ঢাকা      শুক্রবার ১৭, অগাস্ট ২০১৮ - ২, ভাদ্র, ১৪২৫ - হিজরী

হাত-পা ঘামা নিয়ে যন্ত্র তৈরি: ড. খন্দকার সিদ্দিক-ই-রব্বানীর বিশেষ সাক্ষাৎকার

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিকেল ফিজিক্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের প্রথম চেয়ারপার্সন এবং বর্তমানে অনারারী প্রফেসর, ড. খোন্দকার সিদ্দিক-ই রব্বানী। তিনি ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। পরে স্কলারশিপ নিয়ে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে যান তিনি। তারপর যুক্তরাজ্য থেকে ‘মাইক্রো ইলেকট্রনিক্স’ এর ওপর পিএইচডি করে দেশে ফিরে চিন্তা করেন জীবনটা অর্থবহ হওয়া দরকার। সেজন্য বিদেশে নানা লোভনীয় চাকরির সুযোগ থাকলেও তিনি দেশেই থেকে যান। বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে আমার দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করার জন্য বিভিন্ন ধরণের যন্ত্র উদ্ভাবন করেছেন তিনি। বর্তমানে নতুন আলোচিত যন্ত্রটি হলো হাত-পা ঘামা নিরাময়ের যন্ত্র। তার এ যন্ত্র তৈরিসহ বিভিন্ন বিষয়ে তিনি মেডিভয়েসের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ওবায়দুল্লাহ মামুন।

 

মেডিভয়েস: হাত-পা ঘামার কারণ কী? যন্ত্রটি কিভাবে কাজ করে?

ড. খোন্দকার সিদ্দিক-ই রব্বানী: এটা আমাদের আবিষ্কার না। এটাকে আমরা আমাদের নিজের পদ্ধতিতে ডিজাইন করেছি। কারণ বিদেশে এটা ১৯৫০ দশক থেকেই ব্যবহার হয়ে আসছে। এটা যেভাবে কাজ করে, আসলে আমরা একটা হালকা বৈদ্যুতিক প্রবাহ হাতের মধ্য দিয়ে পাস করি। তাতে কেউ কেউ ধারণা করছে, আমাদের যে ঘর্ম গ্রন্থিগুলো আছে সেগুলোতে আমাদের চামড়া থেকে কিছু জিনিস গিয়ে বন্ধ করে দিচ্ছে। সেগুলোতে ঘাম তৈরি হতে থাকলে একটা চাপ বাড়তে থাকে। সেই চাপ ব্রেইনে খবর পাঠায় যে, আর তৈরি করার দরকার নাই। কিন্তু এটা পুরো ঘটনাকে এক্সপ্লেইন করে না।

আমরা দেখেছি, আমাদের এ সিস্টেমে একজন মানুষ প্রতিদিন ২০মিনিট করে দুহাতে ৪০ মিনিট ১০ দিন ব্যবহার করলে তার ঘাম স্বাভাবিক হয়ে যায়। হয়ে গেলে এক থেকে দেড় মাস সে ভালো থাকে। এখন এই এক থেকে দেড় মাস ভালো থাকছে আমরা ব্রেইনের সেই সংকেতটার সাথে এটা মিলাতে পারছি না। তারপর আবার হয় তখন চার-পাঁচ দিন নিলে আবার এক থেকে দেড় মাস ভালো থাকে। অনেক ক্ষেত্রে অনেকের হাত-পা দুটোই ঘামে। কারো কারো আলাদা থেরাপি দিতে হয়। অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায়, হাত ভালো হলেই পা ভালো হয়। এখন ব্রেইন কিন্তু সে সংকেত পায়নি। কিন্তু কেনো ভলো হলো সেটা আমরা বুঝতে পারছি না।

 

মেডিভয়েস: হাত ঘামে কেন?

ড. খোন্দকার সিদ্দিক-ই রব্বানী: এটা পৃথিবীতে বিজ্ঞানীদের কাছে পরিষ্কার না। এই পদ্ধতিতে ভালো হয় কেন সেটাও পরিষ্কার না। তবে এ পদ্ধতিতে শতকরা ৯০ ভাগ রোগী ভালো হয়।

 

মেডিভয়েস: এটা কোথায় পাওয়া যাবে এর খরচ কেমন?

ড. খোন্দকার সিদ্দিক-ই রব্বানী: আমরা এটা জনগণের কাছে সহজে পৌঁছে দিতে চাই। আমরা জনকল্যাণে একটা কোম্পানি করেছি। সেই কোম্পানির মাধ্যমে আমরা এটা বিক্রি করছি। সেই ঠিকানা হচ্ছে প্রিয়াঙ্গন শপিং মল।নিউমার্কেটের কাছে ৩৬/৬। সেখানে এটা বিক্রি করা হয়। সাধারণ মানুষকে চিকিৎসাও দেয়া হয়। বর্তমানে একটা ক্যাম্পেইন চলছে। সেখানে কেউ ফ্রি চিকিৎসা নিতে পারেন ভালো হয় কিনা। যন্ত্রের দাম মাত্র ৮ হাজার টাকা। সেখানে সুবিধা হলো কারো যদি এই রোগ ভালো না হয় তাহলে যন্ত্র ফেরৎ দিয়ে টাকা নিতে পারবে।

 

মেডিভয়েস: এটা স্থায়ী ভালো হয় কিনা? কত সময় লাগে? এটার কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে কিনা?

ড. খোন্দকার সিদ্দিক-ই রব্বানী: পৃথিবীতে অনেক চিকিৎসা পদ্ধতি আছে যেগুলো স্থায়ী ভালো হয় না। এটার বিষয়ে বলবো, শতকরা নব্বই রোগী ভালো হচ্ছে। এটার কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। তবে আমাদের কিছু সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। যেমন- যন্ত্রে অ্যালুমিনিয়াম যে ধাতু আছে তাতে যেন সরাসরি হাত না লাগে, হাতে যদি ঘা থাকে তাহলে সেটা টেপ দিয়ে বেঁধে ফেলতে হবে।

মেডিভয়েস: বিদেশের যন্ত্র ও আমাদের দেশীয় যন্ত্রের মধ্যে দামের পার্থক্য কেমন?

ড. খোন্দকার সিদ্দিক-ই রব্বানী: আমাদের তুলনায় তাদের যন্ত্রের দাম দ্বিগুণ-তিনগুণ বেশি। কেউ যদি বাইরের দেশ থেকে এ যন্ত্র নিয়ে আসতে চায় তাহলে অনেক খরচ হবে। আবার নষ্ট হয়ে গেলে সেটাকে ঠিক করাও কঠিন। আমাদের এখানে এটার দাম ৮০০০ (আট হাজার) টাকা মাত্র।

দেশীয় যন্ত্রটির ডিজাইন আমাদের হাতে করা। যন্ত্রটির দুই বছর গ্যারান্টি আছে। এর নষ্ট হলে বিনা খরচে মেরামত করে দিই।

 

মেডিভয়েস: এ যন্ত্র তৈরির পেছনে গল্প বলুন।

ড. খোন্দকার সিদ্দিক-ই রব্বানী: নব্বইয়ের দশকে আমরা স্নায়ু নিয়ে কাজ করছিলাম। ইংল্যান্ডের সাহায্যে আমি আশির দশকে একটি প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করি। সেখান থেকে আমার ভাবনা শুরু হয় যে, আমি নিজে হাতে কিছু তৈরি করব। ইলেকট্রিক্যাল যন্ত্রগুলো আমার কাছে খুব পছন্দনীয়।

আমি মস্তিষ্ক-স্নায়ুর পরিমাপের জন্য নার্ভ কনডাকশন যন্ত্র বানানোর জন্য মনস্থির করলাম। তারা আমাকে অনেক সাহায্য করলো। তো আমি একটা নার্ভ কনডাকশন যন্ত্র বানালাম দেশেই। এবং এটার দ্বারা রোগ নির্ণয়ও শুরু হয়। তো সেসময় বারডেমের ইব্রাহিম স্যারের সাথে আলাপ করলাম। স্যার আমাকে ডায়াবেটিক সেন্টারে একটা রুম ও একজন চর্ম ডাক্তার দিলেন। তার নাম ডা. রেজা বিন জায়েদ। তার সাথে আমরা জয়েন্টলি কাজ করতাম।

তিনি আমাকে একদিন বললেন, ভাই, আয়োন্টফোরেসিস যন্ত্রটি আমরা তৈরি করতে পারি কিনা। তখন আমি যন্ত্রটি তৈরি করি। তখন থেকে চিকিৎসাও শুরু হয়। ডা. রেজা বিন জায়েদ ও আমাদের যৌথ প্রচেষ্টায় এটা তৈরি হয়েছে।

 

মেডিভয়েস: এটা প্রসারের ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা আছে কিনা? উত্তরণের উপায় কী?

ড. খোন্দকার সিদ্দিক-ই রব্বানী: মেডিকেল যন্ত্র হিসেবে বাজারজাত করার জন্য সরকারের নিবন্ধন ফি, কারখানা ভিজিট ফি এগুলো আমাদের প্রতিবন্ধকতা। আমরা সরকারের কাছে আবেদন করেছি স্থানীয় প্রযুক্তিতে তৈরি যন্ত্রপাতির জন্য নিবন্ধন বিনামূল্যে করার জন্য। কিন্তু এখনও কোনো উত্তর পাইনি। সরকারের প্রতি আমার আহ্বান থাকবে দেশীয় প্রযুক্তির পণ্যের প্রসারের জন্য এ ধরণের সব ফি ও কর মাফ করার।

 

মেডিভয়েস: আমরা এ প্রোডাক্টটা বিদেশে রফতানি করতে পারি কিনা?

ড. খোন্দকার সিদ্দিক-ই রব্বানী: ইউরোপ বা আমেরিকায় এটা পাঠাতে গেলে অনেক অর্থ খরচ হবে। তবে আফ্রিকার দেশগুলোতে পাঠানো যায়। আমরা যদি ফান্ড পাই তাহলে আমরা বিদেশে পাঠাতে পারব। তবে দেশেই এর ব্যাপক প্রচলন করতে চাই। যন্ত্রটিকে আরো অত্যাধুনিক করতে চাই।

 

মেডিভয়েস: এটা চিকিৎসা বিজ্ঞানের একটা অংশ। চিকিৎসকদের উদ্দেশে কিছু বলার আছে কিনা?

ড. খোন্দকার সিদ্দিক-ই রব্বানী: আমি চিকিৎসদের বলবো যে, আপনারা এ যন্ত্রটি রোগীদের পেসক্রাইব করুন। কারণ এটা আমাদের দেশীয় পণ্য। আবার আমাদের ক্লিনিক, হাসপাতালগুলোতে এটার প্রচলন করা যেতে পারে। আমরা এ যন্ত্রটি কুরিয়ার করে পাঠাতে পারি। আবার ব্যবহারও স্কাইপিতে শিখিয়ে দিতে পারি।

 

মেডিভয়েস: আপনার উদ্ভাবিত আরও কোনো যন্ত্র আছে কিনা?

ড. খোন্দকার সিদ্দিক-ই রব্বানী: আমরা আমাদের মতো করে প্রযুক্তির উন্নয়ন করছি। আমরা সাধারণ মানুষকে দেয়ার মতো বেশ কয়েকটা যন্ত্র নিয়ে কাজ করেছি। ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য নিজেদের মতো করে প্যাডোগ্রাফ বানিয়েছি। দেশের বাইরে এটার দাম ৪০ লক্ষ টাকা। আমাদেরটার দাম মাত্র তিন লাখ টাকা। যারা ফিজিওথেরাপি নেন তাদের জন্যও আমরা যন্ত্র আবিষ্কার করেছি। আবার আমরা ইসিজি মেশিন বানিয়েছি। যেটা থেকে ডাকা অল্প সময়ের মধ্যেই দেশের যেকোনো প্রান্তে পৌঁছে দেয়া যায়।

মেডিভয়েস: আপনাদের উদ্ভাবিত দুটো মেথডের কথা শুনেছি, সে দুটো কী?

ড. খোন্দকার সিদ্দিক-ই রব্বানী: এদুটো আমাদের আবিষ্কার। প্রথমটি হচ্ছে, 'ফোকাস্‌ড ইমপিডেন্স মেথড' - এটি  নিয়ে গবেষণা চলছে। ফুসফুস, পাকস্থলী, রক্তনালীর সমস্যা, এবং কিছু কিছু ক্যান্সার নির্ণয়ে এর সম্ভাবনা আছে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে  ' ডিস্ট্রিবিউশন অফ এফ-লেটেন্সী' বা 'ডিএফএল' - এটি নার্ভের পরিমাপে একটা নতুন প্যারামিটার। ঘাড়ে ও পিঠের ব্যথায় নার্ভের উপর চাপ পড়েছে কিনা এ প্যারামিটার ব্যবহার করে আমরা তা নির্ণয় করতে পেরেছি।  আমরা এর জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রটিকে ছোট করে তৈরি করে মোবাইল ফোনের সাথে সংযুক্ত করে আউটপুট দেবার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছি।

মেডিভয়েস: যারা এ বিভাগে ক্যারিয়ার গড়তে চান তাদের জন্য কিছু বলুন।

ড. খোন্দকার সিদ্দিক-ই রব্বানী: এটা একটা সম্ভাবনাময় জায়গা। আসলে বিজ্ঞানের দুটো কাজ। এক. বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে জানা। দুই. রিসোর্সগুলোকে কাজে লাগিয়ে মানুষের কল্যাণ করা। সভ্যতার শুরু থেকেই প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু হয়েছে। এর ভবিষ্যত অনেক বিশাল। কিন্তু আমাদের দেশে চাকরির ক্ষেত্র তৈরি হয়নি। আমরা সরকারকে আহ্বান করব, প্রত্যেকটা হাসপাতালে বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারদের সম্পৃক্ত করা হোক। রেডিওথেরাপিতে আমাদের সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। আমাদের ক্ষেত্রে সরকারকে ভূমিকা রাখতে হবে।

মেডিভয়েস: ডাক্তারদের উদ্দেশে কিছু বলুন।

ড. খোন্দকার সিদ্দিক-ই রব্বানী: চিকিৎসকরা সেবার ভূমিকায় থাকবেন। আপনারা অনেক ত্যাগ স্বীকার করছেন। ডাক্তারদের প্রতি আমার অনুরোধ থাকবে আপনারা রোগীর প্রতি একটু সহানুভূতিশীল হবেন। একটু সময় নিয়ে কথা বলবেন। সবকিছু ভালোভাবে বুঝিয়ে বলবেন।

রোগীদের জন্য বলবো যে, একজন ডাক্তার কখনোই চান না তার রোগী মারা যাক। তাদের কাজের অনেক চাপ। সুতরাং ডাক্তারদের প্রতিও সহানুভূতিশীল হবেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


আরো সংবাদ














জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর