ডা. মুহাম্মাদ সাঈদ এনাম ওয়ালিদ

ডা. মুহাম্মাদ সাঈদ এনাম ওয়ালিদ

চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট, জনস্বাস্থ্য গবেষক।


২৯ জুলাই, ২০১৮ ০৯:৪২ পিএম

মানসিক রোগীর গল্প

মানসিক রোগীর গল্প

সেদিন এক রোগী দেখলাম। প্রবলেম মাথা ব্যথা আর মন খারাপ। অনেক ডাক্তার দেখিয়েছেন। সিটি, এম. আর. আই. সহ সকল পরীক্ষা-নিরীক্ষা ঢাকা থেকে বহু আগে করিয়েছেন। সব কিছুই নরমাল। ওষুধ খাচ্ছেন ডাক্তারের পরামর্শ মেনে। তাও সমস্যা গুলোর কোন উপশম নেই। যায়, আবার ফিরে আসে।

নিউরোমেডিসিন স্পেশালিষ্ট এক বড় ভাই বুঝিয়ে শুনিয়ে রেফার্ড করে পাঠালেন। সাইকিয়াট্রিস্ট এর কাছে আসতে চায়নি। ভার্সিটির বন্ধুবান্ধব কী বলবে। সে কি পাগল নাকি? আমাদের সমাজে এখনো প্রচলিত ধারনা, ঘোরতর পাগল হলেই কেবল সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে যেতে হয়। এর আগে পরিবার, সমাজ, সংসার তছনছ হয়ে সব চুলোয় যাক। সমস্যা কী?

যাহোক কথা বলতে বলতে, কারণ হিসেবে বহুক্ষণ পর জানলাম তার মা বাবা গত ১৫ বছর যাবৎ সেপারেশন এ থাকেন। একই ছাদের তাদের বসবাস কিন্তু আলাদা আলাদা রুমে। স্বামী-স্ত্রী তারা কেউ কারো সাথে কারো কথা কয় না।

কিন্তু সমস্যা হয়ে যাচ্ছে বাচ্চা গুলোর। অবাক হচ্ছেন! অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে? হ্যাঁ। আমিও অবাক হয়েছিলাম শুনে!

পরে জানলাম এক বিন্দুও মিথ্যে নয়।

বললাম চিকিৎসা তো তোমার মা বাবার দরকার।

সেও মাথা নেড়ে 'হ্যাঁ' বলল।

'তাহলে নিয়ে এসো একদিন, গল্প করি সবাই মিলে। দেখি প্রবলেম গুলো কোথায়?

ও বলল, 'একবার বাবাকে বলেছিলাম, 'বাবা, তোমরা দুজন মেন্টালী সিক। সাইকিয়াট্রিস্ট দেখাও!'

বাবা চড় মেরে আমাকে বলেছিলো,

"বেশি পেকেছিস। আমি কি পাগল? তর মা একটা পাগল। তোর মায়ের গুষ্টি শুদ্ধ্ব পাগল। তোর মা কে পাগলের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যা।"

'মাকে গিয়ে কেঁদে কেঁদে বললাম। মা বাবা রাগ হলেই আমাদের মারে কেনো?'

মা বললো, 'কাঁদিস না। দেখিস না গত ১৫ বছর আমি কাঁদি না। কথা ও বলি না, থাকিও না লোকটার সাথে। মেন্টালী সিক একটা লোক...'

মেয়েটি লজ্জা পাচ্ছিলো। বললাম, 'লজ্জার কিছু নেই। উন্নত বিশ্বে সচেতন নাগরিক ফ্যামিলি তে এসব কনফ্লিক্ট দেখা দিলে সাইকিয়াট্রিক কাউনসেলিং নেয় তারা। আমাদের দেশে শিক্ষা সচেতনতা কম। তুমি সাইকিয়াট্রিস্ট দেখাতে এসেছো, তোমাকে ধন্যবাদ। তবে ডাক্তারের কাছে কিছু লুকাতে নেই...'

সে তার ফ্যামিলির পুরো হিস্ট্রি খুলে বললো। সে এক করুন কাহিনী!

দুই.

বহু আগের কথা। সে তখন খুব ছোট। তিন বোনের পর এক ভাই হয় তাদের। ভাই টি খুব কাংখিত ছিলো তাদের উভয় পরিবারের জন্য। ভাইটি ছিলো চাঁদের টুকরোর মতো দেখতে। ওর যখন ছ'মাস বয়স তখন ভাইটি সহ নানা বাড়ি বেড়াতে যান মা। কী এক অনুস্টান আয়োজন করতে। নানা বাড়িতেই হঠাৎ করেই অসুস্ত হয়ে মারা যায় তাদের বংশের প্রদীপ, একমাত্র ভাই!

তারপর থেকেই দোষাদোষ। বাবা দোষী করে মাকে আর নানা বাড়ির সবাই কে। তার অভিযোগ সন্দেহতীর নানা বাড়ির সবার দিকে। নানা বাড়িতে বেড়ানো যাওয়াটা ই কাল হয়েছে। তারাই মেরেছে, চিকিৎসায় অবহেলা করেছে।

আর মা দোষী করেন বাবাকে। নিশ্চয় এটা বাবা'দের পরিবারের কোন না কোন কুকর্মের ফল।

এ নিয়ে রোজ রোজ স্বামী-স্ত্রীতে মনমালিন্য, কথা কাটাকাটি, গালিগালাজ, ব্যাগ গুছাগুছি, এমন কী হাত তোলা পর্যন্ত। অবশেষে লোকলজ্জার ভয়ে একই ছাদের নীচে বসবাস। সেপারেশন লাইফ গত ১৫ বছর!

'আমার তো বিশ্বস হয় না। এক বাড়িতে, একই ছাদের নীচে থাকেন তোমার মা বাবা, অথচ তারা একে অপরের সাথে কথা বলে না!'

'হ্যা স্যার কথা বলে না তারা। বাবার কিছু লাগলে বাবা আমাদের ধমক দিয়ে বলেন,

"এই যাহ তোর মাকে বল এটা লাগবে"।

'আর মার কিছু লাগলে...?', আমি জিগ্যেস করলাম।

মা ও একই। ধমক দিয়ে বলেন, "যাহ তর বাপ কে গিয়ে বল কিছু খাবেনা নাকি?"

কথা গুলো বলতে বলতে মেয়েটির দু চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো,

'স্যার পৃথিবীতে মা আর বাবা পাশে বসে হেসে হেসে দুটো কথা বলতে পারে, এটা আমরা কখনো দেখিনি!'

তিন.

মাথা ব্যাথা, আর মন খারাপ নিয়ে ডাক্তারের চেম্বারে চেম্বারে বছরের পর বছর ধর্না দেয়া অনার্স পড়ুয়া মেয়েটির বাবা একজন উচ্চপদস্থ বেসরকারি কর্মকর্তা, আর মা ব্যাংকার! কিন্তু তারা দুজনেই মানসিক রোগে জর্জরিত। তাদেরতো জীবন তো শেষ হলোই এখন তার প্রভাব পড়ছে সন্তানদের উপর।

এসব কেইস গুলো নিয়ে ভেবেছিলাম সবার সচেতনতার একটা গল্প লেখবো, কিন্তু সময় পাচ্ছি না।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে