক, ১৪২৫ - হিজরী



অধ্যাপক ডা. আব্দুল ওহাব মিনার

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, সাহিত্যিক


এপ্রোন পরিধানের অদম্য সাধ

‘মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষা’ অনেক পরীক্ষার্থীকেই আকৃষ্ট করে, তার চেয়ে বেশি আকৃষ্ট করে তাদের অভিভাবকদের৷ কোনো এক অজানা কারণে মেডিকেল কলেজে পড়ানো, ছেলেমেয়েকে চিকিৎসক বানানোর প্রতি অদম্য আগ্রহ আমাদের দেশের অভিভাবকদের মধ্যে মাত্রাতিরিক্ত৷

এমনকি যেসব পিতামাতা মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা করে চিকিৎসক হয়েছেন আর মেডিকেল জীবনের কঠিন অধ্যায় পার হবার প্রাক্কালে নিজের বাবা-মাকে গালমন্দ করেছেন আজ তারাই সন্তানদের জন্য চিকিৎসা পেশাকেই একমাত্র অপশন রেখেছেন৷

যারা পরীক্ষার্থী তাদের বিষয়টা অভিভাবকদের মতো অতোটা তীব্র না হলেও তারাও এই পেশায় আসার জন্য মরিয়া৷ এইচএসসি পরীক্ষা শেষ করেই দৌড় শুরু করে কোচিং সেন্টারের দিকে৷ নাওয়া খাওয়া সব ভুলে একটাই স্বপ্ন পূরণের তাগিদে ছুঁটে চলে দিনমানভরি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের দিকে। সেটা হচ্ছে সাদা এপ্রোন পরিধানের অদম্য সাধ, গলায় স্টেথো ঝুলানোর বাঁধ ভাঙা মোহ৷

এহেন আকাঙ্ক্ষা বা স্বপ্ন থাকাটা যেমন স্বাভাবিক, আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে যেমন যৌক্তিক একইসাথে একজন চিকিৎসক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ জিনিস মনে করিয়ে দেয়াটা আমি আজ দায়িত্ব মনে করছি৷

১. প্রতিটা পেশার কিছু স্বতন্ত্র চাহিদা থাকে, এই স্বাতন্ত্রতাই ওই পেশার ভূষণ৷ চিকিৎসা পেশার ভিন্নতাটা আসলেই অন্যান্য পেশার চেয়ে ব্যতিক্রম৷ কারণ আমার দৃষ্টিতে একটাই, সেটা হচ্ছে চিকিৎসা পেশা জীবনকে নিয়ে সরাসরি ডিল করে যা অন্য পেশার ক্ষেত্রে অনুপস্থিত৷

২. নশ্বর এই পৃথিবীতে মানুষ বেশিদিন থাকে না৷ মরেও তাই মানুষ বেঁচে থাকার চেষ্টা করে, স্বপ্ন দেখে৷ সকল ধর্মের অনুসারীরাই তাই এই পেশার দিকে মনোনিবেশ করে, মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করে প্রভুকে সন্তুষ্ট করার প্রয়াস পায়৷

৩. আদালত কর্তৃক দুর্বৃত্ত খেতাবপ্রাপ্ত এই পেশায় কিন্তু ওই খেতাব প্রদানকারী, পত্রিকার পাতায় ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুর খবর ছাপিয়ে উল্লাসে ফেটে পড়া সেই ভাইটি, উপজেলায় ফলস সার্টিফিকেট না পেয়ে ডাক্তারকে ইনজুরড করে ফ্লোরে ফেলে রেখে যাওয়া সেই পার্টি মাস্তান- এরা সবাই নিজের ছেলে মেয়ে বা ভাই বোনকে এই ‘কসাই’ পেশার দিকে পাঠায়৷ 

৪. বাংলাদেশের মতো একটা নানান অভাব অভিযোগের দেশে অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিপূর্ণ এই পেশায় অভিভাবকরা তাই সন্তানদের দিতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন৷ সামাজিক স্বীকৃতি, কিছুটা সম্মান আর বৈধ আয়ের একটা বন্দোবস্ত এই পেশায় যেমন আছে অন্যত্র সেটা অনেকটাই অনুপস্থিত৷ একজন চিকিৎসক মানে সে একজন অন্তর্র্জাতিক ব্যক্তি, আন্তর্জাতিক চিকিৎসক৷

আপনি আপনার সন্তানকে এই পেশায় দিচ্ছেন বলে কি চিকিৎসকদের সকল অপকর্ম মেনে নেবেন? নিশ্চয়ই না৷ কিছু কিছু সরকারি বেসিরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে সীমাহীন অভিযোগ ক্রমাগত আসছেই৷ ঢালাওভাবে সব অভিযোগ অস্বীকার করার মতো দুঃসাহস আমার অন্তত নেই৷ তবে এটাও ঠিক ঘটনার ভেতরে না গিয়েও অনেক অভিযোগ করা হয় যা মূলত এক ধরণের অবিচার৷ কোন কোন চিকিৎসকের আচরণ, চিকিৎসা পদ্ধতি আমাদের চিকিৎসকদের কাছেই দারুণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ৷
 
আপনি আমি কি ফরমালিন মিশ্রিত ফল বিক্রেতাকে মারধর করি, ট্রাক থামিয়ে প্রকাশ্যে টাকা হাতিয়ে নেয়া পুলিশ সার্জনকে পিটাই? মিথ্যুক চরিত্রহীন রিপোর্টারকে গণধোলাই দেই? দেই না৷ আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাই, প্রয়োজনে আদালতের স্মরণাপন্ন হই৷
 
সব পেশায়ই দুষ্ট ও অসৎ লোক আছে, তাদের বিচার কি আমরা কর্মস্থলে করি? করি না৷ দু একজন নষ্ট লোকের জন্য আপনি পুরো পেশাকে দায়ী করলে ত্যাগী ও আন্তরিকভাবে সেবাদানে ব্রত সেই ভাল চিকিৎসকদের মন ভেঙে যাবে৷

আর একটা বড় সমস্যা সরকারি দ্বান্দ্বিক নিয়মকানুন এবং আইনের অপপ্রয়োগ৷ একটা উদাহরণ দিলেই বাকিটা বুঝতে সহজ হবে৷ সরকারি মেডিকেল কলেজে শিক্ষক স্বল্পতায়, অপরিষ্কার হাসপাতালের ফ্লোরে যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশের শরণার্থীদের মতো অমানবিকভাবে শুয়ে কাতরানো রোগীদের বেলায় কোন অসুবিধে নেই কিন্তু বেসরকারি মেডিকেল কলেজ বা হাসপাতালে এমন নয় এর চেয়ে কম কল্পলেইনই অনেক বড় করে দেখা হয়৷ পেনাল্টি করা হয়, হয়রানি করা হয়৷ বুঝতেই পারছেন সুবিধাভোগী গ্রুপটা এখান থেকে ফায়দা নেয়৷

এবার আসুন দেখি কী করলে আপনার মনটা যৌক্তিকভাবে সান্ত্বনা পাবে তেমন দু একটা পরামর্শ রাখছি৷

আপনার জীবন কোন মোবাইল ফোন নয় বা অট্রালিকার ইট পাথর নয় যে আপনি যার তার হাতে সপে দেবেন৷ পেশার জ্ঞানে হালনাগাদ একজন পারদর্শী ও মানবদরদী চিকিৎসকের কাছে আপনাকে সপে দিতে দ্বিধা করবেন না নিশ্চয়ই৷ এতগুলো গুণসমৃদ্ধ একজন চিকিৎসক কোথায় পাবেন?

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় আমরা কি এমন চিকিৎসক বানানোর ব্যবস্থা রেখেছি? না নেই, রাখিনি৷ আমদানিওতো করা যাচ্ছে না৷ কী করা যায়! শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন ছাড়া মানবিক মানুষ তৈরি সম্ভব নয়। বই পড়ুয়া কিছু ডিগ্রিধারী বিবেকহীন মানুষ পাওয়া যেতে পারে৷

আমার প্রত্যাশা ও কর্তৃপক্ষের করণীয় 
১. এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ ৫ ছাড়া মেডিকেলে আবেদন করার সুযোগ রহিত করা, বন্ধ করে দেয়া (বর্তমানে ৪.৫ কেও সুযোগ দেয়া হচ্ছে)৷

২. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েটের মতো একবারের বেশি দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ বন্ধ করে দেয়া৷

৩. মেধা তালিকায় এগিয়ে থাকা বেসরকারি মেডিকেল কলেজে চান্স প্রাপ্তদের আর্থিক কারণে পড়ার সুযোগ হারানো ছাত্রছাত্রীদের সরকারি ঋণের ব্যবস্থা করা৷ এটা করলে মেধার সঠিক মূল্যায়ন হবে৷ বর্তমান সরকারের জন্য এটা সম্ভব৷

৩৩ তম বিসিএসে ৬০০০ আর শুক্রবারে হয়ে যাওয়া ৩৯ তম বিসিএসে আরও চার হাজার ডাক্তার নিয়োগের প্রস্তুতি পরবর্তীতে এবছরেই বাকি ৬০০০ ডাক্তার নিয়োগের সরকারি ঘোষণা- সরকারের অসাধারণ/অকল্পনীয় পদক্ষেপ৷ সরকার চাইলে বেসরকারি মেডিকেলের ছাত্রছাত্রীদের লোনের ব্যবস্থা করে দেবেন৷

৪. সেনাবাহিনীর কায়দায় মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা নেয়া যার মাধ্যমে প্রার্থীর লোভহীন মানব সেবার প্রতি ত্যাগী মনোভাব ফুটে উঠবে৷ ভারসাম্যপূর্ণ মেজাজের ধৈর্যশীল একজন দেশপ্রেমিক মানুষ বাছাইটা এভাবে করা সম্ভব৷ (প্রয়োজনে সেনাবাহিনীর আদলে দুই তিন দিন তাদের রেখে এই যাচাই বাছাইর কাজটা চলতে পারে)৷ আজ এটা উদ্ভট ঠেকলেও আদতে এই মনস্তাত্ত্বিক ও দর্শনগত পরীক্ষার ইমপ্যাক্ট অনেক বেশি একদিন প্রমাণিত হবে৷

৫. সরকারি সব আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ বাঞ্চনীয়৷

৬. ভর্তি পরীক্ষার পাশ নম্বর কোনভাবেই সরকারি মেডিকেলে চান্স পাওয়া প্রার্থীর চেয়ে খুব নিচে হবে না৷ মেধাবীদের সরকার ঋণ দিলে এই পাশ নম্বর ৪০ না হয়ে ১০ হলেও সমস্যা নেই৷ আর তা না হলে সরকারি মেডিকেলে চান্সপ্রাপ্তদের সর্বশেষ নম্বরের চেয়ে ১৫/২০ কম নির্ধারণ করা যায়৷ 

ধরা যাক, সরকারি মেডিকেলে সর্বশেষ প্রাপ্তনম্বর ৭৬.২৫৷ তাহলে পাশ নম্বর ওই বছরের জন্য ধরা হবে ৫৬.২৫৷ তাহলে ৪০ পাওয়া সকল সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রত্যাখ্যাত শিক্ষার্থীর টাকার জোরে মেডিকেলে পড়ার সুযোগটা বন্ধ হবে, মেধাবীদের সম্মান করা হবে৷ এসব কিছুই সরকার/মন্ত্রণালয়ের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে৷

আপনি এদেশের নাগরিক৷ স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া আপনার নাগরিক অধিকার৷ মানসম্মত উন্নত স্বাস্থ্যসেবা পেতে আপনাকেই একজন সুনাগরিক হিসেবে এগিয়ে আসতে হবে৷ থাইল্যান্ড বা নেপাল থেকে কেউ এসে আমাদের সমস্যার সমাধান করবে না৷ আমি এই পেশায় থাকার কারণে সমস্যাগুলো ভেতর থেকে যেভাবে দেখি ও সমাধান যেভাবে হতে পারে বুঝি তুলে ধরলাম৷

পুনশ্চ: আপনি একজন মেডিকেল ভর্তিচ্ছু পরীক্ষার্থী হিসেবে বা অভিভাবক হিসেবে আপনার আবেগ, রাগ, ক্ষোভ বিবর্জিত নিরপেক্ষ সুচিন্তিত মতামত দিন৷

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


এডু কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

এক নজরে দেখে নিন বিভিন্ন মেডিকেল কলেজের ভর্তি বিজ্ঞপ্তি 

এক নজরে দেখে নিন বিভিন্ন মেডিকেল কলেজের ভর্তি বিজ্ঞপ্তি 

মেডিভয়েস ডেস্ক: সারা বাংলাদেশের মেডিকেল কলেজগুলোতে একযোগে শুরু হয়েছে ২০১৮-২০১৯ শিক্ষাবর্ষে এমবিবিএস…

আরো সংবাদ














জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর