ঢাকা      মঙ্গলবার ২৩, অক্টোবর ২০১৮ - ৮, কার্তিক, ১৪২৫ - হিজরী



ডা. গুলজার হোসেন উজ্জল

রেসিডেন্ট,
হেমাটোলজি বিভাগ
বিএসএমএমইউ।


মৃত্যু আমাকে টানে

মৃত্যু সত্য। প্রচন্ড রকমের সত্য। পৃথিবীর একমাত্র ধ্রুব সত্য হলো মৃত্যু। আপনি আর দ্বিতীয়বার জন্মাবেন কিনা আপনি জানেন না। আপনার কখনো আমাশয় হবে কিনা আপনি জানেন না। আপনার দ্বিতীয় বিয়ে হবে কিনা আপনি জানেন না৷ কিন্তু আপনার যে মৃত্যু হবে এ ব্যাপারে আপনি শতভাগ নিশ্চিত৷ একটি জনপদে কতজন মানুষের হাই প্রেশার হয় তা বের করতে হয় জরিপ করে, গবেষণা করে। কিন্তু কতজন মানুষ মারা যায় তা জরিপ করা লাগে না।

মৃত্যুর সৌন্দর্য আছে। মৃত্যুর মাঝে রোমান্টিসিজমও আছে। জীবনানন্দ দাশ এটা ভাল বুঝতেন। তাই তাঁর কবিতা জুড়ে মৃত্যু নিয়ে আছে দারুন সব রোমান্টিক শব্দ বিন্যাস৷ 
‘যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ 
 মরিবার হলো তার সাধ।’

ছোট বেলায় আমি মৃত্যু নিয়ে অনেকরকম কল্পনা করতাম। ভাবতাম আমি না থাকলে এই পৃথিবী কেমন হবে? কেমন হবে আমার এই মরে যাওয়া ব্যাপারটা? কিন্তু মরে গেলে ফিরে আসা যাবে না বলে মরার সাহস হয়নি। একদিন আব্বার কোলে শুয়ে বলেছিলাম আমি আগামিকাল গাড়ির নিচে চাপা পড়ে মরব, কেমন হবে? আব্বা খুব সিরিয়াসলি নিতেন। চোখে চোখে রাখতেন আমি সত্যি সত্যি ওই কাজটি করি ফেলি কিনা সেই ভয়ে।

আমি হয়ত মজাই নিতাম। সবার সিম্প্যাথি পাবার ছেলেমানুষি চেষ্টা।

একবার স্কুলে গিয়ে বলেছিলাম আমার কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে, ডাক্তার বলেছে বাঁচবো না।

আমার অভিনয়ে খুঁত ছিল না। কিন্তু আমার দুই দুষ্ট বন্ধু আমাকে জাপ্টে ধরল। তারপর পকেট থেকে এক টাকা বের করে নিল। আট আনা দিয়ে দুইটা আইস্ক্রিম কিনলো। মরেই তো যাবি- খাওয়ায়ে গেলি। মরে গেলে তো আর খাওয়াতে পারবি না। আট আনা দামের আইস্ক্রিম। মাথায় পাউরুটি লাগানো থাকতো। আমার পয়সায় কেনা সেই আইস্ক্রিমের মাথার দিক থেকে আমাকে সে এক কামড় খেতেও দিয়েছিল।

সেই বন্ধু পরে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওয়ার্ডবয় হয়েছিল। যারাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসতো তাদেরকেই সে বলতো, ‘আমার বন্ধু, স্কুল লাইফের ফ্রেন্ড, উজ্জ্বল, ডাক্তার, বিসিএস, চিনেন নাকি? আচ্ছা দাড়ান ফোন দেই।’

সেই বন্ধু মারা গেল বিষাক্ত দেশি মদ খেয়ে। মেথিলেটেড স্পিরিট ছিল মনে হয়। ঈদের দিন রাতে।

ডাক্তারি পাশ করার পর কোন বিষয়ে বিশেষায়িত হব ভাবতে আমার ছয় সাত বছর লেগে গেছে। যে বিষয়ই ভালো লাগে দেখি সেটাই মৃত্যুবান্ধব। নেফ্রোলজি ভাল লাগতো। কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিসের নানারকম হাতের কাজ খুব দ্রুত রপ্ত করে ফেললাম। বলা যায় এক হাতেই তুলে দাড় করালাম একটি বেসরকারি ডায়ালাইসিস সেন্টার। ঢাকা শহরে তখনো এত ডায়ালাইসিস সেন্টার হয়নি। ঢাকার বাইরে তো নয়ই।

রোগীরা আসে। ডায়ালাইসিসের জন্য নিবন্ধিত হয়। আমার সাথে কথা বলে। ডায়ালাইসিস শুরু করে। কিন্তু দুই চার বছর পর তারা থাকে না। তারা কেউ কেউ মরে যায়। কিডনির পথ ছেড়ে দিলাম। ক্যনসারে এলাম। এখানেও মৃত্যু। এমফিলে ঢুকলাম অনকোলজি বিভাগে। চার বছর সলিড টিউমার নিয়ে পড়ে থেকে সেও ছেড়ে দিলাম। এলাম রক্ত রোগ বিভাগে৷ এখানেও মৃত্যু।

মৃত্যু আমাকে টানে। মরতে যাওয়া মানুষগুলো অদ্ভুত। এদের সাথে থাকলে জীবনকে খুব সুন্দর মনে হয়। 
- ব্লাড ক্যানসারের রোগী রাম প্রসাদ জিজ্ঞেস করেছিল, ‘স্যার, কদ্দিন বাঁচবো।’ 
- আমি বলেছিলাম হিসাব তো বলে ছয় মাস।
- স্যার, আর ছয় মাস বাড়ানো যায় না? 
- কী করবা? 
- জায়গা সম্পত্তি নিয়া প্যাঁচ আছে স্যার। প্যাঁচ ভাঙ্গাইতে হইব।

রাম প্রসাদ আমাদের অবাক করে দিয়ে বেঁচে আছে। এখনো এসে ফলো আপ করে যায়। আজকে পাঁচ বছর হতে চলল। এই উপরি পাওয়া জীবনে তার প্যাঁচ বেড়ে গেছে।

সাদিয়া মেয়েটাকে ভালবেসেছিল একটা ছেলে। প্রথম সাইকেল কেমো শেষ করে সে বিয়ে করে ফেলল। ন্যাড়া মাথার বিয়ের কন্যা গয়না টয়না পরে আসলো কন্সোলিডেশন ফেইজের কেমো নেবার জন্য। সাথে নতুন জামাই।

সাদিয়ার মা জামাইয়ের জন্য প্রাণ ভরে দোয়া করে। এমন ছেলে হয় না।

সাদিয়া সুস্থ হয়ে গেছে। এখন শুধু ফলো আপ করতে আসে। তার হৃদয়বান ভাল স্বামীটা নেশাগ্রস্ত হয়েছে। বউকে মারধোর করে। সাদিয়া কান্দে আর বলে এর থেকে আমার মরণ ভাল। আমি যে কোনদিন আত্মহত্যা করব স্যার।

মরণ ভাল। সত্যিই ভাল। মরণ শ্যামের মতই লীলাময়। বেঁচে আছি সুন্দর একটা মৃত্যু চাই বলে।

আনোয়ার হোসেন সাহেব সারাজীবন ভেবে পাননি এই জীবনের অর্থ কী? তার আশেপাশের মানুষেরাও পাননি। লেখাপড়ার জন্য মানুষটা করেননি এমন কোন কষ্ট বাকি নেই। লাঞ্চনা, অপমান, ক্ষুধা, দারিদ্র সব। বিস্তর পড়ালেখা করে চাকুরে হয়েছেন। তার বন্ধুরা যারা গ্রামের বাজারে জুতার দোকান দিয়েছিলেন তারাও অনেক সম্পদের মালিক হয়েছেন। তার ওসব কিছু হয়নি। একটা বাড়ি করতে পারেননি। না কোন ব্যাংক ব্যালেন্স। লোকে টিপ্পনি কাটতো তার রাবারের জুতা আর কম দামি শার্ট দেখে। উনি বলতেন এতেই তো চলে।

লোকে বলত জমি কেনেন। উনি বলতেন কী লাভ বোঝা বাড়িয়ে?

হাসপাতালে আনোয়ার হোসেন যখন মৃত্যু শয্যায় ছোট ছেলে তাঁর বুকে হাত রেখেছিল। কপালে চুমু দিয়ে দিচ্ছিল বারবার। ডান হাতে ধরা ছিল বড় ছেলে। বড় মেয়ে কাঁদছিল পাশে দাঁড়িয়ে- ‘আব্বা আর কয়েকটা বছর থাকতেন আমাদের সাথে।’

আনোয়ার হোসেনের মুখে স্মিত হাসি। তিনি বলতে চাইছিলেন এমন সুন্দর মৃত্যুর জন্যই আমি একটা সরল জীবন যাপন করেছিলাম। তোমরা বোঝনি।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

মুলারিয়ান এজেনেসিস: প্রকৃতির অবিবেচক খেয়াল ও প্রমিতির কান্না

মুলারিয়ান এজেনেসিস: প্রকৃতির অবিবেচক খেয়াল ও প্রমিতির কান্না

প্রমিতি, বয়স- ১৬। এইচএসসি ১ম বর্ষে পড়ে। প্রাণবন্ত, উচ্ছ্বল প্রজাপতির মতো। যখন কথা…

ইন্টার্ন ডাক্তারদের আবার কষ্ট আছে নাকি?

ইন্টার্ন ডাক্তারদের আবার কষ্ট আছে নাকি?

আপনার বেতন কত? ছোটবেলায় শুনেছিলাম এ প্রশ্ন করা নাকি বেয়াদবি! সেই ভয়ে…

সব মৃত্যুই দুঃখের, সুখের কোন মৃত্যু নেই!

সব মৃত্যুই দুঃখের, সুখের কোন মৃত্যু নেই!

তখন আমি সিওমেক হাসপাতালের ইন্টার্ন। মেডিসিন ওয়ার্ডে রাউন্ড দিচ্ছেন প্রফেসর ইসমাইল পাটোয়ারি…

‘কেটা ফের জানতোক যে, পিঁপিয়া খাল্যে ছ্যালা ধলো হয়?’

‘কেটা ফের জানতোক যে, পিঁপিয়া খাল্যে ছ্যালা ধলো হয়?’

এক সদ্য গর্ভবতী রোগীকে কাঁচা পেঁপে খেতে নিষেধ করলাম। - আনারস আর কাঁচা…

ইন্টার্ন চিকিৎসকদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা

ইন্টার্ন চিকিৎসকদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা

ফাঁকিবাজির মহান ব্রত নিয়ে ইন্টার্নি শুরু করেছিলাম। আমি জন্মগত ভাবেই ফাঁকিবাজ। সবাই…

‘বুকের ভিত্রে চ্যাংনা চ্যাঁও চ্যাঁও করে’

‘বুকের ভিত্রে চ্যাংনা চ্যাঁও চ্যাঁও করে’

ডাক্তার- আপনার সমস্যা কী? রোগী- বুকের ভিত্রে চ্যাংনা চ্যাঁও চ্যাঁও করে। ডাক্তার-…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর