ডা. মিজানুর রহমান কল্লোল

ডা. মিজানুর রহমান কল্লোল

সহকারী অধ্যাপক, অর্থোপেডিকস ও ট্রমা বিভাগ,

ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল


৩০ জুলাই, ২০১৮ ০১:১৯ পিএম

ডেঙ্গুর বিশেষ কোনো চিকিৎসা পদ্ধতি নেই

ডেঙ্গুর বিশেষ কোনো চিকিৎসা পদ্ধতি নেই

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ৫-১০ কোটি লোক ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হচ্ছে। এর মধ্যে আড়াই থেকে পাঁচ লাখ লোকের হচ্ছে মারাত্মক ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার এদের মধ্যে মারা যাচ্ছে প্রায় পঁচিশ হাজার। ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশে প্রথম ডেঙ্গুজ্বর দেখা যায়। তখন একে ‘ঢাকা ফিভার’ নামে অভিহিত করা হয়েছিল।

ডেঙ্গুজ্বরে কী হয়? 
ডেঙ্গুতে হঠাৎ করেই তীব্র জ্বর (১০৪-১০৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট), অসহনীয় গা ব্যথা, মাথাব্যথা, গিরায় ব্যথা হয়। এর সঙ্গে বমি ও শরীরে র‌্যাশ বেরোয়। টিপিক্যালে র‌্যাশ বেরোয় ষষ্ঠ দিনে। তবে র‌্যাশ ছাড়াও ডেঙ্গুজ্বর হতে পারে। লক্ষ রাখতে হবে, মশা কামড়ানোর দুই সপ্তাহ পরে জ্বর হলে বা দুই সপ্তাহের বেশি জ্বর থাকলে সেটি ডেঙ্গু নয়। ৭-১৪ দিনের মাথায় র‌্যাশগুলো চলে যায়। 

চার ধরনের ভাইরাস দ্বারা এ জ্বর হয়। যে কোনো একটি ভাইরাস দ্বারা কেউ আক্রান্ত হলে দ্বিতীয়বার ওই ভাইরাসে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা নেই। আবার সাধারণত ৭-৮ মাসের মধ্যে কোনো ভাইরাস আক্রমণ করে না।

প্রকারভেদ 
চিকিৎসার সুবিধার জন্য ডেঙ্গুজ্বরকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। ক্ল্যাসিক্যাল ডেঙ্গু ফিভার, ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার ও ডেঙ্গু শক সিনড্রোম। ক্ল্যাসিক্যাল ডেঙ্গু অন্য ভাইরাস জ্বরের মতোই। পর্যাপ্ত তরল এবং জ্বর কমানোর জন্য প্যারাসিটামল খেয়ে এ জ্বরের চিকিৎসা করা হয়। লক্ষ রাখতে হবে প্যারাসিটালের পরিবর্তে কোনো অবস্থাতেই যেন ভাইক্রোফেনাক, নিমেসুলেমাইত ও ইনডোমেথাসিন জাতীয় ওষুধ না দেওয়া হয়। 

ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভারে দৃশ্যত কোনো রক্তক্ষরণ না থাকলে তাকে গ্রেড-১, রক্তক্ষরণ হলে গ্রেড-২, এগুলোর সঙ্গে রক্তচাপ পাওয়া গেলে তাকে গ্রেড-৩, আর রক্তচাপ না পাওয়া গেলে তাকে গ্রেড-৪ বলে। গ্রেড ৩ ও ৪ কে একত্রে ভেঙ্গ শক সিনড্রোম বলে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংজ্ঞা অনুযায়ী, রক্ত প্লাটিলেটের সংখ্যা এক লাখ বা তার কম হলে এবং হেমাটোক্রিট (PCV)-এর তারতম্য শতকরা ২০ ভাগ হলে তাকে ভেই হেমোরেজিক ফিভার বলে জ্বরের সঙ্গে রক্তক্ষরণ থাকলেই তা হেমোরেজিক ফিভার নয় ডেঙ্গুর জটিলতা হিসেবে লিভারের অসুখ (ফালমিনেটিং লিভার ফেইলিওর) অথবা ব্রেইনের অসুখ (এনকেফালাইটিস/ এনকেফালোপ্যাথি) হতে পারে।

ডেঙ্গুজ্বরের পরীক্ষা-নিরীক্ষা 
ডেঙ্গুতে শ্বেতকণিকা (নিউট্রোফিল), অণুচক্রিকা (প্লাটিলেট) ও ইএসআর কমে যায়। অপরদিকে হিমোগ্লোবিন, হেমাটোক্রিট, লিভার এনজাইম ও অ্যান্টিভ বাড়ে। ডায়াগনোসিসের জন্য এসব পরীক্ষা বারবার করতে হয়। জ্বরের প্রথমদিকে অবশ্যই টিসি, ভিসি, ইএসআর করাতে হবে যাতে ব্যাকটেরিয়া থেকে ভাইরাল ইনফেকশন পৃথক করা যায়। ডেঙ্গুতে টোটাল কাউন্ট কমে এবং টাইফয়েড, রিকেটশিয়াতে তা স্বাভাবিক থাকে কিন্তু লেপ্টোস্পাইরোসিসে কাউন্ট বাড়ে। ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে সব অর্গানের সমস্যা হয়। সে অনুযায়ী পরীক্ষা করাতে হবে। 

অ্যান্টিবডি টেস্ট ৫ম বা ৬ষ্ঠ দিন থেকে করা যেতে পারে। ৪র্থ দিনে প্রাটিলেট ও পিসিভি করতে হবে। ৭ম দিনে জ্বর না গেলে টাইফয়েভ ও রিকেটশিয়ার কথা ভাবতে হবে। জন্ডিস থাকলে লেপ্টোস্পাইরোসিসের। কথা স্মরণে রাখতে হবে এবং সে অনুযায়ী পরীক্ষা প্রয়োজন।

এডিস মশা গৃহপালিত। দেওয়ালের কোণে, দরজার ফাঁকে ও পর্দার ভাজে এরা সেটে থাকে। যেহেতু এ রোগের ভ্যাক্সিন নেই তাই প্রতিরোধের জন্য মশা ও তার লার্ভা বা ডিমকে মেরে ফেলা বা বংশবৃদ্ধি রোধ করাই একমাত্র টার্গেট। মশার ডিম পাড়ার বা লার্ভা জন জায়গা হলো জলকান্দা, ডিমের খোসা, নারকেলের খোলা, এয়ারক এসি, গাড়ির পরিত্যক্ত টায়ার, ফুলের টব ও নির্মীয়মাণ ইমারতের চৌবাচ্চায় জমানো পানি এবং বাসার পাশে জন্মানো আবর্জনা। বৃষ্টির দিনে যত্রতত্র জমা পানি কোনো অবস্থাতেই যেন এসব ছোট জলাধারে পাঁচ দিনের বেশি পানি জমতে না পারে।

ঘরের মধ্যে ওষুধ ছিটিয়ে হলেও মশা মারতে হবে। শুধু রাতে নয়। দিনেও মশারি ব্যবহার করতে হবে। কয়েল, স্প্রে, ম্যাট, লিকুইড- সব ধরনের মশক নিধন ব্যবহার করতে হবে। অতিরিক্ত অযৌক্তিক চিকিৎসার ফলে জটিলতা যেন না বাড়ে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

কোনো ব্যক্তি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে তিন দিনের মধ্যে এ মশা কামড়ালে তা সংক্রমণ করার ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়। ৫-৬ দিন সুপ্তাবস্থায় থাকার পর এ মশা যাকে কামড়ায় তারই ডেঙ্গুজ্বর হবে। এরপর সে সারাজীবনই সংক্রমিত থাকবে। মশাটি সর্বোচ্চ ৫০ গজ উড়তে পারে। অন্য মশার চেয়ে এদের আকার বড়। এরা কামড়ায় সাধারণত সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময়। দিনের অন্ধকারে এরা লুকিয়ে থাকে।

চিকিৎসা
ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিয়ে এখনো ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। তবে সাধারণভাবে বলা যায়, ডেঙ্গুর চিকিৎসার জন্য কোনো অ্যান্টিভাইরাল, করটিকোস্টেরয়েড, ডোপামিন (ব্লাড প্লোসার বাড়ায়), কার্বোজোক্রোম (ক্যাপিলারিলিক কমায়) ইত্যাদি ড্রাগের তেমন প্রয়োজন নেই। যেহেতু এটি ভাইরাস জ্বর তাই অ্যান্টিবায়েটিকের ভূমিকা কম। স্টেরয়েড ব্যবহারের কারণে অনেক রোগী জ্বর শেষে ডায়াবেটিস নিয়ে আসেন। 

ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভারে একটি মারাত্মক সমস্যা হলো- রক্তক্ষরণ, লিভার ফেইলিওর ও শক। ডেঙ্গুর বিশেষ কোনো চিকিৎসা পদ্ধতি নেই। শক প্রতিরোধের জন্য প্রচুর পরিমাণ পানি খেতে হবে। আশঙ্কাযুক্ত রক্তক্ষরণ ও হেমাটোক্রিট বেশি থাকলে প্রাটিলেট দিতে হয়। অনেকে প্লাটিলেট কাউন্ট ১০,০০০-এর কম হলে রক্ত দিতে বলেন, এসব ক্ষেত্রে ব্রেইন বা অন্য কোনো ভাইটাল অর্গানে রক্তক্ষরণ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

আরও পড়ুন-

►ডেঙ্গু জ্বরে প্লেটলেট দেয়ার নিয়ম

►ডেঙ্গু এক আতংকের নাম

►ডেঙ্গু আক্রান্ত মেডিকেল শিক্ষার্থীর মৃত্যু

►ডেঙ্গু জ্বর কী ও কিভাবে ছড়ায়?

►ডেঙ্গুতে প্রাণ গেল ডাক্তারের

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে