ডা. শিরীন সাবিহা তন্বী

ডা. শিরীন সাবিহা তন্বী

মেডিকেল অফিসার, রেডিওলোজি এন্ড ইমেজিং ডিপার্টমেন্ট,

শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বরিশাল।


০৭ অগাস্ট, ২০১৮ ১২:৩৫ পিএম

জীবনে প্রথম বার একা!

জীবনে প্রথম বার একা!

এক্কেবারে একা কোথাও যাচ্ছে নিতু। বার বারই চেষ্টা করছে খুব সাবলীল এবং স্বাভাবিক আচরণ করতে। আর এই অতি চেষ্টা ওকে বার বার ফ্লপ করে দিচ্ছে। ওর সাথে কোন বড় লাগেজ নেই। কেবল একটা লেডিস পার্স। বাস কন্ডাকটর বার বার জিজ্ঞাসা করেছে। উত্তরে নিতু এমন আঁতকে উঠেছে ব্যাগ বলে, যেন কাউকে খুন করে ব্যাগে ভরে ফেলে দিয়ে যাচ্ছে ও।

ঢাকা থেকে বাসে উঠেছে নিতু। গন্তব্য চিটাগং। মোবাইল বন্ধ করে রেখেছে কাল থেকে। টাকাও নেই। টিকিটের পরে হাতে আছে মাত্র দেড় হাজার টাকা। কী ভীষন অনিশ্চয়তা! কী করতে যাচ্ছে, কী ঘটতে যাচ্ছে নিতুর জীবনে তা যেন ও নিজেই জানে না।

এক ইয়ার সিনিয়র রুমমেট শিলা আপুর বিয়েতে নিতুর পরিচয় ইভানের সাথে। বেশি আলাপ নয়। এক দুবার দেখা। ইভান বরের ছোট বেলার বন্ধু। গেট ধরায় বেশ ঝগড়া করতে হয়েছিল মোটা অংকের সেলামী আদায়ের জন্য।

ঝামেলাটা বাঁধে রাতে। বৌ ভাতের দিন বরের জমিদারী গ্রাম্য বাড়িতে ফটোগ্রাফী প্রাকটিস করতে করতে ওকে ফেলেই গাড়ি চলে যায়। সে কী কান্না বেচারীর! ইভান তখন এক রিলেটিভের গাড়ি করে বন্ধুর অনুরোধে ওকে পৌছে দেয়। পুরো রাস্তা ফ্যাচর ফ্যাচর কাঁদছিল নিতু। আর ইভান ইনসাল্ট করে হাসছিল! তিন বছর আগের কথা। মনে হচ্ছে যেন তিন দিন।

ইন্টার্নশীপ শেষ করে ক্লিনিকে জব করতো তখন ইভান। বিসিএসের রেজাল্ট দেব দেব করছিল। এখন সে চিটাগং মেডিকেলের ডাক্তার। হাসপাতালের কাছাকাছি মায়া কানন নামে একটা বাসার ছাদে এক রুমের এক ফ্লাটে থাকে। আর কিছু জানে না নিতু।

মাস্টার্সের ভাইবা শেষ করে হল থেকে বাসায় ফিরেছে নিতু আট দিন। কথা নেই বার্তা নেই কাল মা বলে বিয়ে! এটা ফান না সত্যি ভাবার আগেই একদল নারী পুরুষ এলেন। মোটা একখানা আংটি পরিয়ে দিলেন। নিতু কিংকর্তব্যবিমূঢ়! মাল্টিন্যাশনালের ওই ছেলেকে বিয়ে করে ঘর সংসার করতে হবে!

কিন্তু ওই মোটা কালো ফ্রেমের ডাক্তারটি? বিয়ে থেকে আসার দুমাস পরে প্রথম ফোন দিয়েছিল ইভান। নেহায়েৎ খেঁজুরে আলাপ। দুজনের কারোরই ফেসবুকে আইডি নেই। ফোনে কথা হতো। কী কথা হতো? এই অবোল তবোল। নদী, ফুল পাখি। ডাক্তার সাহেব আবার কবিতা লিখেন। গল্প গুছিয়ে করতে পারেন না। তবে খুব ভাল শ্রোতা। নিতু বকবক করে যায়। আর ইভান শুনে। গাড়ি এগুচ্ছে। পথে কিছু খায়নি নিতু। গা গুলাচ্ছে। সবথেকে অদ্ভুত ব্যাপার ইভানের চেহারাটাই পুরো পথ ধরে মনে করতে চেষ্টা করেছে নিতু, পারেনি। ছায়ার মত একটা অবয়ব। স্বপ্নের মত এক পুরুষ।

মা চার হাজার টাকা হাতে দিয়ে পার্লারে পাঠিয়েছিল সকালে। ফোনে বলে রেখেছে। পার্লারে বসে আদিবাসী মেয়েটি যখন নরম গলায় বলল, আপনার বিয়ে? দুলাভাই কী করে? দেখতে কেমন? অস্ফুটে বলল নিতু, ডাক্তার!

হঠাৎ হাত পা অসার লাগল নিতুর। চোখ গড়িয়ে নোনা জলে চোখ মুখ একাকার। সারা জীবনের ভীরু মেয়েটা জীবনে প্রথম একা একটা কঠিন ডিসিশন নিল। হেয়ালী চশমিশটার সামনে গিয়ে দাঁড়াবে। তিন বছরে এত কথা! একবারও বলেনি ভাল লাগে। একবারও বলেনি ভালবাসে। শুধু কথা বলে গেছে। না বলে একটি দিনও কোথাও যায়নি। প্রতিটি মুহূর্তের হিসেব দেয় নিতুকে। তবু পরিচয় পর্বেই থেকে গেছে কথা বার্তা। এ যুগে এমন পাগলতো এই পৃথিবীতে দুটোই আছে! আংটির ঘটনা থেকে ফোন বন্ধ নিতুর। আচ্ছা ইভান কী টেনশন করছে!

বাড়ির দারোয়ান একটু অবাক হলো। অনেক খুঁজে ঠিকানা পেয়েছে। এক মোবাইল দোকানদার এক পিচ্চিকে দিয়ে মায়া কাননে পাঠিয়েছে ওকে। সিড়িঁ দিয়ে উঠতে প্রচন্ড ভয় লাগছে নিতুর। যদি ইভান ইনসাল্ট করে, যদি উল্টাপাল্টা কিছু বলে। ওদিকে বাড়িতে এতক্ষণে কী হচ্ছে আল্লাহই জানে। সব শক্তি, সব সাহস শেষ। এই গোধূলি বেলায় যেন অজ্ঞান হবার যোগাড় নিতুর।

ছাদের দরজা খুলেই ইভানকে দেখল ও। এখন চেহারা স্পষ্ট হলো। ভূত দেখার মত চমকে উঠেছে ইভান। দৌড়ে এসে বলল, কী হয়েছে তোমার? ফোন বন্ধ কেন?
বাবা বিয়ে দিচ্ছিলেন। বিয়ে করবো না। তাই পালিয়ে এসেছি। ইভান হাসল।

এখন অনেক কাজ। প্রথমে নিতুর বাসায় ফোন দিতে হবে। নিতুকে খাইয়ে দাইয়ে একটু সুস্থ করে নাইট কোচেই ঢাকা ফিরতে হবে। বাবা তো নেই। মা, আপাকে ফোন দিতে হবে।

অবশেষে এতদিনে এই অপেক্ষার অবসান হলো। নিজের সাথে বাজি ধরেছিল এই একটি মেয়ে। রাতের আধাঁরে দেখা পুতুলটাকেই ভাল লেগেছে, ভালবেসেছে। বিশ্বাস ছিল ওকে পাবে। কিভাবে পাবে জানত না। হারিয়ে গেলে কী হতো আজ আর ভাবতেও চাচ্ছে না। শুধু জানে ও ওর ভালবাসার মেয়েকে জীবনে পেয়েছে। ক’জন পুরুষের ভাগ্যে এই ঘটনা ঘটে!

আকাশে আধভাঙ্গা কলসীর মত একখানা চাঁদ। নাইট কোচে ইভানকে নিয়ে ফিরছে নিতু। এই নিস্তব্ধ রাতের প্রকৃতি কী জানে এই ছেলেটাকে নিতু কী ভীষণ রকমের ভালবাসে! এই পথ ধরে লক্ষ বছর চলতে রাজী ও! শুধু এই চশমিশকে ওর সাথে থাকতে হবে।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত