মাহবুব কবির মিলন

মাহবুব কবির মিলন

সদস্য (যুগ্ম সচিব) বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ


১৭ জুলাই, ২০১৮ ০৩:২০ পিএম

বাবা মার কাঁধে যেন সন্তানের লাশ না ওঠে

বাবা মার কাঁধে যেন সন্তানের লাশ না ওঠে

বড় মেয়ের বয়স তখন ৪-৫ বছর। স্কুল থেকে বাসায় এসে দুপুরে উঠল প্রচন্ড পেট ব্যথা। চিৎকার আর গড়াগড়ি খাচ্ছে একনাগাড়ে। সন্ধ্যায় পাশে এক ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলাম। ওষুধ দিলেন। কাজ হল না। রাতে ক্লিনিকে নিয়ে গেলাম। বাচ্চার কান্না আর চিৎকারে আমরা দুইজন, আব্বা আম্মা সমানে কেঁদে চলেছি। ক্লিনিকের ডাক্তার দেখে ওষুধ দিলেন। কাজ হল না। কল দেয়া হল চট্টগ্রামের নামকরা শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ জনাব বদরুল আলম সাহেবকে।

খুব ভাল করে দেখলেন। তাকিয়ে আছি তাঁর মুখের দিকে। কপাল কুঁচকে গেল এক সময়। তারপর হেসে বললেন, ওষধ দিচ্ছি, কাল সকাল পর্যন্ত না কমলে দুপুরের মধ্যে বাচ্চার এন্ডোস্কপি করাতে হবে। বাইল ডাক্ট বা পেটে কোথাও ক্রিমি ঢুকে পড়তে পারে। হাত পা আমার ঠান্ডা হয়ে কাঁপতে লাগল। আমি ভাল করে জানি সেটা কী কষ্টের জিনিস। দুইবার করেছিলাম। দুইবারই প্রায় অজ্ঞান এবং তারপর প্রচন্ড জ্বর হয়েছিল আমার।

সারা রাত বাচ্চার চিৎকার। আমাদের কান্না। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা। পরের দিন ব্যথা না কমাতে দুপুরে নিয়ে গেলাম এন্ডোস্কপি করাতে। এই কষ্ট যেন কোন বাবা মা না পায়। রুমের ভিতরে পেট ব্যথায় চিৎকাররত বাচ্চার মুখ দিয়ে পাইপ ঢুকান হচ্ছে। আমরা বাইরে সমানে কেঁদে যাচ্ছি। থাক সে স্মৃতি। রিপোর্ট নীল। কোন সমস্যা নেই। কিন্তু বাচ্চার চিৎকার থামছে না।

বিকালে আবার কল দেয়াতে বদরুল আলম সাহেব এসে এন্ডোস্কপি রিপোর্ট দেখে অনেকক্ষণ ধরে পেট টিপাটিপি করে বেশ চিন্তিত হয়ে গেলেন। বললেন, একটা রিস্ক নেব কাল সকালে। সারারাত ধরে ফলো করবেন বাচ্চার গায়ে লাল চাকাচাকা কিছু ওঠে কিনা এবং হাতের আঙ্গুলগুলো ফুলে যাচ্ছে কিনা। ইউরিনের কালার লাল হয় কিনা ভাল করে খেয়াল করবেন। তিনি চলে গেলেন।

বুঝলাম ইউরিন লাল হলে ভীষণ বিপদ। সারারাত ধরে কাঁদি আর বলি, আল্লাহ বাচ্চার ইউরিন যেন লাল না হয়। বাচ্চা আমার চিৎকার আর কাঁদতে কাঁদতে নিস্তেজ হয়ে গেছে।

সকালে খেয়াল করলাম, হাতের আঙ্গুলগুলো কেমন যেন ফোলা ফোলা। জামা তুলে দেখি কয়েক জায়গায় লাল চাকা হয়ে আছে। জমে গেলাম। ডাক্তার সাহেবের অনুমানের সাথে মিলে গেল কিভাবে! কী হয়েছে তাহলে?

সকালেই তিনি আসলেন। হেসে বললেন, রেয়ার ডিজিজ তবে জটিল খুব, যদি কিডনিতে এটাক করে। নাম বললেন, সম্ভবত ‘পারপিউরা’ টাইপের হবে কিছু। স্টেরয়েড দিলেন। বিকাল হতে হতে ব্যথা কমতে লাগল। রাতে ভাল। বাচ্চার মুখে হাসি।

বাসায় নিয়ে গেলাম ভাল বাচ্চা। মাঝরাতে শুরু হল ঘুম থেকে প্রচন্ড চিৎকার করে কান্না, কান্না থামে না। আবার সমস্যা। পরের দিন মাঝ রাতেও ঘুম থেকে ওঠে চিৎকার।

পরের দিন সকালে ফোনে প্রফেসর বদরুল আলম সাহেবকে কাহিনী বললাম। হেসে বললেন, বুঝেছি। ঠিক হয়ে যাবে। এতদিনের ব্যথায় আতংকে এটা হচ্ছে। তিনি ঘুমের ট্যাবলেট রিভোট্রিল অর্ধেক করে খেতে দিলেন। আবার জমে গেলাম, আমি মাঝে মাঝে ঘুমের জন্য ওটা অর্ধেক করে খাই। বাচ্চাকে সেই ডোজ!

রাতে আল্লাহ আল্লাহ করে বাচ্চাকে খাওয়ালাম। আর কেঁদে ওঠেনি। দুই তিন দিন দেয়া হল রিভোট্রিল। সম্পূর্ণ ভাল হয়ে বাচ্চা। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে আমার সোনার টুকরা।

চিকিৎসা বিজ্ঞান এক জটিল বিষয়। আরও জটিল হয়ে দেখা দেয় যদি সেখানে কোন অবহেলা বা ত্রুটি বিচ্যুতি থাকে। আবার চিকিৎসকরা সম্পূর্ণ চেষ্টা করার পরেও ০.১% দুর্ঘটনার চান্স থাকতে পারে। সে ০.১% জুটে যেতে পারে যে কোন অভাগার।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে হেফাজত করুন। কোন বাবা মার কাঁধে যেন সন্তানের লাশ না ওঠে। আমীন।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না