২৪ জুলাই, ২০১৮ ১১:০০ এএম

শিশুর খিঁচুনি জ্বরের ব্যাপারে আপনি সচেতন তো?

শিশুর খিঁচুনি জ্বরের ব্যাপারে আপনি সচেতন তো?

সাধারণত ৬ মাস থেকে ৬ বছর বয়সের কিছু শিশুর ক্ষেত্রে জ্বর ১০৩ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা এর কাছাকাছি হলে খিঁচুনি শুরু হয়। একে ফেব্রাইল কনভালশন বা খিঁচুনি জ্বর বলা হয়ে থাকে। সব ক্ষেত্রে খিঁচুনির কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। যে কারণেই জ্বর হোক জ্বরের মাত্রা তীব্র হলেই এসব শিশুদের খিঁচুনি শুরু হয়ে যায়। এসব রোগের মধ্যে, তীব্র কাশি, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, প্রস্রাবের নালীতে ইনফেকশন অন্যতম।

যেসব শিশুদের ফেব্রাইল কনভালসন তথা জ্বরজনিত খিঁচুনি হওয়ার ইতিহাস আছে তাদের ক্ষেত্রে জ্বর না হওয়ার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। শিশুকে সবসময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও ইনফেকশনের ঝুঁকি মুক্ত রাখতে হবে। যদি তারপরও জ্বর এসে যায় তবে জ্বরের শুরুতেই তাদের প্যারাসিটামল সিরাপ খাওয়ানো শুরু করতে হবে, ও প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে এন্টিবায়োটিকও শুরু করতে হবে। 

এসব রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসক আগেই প্যারাসিটামল সিরাপের মাত্রা ও সময় আগেই নির্ধারণ করে দেন। প্যারাসিটামল খাওয়ানোর পাশাপাশি তাকে তার শরীরের ওজনের ভিত্তিতে ডায়াজিপাম গ্রুপের ওষুধ খাওয়াতে হবে। যেমন দশ কেজির একটি বাচ্চার ক্ষেত্রে ৫ মি:গ্রা: এর সেডিল ট্যাবলেট এর অর্ধেক গুড়া করে পানিতে গুলিয়ে খাওয়াতে হবে দিনে তিন বার। 

এছাড়া জ্বর কমাতে পরিষ্কার ভেজা কাপড় দিয়ে শরীর মুছে দেয়া যেতে পারে। ১০১ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি জ্বর হলে ১২৫ মিলিগ্রামের প্যারাসিটামল সাপোজিটরি (যাকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় 'ঢুশ') দেয়া যেতে পারে। এরপরও দুই দিনের মধ্যে জ্বরের কোন প্রকার উন্নতি না হলে, তাকে দ্রুত কোন শিশু চিকিৎসকের নিকট নিতে হবে।

কিভাবে বুঝবেন বাচ্চার খিচুনি হচ্ছে?
আপনার বাচ্চার নিচের কোনো একটি লক্ষণ অথবা সবগুলোই আছে কি না, সেটা পরীক্ষা করে দেখুন।

- শরীর হাত পা শক্ত হয়ে চোখ উল্টে যাওয়া (হাত দিয়ে ধরলেও কোন পরিবর্তন আসবে না। যদি হাত দিয়ে ছুলেই সে স্বাভাবিক হয়ে যায় তবে সেটা খিঁচুনি নয়।)
- চোখের পলক না ফেলে এক দৃষ্টে একদিকে তাকিয়ে থাকা বা চোখ পিট পিট করা।
- পুরো শরীর বা শরীরের একটি অংশ বিশেষ করে হাত-পা কাঁপা। বেশি ছোট শিশু কেমন যেন সাইকেল চালানোর মতো অঙ্গভঙ্গি করতে পারে।
- প্রস্রাব-পায়খানা করে দেয়া।
- দাত দিয়ে জ্বিহবা কামড় দিয়ে রক্ত বের করে ফেলা।
- খিঁচুনি শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও কিছু সময় কাউকে চিনতে না পারা।

বাচ্চার খিঁচুনি হলে কী করবেন?
- প্রথম কথা নিজে শান্ত থাকুন। বেশির ভাগ খিঁচুনি পাঁচ মিনিটের কম স্থায়ী হয়। এর মধ্যে চিকিৎসক খিঁচুনির জন্য যে ওষুধ দিতে বলেছে যা যা করতে বলেছে ঠান্ডা মাথায় তা করুন। পায়ুপথে ডায়াজিপাম দেয়ার ক্ষেত্রে তাড়াহুড়োয় ডোজ ভুল করবেন না।
- বাচ্চাকে একপাশে কাত করে রাখুন কিংবা উপুড় করে রাখুন। এতে মুখ থেকে লালা বেরিয়ে যেতে পারবে। শ্বাস নালীতে আটকে জীবন সংশয় করবে না।
- বাচ্চাকে এমন নিরাপদ স্থানে রাখুন, যাতে সে কোথাও পড়ে না যায় কিংবা তার শরীরে অন্য কোনো বস্তুর আঘাত না লাগে।
- বাচ্চার নড়াচড়ার ধরণ খেয়াল করুন এবং খিঁচুনি কতক্ষণ স্থায়ী থাকে, সেটা খেয়াল করুন।
- খিঁচুনির সময় বাচ্চাকে একটি শান্ত শীতল নিরিবিলি পরিবেশ দিন। অযথা চিৎকার চেঁচামেচি করে তার ক্ষতি করবেন না।
- খিঁচুনির পর বাচ্চাকে বিশ্রামে রাখুন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে সংশ্লিষ্ট শিশু চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান।

বাচ্চার খিঁচুনির সময় কী করবেন না:
- বাচ্চার দুই দাঁতের পাটির মাঝখানে জোর করে কোনো বস্তু ঢোকাবেন না।
- বাচ্চাকে ধরার চেষ্টা করবেন না কিংবা তার কাঁপা বন্ধ করার চেষ্টা করবেন না। চাপাচাপি করবেন না।
- খিঁচুনির সময় বাচ্চার মুখে কোনো খাবার বা ওষুধ দেবেন না।

কোন শিশুর প্রথমবার খিঁচুনি কবে হবে, তা আগে থেকে কোনভাবেই বলা সম্ভব নয়। কাজেই প্রথম খিঁচুনি দেখা দেওয়া মাত্রই দ্রুত ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে। চিকিৎসক সঠিক পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে আসল কারণ খুজে বের করবেন।

ঝুঁকিপূর্ণ শিশু:
যেসব শিশু ১ বছর বয়সের আগেই খিঁচুনি শুরু হয়, তারা খুবই ঝুঁকিতে থাকে। তাছাড়া তার মা বাবার যদি খিঁচুনির সমস্যা থাকে, এ ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। আর যদি খিঁচুনি ১৫ মিনিটের বেশি থাকে কিংবা ঘন ঘন হয়, সেক্ষেত্রে এটি জ্বরজনিত খিঁচুনি না হয়ে অন্য কোন রোগও হতে পারে। সুতরাং এ সময় শিশুর কাছাকাছি থেকে তাকে সচেতনভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে।

সতর্কতা:
প্রতিটি খিঁচুনিই বিপদজনক এবং মস্তিষ্কের কিছু না কিছু ক্ষতি করে। তাই সবচেয়ে ভালো হয়ে খিঁচুনি আসার সুযোগ না দিলে। আর খিঁচুনি শুরু হয়ে গেলে দ্রুতই তা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। নিয়ন্ত্রন করতে না পারলে নিশ্চিতভাবেই শিশুর মস্তিষ্ক কিছুটা ক্ষতিগ্রস্থ হবে। ফলে শিশুর মানসিক বিকাশ কিছুটা বাধাপ্রাপ্ত হতে পারে। তাই সর্বোচ্চ সতর্কতার কোন বিকল্প নাই। 

এছাড়া সঠিকভাবে চিকিৎসা না করালে এটি পরবর্তীতে মৃগী রোগ বা এপিলেপ্সি হিসেবে সারা জীবনের জন্য থেকে যেতে পারে। সুতরাং শিশুর জ্বরের সাথে খিঁচুনি থাকলে, এটাকে সাধারণ ব্যাপার ভেবে মোটেও সময় নষ্ট করবেন না। দ্রুত শিশু চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।

সংকলনে-  ডা. আহমদ হাবিবুর রহিম 
           বিসিএস (স্বাস্থ্য), সহকারী সার্জন
         বিলাইছড়ি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, রাঙ্গামাটি।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত