ঢাকা      বৃহস্পতিবার ২২, অগাস্ট ২০১৯ - ৭, ভাদ্র, ১৪২৬ - হিজরী

সাহসের সরোবর

একটু একটু করে রাতটা এসেই গেল।
রাত না বলে সন্ধ্যা বললেও অবশ্য খুব একটা ক্ষতি হয় না। যার যা খুশি বলুক সেটা। ওটা নিয়ে খুব একটা মাথাব্যাথা সাঈফের নেই।

গণভবনের পাশ দিয়ে চলা এই রাস্তাটি আসলে সন্ধ্যা নামলেই অন্য রকম হয়ে যায়। সেই রাস্তাটি ধরেই অনেকক্ষন সাঈফ হাঁটছে। আজকে কেন জানি মনে হচ্ছে, খুব ব্যস্ত এ নগরী। আর তার চেয়েও ব্যস্ত ছুটে চলা মানুষগুলো কানের পাশ দিয়ে শাঁ শাঁ করে ছুটে চলা সিএনজি, বাস আর রিকশাগুলোও থেমে নেই। ওরাও পেছন থেকে মাঝে মধ্যে সাইড চাইছে।

ঘোর লাগা চোখ নিয়ে সাঈফ হাঁটছেই শুধু। আর রাস্তায় জ্বলে থাকা বাতিগুলো মনে হচ্ছে নি¯প্রভ। আর ল্যাম্পাপোষ্টের আলোয় নিচে দাড়িয়ে থাকা গাছের পাতাগুলো কেন জানি বেশ হলদে হলদে লাগছে। একটু পরেই যেন ঝরে পড়বে টুপ করে। আর বাতাসে ভেসে ভেসে আরও কিছুটা দূরে গিয়ে হারাবে। এমন হচ্ছে কেন? বুঝতে পারছেনা সাঈফ। 

স্কুল আর কলেজে সব সময় ভালো রেজাল্ট করে আসা নিজেকে বড় অপরাধী লাগছে আজ। মেডিকেলে আসার পরের দিনগুলোর কথা মনে পড়লে ওর হাসি পায় খুব। চান্স পাবার পরে কোচিং এর সেলিব্রেশনে একসেট বই এর সাথে আরও দিয়েছিল একটি স্টেথোস্কোপ।

বাড়িতে এসে র‌্যাপিং পেপারে মোড়ানো গিফটগুলো খুলেই উচ্ছ্বসিত হয়ে গিয়েছিল ও। স্টেথো গলায় ঝুলিয়ে কয়েকবার আয়নার সামনে দিয়ে ঘুরেও এসেছে। “বাহ! বেশ তো ডক্টর ডক্টর লাগছিল নিজেকে। এইতো এমনই হওয়া চাই। ডক্টর হবে এমন স্মার্ট। যুতসই একটি চশমা আর, গলায় ঝুলানো স্টেথো, আর কি চাই!!

তখনকার জন্য এই ভাবনাগুলোই যথেষ্ট ছিল। আজ আর তেমনটা নেই। থার্ড টার্মের রেজাল্ট দিল। এ্যানাটমীতে ফেল, বায়োকেমিস্ট্রি আর ফিজিওলজিতে চঙঈ (চধংং ড়হ ঈড়হংরফবৎধঃরড়হ)। আসলেই বিদঘুটে টাইপের রেজাল্ট হয়ে গেল। এর ওপর নির্ভর করছে প্রফের ক্লিয়ারেন্স। আর তার ওপর প্রফের পাশ ফেল।

ধুর!! জীবনটা কেমন যেন অর্থহীন অর্থহীন লাগছে। বার বার চোখের সামনে ভেসে উঠছে মায়ের মায়া মাখা মুখটা। আর স্বপ্ন সাজাতে থাকা বাবার দীপ্ত মুখচ্ছবি-নিজে নিজেই মাথাকুটে মরবার ইচ্ছাগুলোকে তীব্র করে ফেলে। মা ফোন করলেই একটা কমন প্রশ্ন, “বাবা কেমন আছিস? পরীক্ষা চলছে, তাই না? শরীরের যতœ নিস। আর ওহ! বললি না তো, পরীক্ষা কেমন হল?” যেমনই হোক, উত্তর একটাই- “ভালোই আছি, আম্মু। আর, পরীক্ষা? হ্যাঁ! ভালোই হচ্ছে। দেখা যাক কি হয়?”

আসলে হয় না। পরীক্ষাগুলো ভালো হয় না। মাঝে মাঝে মনে হয়, শুধু শুধু এভাবে মা আর বাবার রক্ত পানি করা টাকাগুলো নষ্ট না করলেও তো হয়। জীবনের তো একটি মানে থাকা দরকার আছে, তাই না? কি জানি কে জানে? সাঈফ প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে ফেরে ঠিকই, কিন্তু বারবার একটি বি¯ৃ—ত শূন্যতা ছাড়া সামনে কিছুই এসে দাঁড়ায় না। 

আনমনে ভাবছিল সাঈফ। হঠাৎ একটি কাঁপাকাঁপা কন্ঠ সাঈফের মনোযোগ কেড়ে নিল। “বাবা, একটু রাস্তা পার করে দেবে? বাবা!” কি যেন মনে করে সাঈফ ফিরে তাকালো। সামনে সাদা ছড়ি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা বৃদ্ধাকে দেখে অন্য রকম এক মায়ায় ভরে উঠল ওর মন। “চাচী কোথায় যাবেন?” “বাবা! কষ্ট করে একটু রাস্তার ওপারে পৌঁছে দেবে আমায়?”

“হ্যাঁ, হ্যাঁ, অবশ্যই! একটু দাঁড়ান। গাড়িগুলো চলে যাক, তারপর আমরা যাই?” “আচ্ছা ঠিক আছে।” বিদ্যুৎ ঝিলিকের মত সাঈফের মনে হল, পৃথিবীতে তার চেয়ে অসহায় মানুষ আসলে অনেক আছে। চাওয়া আর পাওয়ার মাঝে যাদের রয়েছে বিরাট ফারাক। এতোসব অপূর্ণতা নিয়েও মানুষ বাঁচতে চায়। লড়াই করে যায় নিয়তির সাথে।

ওরা আমাদেরই অংশ, আমাদেরই। এতকিছু ভাবতে ভাবতেই সিগন্যাল শেষ হয়ে এলো। “চাচী! আসুন আপনাকে রাস্তা পার করে দিই”। কথাগুলো বলতে বলতে পরম মমতায় সাঈফ বৃদ্ধার হাতটা ধরে হাটতে শুরু করলো খুব সাবধানে। রাস্তাটা পার হয়ে সাঈফ জিজ্ঞাসা করলো, “চাচী, এবার যাবেন কোথায়?”

বৃদ্ধা বললেন, “বাবা! এখান থেকে পাঁচ মিনিট হাঁটলেই আমার থাকার জায়গা। আজ ভিক্ষা করে ফিরে আসতে দেরী হয়ে গিয়েছে, তাই এখনো রাস্তায় রাস্তায় লাঠি ঠুকে চলতে হচ্ছে। আমাদের জীবনতো এমনই, ঘরের চেয়ে রাস্তাতেই কাটে বেশিক্ষন।” সাঈফ বলল, “আমি আপনাকে এগিয়ে দিয়ে আসি?” হঠাৎ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো বৃদ্ধার মুখ। চল বাবা বলেই হাঁটা শুরু করলেন বৃদ্ধা। 

বৃদ্ধার বসবাসের খুপরি ঘরে পৌঁছে দিয়ে সাঈফ যখন একশত টাকার একটা নোট হাতে গুঁজে রেখে চলে আসছিল, তখন বৃদ্ধার চোখ জলে ভরে উঠেছিল। শেষে শুধু দুয়া করলেন আল্লাহর দরবারে, যিনি রাহমানুর রাহীম, তিনি যেন এর উত্তম প্রতিদান দেন। আর এবার ভিজে থাকা হৃদয় নিয়ে সাঈফ হাঁটছিল উল্টোপথে।

নিজেকে আর ততটা বিষন্ন লাগছেনা। বরং কেন জানি ওর মনে হচ্ছে, পৃথিবীটা আসলেই ভীষণ বিস্তৃত, ভীষণ রকম বিশাল। আর কানে বার বার বাজছিল বৃদ্ধার শেষ কথাগুলো। “বাবা, আমারও একটা ছেলে ছিল তোমার মত ফুটফুটে। পাঁচ বছর বয়সে ওর প্যারালাইসিস হয়।

অনেক দিন ভুগে ভুগে শেষে একদিন সব কষ্টকে ফাঁকি দিয়ে সাড়া দিল আল্লাহর ডাকে...। বুকের মানিক হারিয়ে গিয়েছে কতদিন হল। এমন করে তো কেউ আর আমার খোঁজ নেয় না। অনাহারে অনাদরে কাটে দিন। যাক, দুয়া করি অনেক বড় মানুষ হও”। 

সাঈফের চোখও ভিজে ছিল অশ্র“তে। বলতে পারেনি আর কিছুই। শুধু আবারো আসবার কথা দিয়েই চোখ দুটো মুছতে মুছতে বেরিয়ে এসেছে। আর একটু আত্মস্থ হবার পরই মনে  হলো, কষ্টের মুহুর্তে মানুষের পাশে আশার আলো জ্বেলে থাকবার প্রশান্তি; পৃথিবীর অন্য সব কিছুর চাইতে ভীষণ রকম দামী।

হয়তো জগতের সব অর্জন কেড়ে নিয়ে কাউকে রিক্ত করা যায়। কিন্তু কারো জন্যে হৃদয় থেকে উৎসারিত দুআ সত্যিই অনন্য, যা কেড়ে নেয়া যায় না কখনোই। সাঈফের মনে হল, আমি পারবই! কেন পারবো না? আমাকে যে পারতেই হবে। আমার দিকে তাকিয়ে আছে আমার মা, আমার ভাই, আমার বাবা, আমার বোন, আমার দেশ, আমার জাতি। 

সাঈফের মনে হচ্ছে, ওর নিজেরই একটা পৃথিবী আছে। আর সেই পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে অনায়াসে ও ঘুরতে পারে, ফিরতে পারে। হাঁটছে সাঈফ অন্য রকম দীপ্ত পদক্ষেপে, অন্যরকম এক সাহসের ডানা মেলে, অন্য কিছু আবেগের সম্মোহনে। এ পথ যেন মিশে গেছে অন্য কোন মোহনায়, যেখানে স্বপ্নেরা কানাকানি করে ফিরে অবিরাম অনুক্ষণ জুড়ে, যেখানে উঁকি দেয় বেঁচে থাকার ইচ্ছেরা। 
 

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

ভিআইপি রোগী

ভিআইপি রোগী

এমবিবিএস পাস করে কেবল ১৯৮৫ সনের নভেম্বর মাসে ইন-সার্ভিস ট্রেইনিং শুরু করেছি।…

স্বাস্থ্যখাতে নৈরাজ্য সৃষ্টির পাঁয়তারা ‘অশনিসংকেত’

স্বাস্থ্যখাতে নৈরাজ্য সৃষ্টির পাঁয়তারা ‘অশনিসংকেত’

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সৈন্যের সংখ্যা বিশ্বে তৃতীয়! অথচ জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ কোনো…

গর্ভবতী মায়ের সন্তানের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কতটুকু, করণীয় কী?

গর্ভবতী মায়ের সন্তানের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কতটুকু, করণীয় কী?

ডেঙ্গু বিষয়ক নানা প্রশ্নের একটি হচ্ছে, গর্ভবতী মায়ের ডেঙ্গু হলে সন্তানেরও তা…























জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর