ঢাকা রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৯, ৫ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ৪ ঘন্টা আগে
অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ

অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ

প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও একুশে পদকপ্রাপ্ত চিকিৎসক 

 


০৩ অগাস্ট, ২০১৬ ১০:৪৩

চিকিৎসায় অবহেলা ও অবহেলায় চিকিৎসা

চিকিৎসায় অবহেলা ও অবহেলায় চিকিৎসা

সম্প্রতি অল্প সময়ের ব্যবধানে চিকিৎসায় “অবহেলা” বা ভুলজনিত কারণে রোগীর মৃত্যুর বেশ কিছু অভিযোগ বিভিন্ন মিডিয়ায় এসেছে। বরাবরের মতো এ নিয়ে রোগীর লোকদের সাথে হাসপাতাল বা ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের গোলযোগ, হাতাহাতি ঘটেছে, থানা পুলিশ জড়িত হয়েছে এবং হাসপাতালের চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও নার্সদের গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। প্রসঙ্গটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্র্ণ তাই তা বিশদ আলোচনার দাবী রাখে। 

প্রথমে বলে নেয়া দরকার, যে কোন চিকিৎসকই তার রোগীকে মেরে ফেলতে চান না। তাই প্রশ্নটা এখানে হত্যার নয় বরং অবহেলা, ভুল এবং অদক্ষতার। পেশা হিসেবে চিকিৎসা অনন্য হলেও চিকিৎসক অনন্য নন। তারা এ মাটিরই মানুষ। অন্যান্য পেশার লোকজনের মধ্যে কেউ নিঃস্বার্থ পরোপকারী, কেউ বা চরম পেশাদার আবার কেউ বা স্বার্থান্বেষী। ডাক্তারদের বেলায়ও এই কথা গুলো প্রযোজ্য। আর তাই দক্ষ হাতের সেবার সাথে সাথে অবহেলা, ভুল ও অদক্ষতার ঘটনাও ঘটে। দেশের এমন কোন ক্ষেত্র নেই যেখানে অবহেলা, অরাজকতা, দুর্নীতি এই ধরনের অভিযোগ নেই। কাজেই ডাক্তারদের বেলায় সবাই ভাল হবেন, এটা আশা করা যায় না। ডাক্তাররাও কী সব অফিসে বা কোন প্রয়োজনে অন্যের কাছে গিয়ে কি ভালো আচরণ বা সহযোগিতা পান? 

চিকিৎসকদের ভুল করার প্রসঙ্গে বলতে হয়; ভুল যে কারোরই হতে পারে, চিকিৎসক আলাদা নন। সকল ভুলের গুরুত্ব এক রকম নয়। ভুল করে কাশির সিরাপ এক চামচ কম দেয়া আর ভুল করে ডান কিডনীর বদলে বাম কিডনী কেটে ফেলা বা এক ঔষধের পরিবর্তে অন্য কোন মারাত্মক ঔষধ দেয়া এক কথা নয়। কিছু কিছু ভুলের জন্য কোন অজুহাতই গ্রহণযোগ্য নয়। এসব ক্ষেত্রে অনেক সময় ডাক্তারের লাইসেন্স বাতিল করার বিধানসহ অন্যান্য শাস্তি দেয়ার নিয়মও আছে। তাই কেউ মারা গেলে যদি তা ডাক্তারের অদক্ষতা, অবহেলা বা অমনোযোগীতার কারণে হয়ে থাকে, তবে প্রমাণ সাপেক্ষে অবশ্যই তাঁর শাস্তি হওয়া উচিৎ। কিন্তু রোগী মারা যাওয়া মানেই ডাক্তারের ভুল  নয়। আমাদের মনে রাখা দরকার যে সব রোগীকে ডাক্তার ভালো  করতে পারবেন না। যেমন স্ট্রোকে বা হৃদরোগে আক্রান্ত রোগী, লিভার বা কিডনী নষ্ট হয়ে যাওয়া রোগীদের মারা যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশী। অনেক রোগের কারণ এখনও মানুষের অজানা  এবং এসব রোগের চিকিৎসা পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশেও এখনো সম্ভব হয়ে ওঠেনি। অনেক উন্নত প্রযুক্তি সমৃদ্ধ দেশে অনেক সময় ভুল ভ্রান্তি হয়ে থাকে, যদিও তা ইচ্ছাকৃত নয়। আর আমাদের এখানে জানা থাকা চিকিৎসা, ঔষধ, প্রযুক্তি বা অন্যান্য অবকাঠামোর অভাবে অনেক সময় প্রয়োগ করা যায় না। সিসিইউ বা আইসিইউতে রোগী মারা যায় বেশী, কারণ সেখানে মুমূর্ষু রোগীই ভর্তি করা হয় এবং অনেক ক্ষেত্রেই অবস্থা এমন জটিল থাকে যে কিছুই করা সম্ভব হয় না। 

অনেক সময় চিকিৎসার ক্ষেত্রে রোগীর লোকের সম্মতির প্রয়োজন হয়। এক্ষেত্রে দেখা যায় রোগীর সাথে যে আত্মীয়স্বজন থাকেন তারা একেকজন একেক সিদ্ধান্ত দেন। রোগীকে ভর্তি করাবেন কিনা, করলে কোথায় করাবেন, সার্জারী করাবেন কিনা, প্রয়োজনীয় অর্থ খরচ করতে পারবেন কিনা এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করেন। এতে সময় নষ্ট হয়। কিন্তু এরপর রোগী মারা গেলে চিকিৎসকের দোষ দেয়া হয়। অনেক সময় বিত্তবান রোগীরা বিদেশের নামী দামী হাসপাতালে অনেক অর্থ খরচ করে চিকিৎসা নিয়ে আসেন। এরপর এত ব্যয়বহুল সেবাকে আমাদের দেশের সরকারি হাসপাতাল বা ছোট খাট ক্লিনিকের সেবার সাথে তুলনা করেন  এবং বলেন “এখানকার চিকিৎসা খুবই খারাপ”। এটা মোটেও যৌক্তিক নয়।

আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থাও কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভুলকে অনিবার্য করে তুলে। প্রয়োজনের তুলনায় ডাক্তারের সংখ্যা অনেক কম হওয়ায় তাদের স্বল্প সময়ে অনেক রোগী দেখতে হচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে রোগীর অত্যধিক চাপ থাকে, তাই ভুলের সংখ্যা বাড়ছে। এমনকি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যাও রোগীর তুলনায় যথেষ্ট কম। তাই অনেকেই ভালো চিকিৎসার আশায় প্রাইভেট চেম্বারে গিয়েও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা পান না বা অসুবিধার সম্মুখীন হন। কারণ যে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রোগীকে চিকিৎসা দিবেন তিনিও মাত্রাতিরিক্ত চাপের মধ্যে থাকেন এবং সেবা দিতে হিমশিম খান। অন্যদিকে বেশির ভাগ জনগোষ্ঠী দরিদ্র হওয়ায় তারা চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে পারেন না। পরীক্ষা তো দুরে থাক, ঔষধ কেনার টাকাও জোগাড় করতে পারেন না। এক্ষেত্রে চিকিৎসককে নিজের দক্ষতা আর যোগ্যতাকে কাজে লাগিয়েই সেবা দিতে হচ্ছে। এমনকি মুমূর্ষু রোগীকেও পরীক্ষা নিরীক্ষা ছাড়া চিকিৎসা সেবা দিতে হচ্ছে। এতে ভুলের ঝুঁকি বাড়ছে বৈকী কিন্তু এছাড়া উপায়ও নেই। শতভাগ নিয়ম মেনে বইয়ে লিখা আদর্শ চিকিৎসা দিতে হলে বেশির ভাগ রোগীকে হয় চিকিৎসা ছাড়াই বাড়ি ফিরতে হবে অথবা চিকিৎসা হবে কিন্তু বাড়িঘর জমিজমা বিক্রি করে খরচ বহন করতে হবে যা অনেকের পক্ষেই অসম্ভব।

একটা কথা প্রত্যেকের মনে রাখা উচিৎ যে আমাদের চিকিৎসকদের হাতে প্রতিদিন হাজার হাজার রোগী সুস্থ হচ্ছেন। শুধু রাজধানীতেই প্রতিদিন শত শত অপারেশন হচ্ছে। প্রায় সবাই ভালো হয়ে বাড়ী ফিরে যাচ্ছেন। হৃদরোগের বড় বড় জটিল অপারেশন সহ কিডনী বা লিভার ট্রান্সপ্লান্টেশন দেশেই হচ্ছে এবং বিদেশে যাবার প্রবণতাও বেশ কমে আসছে। কিন্তু এসব কখনো মিডিয়ায় প্রচার পায় না। দেখা যায় দৈবাৎ দুই একজনের বেলায় অঘটন ঘটলে এমন কী সামান্য ছোটখাট ত্রুটি বিচ্যুতি হলেও সেটাই মিডিয়াতে বেশী প্রচার পায়, মানুষের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝি তৈরী করে সকল চিকিৎসককেই ঢালাওভাবে কাঠগড়ায় তোলা হয়। এমন কী চিকিৎসার মান মর্যাদাও ভূলুন্ঠিত করার চেষ্টা চলে। মিডিয়ার এই একচোখা নীতি চিকিৎসকদের সম্পর্কে জনমনে ভুল ধারণার সৃষ্টি করেেছ। ব্যক্তিগতভাবে কোন একজন এজন্য দায়ী হলে সব ডাক্তারকে একসাথে দোষারোপ করা বা ঢালাও অপপ্রচার কোন ক্রমেই কাম্য হতে পারে না। 

অনেক রোগী প্রায়ই অভিযোগ করেন অনেকদিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে আছি, কোন ডাক্তার নার্স ঠিকমতো আসে না, ভালো করে দেখে না, ঔষধপত্র ঠিক মতো দেয় না ইত্যাদি। এগুলো আকাক্সিক্ষত এবং সত্যিকার অর্থেই ডাক্তার বা নার্সদের উচিত রোগীকে নিয়মিত ঠিক ভাবে দেখা। অনেক রোগী বা তার আত্মীয় স্বজন মনে করেন, ডাক্তারের কাছে বা হাসপাতালে যাওয়া মাত্রই সেবা পাওয়া যাবে অথবা আশা করেন চিকিৎসক বারবার এসে তাদেরকে দেখে যাবেন। প্রত্যেকের কাছেই তার রোগীর সমস্যাই সবচেয়ে বেশী বলে মনে হয়। কিন্তু চিকিৎসককে যখন একই সাথে অনেক রোগীকে সেবা দিতে হয় তখন কাউকে তো একটু অপেক্ষা করতেই হবে। অনেকে আবার কোন অধ্যাপকের অধীনে রোগী ভর্তি করে আশা করেন, সেই অধ্যাপক তখনই রোগীকে দেখে যাবেন। অথচ অধ্যাপকের শুধু একাধিক রোগী দেখার দায়িত্বই থাকে না সাথে তাদের ছাত্র পড়ানো, পরীক্ষা নেয়াসহ একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্বও পালন করতে হয়। 


দেখা যায় হাসপাতালে ঔষধ নাই, বিছানাপত্র ঠিক নেই, পরীক্ষা নিরীক্ষার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নেই, খাবার মান ভাল না, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার অভাব এমন অনেক সমস্যা। এগুলোর জন্যও জনসাধারণ ডাক্তারকেই দায়ী করেন। আসলে এসবের দেখভালের দায়িত্ব ডাক্তারের নয়, আলাদা প্রশাসন বা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। অথচ দোষ চাপিয়ে দেয়া হয় ডাক্তারের উপর। এখানে চিকিৎসক ছাড়াও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, নার্স, ওয়ার্ড বয়, টেকনিশিয়ান সবারই নিজ নিজ ভূমিকা আছে। চিকিৎসকের দিকে আঙ্গুল তোলার আগে তার কর্মপরিধি বোঝা দরকার।

একথা সত্য যে একজন রোগী নেহায়েত দায়ে পড়েই চিকিৎসকের কাছে আসেন, তাকে বিশ্বাস করে তার অমূল্য সম্পদ পুরো জীবনটাই সজ্ঞানে তার হাতে তুলে দেন। তাই চিকিৎসকের ভুল বা অবহেলা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই রোগীর কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না, বিশেষ করে যখন তা জীবন মৃত্যুর মাঝে নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। এক্ষেত্রে কোন রোগীর ক্ষতি হলে বা মারা গেলে  তার আত্মীয়স্বজন, বন্ধু বান্ধব স্বাভাবিকভাবেই আবেগপ্রবণ হয়ে উঠেন । চিকিৎসকের ছোট, গুরুত্বহীন ভুলও তখন অনেক বড় করে দেখা হয়। এ বিষয়টা চিকিৎসকদেরও উপলব্ধি করা দরকার এবং মানবিক দৃষ্টিতেই দেখা দরকার। সাধারণ লোকজন অনেক ক্ষেত্রেই সহনশীল। রোগীর মৃত্যুতে আবেগাপ্লুত হয়ে চিকিৎসককে দায়ী করলেও  অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অন্যান্য দেশের মতো মামলা মোকাদ্দমায় যান না। তারা ভাগ্যকে মেনে নেন। চিকিৎসকের সীমাবদ্ধতা তারা বোঝেন, জীবন  মৃত্যু চিকিৎসকের হাতে নয়, এটাও মানেন। ডাক্তারদের তাই একটু ধৈর্য্য ধরে তাদের সাথে মানবিক আচরণ করা উচিত। তাহলে অনেক অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতিই এড়ানো যায়। 

আবেগের বশে হোক বা স্বাভাবিক বিবেচনায় হোক চিকিৎসকের ভুল হয়েছে বা অবহেলা ছিল, এ ধরনের ধারণা যদি রোগীর বা তার স্বজনের হয়েই থাকে, তবে তাদের অবশ্যই আইনের আশ্রয় নেয়ার অধিকার আছে। কিন্তু অভিযোগ করলেই চিকিৎসক ভুল করেছেন বলে ধরে নেয়ার কোন যৌক্তিকতা নাই। তদন্তে প্রমাণ হলে আটক করা যায় এবং শাস্তি দেয়া উচিৎ, কিন্তু তার আগেই অপরাধী ঘোষণা করে, আটক করে নিয়ে যাওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত? 

ভুল বা অবহেলার অভিযোগ করলেই হবে না, তা প্রমাণ হতে হবে, ভুলের মাত্রা দেখতে হবে, তার কারণ আর ফলাফলও বিশ্লেষণ করতে হবে। এসব ছাড়াও পত্রপত্রিকায় মতো পরিচয় করিয়ে দেয়া, হাজতে নেয়া শুধু হয়রানি নয়, নিদারুণ অমানবিক এবং অনেক বড় অন্যায়।

তাছাড়া কথায় কথায় চিকিৎসককে অবহেলা আর ভুলের অভিযোগবিদ্ধ করলে তা সমগ্র চিকিৎসক সমাজকেই ভুল সংকেত দেবে। একদিকে চিকিৎসাকে মহান ব্রত বলে সেবা দাবী করা আর অন্যদিকে ঢালাওভাবে সব চিকিৎসকের সাথে অপরাধীর মতো আচরণ করা নিশ্চয়ই চলতে দেয়া যায় না। দুই একজন চিকিৎসক ভুল করলেই সব চিকিৎসককে সমানভাবে দায়ী করাও যৌক্তিক না। এর ফলে সেবা পরায়ণ চিকিৎসকগণও ক্রমেই ঝুকিপূর্র্ণ, জটিল রোগীকে চিকিৎসা দিতে নিরুৎসাহিত হবেন, রোগীর মারা যাবার ন্যূনতম সম্ভাবনা থাকলেই তাঁকে অন্যত্র পাঠিয়ে দিবেন। রোগীর আর্থিক দিক বিবেচনা করে কম খরচে ঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসা করা থেকে বিরত থাকবেন। চিকিৎসকের এই এড়িয়ে চলার মনোভাব অনেক রোগীর বেলায় বিশেষ করে দরিদ্র রোগীদের জন্য মঙ্গলজনক হবে না তা বলাই বাহুল্য। 

চিকিৎসকদের দক্ষতার ক্রমাবনতি এবং ইনভেস্টিগেশনের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার জন্য আমাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা অনেকটাই দায়ী। চিকিৎসা শিক্ষাব্যবস্থা দিন দিন অবনতির দিকে যাচ্ছে। মেডিকেল কলেজগুলোয় মান সম্মত শিক্ষকের অভাব রয়েছে, অনেক পদ বছরের পর বছর খালি পড়ে আছে। রাজনৈতিক আর আর্থিক কর্মকান্ডের ডামাডোলে  অনেক শিক্ষক এমনকি ছাত্রেরও পড়াশুনার দিকে নজর দেয়ার সময় নেই। হাতে কলমে শিক্ষার সুযোগ অনেক প্রতিষ্ঠানেই সীমিত, এমনকি রাজধানীর অনেক নামী দামী প্রতিষ্ঠানেও। ঢালাও অনুমোদনের ফায়দা লোটা অনেক বেসরকারী মেডিকেল কলেজে ছাত্র ভর্তি করা হয় পয়সার বিনিময়ে, এ ধরনের কথাও শোনা যায়। ¯œাতকোত্তর শিক্ষার অবস্থা আরো খারাপ। রাজনৈতিক বিবেচনায় ভর্তি আর পাস করানোর অভিযোগ বাজারে প্রবলভাবেই চালু আছে। কিন্তু শেখানোর যোগ্যতা সম্পন্ন লোকজন দিন দিন কমে যাচ্ছে। চিকিৎসকদের পাঠ্যক্রমে চিকিৎসা বিষয়ক বৈজ্ঞানিক অংশটুকু যাও বা পড়ানো হয়, মানবিক দিকটা একেবারেই অবহেলিত থাকে। রোগীর সাথে আচরণ, তথ্য আদান প্রদান, সেবার মনোভাব, এগুলোর ভিত গোড়াতেই শক্ত করা দরকার কিন্তু আমাদের ব্যবস্থায় তা হয় না। এর সাথে কর্মজীবনে যোগ হয় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পেশাগত হতাশা । ডাক্তারদের পদোন্নতি সোনার হরিণ, দলাদলি এখানে মূল নিয়ামক। কর্মক্ষেত্রে সুযোগ সুবিধা কম, সেবা দিতে চাইলে দেয়ার উপায় নেই।

নবীন ডাক্তারদের বেশিরভাগেরই নুন আনতে পানতা ফুরায় অবস্থা। তাই নিঃস্বার্থ সেবার মনোভাব ক্রমেই লোপ পায়। চিকিৎসা ব্যবস্থার এই অবহেলিত রুপ তৈরী করছে অদক্ষ, হতাশাগ্রস্থ আর কখনও কখনও আদর্শহীন চিকিৎসক, যাদের দ্বারা ভুল আর অবহেলা হওয়াটাই স্বাভাবিক। সমস্যা তাই যত না চিকিৎসকের মধ্যে তার চেয়ে বেশি দক্ষ চিকিৎসক তৈরীর পদ্ধতিতে এবং চিকিৎসা ব্যবস্থায়। শুধুমাত্র এক তরফা চিকিৎসকের উপর দোষ চাপানো অনুচিত। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে তাই হচ্ছে। ভালো চিকিৎসক তৈরীর যথাযথ ব্যবস্থা না করে ভালো সেবা পাওয়া বা আশা করা কি সম্ভব? অযথা এক তরফা ডাক্তারদের উপর দোষ চাপিয়ে কি লাভ? যারা প্রশাসনের সঙ্গে জড়িত, তাদের কি কোন দায়িত্ব নেই?
এ অবস্থা থেকে বের হবার জন্য চিকিৎসদের অবশ্যই কিছু করণীয় আছে। অনেক রোগী বা তার আত্মীয়স্বজনের অভিযোগ হলো ডাক্তাররা রোগীর সাথে ভালো করে কথা বলেন না, রোগীর  অভিযোগ ভালো করে শুনেন না বা ভালো ভাবে রোগীকে পরীক্ষা নিরীক্ষা করেন না। রোগ সম্পর্কে কিছু জানতে চাইলেও তা  ভালোভাবে রোগীকে বোঝান না। এর ফলে ডাক্তার এবং রোগীর সম্পর্ক দিন দিন খারাপ হচ্ছে। এ অবস্থায় আমরা যারা ডাক্তারী পেশায় জড়িত, তাদের রোগীর আস্থা অর্জন করাকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। এর জন্য চিকিৎসার শুরুতেই রোগীর কথাবার্তাগুলো মনোযোগ সহকারে শুনতে হবে, তাকে কিছু সময় দিয়ে ভালো ভাবে পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে হবে। সম্ভব হলে রোগীকে তার অবস্থা জানাতে হবে, অনেক সময় জটিল রোগ যেমন ক্যান্সার জাতীয় রোগ অথবা নিরাময়যোগ্য নয় এমন রোগ রোগীর আতœীয়স্বজন বা বন্ধু বান্ধবকে আলাদাভাবে ডেকে জানাতে হবে। কতদূর কি করা যায় জানাতে হবে, কোন সীমাবদ্ধতা থাকলে তাও জানাতে হবে। মোট কথা রোগীর সমস্যা বা চিকিৎসার ব্যাপারে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতে হবে। সব সমস্যার সমাধান হবে না ঠিকই, কিন্তু আন্তরিকতার প্রমাণ রাখতে হবে। এতে চিকিৎসক ও রোগীর মাঝে দূরত্ব হ্রাসসহ ভুল বোঝাবুঝি অনেকটাই কমে আসবে। আরও একটা কথা বাজারে চালু আছে যে অনেক ডাক্তার বিভিন্ন ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে কমিশন পান। হয়তো বা মুষ্টিমেয় ডাক্তার এর সঙ্গে জড়িত। এই বদনামটুকু ঘোচাতেও ডাক্তারদেরই এগিয়ে আসতে হবে। 

তবে সার্বিকভাবে এক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকাই মূখ্য। বিএমডিসিকে আরো যথাযথ এবং বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। চিকিৎসকের ভুলের মাশুল অনেক ক্ষেত্রেই অপূরণীয় হয়ে থাকে, অন্য সকল পেশায় তা নয়। তাই চিকিৎসা খাত নিঃসন্দেহে বিশেষ  বিবেচনার দাবী রাখে।  চিকিৎসা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো, বাস্তবমুখী করা  এর  সমস্যাগুলো জরুরী ভিত্তিতে চিহ্নিত করা ও সমাধান করা এসবই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে করতে হবে। চিকিৎসায় চিকিৎসকের অবহেলা অবশ্যই তদন্ত করে দেখা উচিৎ, প্রমাণ হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া উচিত কিন্তু তা হবে সমস্যার উপশম মাত্র। প্রতিরোধ করতে হলে সমগ্র চিকিৎসা ব্যবস্থাকে ঘিরে থাকা অবহেলার স্বরুপ উদঘাটন করে তার প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে হবে। দক্ষ ডাক্তার তৈরীর বদলে  অদক্ষ ডাক্তার তৈরীর ব্যবস্থা রেখে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। 

পরিশেষে ডাক্তারদেরও মনে রাখতে হবে যে তারা যেন নিজেদেরকে দক্ষভাবে তৈরি করার চেষ্টা করেন, সমস্ত ঝামেলার মাঝেও ধৈর্য্য, বুদ্ধিমত্তা, কর্মদক্ষতা এবং সাহসিকতার সাথে রোগীকে ভালোভাবে চিকিৎসা দেয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যান। তবেই রোগী এবং ডাক্তারের মাঝের দূরত্বটাকে কমিয়ে আনা সম্ভব। অনেক ভয় ভীতির মাঝেও হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা কোন ডাক্তারের জন্যই উচিত হবে না। কাজ চালিয়ে যেতে হবে সততা ও আন্তরিকতার সাথে।

 

(মেডিভয়েস : সংখ্যা ৫, বর্ষ ২, জুন-জুলাই ২০১৫ তে প্রকাশিত)

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত