ডা. তাইফুর রহমান

ডা. তাইফুর রহমান

কনসালটেন্ট কার্ডিওলজি

জেনারেল হাসপাতাল, কুমিল্লা।


২১ জুলাই, ২০১৮ ০৪:৫০ পিএম

সংসার সমুদ্রে আশার ভেলা

সংসার সমুদ্রে আশার ভেলা

মানুষ বেঁচে থাকে আশা, ভালোবাসা ও অনুপ্রেরণা নিয়ে। যেদিন আশার মৃত্যু হয় সেদিন হারিয়ে ফেলে বেঁচে থাকার সকল অনুপ্রেরণা। বেঁচে থাকার কোন অর্থ খুজে পায় না মানুষ, হারিয়ে যেতে চায় আশাহীন এই ধূসর পৃথিবী থেকে। আর তখনই মানুষ আত্মহত্যা করে।

সব আশা কখনো পূর্ণ হবার নয়। পঙ্গু ছেলেটারও জীবনে আশা জাগে ইস যদি জাতীয় দলের ক্রিকেটার হতে পারতাম! ছেড়া কাথায় শুয়ে কোটি টাকার স্বপ্ন দেখতেতো কোন আপত্তি নেই। কিন্তু সেই আশার স্বপ্নভঙ্গ অবশ্যম্ভাবী।

একটি বাচ্চা জন্ম নিল, দুই হাত নেই। সে বড় হলো। চোখ মেলে দেখল হাজারো পূর্ণাঙ্গ মানুষ হাসছে, খেলছে। তার দু’চোখ বেয়ে অশ্রু নামে, সামনে ধুধু অন্ধকার। রোড এক্সিডেন্টে একজন দু’পা হারালো। ঘুম থেকে জেগে প্রায়ই ভুলে যায়, নামতে যায় ফ্লোরে, হুমড়ি খেয়ে পড়ে। ব্যথায় কুকড়ে উঠে শরীর, মন। বিষণ্নতায় ছেঁয়ে যায় সমস্ত অন্তর। অতীত সুখস্মৃতিগুলো বিষণ্নতার  পালে দোলা দেয়। অবসন্ন মন।

একমাত্র ছোট্ট ছেলে/মেয়েটির মৃত্যুতে বিধ্বস্ত মা বাবা। আর কখনো দেখবোনা তাকে, কোলে তুলবোনা, তার আধো আধো বোলে বলা কথা শোনা হবে না কোনদিন ভাবা যায়!

এই মানুষগুলো কী নিয়ে বেঁচে থাকবে? কোন আশায় তারা বুক বাধবে? কী হবে তাদের বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা?

জন্ম থেকে দু হাতবিহীন সুন্দর ছেলেটি, জীবনে এক লহমার গাফলতে দু'পা হারানো যুবক, ব্রেন স্ট্রোক করে বিছানাবন্দী হয়ে যাওয়া মানুষটার যখন সমস্ত শরীরে পচন ধরে, একমাত্র সন্তানকে হারানো বিধ্বস্ত পিতা, অটিস্টিক সন্তানকে বুকে আকড়ে ধরা বাকরুদ্ধ জননী, কিসের আশায়, কোন স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকবে? কী হবে তার সামনের পথ চলার অনুপ্রেরণা?

এই এক জীবনে তাদের আশা পূর্ণ হবার নয়। তারা অহর্নিশি নিজের নিয়তিকে তিরস্কার করবে, দোষারোপ করবে স্বীয় স্রষ্টাকে। জীবন সংগ্রামের এক দুঃসহ ভার তারা বয়ে চলছে প্রতিনিয়ত।

কিন্তু তারা যদি অনন্ত জীবনের শেষেও কোন ক্ষীণ আলোয় দেখতে পায় তার সুস্থ অবয়ব! কেউ যদি তাকে আশার বাণী শোনায়, সে যদি দিব্যচোখে দেখে সে তার চার হাত পা নিয়ে সুস্থ স্বাভাবিক ভাবে চলছে।

কেউ যদি দেখে তার প্যারালাইজড হাত পা আগের অবস্থায় ফিরে এসেছে, যদি দেখে অকালে চলে যাওয়া ছোট্ট আদরের শিশুটি কোলে এসে ঝাপিয়ে পড়েছে, যদি দেখে পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়া মা-বাবার সাথে বসে আবার গল্পে মেতে উঠেছে, যদি দেখে তার অটিস্টিক সন্তানটি সুস্থ স্বাভাবিক হয়ে হেটে বেড়াচ্ছে পৃথিবীর বুকে, তাহলে অনেক কষ্টই লাগব হয়ে যাবে নিমিষে।

প্রতিটি মূহুর্তের ভারী নিঃশ্বাস আস্তে আস্তে হালকা হয়ে আসবে। চলার পথের দুঃসহ ভার অনেকটাই সহনীয় হয়ে যাবে। ব্যাদান মুখে ফুটবে সুখ স্বপ্নের ঝিলিক। সেটা কি সম্ভব? কতদিন পর? কিভাবে?

একবার ভাবি এই যে অসামর্থ্য, এই যে কষ্টপাথরের আঘাত সবই কী প্রকৃতির নিষ্ঠুর খেলা? নিয়তির হেয়ালি কোন সিদ্ধান্ত? তাহলেতো হেরে গেলাম এই জগৎ সংসারে! অসার শুন্যতা জন্ম-জন্মান্তরে। কারণ খেলারতো কোন প্রতিদান নাই, হেয়ালের নেই কোন ভবিষ্যত পরিকল্পনা! তাহলে?

পৃথিবীর কোনকিছুই হেয়ালের বশে হয় না। খেলার ছলে ঘটে না কোন ঘটনা। এসব কিছুই স্রষ্টার মহাপরিকল্পনার অংশ। যাকে অশেষ দয়ার আধার বলে জানি। যিনি পরম করুনাময় তিনি কিভাবে একটা মানুষকে অটিস্টিক করে বানান! কিভাবে সাজান বদ্ধ উন্মাদ করে, কিভাবে করেন মানুষের হাসির পাত্র করে! তাহলে কী এটা স্রষ্টার খেয়াল? সেটা হবার নয়, কারণ তিনি সকল বিচারকের চাইতে বড় বিচারক।

সৃষ্টিগত কোন ভুলে এমনটা হয়ে গেছে তাও ভাবার সুযোগ নেই। কারণ তিনি সকল বিজ্ঞানীরর চাইতে বড় বিজ্ঞানী। উনার সৃষ্টিতে কোন ভুল নেই। তিনি নিজেই ঘোষণা করেছেন, ‘তুমি রহমানের সৃষ্টির মধ্যে কোন ত্রুটি খুজে পাবে না। বারে বারে তাকাও, তোমার দৃষ্টি ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে ফিরে আসবে, কোন অসামন্জস্যতা খোজে পাবে না।’

তাহলে এই যে বাচ্চাটা যে অটিস্টিক হয়ে জন্ম নিল, এই যে বিকলাঙ্গ শিশুটি পৃথিবীতে মানুষের হাসির পাত্র হলো! এটা কি অসামন্জস্যতা নয়? না। একবার ভাবুন---

নিশ্চয়ই এসব পরম করুণাময়ের মহাপরিকল্পনার কোন অনুসর্গ। যিনি প্রত্যেকটা কষ্টের বিনিময় দিবেন। মুমিনের মশার কামড়ও বৃথা যাবে না। উনি নিজেই ঘোষণা করেছেন, ‘যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু এবং জন্ম একমাত্র দেখার জন্য কাজের দিক দিয়ে কে উত্তম।’ তার মানে পৃথিবী একটি পরীক্ষাকেন্দ্র। যেখানে মৃত্যু নির্দিষ্ট করে মানুষকে জন্ম দেয়া হয়েছে। একেক জনকে একেক মেয়াদের এই পরীক্ষা। আইএসএসবির মতো প্রতিটা সূক্ষাতিসূক্ষ কাজকে মূল্যায়ন করা হবে একদিন। 

কাউকে শক্তিশালী করা হয়েছে সে অহংকার করে কিনা দেখার জন্য। কাউকে সুস্থ সুন্দর করা হয়েছে সে অসুস্থকে দেখে অবজ্ঞা করে কিনা দেখার জন্য। কাউকে অসুস্থ, অটিস্টিক করা হয়েছে তাদের ধৈর্য্য দেখার জন্য। স্রষ্টার আনুগত্য দেখার জন্য। পাশাপাশি সুন্দর আগামীর স্বপ্ন দেখিয়েছেন মহান প্রভু ‘তোমরা দুনিয়ার জীবনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছ অথচ আখিরাত হচ্ছে উত্তম এবং চিরস্থায়ী।’

আমরা জানি, আমরা বিশ্বাস করি মৃত্যু মানে জীবনের শেষ নয়, অনন্ত জীবনের শুরু। সেই অনন্ত জীবনে কেউ পঙ্গু থাকবে না। অটিজমের স্হান নেই সেই জগতে। বৃদ্ধ, বিধ্বস্ত কোন মানুষ থাকবে না সেদিন। সেই জীবনে মৃত্যু নামক কোন সমাপ্তি থাকবে না। সবাইকে একদিন যেতেই হবে সেই পথে, হতে হবে অনন্ত জীবনের যাত্রী।

তাহলে প্রস্তুতি দরকার। সংগ্রহ করতে হবে সেই জীবনের পাথেয়। কোথায় পাব সেখানে ভাল থাকার মূলমন্ত্র? কোথায় সেই গাইডলাইন, কোথায় সেই সিলেবাস? কী করলে ফিরে পাব সুন্দর স্বাভাবিক জীবন? অনিন্দ্য সুন্দর হাসিতে উদ্ভাসিত হবে জন্ম থেকে নিদারুণ কষ্টে থাকা আমার নাড়ি-ছেঁড়া ধন। আমার সন্তান।

চলবে-----

আরও পড়ুন-

►সংসার সমুদ্রে আশার ভেলা: পর্ব-২

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না