ঢাকা শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ২ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ৩৮ মিনিট আগে
ডা. মুহাম্মাদ সাঈদ এনাম ওয়ালিদ

ডা. মুহাম্মাদ সাঈদ এনাম ওয়ালিদ

চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট, জনস্বাস্থ্য গবেষক।


২১ জুলাই, ২০১৮ ১২:৪০

ভন্ড বাবার লালাপড়া

ভন্ড বাবার লালাপড়া

ছোট ছিমছাম গড়নের একটা মেয়ে বার বার চেম্বারের পর্দা উল্টিয়ে আমার দিকে তাকাচ্ছিলো আর ফিসফিস করে এসিস্ট্যান্ট এর কাছে জানতে চাইছিলো তার সিরিয়াল আসছে কিনা? কেমন দেরী,আর ক'টা রোগী? 

অযথা তাড়াহুড়া পায়াচারী করা মেয়েটি হয়তো জেনারেল এনজাইটির পেসেন্ট।  চেম্বারে এসে যে সমস্ত রোগী খুব তাড়াহুড়া করেন তাদের বেশির ভাগই দেখা যায় তারা তাদের রোগ নিয়ে সামান্য এনজাইটিতে ভুগছেন। তাই তারা চেম্বারে এসে আর স্থীর থাকতে পারেন না। পায়াচারী করেন। উঠবস করেন। এতো দেরী, এতো দেরী, ডাক্তার সাহেব কই, ইত্যাদি বলে বলে অস্থির করে তোলেন সবাইকে। 

যাক একসময় মেয়েটির সিরিয়াল আসলো। মাসহ বসলো আমার সামনে। 

ছিপছাপ গড়নের চপল চঞ্চল ফর্সা মেয়ে। বয়সের তুলনায় শরীর বাড়ন্ত। এ বয়সী ছেলে মেয়েরা অনেকটা লাউ গাছের ডগার মতো অনেকটা অজান্তেই হুট লম্বা হয়ে যায়। তার দিকে তাকিয়ে বললাম,'কি ব্যাপার! এতো তাড়াহুড়ো কিসের?'

সাইকিয়াট্রিস্টকে রোগীর "মুড এন্ড এফেক্ট" বুঝতে তাদের ফেইস রিড করতে হয়।কপালে ভাজ, চোখের দৃষ্টি, চোখের পাতার কাঁপন, ঠোটের কাঁপুন, চিউইং, গ্রাইমেসিং এসব। একেকটার একেক মিনিং হয়।

চেম্বারে বসেই কিছু স্কিজোফ্রেনিয়ার রোগী বার বার ঠোট নাড়াতে থাকেন, যেনো মনে হয় তার দাঁতের কোনে কিছু একটা লেগে আছে, ওটা তিনি বের করার চেষ্টা করছেন, কিন্তু পারছেনা। একে গ্রাইমেসিং বলে। গ্রাইমেসিং দেখলে বুঝা যায় তিনি স্কিজোফ্রেনিয়ার রোগী। 

কেবল সাইকিয়াট্রিস্ট নয় সকল চিকিৎসকদের রোগী পরীক্ষা শুরুর প্রথম ধাপ হচ্ছে প্রথমে এক নজর তাকিয়ে রোগীটাকে দেখে নেওয়া। এক্সামিনেশন এর এ পর্যায়কে বলে ইন্সপেকশন। 

চিকিৎসা বিদ্যার ছাত্রদের ক্লিনিক্যাল এক্সামগুলোর একটা বোর্ডে ভাইভা শুরুই হয় ইন্সপেকশন দিয়ে। স্যার এসেই বলেন, 'ইন্সপেক্ট ইয়োর পেশেন্ট এন্ড এক্সপ্লেইন'। পারলে স্যার আগাতে থাকে প্রশ্ম করেন। না পারলে ওখানেই ফেইল।

ইন্সপেকশন, পালপেসন, পারকাসন, এন্ড আসকালটেসন।  চেম্বারে হাসপাতালে রোগী পরীক্ষা করার ক্রম ধাপ। রোল অব থাম্ব। এটা চিকিৎসককে করতেই হয়। সেই অভ্যাস ছাত্রদেরকে আজীবন গেঁথে দিতেই পরীক্ষার হলে প্রতিটি পরিক্ষার্থীদের সকল পরীক্ষায় পাশ করার জন্যে। এই ধাপগুলো ফলো করে করে এগুতে হয়। পরীক্ষক ও চিলের চোখ নিয়ে তাকিয়ে থাকেন এটি ফলো করা হচ্ছে কিনা! 

পরীক্ষার আগে প্রফেসর, সি এ বা রেজিস্ট্রার দিয়ে সারা হাসপাতাল ঘুরে ঘুরে বাছাই করে যে কোন বেড থেকে আচমকা এক রোগী কে সিলেক্ট করে পরীক্ষার্থী বা পরীক্ষার্থিনী'র সামনে এনে হাজির করেন। সেটা আবার নিজের মেডিকেলের রোগী হতে পারে অথবা হতে পারে চেম্বারের কোন রোগী।  হয়ত স্যার আগে রাতেই পেশেন্টেকে ম্যানেজ করে রাখেন। পরীক্ষা শুরুর জাস্ট আগে আগে ভর্তি করে বোর্ডে নিয়ে আসেন। 

সবই স্যারদের প্ল্যান। অজানা অচেনা রোগীকে সামনে বসিয়ে পরীক্ষার্থী বা পরীক্ষার্থিনী কে 'শুরু করো',  বলে মিনিট পাঁচেক সময় দিবেন। তারপর সকল এক্সামিনার এক যোগে ছাত্রকে নিয়ে শুরু করবেন প্রশ্নের খেলা। প্রশ্নের পর প্রশ্ন। যতক্ষন না ছাত্রটি আটকেছে, চলতেই থাকবে। এরইমধ্যে আমল নামায় লেখা হয়ে যায় 'প' আকার পাশ নাকি আ-বা-র। 

যাদের প্রস্তুতি ভালো, হাসপাতালের সকল ওয়ার্ড চষে বেড়িয়ে রোগী দেখে, তারা ধুমধাম চার ছক্কা পিটিয়ে খেলায় জিতে চলে যায়। আর যাদের প্রস্তুতি "নট আপ টু দা মার্ক", স্যার রা হাসি মুখে ভাইভা বোর্ডেই তাদের কিছুটা পড়িয়ে দেন। 

ভাইভাতে ধমক খেলে বুঝতে হবে পাশ, আর হাসি মুখে বাপজান টাপজান বলে আদর সোহাগ করে টেবিলে রাখা বিস্কুট, পানি, চানাচুর ইত্যাদি অফার করে খাইয়ে দিলে বুঝে নিতে হবে, নট আপটু দা মার্ক। আমল খারাপ। তাদের কপালে, "ধন্যবাদ দেখা হবে বিজয়ে, তবে পরের বার"। 

যাই হোক বলতে চাচ্ছিলাম ইন্সপেকশন এর কথা। কখনো কখনো ভালো ইন্সপেকশনেই রোগীর ডায়াগনোসিস এ পৌছা যায়। 

সাইকিয়াট্রিতে ফেসিয়াল এক্সপ্রেশন ইন্সপেকশন খুবই গুরুত্বপুর্ন। ফেইসে "মুড এন্ড এফেক্ট" দেখতে হয়।  অনেক রোগ আছে যা চেহারায় ছাপ ফেলে। চেহারাতে অনেক রোগের লক্ষন গুলো সুন্দর ফুটে উঠে।বিশেষ করে ব্রেইন বা মানসিক রোগগুলোতে আছেই।

এই যেমন, একজন ম্যানিক মহিলা রোগীর দিকে তাকালে দেখা যাবে তিনি কটকটে কড়া লাল, নিল কিংবা হলুদ লিপস্টিক লাগিয়েছেন, সেই সাথে থাকবে তার কুচকুচে কালো বা কড়া লালের ম্যাচিং ওর নন ম্যাচিং বেশভূষা মেকাপ, গেট আপ। বাহারি রং চং এর গহনাও থাকবে সাথে।কথাবার্তা হবে অনেক অনেক বেশি। গোছালো কিংবা অগোছালো, চিন্তা চেতনায় হাইপার।

আবার ডিপ্রেশন এর পেশেন্ট এর থাকবে পুরো উলটো। এদের চেহারাটা থাকবে মলীন। কপালে থাকবে ভাঁজ। কথাবার্তায় একেবারে ঠান্ডা। যেনো ইহ জনমে তার কেউ নেই, তার জীবনটা একেবারেই সাদাকালো পানসে। সুইসাইড করলেই শান্তি।

আবার একজন পারকিনসন্স রোগীর ফেইস ধরা যাক। উনাকে দেখলে বুঝা যাবে না যে, উনি ঠিক কি বলতে চাচ্ছেন বা বুঝাতে চাচ্ছেন।  সেটাকে মেডিকেলের ভাষায় বলে 'এক্সপ্রেশন লেস ফেইস'। মানে এক্সপ্রেশনটি কি, তা ঠিক বুঝা যাচ্ছেনা।

ভালো মানের একজন বিশেষজ্ঞ আপনার ফেইস এক্সপ্রেশন দেখে অনেক কিছুই বলে দিতে পারেন। তবে সেটা 'বাবার দরবারে শেষ দর্শন' বা রাস্তায় কঞ্চিতে চড়াটিয়া পাখির' 'ঠোটের বয়ানের' মতো মত হাবিজাবি ফালতু না, বিজ্ঞান সম্মত যা চিকিৎসা বিদ্যার বইয়ের পাতায় খুব সুন্দর করে লিখা।

সেই লেখাগুলো বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ বিস্তর পরীক্ষানিরীক্ষা ও গবেষণালব্দ জ্ঞান থেকে নেয়া।

ছিপছিপে হালকা গড়নের লাউ ডগার মতো বাড়ন্ত শারীরিক গঠনের ছোট্ট মেয়েটির মুখাবয়ব বড় যে গলতি ধরা পড়লো সেটা হলো তার কপালে একটি চিকন পোড়া দাগ। সদ্য পোড়া। কালো পোড়া রক্তের চটা লেপ্টে আছে এখনো।

জিজ্ঞেস করলাম, কি ব্যাপার, পোড়া দাগ কিসের?

'গরম সুই দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে পীর বাবায়'! জবাব দিলো সে।

'মানে?'

'স্যার আমি বলছি' বলেই মেয়ের মা বলতে লাগলেন,

'গেলো বছর তিনেক থেকেই আলগা এক রোগে পেয়েছে মেয়েটিকে। কোন কিছুতে একটু উনিশ বিশ হলেই সে অজ্ঞান হয়ে যায়। তার শ্বাস কষ্ট হয়। দম আটকে যায়। হাতে পায়ে খিঁচুনি হতে থাকে অবিরত। বুকে বান বান লাগে।

বিড় বিড় করে কথা বলতে থাকে। এনিয়ে ক'বছর থেকে বার বার হাসপাতালে ভর্তি হই। প্রতিবার স্যালাইন ইঞ্জেকশন আর অক্সিজেন দেয়া হয়। ভালো হয়ে যায়'।

'আবার কদিন যেতে না যেতে সেই আগের মতো। আজ সকালে ও তাই হয়েছে। বিরক্ত হয়ে আজ আর হাসপাতালে যাইনি। গিয়েছিলাম এক পীরের কাছে'

'শুনলাম আমাদের শঙ্খঘর গ্রামে এক পীর আছেন, তিনি নাকি "উপরী" তাড়ান। তার কাছেই গিয়েছিলাম। দুটা জালালী কবুতর, তিনটে কালো মুরগী, একটি কাক, এক কেজি পোলাউ এর চাল আর এক দানা মশুরির ডাল নিয়ে'। জালালি কৈতর খুব দাম। দুই হাজার টাকা জোড়া।

'আজব, এত্তো জিনিস সাথে এক দানা মসুরি ডাল', একদানা ডালে কি হবে? উনি কি ডাল চিবিয়ে খাইয়ে দেন'?

'জ্বী এগুলো বাবার উপরি তাড়ানোর হাদিয়া'

'তা না হয় বুঝলাম, এগুলো বাংলাদেশের গ্রামে গঞ্জের কিছু টাউট বাটপার আর তাদের সাথে থাকা রুই কাতলা টাইপের কিছু সাংগ পাংগদের নাটক আর প্রতারণা, কিন্তু কপালে পোড়া দাগ কিসের?'

'জ্বি বলছি, বাবায় একটা সুই দিলেন। পানি পড়া দিলেন। আর তার মুখের লালা পড়া দিলেন'

'লালা পড়া?'

"হ্যা। লালা পড়া। 'উপরি বাতাস' কাটার মন্ত্র জপে তার মুখের লালা মেয়েটির সারা গায়ে নিজ হাতে মেখে দিলেন। তার পর বললেন, যাহ বাড়ি যা। উপরি আর লাগবেনা, লালা পড়া দিলাম তোকে। আমি আবার যাকে তাকে লালা পড়া দেইনা। তোর গায়ে সন্ধ্যা বেলার ত্রীমুখি রাস্তার "উপরি" লাগছিলো। তার ঘ্রাণ পাইছি, তাই লালা পড়া দিলাম। উপরি এখন ভাগছে আর আসবেনা। যাহ বাড়ি যাহ।

এরপর আমাকে বললেন, 'খবরদার ভর দুপুর, সন্ধ্যা আর আমাবস্যায় এই জোয়ান মেয়েডা যেনো আর ত্রী-মুখিতে রাস্তায় না যায়।যাইলে কিন্তু বড় ক্ষতি হইয়া যাইবো। আবার উপরি লাগবো। পুরুষ উপরি। উপরি'র মধ্যে কিন্ত দুই জাত। মেয়ে উপরি আর পুরুষ উপরি'।

'ত্রীমুখি রাস্তার উপরিগুলা আবার 'বজ্জাৎ উপরি"। সেই গুলানরে তাড়াতে খুব কষ্ট। বুঝছস। লাগলে খবর আছে। আমাবস্যা তে একলা ঘরে সারা রাইত ধইরা মন্ত্র জপতে অইবো আর লালা পড়া দিতে অইবো", এক নি:শ্বাসে মেয়েটির মা 'বাবার' বলা কথাগুলো বললেন। তার বলার ভঙ্গীতে বুঝলাম তিনি উপরিতে খুব বিশ্বাস করেন।

আচ্ছা তার পর কি হলো?

'তারপর পিরের কাছ থেকে এক হাজার টাকা হাদিয়া দিয়া একটা সুই নিয়া বাসায় আসি।বাসায় আসার পর মেয়েটি আবার অজ্ঞান হয়। তখন মনে পড়ে, পীর বাবায় কইছিলো, 'বড় উপরি পলাইয়া গেছেগা তয় তার ছাওয়াল পাওয়ালগুলা একটু আধটু লাইগা থাকতে পারে। ডিস্টার্ব করবো। যাইবো'গা কদিন পর।
 
আর বেশি ডিস্টার্ব করলে তোরা এই সুইডারে গরম কইরা টকটকে লাল কইরা তারপর দিবি কপালের চামড়ায় ভিতর ঢুকিয়ে"।

বাড়িতে ফিরার পর মেয়েটি আবার অজ্ঞান হলে 'বাবার' কথা মতো আমরা প্রথমে ওর হাত পা বেঁধে নেই এবং সুইটা আগুনে পুড়িয়ে লাল করে নিয়ে 'সুই-পোড়া' দেই', এই দাগটা স্যার সেই সুই দিয়ে পোড়ার।

এবার মেয়েটি ক্ষেপে গিয়ে মুখ খুললো, 
'দেখছেন, দেখছেন পাগলদের কান্ড। আমারে কি করছে এরা সবাই মিলে।আমার কপালটা পুড়িয়ে দিছে। আমার নাকি উপরি বাতাস লাগছে। ওরা আমাকে বেঁধে গরম সুই দিয়ে কপাল জ্বালিয়ে দিসে। আর এটা করছে আমার দুলাভাই আর মা'য় মিলে'। স্যার দেখেন দেখেন বলে, মেয়েটি তার দগদগে পোড়া দাগটি আবার দেখালো।

সত্যি, বিভৎস। সাদা কপাল একেবারে পুড়িয়ে দিয়েছে তারা উপরি তাড়ানোর নামে ভন্ড বাবা কথামত। আমাদের দেশের গ্রামে গঞ্জে এখনো মানসিক রোগীদের রোগ তাড়াতে এসব গাঁজাখুরি চিকিৎসা পদ্ধতি দেখা যায়। সমাজের এক শ্রেণীর টাউট বাটপার এতে জড়িত থাকে। এদের আবার উপর মহলে থাকে অদৃশ্য যোগাযোগ। সবাই এসব হাদিয়ার ভাগবাটোয়ারা পায়,মজাও লুটে এসব থেকে।

'বলো কি হয়েছে তারপর',।

সে আবার শুরু করলো, 'স্যার এরা উপরি বিশ্বাস করে। আর ঐ যে ভন্ড পীরবাবা, ঐটা তো একটা শয়তান। পীরবাবা টিরবাবা না। সারা গায়ে দুর্ঘন্ধ, ময়লা। লম্বা লম্বা নোখ, আর পুরা ন্যংটা। এই শয়তান আর তার সাংগো পাংগো'রা আমার সারা গায়ে লালা মাখায়ে দিছে, ওয়াক থু। আল্লাহ গো আমারে বাঁচাও। আমারে নাপাক করে দিসে বদমাশটা। আর সব করছে মা আর দুলাভাই।

মা এবার মেয়েটির মুখ চেপে ধরে। 'খবরদার তুই বাবার রে গালি দিস কেনো? গুনাহ হবে। মেয়েটি কে থামাতে চান তিনি।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, তোমার বাবা কই?

'স্যার বাবা বিদেশে। বাবা থাকলে কি এই পাগলা বাবার পাগলা মুরীদগুলা আমারে এই সর্বনাশ করতে পারতো, আব্বু সব বদমাশগুলারে ধইরা পানিতে চুবাইতো'

তোমার ভাই চাচা বা মামা কেউ নেই? মানে পুরুষ অভিভাবক।

"জ্বী স্যার, সবাই আছেন, কিন্তু মা উনাদের না জানায়া দুলাভাই এর সাথে শলা পরামর্শ কইরা লুকাইয়া আমারে নিছে ভন্ড বাবার কাছে, মেয়েটি আর কিছু বললো না। তার চোখ দুটো ছল ছল করে উঠলো।

তার মাকে জিগ্যেস করলাম, ওই ভন্ডটার সন্ধান কিভাবে পেলেন আপনারা?

'স্যার উনি ভন্ড না। উনার অনেক কেরামতি আছে। উনি আমাদের গায়ের অনেক নিঃসন্তান মাইয়ার কোললে সন্তান দিসে কেরামতি কইরা। আমার বড় মেয়ের জামাই ওই 'বাবার' মুরীদ। সেই বলছে সব। বাবায় নাকি সুই পুড়া দেন গত দশ বছর। তাছাড়া জামাইয়ের একটা আংটি পাথরের দোকান আছে শহরে। পীর বাবায় আংটি পরার হুকুম দিলে সবাই জামাইর দোকান থেকে কিনে। কিছু কিছু আংটির দাম লাখ লাখ টাকা'

'তা আমার কাছে এখন আসছেন কেনো? '

'স্যার সুই পোড়া দেবার পর তার কপাল থেকে রক্ত পড়তে থাকে চুইয়া চুইয়া। কালো কাল রক্ত। রক্ত পড়া বন্ধ না হওয়ায় হাসপাতালে যাই। ঐখানের বড় ডাক্তার এসব দেখে শুনে আমাদের খুব গালি গালাজ করে। বলে তোমাদের পুলিশে দেয়া উচিৎ। পরে বলেন, 'মানসিক ডাক্তার এর কাছে জলদি যান। মেয়েটিকে মেরে ফেলবেন তো আপনারা এই সব ছাইপাস ভন্ড পীর ফকির দিয়ে চিকিৎসা দিয়ে'। তাই আসলাম..'

ছোট্ট মেয়েটি আর কোন কথা বলছিলো না। তার গাল বেয়ে অস্রু পড়ছিলো। বোবা কান্নায় টোটটা কাঁপছিল। বুঝা যাচ্ছে সে খুব দুঃখ পেয়েছে,। অপমানিত ও লাঞ্ছিত হয়েছে এসবে।

তুমি কি সত্যি অজ্ঞান হয়ে যাও ? হাত পা ছুড়াছুঁড়ি করো? জিগ্যেস করলাম।

'জ্বি স্যার', সে মাথা নাড়ে।

অজ্ঞান হবার আগে তুমি কি বুঝতে পারো যে তুমি অজ্ঞান হতে যাচ্ছো?

না স্যার, বুঝি না।

আমরা বুঝি স্যার, পাশে বসা মা বললেন।

'আপনি কিভাবে বুঝেন?' জিগ্যেস করলাম

'এইতো স্যার, কোন ব্যাপার নিয়ে ধমকালে, শাসন করলেই তার খিচুনি শুরু হয়, লম্বা লম্বা করে দম নিতে থাকে, পরে কিছুক্ষণ দম বন্ধ হয়ে থাকে। হাত পা ছুড়তে ছুড়তে এক সময় অজ্ঞান হয়ে নিস্তেজ হয়ে যায়। ঘন্টার পর ঘন্টা যায় আর জ্ঞ্যান আসেনা।

ওহ তাই?

অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়ে ব্যাথা পেয়েছে, বা জিহবা কেটেছে কখনো?

'না না স্যার এইতো বিছানায় পড়ে যায়। আমরা ধরাধরি করে শুইয়ে দেই'

'আচ্ছা অজ্ঞান হলে তুমি কিছু বুঝ, এই যেমন আশেপাশে কি হচ্ছে, কি করছে?' মেয়েকে বললাম।

'জ্বি স্যার সব বুঝি?'

তাই..?

আমি মেয়েটির মাকে বাইরে অপেক্ষা করতে বললাম। তিনি ইতস্তত করে গেলেন।

"শোন,আমার মনে হচ্ছে তোমার সমস্যা অন্য কিছুতে। তোমার সমস্যাটা মানসিক। সম্ভবত তোমার মনের কোনে কোথাও কোন কষ্ট বা ব্যাথা লুকিয়ে আছে যা তুমি সহ্য করতে পারছোনা। আবার কাউকে বলতেও পারছো না। এসব কস্ট, সমস্যা তুমি নিতে পারছোনা। যাক, তুমি কিসে পড়ো?

স্যার সেভেনে?

পড়াশুনা ভালো লাগে?

জ্বী?

'শিক্ষকদের কেউ কি আছেন খুব শাসন করেন বা আদর করেন'

'না স্যার'

'ভাই, বোন কেউ আছেন অত্যাধিক শাসন করেন বা আদর করেন?'

'না'। সে মাথা নেড়ে বলে।

মেয়েটির মা হুট করে আবার ঢুকে পড়লেন।
আমি তাকে বললাম, "প্লীজ বাইরে বসুন, আমি ওর সাথে কথা বলতে চাই একাকী,পরে আপনার সাথেও বলবো।

মা বললেন, 'স্যার আমি জানি আপনি কি বলবেন। আমি থাকি, অসুবিধা নাই।

'না। আপনি একটু বাইরে বসুন।

"যাও মা, তুমি বাইরে যাও,তুমিই সব কিছুর মুলে। মেয়ে এবার একটু শক্ত করেই বললো মাকে।

আমি চেম্বার এসিস্ট সিস্টারকে একটু দূরে বসতে বললাম। যাতে মেয়েটি মন খুলে বলতে পারে।

'বলো, কি সমস্যা তোমার?'

'স্যার তেমন কোন সমস্যা নাই। তবে ছোট একটা আছে'

'নাম কি তোমার?'

'পপি'

'পপি তুমি কাউকে ভালোবাসো?'

সে উত্তর দেয়না। মাথা নীচু করে বসে রয়। অনেক সময় নিরুত্তরই উত্তর বহন করে।

'কাকে ভালোবাসো?' আমি সরাসরি বললাম।

'ন্যা স্যার কাউকে না'

'আড়াল করোনা। তোমার মতো ৮/১০ জন রোগী প্রতিদিন আমাদের দেখতে হয়। বলো। আমি সাহায্য করবো তোমাকে। কেউ কিছু জানবেনা'।

মেয়েটি একটু চুপ থেকে বললো,

'হ্যা ভালোবাসি'

'কাকে?'

'একজন কে'

'কে সেই একজন?'

'দুঃসম্পর্কিত আত্মীয়'

'কতদিন থেকে?'

'তিন বছর যাবৎ'

'এতো অল্প বয়সে ভাল বাসাবাসি? সত্যি?'

'স্যার কাউকে বলবেন নাতো?'

'না, বললাম তো বলবোনা। তুমি নিশ্চিন্ত থাকো। কেউ কিছু জানবেনা'

'জ্বি স্যার আমি একজনকে ভালোবাসি। খুব ভালোবাসি। তাকে ছাড়া আমি বাঁচবোনা, আত্মীয় বলেছিলাম, আসলে আত্মীয় না'

'তাই?'

'জ্বী'

'কিন্তু তোমার যে বয়স, তাও আবার তিন বছর যাবৎ।
এতো অল্পো বয়সে কি করে ছেলেটা?'

'ছেলে না। উনার বয়স আছে। বাজারে উনার মোবাইলের দোকান আছে, ব্যবসা আছে।

'কিভাবে পরিচয়?'

'উনার মোবাইলে আব্বু বিদেশ থেকে টাকা পাঠান নিয়মিত।উনি দিয়ে যান। তাছাড়া উনি আমাদের পরিবারের সদস্যের মতো। সবসময় আমাদের বাসায় আসেন, থাকেনও। খুব ভালো মানুষ। আমাদের বাজার সদাই সব উনি করে দেন।

'তোমার মা এসব ভালোবাসা জানেন?'

'না'

'কেমন গভীর তোমার ভালোবাসা?'

সে উত্তর দেয়না

লোকটির বয়স কতো?

এই তিরিশ, বত্রিশ।

কিন্তু তোমার তো বয়স খুবই কম।এতো সম্ভব না। তোমার পড়াশুনাও বাকি। তোমার একটা ভবিষ্যত ও আছে।

'জ্বি স্যার। এগুলো ভাবলেই আমার মাথা ঝিন ঝিন করে। আমি যে কি করবো বুঝতে পারিনা। তখন অজ্ঞান হয়ে যাই'

'তুমি এই কথাগুলো কাউকে বলেছো?'

'না স্যার। মাকে বলতে চেয়েছি। কিন্তু লজ্জায় বলিনি। এই প্রথম আপনাকে বললাম। আপনি মাকে বইলেন না এসব', সে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো।

'না না আমি বলবো না'

'ভয়ের কিছু নেই। অল্প বয়সে টুকটাক এসব ভুল কেউ কেউ করে বসে। দোষ আসলে আমাদের অভিভাবকদের। আমাদের সচেতন থাকা দরকার এসবে। অনেকেতো অজান্তে কাজী অফিস বা কোর্ট পর্যন্ত চলে যায়। তুমিতো এসব কিছুই করোনি। কিন্তু তোমার এসবের সময় এখন না। তোমারতো এখন পড়ালেখার সময়, তাইনা?'

'জ্বী স্যার' সে মাথা নাড়ায়।

'শোন তুমি তোমার মাকে খুলে বলো সব। হাজার হোক তিনি তোমার মা। তিনি হয়তো প্রথমে একটু রাগ করবেন। কিন্তু এই ঝামেলা থেকে তিনি বেরিয়ে আসতে সাহায্য করবেন । আমি কি তোমার মাকে একটু ঈংগিত দিবো?

'না স্যার। আপনি যখন বলছেন, আমি মাকে সব বলবো। আসলে আমি অনেকদিন থেকে বলতে চাচ্ছি। কিন্তু লজ্জা আর ভয়ে বলছিনা মাকে। তবে মা'র ও একটু সমস্যা আছে উনাকে নিয়ে।

কি সমস্যা..?

'পরে একদিন বলবো স্যার'

'আচ্ছা স্যার কেউ কেউ বলে আমার নাকি হিস্টিরিয়া বা মৃগী রোগ হয়েছে। আবার বলে উপরি রোগ। আসলে কি তাই? উপরি টুপরি বলেতো কোন রোগ নেই। আর এসব বাবারা তো ভন্ড,শয়তান।

'হ্যা,পপি এসব জানি। আসলে আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে। কুসংস্কার এখনো আমাদের চারপাশে লেগে আছে। তুমিতো ভিকটিম, এসব ভালো বুঝতেছো। আর সাধারণ মানুষ ধর্ম বিজ্ঞান জানেনা বলেই এসব বিশ্বাস করে, এবং ঠকে।

'তাহলে স্যার, আমার কেনো এমন হয় মাঝে মধ্যে?'

'তুমি তোমার সমস্যা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দে আছো। কি করবে, বা না করবে এসব বুঝে উঠতে পারছোনা। এ রোগ টির নাম কনভার্সন ডিসঅর্ডার। তোমার অসম ভালোবাসা, তোমার মা'কে নিয়ে সমস্যা, পারিপার্শ্বিক জঠিলতা, এসব তোমার মনের মধ্যে একটি দন্দ তৈরি করেছে যা থেকে তুমি বেরুতে পারছোনা'।

'এসব তুমি কাউকে বলতে পারছো না, আবার এর থেকে বেরুতেও পারছোনা। ভালো মন্দ, নিশ্চিত অনিশ্চিত এর সাথে সারাক্ষণ তোমার মন ঝগড়া করছে'

'আর এই সমস্যাগুলো যখন প্রকট হয় তখন তার লক্ষণ তোমার দৈহিকভাবে প্রকাশিত হয়। এটাই "কনভার্সন ডিসওর্ডার"। আর যতদিন তোমার এসব সমস্যা তুমি কাউকে শেয়ার করছোনা, কাউকে বলছোনা, বা সঠিক পথের সন্ধান পাচ্ছোনা, ততদিন তোমার এসব সিমটম থাকবে।

'স্যার তাহলে আমি কি ভালো হবোনা?'

'অবশ্যই ভালো হবে, তুমি তোমার সমস্যা অনেকদিন পর খুলে বলতে পেরেছো, এটা নিয়ে ডিসকাস করেছো, এখন তুমি ধীরে ধীরে তা থেকে বেরুতে পারবে। এটাই হলো এই রোগ এর চিকিৎসা। জাস্ট একটু শেয়ার করে নেয়া। বাকি হলো চেষ্টা মনোবল'।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত