ঢাকা      মঙ্গলবার ১৭, সেপ্টেম্বর ২০১৯ - ২, আশ্বিন, ১৪২৬ - হিজরী



অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম

মনোরোগবিদ্যা বিভাগ,

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট ও হাসপাতাল,

শেরেবাংলা নগর, ঢাকা। 


‘মৃগী রোগ নয়, জ্বীন ভূতের কিছু হবে’

ছেলেটি প্রায়ই ২-৩ ঘন্টা কানে শোনে না, এখানে সেখান কে যেন তুলে নিয়ে যায়, চোখের সামনে সাদা পাগড়ি পরা কাউকে দেখে চিৎকার করে ওঠে। মাসুদ রানা, বয়স ১৩ বছর, ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র।

৪ মাস আগে সে কোরআন তেলোয়াত করছিল, তখন হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে যায়। ঘন্টা খানেক অজ্ঞান থাকে। পরে আরো কয়েকবার এমন হয় সে সময় তার শরীর কাপে, ঠোঁট কাপে এবং এরকম এক দেড় ঘন্টা থাকে। সে টের পায় কী হচ্ছে কিন্তু কথা বলতে পারে না।

তার বাবা তাকে রাজধানীর একটি বিখ্যাত প্রাইভেট হাসপাতালে, একজন নামকরা নিউরোলজিস্টের কাছে নিয়ে যান। তাকে এমআরআইসহ বিভিন্ন পরীক্ষা করা হয় এবং তার ওই খিঁচুনির ভিডিও রেকর্ড রাখতে বলেন। তাকে নিয়ে ওই হাসপাতালে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে নাকি বোর্ড মিটিংও করা হয়।

খিঁচুনির (ওই শরীর কাপা, ঠোঁট কাপার) ওই ভিডিও দেখে নিউরোলজিস্ট বলেন, ‘এটি মৃগী রোগ নয়, দেখে তো মনে হচ্ছে জ্বীন ভূতের কিছু হবে।’

আমি রোগীর বাবার কাছ থেকে এরকম কথা শুনে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। তাই নিশ্চিত হতে আবার জিজ্ঞেস করলাম, নিউরোলজিস্ট নিজে জ্বীন ভূতের কথা বলেছেন? তিনি মৃদু হেসে নিশ্চিত করলেন জ্বি হ্যাঁ এমনটিই তিনি বললেন।

তারা নিজেরাও তেমনটি ভাবতেন। এরপর তারা হুজুরের কাছে নিয়ে যান। হুজুরের চিকিৎসায় সে আপাত ভালো হয়। জ্বীন ভূতের কথা শুনার পর থেকে ছেলেটি চোখের সামনে সাদা পাগড়ি পরা একজনকে দেখতো যে তার গলা চাপ দিয়ে ধরতে চায়। তখন সে চিৎকার করতে থাকে, কাঁদে, আম্মু আমাকে ধরো বলতে থাকে।

১৫-২০ দিন পরে সে টিভি দেখা অবস্থায় নিজেই মাকে ঢেকে বলে, ‘মা আমি কিছু কানে শুনতে পারছি না, আমার কান বন্ধ হয়ে গেছে।’
- মা দেখলেন সত্যি তাই। তবে কয়েক ঘন্টা পর হঠাৎ করে আবার কানে শুনতে শুরু করে।

এরপর কয়েকদিন পর পর সে ২-৩ ঘন্টার জন্য কানে শুনতো না, পরে আবার ঠিকই শুনতে পেতো। এবার ও নামকরা এক হাসপাতালে গিয়ে নাক, কান গলা রোগ বিশেষজ্ঞ দেখান। তিনি পরিক্ষা করে বলেন সব ঠিক আছে, সমস্যা নেই। কিছু ওষুধ দিয়ে দেন।

এর ২ সপ্তাহ পর স্কুলে যাবার পথ থেকে সে হারিয়ে যায়। কে যেন তাকে উঠিয়ে কাঠাল বাগান নিয়ে ফেলে যায়। সে বলে স্কুল যাওয়ার পথে হঠাৎ একটি দমকা বাতাস গায়ে লাগে। এরপর কী হয়েছে বলতে পারবে না। জ্ঞান ফিরে সে দেখে কাঠাল বাগানে। সেখান থেকে পার্শ্ববর্তী এক দোকানদারের কাছ থেকে মোবাইল চেয়ে নিয়ে তার বাবাকে ফোন করে। পরে বাবা এসে তাকে নিয়ে যায়।

এরপর দুই এক দিন পর পর তাকে কে বা কারা নিয়ে যায় (মিরপুর-১০; তালতলায়; হাবিবুল্লাহ রোড; বাসার কাছে; শেওড়াপাড়া- ইত্যাদি জায়গায়)। কোনবারই সে বলতে পারে না কিভাবে, কেমন করে সে ঐসব জায়গায় চলে যেতো। তাকে যখন পাওয়া যেতো তার চেহারা কালো দেখাতো, ঘামে জামা কাপড় ময়লা থাকতো, ভীত, আতঙ্কিত দেখাতো।

এই যে ভয়ংকর জ্বীন দেখা, কানে না শোনা, প্রায়ই দূরে চলে যাওয়া/হারিয়ে যাওয়া- সবগুলো একই সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে হতে থাকে। সে যখন হারিয়ে যায়, তার পকেটে যে টাকা থাকতো তা অক্ষত থাকতো। সে টাকা দিয়ে নিজেই কয়েক বার বাসায় ফিরে আসে।

এ কাহিনী থেকে যা শিক্ষণীয়:

১. ছেলেটি ডিসোসিয়েটিভ কনভার্সান ডিসঅর্ডারে ভুগছে।

কিছু সময়ের জন্য কানে কিছু না শোনা এবং মাঝে মাঝে শরীর কাপা, ঠোঁট কাপা এ দুটি হচ্ছে কনভার্সন। (মনোসন্জাত কোন দ্বন্দ্ব, চাপের প্রতিক্রিয়ায় নিউরোলজিক্যাল কিছু সিম্পটম দেখা দেওয়া। নিউরোলজিক্যাল কোন কারণ ছাড়াই শুধু মানসিক কারণে এরকম লক্ষণগুলোর উদ্ভব হয়।)

হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়া, যার কোন কিছু সে মনে করতে পারে না- এটি হচ্ছে ফিউগ (fugue) ডিসঅর্ডার (ছোট কালে শুনতাম পরিরা কাউকে তুলে নিয়ে গাছের মগডালে বসিয়ে দিতো। সে না জানতো গাছে চড়তে এবং কিভাবে উঠেছে তাও সে জানতো না।)

সাদা পাগড়ি ওয়ালা কাউকে দেখা (যা অন্যরা দেখে না) এটি এক ধরনের ভিজুয়্যাল হ্যালুশিনেসন। তবে এটি সাইকোসিস নয়।

উপরোক্ত দুটি ডিসোসিয়েটিভ ডিসঅর্ডার (মানসিক দ্বন্দ্ব, চাপের কারণে ব্রেইনের একটি অংশ মূল অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন (ডিসোসিয়েশন) হয়ে যায় বলে, সে যা করে পরে তা তার স্মৃতিতে থাকে না।)

২. এসব মানসিক রোগকে সাধারণ মানুষ জ্বীন, ভূত, পরি ধরা মনে করতো এখনো করে। এ ভুল ভাঙানোর দায়িত্ব আপনার, আমার সবার।

৩. তবে ছোট ছোট শিশুদের মধ্যে ইদানিং এই তথাকথিত জ্বীন ভূতে ধরা রোগ বেশি দেখা দিচ্ছে। এর প্রধান কারণ যা আমি পর্যবেক্ষণে দেখতে পেয়েছি যে, কোনো মানসিক চাপ, ভয়ের কারণে তাদের মধ্যে প্রথমে ডিসোসিয়েশন বা কনভার্সন রোগের লক্ষণ দেখা দেয়।

কিন্তু এরকম লক্ষণকে আত্মীয় স্বজনরা জ্বীন ভূতের ঘটনা মনে করে হুজুর দেখায়। সেখান থেকে শিশুর কোমল মনে (ব্রেইনে) এই লক্ষণগুলোর সঙ্গে জ্বীন ভূতের একটি কানেকশন/সংযোগ তৈরি করে নেয়। পরবর্তী সব ইপিসোডের সময় ওই একই রোগ তখন জ্বীন ভূতের আছর নিয়ে হাজির হয়।

৪. এর সঙ্গে যদি ডাক্তার/বিশেষজ্ঞ ডাক্তার মুখ ফসকে জ্বীন ভূতের কথা বলে বসে, তাহলে তো আর কোন কথাই নেই। 

৫. তাই এই ভূতুরে (কাল্পনিক) জ্বীন ভূতের রোগ থেকে মুক্তি পেতে হলে আপামর জন সাধারণ/চিকিৎসকদের মাথা থেকে ওই ভূত প্রথমে সারাতে হবে।

৬. সাধারণত একটি বা দুটি ধরণ একই রোগীর হতে পারে। কিন্তু এ ছেলেকে ২টি কনভার্সন, ২টি ডিশোসিয়েশন মোট ৪ ধরনের রোগ পেয়ে বসেছে। এমনটি হওয়ার কারণ রোগীর মূল মানসিক দ্বন্দ্ব, ভয়, চাপকে নিরসন না করে অপচিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া। তাই এ ধরনের রোগীকে অপচিকিৎসা না দিয়ে দ্রুত মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের অধীনে চিকিৎসা করাতে হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

স্ট্রোক থেকে বাঁচার গুরুত্বপূর্ণ সাত পরামর্শ

স্ট্রোক থেকে বাঁচার গুরুত্বপূর্ণ সাত পরামর্শ

মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে রক্ত সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটার ফলে যে অব্যবস্থা দ্রুত জন্ম নেয়…

আতঙ্কিত হবেন না: সব কোলেস্টেরল ক্ষতিকর নয়

আতঙ্কিত হবেন না: সব কোলেস্টেরল ক্ষতিকর নয়

মফিজ সাহেব দ্বিতীয়বার যখন আমার চেম্বারে আসলেন, তখন তাকে চেনা দায়। এক…

স্থুলতা: উচ্চতা অনুযায়ী ওজন কত হবে?

স্থুলতা: উচ্চতা অনুযায়ী ওজন কত হবে?

মাত্র একুশ বছরের টগবগে তরুণ ফাহিম। বয়সের তুলনায় একটু বেশিই তরুণ। মায়ের…

কিডনিজনিত নানা সমস্যা, কারণ ও প্রতিকার

কিডনিজনিত নানা সমস্যা, কারণ ও প্রতিকার

কিডনি মানুষের শরীরের অন্যতম অপরিহার্য অঙ্গ। কিডনি ব্যতীত মানুষ বেঁচে থাকতে পারে…

মনে চাপ পড়লে শরীর কেন ব্যথা পায়?

মনে চাপ পড়লে শরীর কেন ব্যথা পায়?

মনের উপর চাপ পড়লে (বোন), কেন তার জমজ ভাই ( শরীর) ব্যথা…

শিশুদের নাক ডাকার কারণ ও প্রতিরোধে করণীয়

শিশুদের নাক ডাকার কারণ ও প্রতিরোধে করণীয়

অ্যাডিনয়েড বড় হয়ে গেলে নাক বন্ধ হয়ে যায়। তখন নাক দিয়ে নিঃশ্বাস…













জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর