০১ অগাস্ট, ২০১৮ ০৩:৪০ পিএম

এনেস্থেশিয়া টু সার্জারি সবই ফার্মাসিস্ট সহকারী এক হাতে সামলান!

এনেস্থেশিয়া টু সার্জারি সবই ফার্মাসিস্ট সহকারী এক হাতে সামলান!

মি. এক্স, পদে তিনি সহকারী ফার্মাসিস্ট। যার কাজ হাসপাতালে রোগীদের ওষুধ বিতরণ করা। শুনে অবাক হবেন, তিনি যে শুধু সেই কাজই করেন তাই না। আরো অনেক কাজে তিনি সিদ্ধহস্ত।

আসুন একটু ফিরিস্তি দেই। তিনি হাসপাতালে রোগীও দেখেন, শুধু তাই না- অফিস টাইমে রোগীদের কাছ থেকে ভিজিটও রাখেন! শুধু কী তাই? তিনি হাসপাতালের আউটডোরে দেদারসে সারকামসিশন করেন। বাকি আছে আরো, পন্ডিত সে জন আবার সার্জনও বটে!

আউটডোরের টিকেট কাউন্টারে রোগী এসে যদি বলে পেট ব্যথা, তবেই কাম সারছে। কাউন্টার ম্যান টিকেটে সোজা মি. এক্সের রুম নাম্বার লিখে দিবে। আর মি. এক্স ফটাফট কিছু টেস্ট লিখে দিবেন, যার মধ্যে আল্ট্রাসনো মাস্ট। আল্ট্রাসনো রিপোর্ট যদি এপেন্ডিসাইটিস বলে তাহলে কেল্লাফতে। আর যদি অন্য কিছু বলে, তাও মি. এক্সের কাউন্সিলিংয়ে চলে যাবে সোজা পাশের ক্লিনিকে।

আর যদি ভুলক্রমে আল্ট্রাসনোলোজিস্ট নিজে থেকে রোগীকে বলে যে রিপোর্ট ভাল চিন্তার কিছু নাই, আর রোগী যদি ফেরত যেয়ে মি. এক্সকে সেই কথা বলে, তবে মি. এক্স অতি ভদ্রতার সহিত আল্ট্রাসনোলোজিস্টকে যেয়ে বলবেন, 'স্যার, রিপোর্ট নর্মাল থাকলেও রোগীরে কিছু বইলেন না!'

রোগী তো গেল পাশের ক্লিনিকে, যে ক্লিনিক আবার মি. এক্সও ওয়াই জেড দ্বারা প্রতিষ্ঠিত! খেলতে খেলতে খেলোয়ার মি. এক্স তার হেভি শরীর আর হেভিওয়েট বাইক নিয়ে অফিস টাইমে মাঝেমাঝেই চলে যান ক্লিনিকে। অফিস শেষে আবার খেলা শুরু, খেলা চলে বিকাল থেকে রাত অবধি। এপেন্ডেকটোমি, সিজারিয়ান সেকশন, হার্ণিয়া, সারভাইকাল টিয়ার, আরও কত কী? এনেস্থেশিয়া টু সার্জারি সবই এই ফার্মাসিস্ট সহকারী মি. এক্স এক হাতে সামলান!

মি. এক্সকে নিয়ে অনেক কথাই হল। অনেকে বলবেন এক্সরা এমনই করে, ওদের কথা বলে কী লাভ! তাহলে আসুন এবার আমাদের গল্প শুনি-

ডা. ওয়াই (পুরুষ) পদে তিনি জুনিয়র কনসালটেন্ট, গাইনি। পদায়ন করেই ঘোষণা দিয়েছেন, 'ভিজিট ছাড়া আমি রোগী দেখবো না!' মনে মনে হয়তো অনেকে ভাবছেন, 'ভিজিট তো নিবেই।' অবশ্যই ভিজিট নিবেন, তবে সেটা তার চেম্বারে। কিন্তু তিনি যখন ঘোষণা দেন, অফিস টাইমেও ভিজিট ছাড়া কোন রোগী দেখবেন না, তখন সেটা উদ্বেগজনক। এবং তিনি সেটাই করছেন।

তিনি সিজার করেন, এতে মানুষের উপকার হচ্ছে। কিন্তু যখন স্পাইনাল এনেস্থেশিয়া দেওয়ার নিডিল হেক্সিসল দিয়ে মুছে এক রোগী থেকে আরেক রোগীকে ততক্ষণ পর্যন্ত ব্যবহার করেন যতক্ষণ না নিডিল বাঁকা হয়। আচ্ছা একটু ভাবুন তো একটা নিডিলের কতই বা দাম! রোগীকে দিয়ে ওষুধ কেনানো হয়, ওষুধ ফার্মেসীতে ফেরত যায়, আবার আসে, আবার যায়। দেখা যায় একই ওষুধ এভাবে আসতে যেতে প্যাকেট ছিড়ে যায়, কিন্তু এই আসা যাওয়া বন্ধ হয় না।

ডেলিভারি মানেই সিজার করবেন, আল্ট্রাসনোও তিনি নিজে করেন, এবং সেখানে তিনি নর্মাল ডেলিভারি করার ক্ষেত্রে কোন না কোন সমস্যা খুঁজেই পান। হয় পানি কম, না হয় বাচ্চা উলটো বা প্লাসেন্টা নিচে। সমস্যা থাকলে বলবেন, ইন্ডিকেশন থাকলে সিজার করবেন। কিন্তু সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় যখন অন্য কারো দ্বারা রিপিট আল্ট্রাসনো করার পর যদি নর্মাল থাকে। আর রোগী যদি সেই কথা রোগী ডা. ওয়াইকে যেয়ে বলে, তবেই সারছে। শুরু হবে বয়ান, 'আল্ট্রাসনো কিচ্ছু হয়নি, আরে ও কি আল্ট্রাসনো করতে পারে? আমি যা বলছি তাই ঠিক!'

জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. ওয়াই এক সময় তার বর্তমান কর্মস্থলেই মেডিকেল অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন, আর তখন থেকেই পেটে ব্যথার রোগী আসলেই ইন্ডিকেশন না থাকলেও রোগী এপেন্ডিক্স হসপিটালে রেখে তারপর বাড়িতে যেতো, এসবের সাক্ষী বহুজন। তখন সারা হসপিটাল গমগম করতো এপেন্ডেকটমি করা পেশেন্টে, সিড়ি করিডোর সবখানেই রোগী, মনে হয় পৃথিবীর তাবৎ মানুষ এপেন্ডিসাইটিস এ আক্রান্ত! বেঁচে থাকার জন্য টাকা লাগবে কিন্তু তাই বলে লোভ কেন।

ডা. ওয়াই জুনিয়র মেডিকেল অফিসারদের ভদ্রভাবে আলতো করে বলেন, 'কেমিকোর রিটটা একটু লিখো!' এই কোম্পানির সাথে আবার তার শেয়ার আছে কিনা! ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কমিশন বাণিজ্য তো আছেই, সেসব আর নাই বা বলি, সেখানেও শেয়ার আছে কিনা। ওই যে উপরের ক্লিনিকের গল্প করেছি, ওই ক্লিনিকেও তার শেয়ার আছে। ডা. ওয়াই ও ফার্মাসিস্ট সহকারী মি. এক্স দুজনে মিলেও অনেক অপারেশন করেন সেখানে!

এতক্ষণ যা লিখলাম, এ কোনো হলুদ লাল সাংবাদিকতা না। এটা সত্য। এসব খবর নিউজেও আসে যা মিথ্যা না, দিবালোকের মত সত্য।

সব কথার সারকথা। সব ডাক্তার তুলসী পাতার ন্যায় পবিত্র না। বহু লোভী ছোটলোক এ পেশায় কিলবিল করছে৷ নিজের চোখে না দেখলে হয়তো বিশ্বাস হবে না। জীবনতো ছোট, নিয়মের মধ্যে সৎভাবে চললেও একজন ডাক্তার অনেক ভাল উপার্জন করতে পারেন। তাহলে কিছু মানুষের কেন এত অনিয়ম! এদের এ অনিয়মের কারণে নিয়ম ও সততার মধ্যে থাকা ডাক্তারদের অনেক কষ্ট হয়। তারা দেশ ছেড়ে যেতে চায়, চাওয়াটাই স্বাভাবিক, কত আর সহ্য করা যায়।

সামনের দিনগুলো ভয়ংকর মনে হয়। মানুষের মন মানসিকতা পরিবর্তন হচ্ছে। আগে লোকে ডাক্তারকে দেবতা ভাবতো, এখন অনেক বেশি কসাই ভাবে। এ ভাবার সবটাই যে ভুল, তা না। খুব কাছাকাছি মিশলে তা টের পাওয়া যায়। সরকারী স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ছাড়া প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানগুলো জনস্বার্থে তৈরি হলেও, তাদের বড় স্বার্থ থাকে অর্থের দিকে। এতে যে মানুষের ভোগান্তি হয় না তা অস্বীকার করা দায়! এখনো মনে পড়ে, খ্যাপের সেই ক্লিনিকের কথা, 'স্যার বেশি বেশি টেস্ট দিয়েন!' শুনে শুধু মনে মনে ভাবতাম, 'এ মেরুদন্ডী প্রাণীগুলো কবে মানুষ হবে!'

অসংখ্য ডাক্তারের ভীড়ে এক শ্রেণি আছে যারা বিভিন্ন সুযোগ ধরে পরীক্ষার আগে প্রশ্ন পেয়েছেন, পলিটিক্যাল জ্যাক ট্যাক ধরে পাশ করেছেন৷ তারা পারেন অল্প কিছু। কারণ তারা ব্যস্ত ছিলেন দেশ ও জাতীর উন্নয়নে। পড়াশোনায় কম সময় পেয়েছেন, তাই তারা রোগীদের গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন কম বোধ করেন বা গুরুত্ব দিতে গেলেও ভুল করে ফেলেন। সব পাশ করা ডাক্তার যে ঠিক চিকিৎসা দেন তা না, কত দেখেছি ভুলভাল চিকিৎসার নমুনা। সেসব কথা আজ বলবো না, বললেলে চাকরি থাকবে না!

আর এক শ্রেণি তৈরি হচ্ছে, যাদের মনোভাব 'মুই কি হনু রে'। রোগী বা রোগীর লোক এসে ভাই বললে সমস্যা! সিস্টার বললে সমস্যা! একই কথা বারবার জিজ্ঞেস করলেও সমস্যা! আমি বুঝি না, তারা কী পড়ে ডাক্তার হয়েছে! রোগী বা রোগীর লোক এসে যদি আমাকে খামচিও দেয়, তাও আমাকে ধৈর্য্য ধরে তাদের কথা শুনতে হবে। তাদের গুরুত্ব দিতে হবে, একই কথা বারবার জিজ্ঞেস করলেও আমি জবাব দিতে বাধ্য। কিন্তু আপনি যদি ভাব নিয়ে বসে থাকেন, তাহলে বলছি এ পেশা আপনার জন্য না।

আর এই আপনাদের মতই কিছু মানুষের জন্য জন্যই রোগীরা দেশের বাইরে যেতে চায়। রোগীর সাথে রোগীর লোকের সাথে কথা বলুন। যতই ডিফেন্ড করুন না কেন, আত্মীয় স্বজন কেউ অসুস্থ হলেই বোঝা যায় একটা মানুষ কত অসহায়। সে সেই অসহায়ত্বে আপনাকে বারবার বিরক্ত করতে পারে, তাকে ঠিকভাবে বোঝান, সময় দিন, চিকিৎসার পাশাপাশি দিন মানসিক সাপোর্ট।

আপনি যদি মনে করেন, রোগীকে দুটো কথা জিজ্ঞেস করেই তিরিশ সেকেন্ডে রোগ ধরে চিকিৎসা দিতে পারেন, এত কথা বলার কী দরকার! তাহলে ভুল করছেন। প্রয়োজন না থাকলেও রোগী আপনাকে কিছু বলতে চায়। কষ্ট করে শুনুন। এতে রোগীর মানসিক শান্তি আসবে। দরকার হলে রোগী কিছু কম দেখুন, তবু তাদের একটু সময় দিন।

আরো কত কিছু বলার আছে, সেসব আরেকদিন। দিনগুলো কেমন যেন এলোমেলো। মাথায় ঘুরপাক খায় অনেক কিছু। আজকাল ভয় লাগে না কিছু, তাই বলতে বলতে ছোট মুখে বড় কথা বলেছি অনেক। যার এক বিন্দুও মিথ্যে নয়৷

লেখক: নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক।

মেডিভয়েসকে বিশেষ সাক্ষাৎকারে পরিচালক

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শতাধিক করোনা বেড ফাঁকা

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না