ঢাকা বুধবার, ২৩ অক্টোবর ২০১৯, ৭ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ১ ঘন্টা আগে
কামারুজ্জামান নাবিল

কামারুজ্জামান নাবিল

ছাত্র, ডক্টর অব মেডিসিন, ইস্পাহান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ইরান


২৩ জুলাই, ২০১৮ ০২:০৫

ফুটপাতের খাবার কতটুকু স্বাস্থ্যসম্মত?

ফুটপাতের খাবার কতটুকু স্বাস্থ্যসম্মত?

আমাদের দেশে বিশেষ করে শহরে রাস্তার পাশের ফুটপাতে অনেক মুখরোচক খাবার পাওয়া যায়। যেগুলোকে আমরা স্ট্রিটফুড বলতে পারি। এসব খাবারের চাহিদা কম নয়। সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী, চাকরিজীবীরা এসব খেতে ভিড় জমান। কিন্তু আমরা কি ভেবে দেখেছি এসব খাবার কতটা স্বাস্থ্যসম্মত?

মেডিকেল সায়েন্সের আর্টিকেল সমৃদ্ধ পাবমেডে বাংলাদেশকে নিয়ে এক আর্টিকেলের সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতি বছর বাংলাদেশে কমপক্ষে ৩০ লাখ মানুষ খাদ্যজনিত অসুস্থতায় ভোগেন। আর এর প্রধাণ কারণ দেখানো হয়েছে, স্ট্রিটফুড বা রাস্তার ফুটপাতের অস্বাস্থ্যকর খাবার।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা FAO এর করা ২০১০ সালের এক গবেষণায় উঠে আসে, বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার রাস্তার পাশের এসব খাবার পরিবেশনের সাথে সম্পৃক্ত ২৫ ভাগ মানুষই অশিক্ষিত যাদের নেই কোন একাডেমিক যোগ্যতা। আরো বলা হয়েছে, এদের অধিকাংশই দিনে ১৩ থেকে ১৮ ঘন্টা কাজে নিয়োজিত থাকেন টয়লেট সুবিধা ছাড়াই। এই দোকানগুলোর ৬৮ ভাগ দোকান ফুটপাতে অবস্থিত। আর ৩০ ভাগ দোকান ড্রেনের কাছাকাছি অবস্থানে অবস্থিত।

এ খাবারগুলো কেন স্বাস্থ্যসম্মত নয়?

পোকামাকড় ও মাছি দ্বারা দূষিত: রাস্তার পাশের প্রায় সব দোকানের খাবার খোলা আকাশের নিচে উন্মুক্ত অবস্থায় তৈরি, বিক্রি ও সাজিয়ে রাখা হয়। এর ফলে এসব খাবারে প্রতিনিয়ত পোকামাকড়, মাছি দ্বারা দূষিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

যানবাহন চলাচলে বাতাসের ধূলিকণা: এসব খাবারগুলো যেভাবে উম্মুক্ত স্থানে পরিবেশন ও তৈরি করা হয় তাতে করে এর পাশ দিয়েই যানবাহন চলাচল করলে বাতাসের ময়লা ধূলিকণাগুলো সেইসব খাবারে পড়বে এটাই স্বাভাবিক।

একটি উদাহরণ দিলে বুঝতে সুবিধা হবে, ধরুন আপনি রিক্সায় করে কোথাও যাচ্ছেন আর একটি ট্রাক বালু বা ইট নিয়ে আপনার রিক্সার সামনে দিয়ে অতিক্রম করে যাচ্ছে। এই মূহুর্তে ট্রাকের উপরের বালু আর ইটের ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র ধূলিকণাগুলো আপনার মুখে এসে যখন পড়ে তখন আপনি কী করেন? অবশ্যই চেষ্টা করেন রুমাল অথবা হাত দিয়ে মূখ আর চোখ ঢাকতে। সারমর্ম দাঁড়ালো যে, এই ধূলিকণাগুলোই আমরা খাচ্ছি।

বিভিন্ন রোগের সংক্রমণ: প্রায় ২৫০ টি ভিন্ন ধরনের ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, প্যারাসাইট, টক্সিন ইত্যাদি মানবদেহের খাদ্যজনিত রোগের সাথে সম্পর্কিত। এর মধ্যে ভাইরাসই ৫০ ভাগ খাদ্যজনিত রোগ সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে। আর ৯০ভাগ খাদ্যজনিত সমস্যার সাথে সম্পর্কিত ব্যাকটেরিয়াগুলোর মাঝে রয়েছে, Staphylococcus, Salmonella, Clostridium, Campylobacter, Listeria, Vibrio, Bacillus, এবং Enteropathogenic Escherichia coli প্রজাতির ক্ষতিকর জীবাণু। এসব ক্ষতিকর জীবাণুর ফলে খাদ্যে বিষক্রিয়া, ডায়রিয়া, আমাশয়, চর্মের সংক্রমণ, শ্বাস-প্রশ্বাস ও পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা সহ প্রাণঘাতী রোগ মেনিনজাইটিস ও সেপ্টেসেমিয়া হতে পারে।

২০১২ সালের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, সিঙ্গারা, ঝাল-মুড়ি, চটপটি, ছোলা, জিলাপি, আঁচার, আমড়া, বিভিন্ন প্রকারের জুস ও রস ইত্যাদিতে Salmonella, Escherichia coli, coliforms, Listeria, এবং Staphylococcus প্রজাতির ব্যাক্টেরিয়া রয়েছে। যেগুলো বিভিন্ন রোগ সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে।

কাগজে খাবার পরিবেশন: অনেক সময় দেখা যায়, রাস্তার ফুটপাতের এই দোকানগুলোতে পরিত্যক্ত বই, খাতা বা পেপারের কাগজে খাবার পরিবেশন করা হয়ে থাকে। আমরা নিজেইতো এসব কাগজ ব্যবহার করি তারপরে কত ময়লা-আবর্জনার সংস্পর্শে এই কাগজগুলো থাকে তা যদি আমরা নিজেরাই নিজেকেই প্রশ্ন করি তবে জবাব খুব সহজেই পেতে পারি। ফলে আমরা সরাসরি সেই ময়লাগুলোই খাচ্ছি তা বলায় যায়।

টাকার নোটের মাধ্যমে: এছাড়াও কাগজের টাকার নোট সংক্রামক রোগ বিস্তারের আরেক বড় মাধ্যম হিসেবে কাজ করতে পারে। এসব দোকানে যারা টাকা আদান-প্রদান করেন তাদের প্রায় পরিবেশনকারীরা সেই হাতেই খাবার স্পর্শ করে থাকেন ও পরিবেশন করে থাকেন ফলে টাকার নোটে থাকা অসংখ্য জীবাণু খাবারকে দূষিত করে। আর এই দূষিত খাবার খেলে যে কেউ মারাত্মক সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হতে পারে।

একই তেলের ব্যবহার: রাস্তার পাশের এসব খাবারে বিশাল একটা অংশের আইটেমগুলো তেলে ভেঁজে তৈরী করা হয়ে থাকে। আর প্রায় দোকানেই দিনের পর দিন একই তেল ব্যবহার করা হয় বলে তা পুড়ে যায় এবং এই তেল হৃদরোগ সৃষ্টি করতে পারে সাথে ক্যান্সার সৃষ্টিতেও ভূমিকা রাখতে পারে।

দূষিত পানির ব্যবহার: এসব খাবারের প্রায় দোকানেই নেই খাওয়ার জন্য বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা। এর ফলে এসব দোকানের খাবার তৈরিতে প্রায়ই ব্যবহার করা হয় দূষিত পানি। ফিল্টার করা পানি ব্যবহার করা হয় না বলে পানিতে Escherichia coli ও Proteus basilas জাতীয় জীবাণু থাকে। যা স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি বয়ে আনতে পারে।

একারণে রাস্তার বা ফুটপাতের জুস বা রস খাওয়া থেকেও সচেতন থাকা উচিত। এ ছাড়া যেসব গ্লাস বা পাত্রে এসব জুস বা রস দেওয়া হয় তা ভালভাবে পরিষ্কার করা হয় না। সেক্ষেত্রে গ্লাস বা পাত্রের মাধ্যমেও আপনি আক্রান্ত হতে পারেন বিভিন্ন রোগে।

আসুন সতর্ক হই: উন্নত দেশগুলোতেও স্ট্রিটফুডের অনেক কদর রয়েছে, কিন্তু সেই খাবারগুলো তৈরিতে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ আর স্বাস্থ্যসম্মত উপায় অবলম্বন করাই সেই দেশগুলোর মানুষ বাংলাদেশের মত ঝুঁকি থেকে মুক্ত।

আশা করছি সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যাক্তিগণ এসব নিয়ে ভাববেন ও নীতিমালা প্রয়োগ করে মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমাতে এগিয়ে আসবেন।

পরিশেষে বলবো, সবকিছুর মূলে রয়েছে আপনার সচেতনতা। এর বিকল্প কিছু নেই। ভাল থাকবেন, সুস্থ থাকবেন।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত