ডা. ফাহমিদা শিরীন নীলা

ডা. ফাহমিদা শিরীন নীলা

এমবিবিএস, এফসিপিএস (গাইনী)

ফিগো ফেলো (ইতালি)

গাইনী কনসালট্যান্ট, বগুড়া।


১৯ জুলাই, ২০১৮ ১০:২৩ পিএম

মোবাইলে চিকিৎসার বিরুদ্ধে প্রয়োজন আইন

মোবাইলে চিকিৎসার বিরুদ্ধে প্রয়োজন আইন

শুরু করি একটা গল্প দিয়ে। বান্ধবীর বাসায় বেড়াতে গেছি। বান্ধবীর স্বামী এডমিনিস্ট্রেশনের উঁচু পদে অধিষ্ঠিত। কথায় কথায় তিনি বললেন, ‘আপনাদের তো বেতন তুলতে হয় না। সব টাকা ব্যাংকেই জমা থাকে।’ একথা বলতে বলতেই উনি উত্তেজিত হয়ে গেলেন। এরপর বলা শুরু করলেন, ‘আপনারা এত খারাপ, রোগীকে মোবাইল নাম্বার দিতে চান না। অমুক ডাক্তারের কাছে মোবাইল নাম্বার চাইলাম, তবু উনি এভয়েড করলেন।’

‘মোবাইল নাম্বার দেয়াটা তো বাধ্যতামূলক না ভাই।’

‘আপনি জানেন, আমার ভাস্তে চিটাগাং থাকে, প্রতিটা প্রেসক্রিপশনে নিজের মোবাইল নাম্বার লিখে দেয়।’

যেহেতু উনি একজনের উদাহরণ দিচ্ছেন, সেখানে আর বলার কিছু থাকে না। তাছাড়া সরকারের একজন উচ্চপদস্থ দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হয়েও যিনি মানুষের প্রাইভেসি বিষয়টা বোঝেন না, তাকে বোঝানো অসম্ভব বিধায় উনার কাছ থেকে সরে আসলাম নিজের সম্মান নিয়ে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মোবাইলে চিকিৎসা দেয়াটা কতটা যুক্তিপূর্ণ। কিছুদিন আগে ডাক্তার-রোগী সম্পর্কিত একটা ফিচারে লিখেছিলাম, প্রযুক্তির উৎকর্ষতা আক্ষরিক অর্থে যে গোষ্ঠীর উপরে সর্বপ্রথম আঘাত হেনেছে সেটা হল ডাক্তার সমাজ। কেন? কিছু উদাহরণ সেদিনও দিয়েছিলাম। আজও দিচ্ছি।

১) মাঝরাতে রোগী ফোন করে ঘুম ভাঙালো, কেন জানেন? তাকে একটা ভ্যাজাইনাল সাপুজিটোরি ব্যবহার করতে দিয়েছিলাম বেশ কিছুদিন পূর্বে। উনি সময়মত সেটা ব্যবহার করেননি বিধায় ব্যবহারবিধি ভুলে গেছেন। এখন মাঝরাতে ঘুমানোর আগে ব্যবহারবিধি শুনে সেটা ব্যবহার করে আমার চিকিৎসার সদ্ব্যবহার করবেন।

২) ভোর ছয় টায় ফোন করে এক ডায়াবেটিক রোগী ঘুম ভাঙালেন, ওনার একটা মিষ্টি খেতে ইচ্ছে করছে, খেতে পারবেন কিনা জিজ্ঞেস করে তাকে দেয়া আমার মিষ্টি না খাওয়ার সুপরামর্শের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করলেন।

৩) ভরদুপুরে বাজারে প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করছি, রোগী ফোন করে জানতে চাইলেন, কাঁচাপেঁপে খেতে নিষেধ করেছি, এখন সেটা রান্না করে বা পাকিয়ে খাওয়া যাবে কি? আমার ব্যস্ততা তার কাছে এড়িয়ে যাওয়ার বাহানা মনে হল বিধায় তিনি আর আমার দরবারে আসবেন না বলে সাফ জানিয়ে দিলেন কড়াকথায়।

৪) প্রচন্ড রোগীর ভীড়ে এক রোগী ফোন করে জানালেন, আমার দেয়া পরীক্ষা করিয়ে তিনি অন্য আরো বড় ডাক্তার দেখিয়েছেন, তিনি ইনজেকশন লিখে দিয়েছেন। উক্ত ডাক্তার ব্যস্ত ছিলেন বলে ইনজেকশন সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিতে পারেননি। এখন তার আবদার, আমি যেন সেটি সম্পর্কে তার সাথে বিষদ আলোচনা করি। আমি ব্যস্ত শুনে বিরক্ত হয়ে যা বললেন তার অর্থ দাঁড়ায়, উক্ত ইনজেকশন সম্পর্কে আসলে আমার কোন জ্ঞান নেই বলেই আমার ব্যস্ততার বাহানা করার মিথ্যে প্রয়াস।

৫) তিন বছর আগে যিনি আমাকে একবার দেখিয়েছিলেন, ফোন করে হজ্বের সময় পিরিয়ড কিভাবে বন্ধ রাখবেন তার পরামর্শ চান। এখন তার মাসিক বন্ধ আছে, সেটা রেগুলার করার ওষুধ এসএমএস করার জন্য অনুরোধ করেন।

উল্লেখিত, এই সকল ঘটনা কেবল এক সমুদ্র ঘটনার মধ্যে এক বিন্দু জলসম উদাহরণ। লেবার পেইন উঠলে যে দিনরাতের তোয়াক্কা না করে প্রতিটা পেইনের সাথে সাথে আমাদের ফোনটা একবার করে বেজে উঠে, সেটা তো বলিইনি। অথচ হয়তো উনি রোগী নিয়ে গেছেন অন্য কোন জায়গায় যেখানে আমার চিকিৎসা দেয়ার কোন নিয়ম নেই। তবু তাদের প্রতি মুহূর্তের আপডেট ওনারা দিতে থাকেন। ‘এখন গাড়ী আসল’, ‘এখন গাড়ীতে উঠলাম’, ‘এখন অমুক জায়গা পার হচ্ছি’, ‘ম্যাডাম, আমরা তো অন্য জায়গায় নিয়ে যাচ্ছি, আপনি প্লিজ ওখানের ডাক্তারের সাথে একটু কথা বইলেন, আমি ফোন ধরায়ে দিব’, ‘ম্যাডাম রোগী তো অস্থির, কী করা যায়?’ চলতেই থাকে এভাবে, ডেলিভেরী না হওয়া পর্যন্ত। সারা প্রেগন্যান্সীতে যে তিন চারটা ফলোআপ করতে পয়সা দিয়েছেন আমাকে, তা কড়ায়-গন্ডায় উসুল করতে হবে তো!

আরও জানতে চান? তবে শুনুন। আমি কনসালটেন্ট হবার পর প্রথম প্রথম অফিসেও প্রেগন্যান্ট মহিলাদের সবাইকে সেল নাম্বার দিতাম। ভাবতাম, ইমারজেন্সীতে কখন কী হয়! ফলাফল যা হল, তা শুনুন ভাল করে। কেউ কেউ প্রেগন্যান্ট বউকে বাড়িতে রেখে বের হয়ে এসেই ফোন দেয়, ‘ম্যাডাম আপনারে খুব ভাল লেগেছে, আপনার সাথে কিছুক্ষণ কথা বলতে পারি?’ শুধু তাই নয়, কেউ কেউ খুবই ব্যক্তিগত যৌন প্রবলেমের কথা বলে পরামর্শ চেয়ে তাদের বিকৃত রুচির বহিঃপ্রকাশেও দ্বিধা করেন না। আরো শোনার মত মানসিক অবস্থা আছে, নাকি এখনো মোবাইলে পরামর্শ দেয়াকে নিজেদের মহান পেশার মহৎ কাজের অংশ মনে করছেন?

শোনেন, ভাই-বোনেরা, আমাদের আজকের যে ডাক্তার-রোগী দা-কুমড়ো সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছে তার জন্য প্রধাণত দায়ী মোবাইল চিকিৎসা। রোগ হলেই পাবলিক ভাবে, পরিচিত কোন ডাক্তারের কাছে শুনে একটা দুইটা ওষুধ খাব, রোগ সেরে যাবে, ব্যস। কেন অযথা পয়সা আর সময় নষ্ট করব ডাক্তারের পেছনে? এই যাদের মানসিকতা, তাদের জন্য আমরা কেন আমাদের সময় এবং পয়সা নষ্ট করব, বলতে পারেন? পারলে স্বপক্ষে যুক্তি দেখান। আত্মীয়-পরিজনের কথা বলছেন তো? খুব সুন্দর করে ফোন করে এরা বেশ গর্বভরে বলবে, ‘অমুক ডাক্তারকে দেখাই, এখন একটু সমস্যা হচ্ছে, একটু পরামর্শ দে তো!’ কিংবা, প্রথমে এরা আপনার সময় নষ্ট করে পরামর্শ নিয়ে ভবিষ্যতে আপনাকেই শোনাবে, ‘অমুক ডাক্তারের কাছে দেখিয়ে শেষ পর্যন্ত ভাল হলাম, তোর ওষুধে তো কাজ হয়নি।’ আপনার কাছে সারাবছর টেলিচিকিৎসা করে সবশেষে আপনার যোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তুলে বলবে, ‘তুই এই অপারেশন পারিস তো, তাইনা? আচ্ছা, তোর চেয়ে আরও বড় অভিজ্ঞ কোন ডাক্তারের নাম বল তো। বুঝতেই তো পারছিস, তোরা ছোট মানুষ, অভিজ্ঞতা কম।’ এখানেই শেষ নয়, অন্য জায়গায় অপারেশন করে কমপ্লিকেশন হলে সংশ্লিষ্ট ডাক্তারের কাছে গেলে আবারও খরচ হবে বিধায় ঘনঘন ফোন করে আপনার দ্বারস্থ হবে। বিশ্বাস হচ্ছে না আমার কথা? ধৈর্য্য ধরে নিজের মোবাইল চিকিৎসা চালু রাখুন, প্রমাণ পেয়ে যাবেন অচিরেই।

বর্তমানে সমাজে ডাক্তারদের যে অবস্থান দাঁড়িয়েছে তা থেকে উত্তরণের প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে, রোগী না দেখে মোবাইল বা অনলাইনে চিকিৎসা দেয়া বন্ধ করা। প্রয়োজনে আইন করে এই চিকিৎসা পদ্ধতি বন্ধ করা উচিত। আর যারা এত কিছুর পরেও মোবাইলে চিকিৎসা প্রদানকে নিজেদের মহৎ পেশার অপরিহার্য অংশ বলে মনে করেন, তাদের নিয়ে আলাদা একটা টেলিমেডিসিন ডিপার্টমেন্ট খুলতে পারেন সরকার। শুধু শুধু একটা বিপদজনক বিষয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে কামড়াকামড়ি আর কতদিন? একের বোঝা বইতে গিয়ে তো কোমর ভাঙতে বসেছে, এবার অন্ততঃ দশে মিলে শক্ত আঁটি হয়ে পাবলিকরে প্রতিরোধ করুন। নয়তো সারাজীবন মানুষ আপনাদের একা ভেবে ভাঙার চেষ্টা করতেই থাকবে। একবার মচকানোর পরে মলম লাগানোর চেয়ে আগেই প্রতিরোধক ব্যবস্থা গ্রহণ বুদ্ধিমানের কাজ নয় কি?

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না