ঢাকা      বুধবার ১৮, সেপ্টেম্বর ২০১৯ - ৩, আশ্বিন, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. শরীফ উদ্দিন

রেসিডেন্ট, বিএসএমএমইউ

 

 


স্মরণের আবরণে মরণেরে রাখি ঢাকি: ভালো থাকুন স্যার

জাতীয় অধ্যাপক ও প্রখ্যাত শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ প্রফেসর এম. আর. খান (মোহাম্মদ রফি খান) জন্মেছিলেন আজকের এই দিনে। ১৯২৮ সালের ১ আগস্ট সাতক্ষীরার রসুলপুর গ্রামের এক অভিজাত পরিবারে তাঁর জন্ম। তিনি পরিবারের মেজো ছেলে। সবাই তাকে মেধাবী হিসেবে জানে। কিন্তু দুরন্ত রফি খানের আগ্রহ খেলাধুলায়।

তাঁর প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শুরু হয় রসুলপুর প্রাইমারি স্কুলে। তিনি সেই স্কুলের ফুটবল টিমের অধিনায়ক। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে তার টিম ১৩টি ট্রফি জয় করে। উচ্চ মাধ্যমিকে তিনি ভর্তি হন সাতক্ষীরা সদরের প্রাণনাথ উচ্চ বিদ্যালয়ে। ১৯৪৩ সালে এ স্কুল থেকেই কৃতিত্বের সাথে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করেন। মেট্রিক পাস করার পর তিনি কলকাতায় যান। ভর্তি হন কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে। ১৯৪৫ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে প্রথম বিভাগে আইএসসি পাস করেন।

১৯৪৬ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। ১৯৫২ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করার পর সাতক্ষীরায় ফিরে আসেন তিনি। তখন আজকালকার মতো ঘরে ঘরে এমবিবিএস ডাক্তার ছিলো না। গোটা সাতক্ষীরা শহরে তিনিই ছিলেন একমাত্র এমবিবিএস ডাক্তার। নিজের গ্রাম রসুলপুরেই একটা ফার্মেসিতে প্রতিদিন দুইবেলা রোগী দেখা শুরু করেন। সদা হাস্যমুখ রফি খানের পসার জমে গেলো অল্পদিনেই। প্রচুর রোগী। অনেকে ভিজিট দেন,অনেকে দেননা। সব মিলিয়ে রোজগার ভালোই।

স্যারের অভিমান: ১৯৫৪ সালে রফি খান আরো ব্যাপক পরিসরে জনসেবা করতে চাইলেন। তিনি সাতক্ষীরা পৌর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত নেন। রাজনীতির কুটিল চক্র তিনি তখনো বুঝে উঠতে পারেননি। তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। তার ব্যাপক জনপ্রিয়তাকে ছাপিয়ে যায় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর ব্যাপক কারচুপি। তিনি নির্বাচনে হেরে যান। তিনি খুলনা নির্বাচন কমিশনে ভোট কারচুপির অভিযোগ এনে মামলা করেন। বহু ঝামেলার পর প্রিসাইডিং কর্মকর্তা মোহাম্মাদ রফি খানের উপর চাপ সৃষ্টি করেন মামলা তুলে নেয়ার জন্য। পরে তাঁর বাবাও তাকে মামলা তুলে নেয়ার জন্য বলেন। তিনি মামলা তুলে নেন। কিন্তু ভীষণ অভিমানে তিনি আর সাতক্ষীরায় থাকতে রাজি হননি।

আন্তর্জাতিক শিশু বিশেষজ্ঞ: এরপর কিছুদিন খুলনায় প্র্যাকটিস করেন। পরে তিনি যুক্তরাজ্যে চলে যান এবং এডিনবার্গ স্কুল অব মেডিসিনে ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৯৫৬ সালে ডিপ্লোমা ইন ট্রপিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড হাইজিন (ডিটিএমএন্ডএইচ) ডিগি লাভ করেন। এরপর নর্দার্ন জেনারেল হাসপাতালে শিশু চিকিৎসার ওপর প্রশিক্ষণের জন্য অধ্যাপক ফরফারের অধীনে কাজ করতে শুরু করেন। এক বছরের প্রশিক্ষণ শেষ করে তিনি লন্ডনে যান। সেখানকার স্কুল অব মেডিসিন থেকে ডিপ্লোমা ইন চাইল্ড হেলথ (ডিসিএইচ) ডিগ্রি লাভ করেন। শিশু চিকিৎসার ক্ষেত্রে তার আগ্রহ ছিলো ব্যাপক। আর বাংলাদেশে এই ক্ষেত্রটিতে ব্যাপক শূন্যতার কথা তিনি জানতেন।

দেশে প্রত্যাবর্তন: ডিসিএইচ পরীক্ষায় পাশ করার পর অনেকেই রফি খানকে দেশে ফিরে প্র্যাকটিস শুরু করার কথা বলতে শুরু করেন। কিন্তু তিনি আবার এডিনবরায় ফিরে যান এবং এমআরসিপি পরীক্ষার জন্য পড়াশোনা শুরু করেন। ১৯৬২ সালে এডিনবরার 'রয়েল কলেজ অফ ফিজিশিয়ানস' থেকে 'এমআরসিপি' পাশ করে সেখানকার এক বড় কলেজে সিনিয়র মেডিকেল অফিসার হিসেবে কাজ শুরু করেন। ততদিনে রফি খানের অভিমান কেটে গিয়েছে এবং দেশে ফিরে আসার জন্য তিনি চেষ্টা করতে থাকেন।

বর্ণাঢ্য কর্মজীবন: ১৯৬৩ সালে তিনি দেশে ফিরে আসেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। পরের বছর তিনি রাজশাহী মেডিকেল কলেজে চলে যান এবং সেখানে শিশুস্বাস্থ্য বিভাগ চালু করেন। তিনি, আরেকজন মেডিকেল অফিসার এবং চারটা বেড- এই নিয়ে তিনি সূচনা করেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগ। রাজশাহীতে পুরো পাঁচ বছর কাটিয়ে ১৯৬৯ সালে আবার ঢাকা মেডিকেলে ফিরে আসেন এবং অধ্যাপক হিসেবে কাজ শুরু করেন।

১৯৭১ সালে তিনি ইনস্টিটিউট অব পোস্ট গ্রাজুয়েট মেডিসিন এন্ড রিসার্চ (আইপিজিএমআর)-এর অধ্যাপক ও ১৯৭৩ সালে এই ইনস্টিটিউটের যুগ্ম-পরিচালকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১৯৭৮ সালের নভেম্বরে তিনি ঢাকা শিশু হাসপাতালে অধ্যাপক ও পরিচালকের পদে যোগদান করেন। একই বছরে পুনরায় তিনি আইপিজিএমআর(পুরাতন পিজি হাসপাতাল)-এর শিশু বিভাগের অধ্যাপক নিযুক্ত হন। এরমধ্যে তিনি ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ থেকে ফেলো অব কলেজ অব ফিজিশিয়ান অ্যান্ড সার্জন (এফসিপিএস) এবং ১৯৭৮ সালে এডিনবার্গ থেকে ফেলো অব রয়েল কলেজ অ্যান্ড ফিজিশিয়ানস (এফআরসিপি) ডিগ্রি লাভ করেন।

টিকা ব্যবস্থা প্রচলনের অগ্রনায়ক: তিনি যখন শিশুস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ শুরু করেন, তখন বাংলাদেশে টিকা বলেই কিছু ছিল না। ১৯৬৫ সালের জানুয়ারিতে রফি খানের ধানমন্ডির বাসায় প্রথম একটি শিশুকে টিকা দেয়া হয়। তাঁর আন্তরিক প্রচেষ্টায় পরে বাংলাদেশ সরকার টিকা দেয়ার কর্মসূচি চালু করেন। বাংলাদেশ এখন পোলিওমুক্ত দেশ। ১৯৮৮ সালে মো. রফি খান সুদীর্ঘ সরকারি চাকরি জীবন থেকে অবসর গ্রহণ করেন এবং নিজের পেনশনের টাকায় গড়ে তোলেন মা ও শিশুদের জন্য নানা ধরনের ট্রাস্ট।

খোকার সম্মাননা: মো. রফি খানের ডাকনাম ছিলো খোকা। তবে উনাকে আমরা 'এম.আর.খান' নামেই চিনি। বাংলাদেশ সরকার উনাকে জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে স্বীকৃতি ছাড়াও একুশে পদক এবং স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) ডা. এম আর খানকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি ও বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমী স্বর্ণপদক দেয়।অবসরের পরও অধ্যাপক ডা. এম আর খানের দিন কাটতো অসম্ভব ব্যস্ততায়। ধানমন্ডির ৩ নম্বর সড়কের বাড়িতে সপ্তাহে পাঁচ দিন রোগী দেখতেন।

ক্লান্তির অবকাশ কোথায়?

এই চির তরুণ মানুষটিকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তিনি ক্লান্তি বোধ করেন কিনা? তিনি বলেছিলেন, 'ক্লান্তির অবকাশ কোথায়? কাজই জীবন, কাজই আনন্দ, কাজই সাফল্য'।

তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম

এই অসম্ভব কাজপাগল, শিশুদের জন্য বুকে এক সমুদ্দুর ভালোবাসা ধারণ করা মানুষটির জন্মদিন আজ। প্রিয় মানুষটিকে স্মরণ করছি ব্যথাতুর মনে। তিনি আমাদের ছেড়ে পরম করুণাময়ের কাছে চলে যান ২০১৬ সালের ৫ নভেম্বর।

পরম করুণাময়ের কাছে প্রার্থনা, যে অসীম ভালোবাসায় তিনি শিশুদের জন্য সারাজীবন ব্যয় করেছিলেন, সেই ভালোবাসা যেন উনাকে চিরদিন ঘিরে রাখে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন অধ্যাপক ডা. এম আর খানকে জান্নাতবাসী করুন। 

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


সম্পাদকীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

ডিপ্রেশন থেকে আত্মহত্যা: করণীয় ও চিকিৎসা

ডিপ্রেশন থেকে আত্মহত্যা: করণীয় ও চিকিৎসা

ডিপ্রেশন একটি ভয়াবহ মানসিক ব্যাধি যা একজন মানুষকে সবার অজান্তে তিলে তিলে…













জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর