ডা. মাহফুজুর রহমান রাজ

ডা. মাহফুজুর রহমান রাজ

ডেন্টাল সার্জন

রাজশহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে


১৬ জুলাই, ২০১৮ ০১:০৭ পিএম

চিকিৎসার জন্য রোগীরা কেন ভারত যায়?

চিকিৎসার জন্য রোগীরা কেন ভারত যায়?

এখন বোধহয় আমাদের ভাবার সময় হয়েছে কেন মানুষ ভারত যাচ্ছে। যেখানে আমাদের দেশে অনেক ভাল ভাল চিকিৎসক এবং বেশ কিছু সম্ভাবনাময় চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান আছে। দীর্ঘদিন যাবৎ বাংলাদেশ থেকে স্রোতের মতো রোগী ভারত যাচ্ছে সেই সাথে চলে যাচ্ছে দেশের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা।

আমি ভারতে চিকিৎসা নিতে যাওয়া রোগী ও স্বজনদের সাথে কথা বলেছি। এবার আমার অভিজ্ঞতাগুলো বলি।

এক.
ভদ্রলোক ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করেন এরিয়া ম্যানেজার পদে। কয়েক মাস বয়সী মেয়েকে দেশে দেখিয়েছেন বিভিন্ন জায়গায়। শেষ পর্যন্ত এক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে ভারতের আহমেদাবাদ গিয়েছিলেন। বাচ্চা সুস্থ আছে চিকিৎসা নিয়ে তিনি খুবই সন্তুষ্ট। জিজ্ঞাসা করলে উত্তরে বললেন স্যার ওখানে এত ভালো আয়োজন আছে যে আল্লাহ যদি না তুলে নেন তাহলে ওখানে সুস্থ করে ফেলবে তারা।

দুই.
ভদ্র লোক চিকিৎসার জন্য গিয়েছিলেন চেন্নাই এপোলোতে। চিকিৎসা নিয়ে খুবই সন্তুষ্ট। বললেন যে চিকিৎসকরা সেখানে পর্যাপ্ত সময় তাকে দিয়েছে এবং তার প্রতি চিকিৎসকদের মনোযোগ ছিল দেখার মতো। ভদ্রলোকের ঢাকায় ও চেন্নাইতে প্রায় একই চিকিৎসা পেলেও তিনি ঢাকার চিকিৎসায় সন্তুষ্ট ছিলেন না, এখানে এসে নিশ্চিন্ত হলেন। খরচ ঢাকা থেকে দশ গুণ বেশি হলেও তিনি খুশি।

তিন.
ভদ্রলোকের স্ত্রীর বুকে ব্যথা সাথে আরও কিছু জটিলতা। ভারতে গেলেন, নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাঝ দিয়ে জানতে পারলেন হার্টের কোন সমস্যা নেই। আনন্দে দেশে ফিরে আসছেন। এমন সময় রাস্তায় ভদ্রলোকের নিজেরই বুকে ব্যথা শুরু হলো। রাজশাহীতে ফিরেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেখালেন। কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসক জানালেন যে না তারও হার্টে কোন সমস্যা নেই। একই বিষয়ে ভারতের খরচ প্রায় সত্তর হাজার টাকা আর বাংলাদেশে খরচ হলো সাত হাজার টাকা। তারপর ভদ্রলোক যা বললেন তাতে আমার মাথা গরম হয়ে গেল। তিনি বললেন, সামনেই আবার ভারত যাবেন বিষয়টি নিশ্চিত হতে। কারণ কি?

আমাদের দেশে ভারতগামী রোগীরা ওষুধের দোকানদার থেকে শুরু করে এমবিবিএস ডাক্তার দেখানোর পর অধ্যাপকদের শরণাপন্ন হন। এরপর সেই রোগী ভারত যায়। কেন যায় ভাবতে হবে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণের প্রাইভেট প্যাকটিসে একটা বিষয় দেখেছি এবং অনেক রোগীও অভিযোগ করেছেন, চিকিৎসকগন চেম্বারে শতাধিক রোগী দেখেন এক বেলাতে। একসাথে তিনটা চারটা করে রোগী রুমের ভিতরে ঢুকানো হয়। শুধুমাত্র একজন রোগী ঢুকালে তাকে দেখার পর বের করে আরেকজন ঢুকাতে এক মিনিট সময় নষ্ট হতো সেটাও নষ্ট করলে সারারাত লেগে যাবে। তাই এই ব্যবস্থা। 

সময় এবং মনোযোগ কোনটাই যথাযথভাবে হয় না। মানুষের প্রাইভেসি রক্ষার জন্য আমাদেরকে জেনেভা শপথ করিয়েছেন। কিন্তু চিকিৎসকগণ একসাথে চারটে রোগী ঢুকানোর জন্য এক রোগীর গোপনীয়তা বাকি তিন রোগী জেনে যায়। সঠিক চিকিৎসা দিলেও রোগীরা মনে মনে খুবই অসন্তুষ্ট হয়ে যায়। ঠিকমতো সময় সে পেল না, মনোযোগও পেল না আর গোপনীয়তাও থাকলো না। ফলে রোগীর মনে কোন তৃপ্তি আসলো না।

ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য রোগীরা একবার শেষ চেষ্টা করতে চান। ক্যান্সারের রোগীর সংখ্যা অনেক। যাদের সামর্থ্য আছে তারা একবার হলেও সাধারণত ভারতে যান। কিডনি ট্রান্সপ্লান্টের ভারতগামী রোগীর সংখ্যা প্রচুর। কারণ আমাদের দেশে কিডনি কেনা বেচা বেআইনি এবং কয়েক বছর থেকে তা প্রতিপালন করা হচ্ছে।

আমাদের বেশিরভাগ রোগী সাধারণ প্রাক্টিসে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সরণাপন্ন হন। বানিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে চিকিৎসকগণ তাদের পর্যাপ্ত সময় দেন না। রোগীরা তাদের প্রতি কাঙ্ক্ষিত মনোযোগ আকর্ষণে ব্যর্থ হয়ে খুবই অসন্তুষ্ট ভাবে ফিরে আসেন। পরবর্তীতে নানান জনের পরামর্শে ভারতে চিকিৎসার জন্য যান। 

এছাড়াও ভারতে চিকিৎসার পরামর্শ ও সেবার জন্য এদেশে কিছু এজেন্ট আছে। একটা বিষয় মনে হয়েছে যে ভারতীয় কর্পোরেট হাসপাতালগুলো মূলত বাংলাদেশের রোগীদেরকে সন্তুষ্ট রাখার জন্য পুরাপুরি পেশাদারী মনোভাবের পরিচয় দেয়। হাজার হাজার ডলার পকেট করে নিয়ে যাওয়া রোগীকে সুস্থ করতে পারুক আর না পারুক পর্যাপ্ত পরিমাণে সময় এবং মনোযোগ তার পিছনে দেয়। 

ভারতের সরকারি হাসপাতালগুলোর চিকিৎসা সেবার মান বাংলাদেশের চেয়ে উন্নত না। বিশ্ব র‌্যাংকিংয়েও তারা এজন্য অনেক পিছনে আছে। কিন্তু ভারত বেসরকারি বড় হাসপাতালগুলোতে পেশাদারি মনোভাব নিয়ে সেবার একটা নির্দিষ্ট মান বজায় রাখে‌।

আমাদের বুঝতে হবে কয়েকটি পেশা অন্যান্য পেশা থেকে একটু ভিন্ন। বিশ্বাসী মানুষেরা যেভাবে তার দুঃখ-দুর্দশার জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে নিজেকে সম্পূর্ণ ভাবে সমর্পণ করেন। ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে একজন অসুস্থ মানুষ সেভাবেই সেই বিশ্বাসে একজন চিকিৎসকের কাছে নিজেকে সমর্পণ করেন। একজন অভিভাবক তার শিশুকে বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছে সমর্পণ করে আসেন অনেকটা সেভাবেই, গভীর আস্থা নিয়ে। 

বিচার প্রার্থীদের হৃদয়ে ঠিক এরকমই অবস্থান মহামান্য আদালতের বিচারকদের প্রতি। সেই জন্য চিকিৎসক, শিক্ষক আর বিচারপতিদের পেশাটা আর দশটা পেশা থেকে ভিন্ন মর্যাদার। এ ধরনের পেশায় কিছু নৈতিকতা আছে। যারা এসব পেশায় আসবেন তাদের সেভাবেই বাছাই, প্রশিক্ষণ, তদারকির মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। তবে একই সাথে তাদের উঁচুমানের আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্টদের।

এখন দেখা যাক কারা বিদেশে যায়? বড় ধরণের ব্যয় করার সামর্থ্য আছে এমন রোগীরা বিশেষায়িত চিকৎসার লক্ষ্যে দেশের বাইরে যান। কেন যান সে বিষয়টি উপরে বিভিন্ন ভাবে যে আলোচনা হয়েছে তার সার-সংক্ষেপ করছি।

প্রথমতঃ ভারতে বাংলাদেশের রোগীর প্রতি ডাক্তারদের আন্তরিক ও গ্রহণযোগ্য মনোযোগ প্রদান।

দ্বিতীয়তঃ ভারতে ক্লিনিক ও হাসপাতালগুলোয় (অধিকাংশ) ঘোষিত/প্রতিশ্রুত সার্ভিস/সেবা প্রদান করে।

তৃতীয়তঃ আমাদের দেশে অধিকাংশ ক্লিনিক, হাসপাতালের মালিক পরিচালকদের নীতিহীন অতিমুনাফার ধান্দা, যেমনটা আমরা দেখলাম ইউনাইটেড, পপুলার ও ম্যাক্স হাসপাতালে অভিযানের পর।

চতুর্থতঃ দেশীয় চিকিৎসা ব্যবস্থা ও চিকিৎসকের বিপক্ষে মিডিয়া ও প্রশাসনের দায়িত্বহীন আচরণ। এই নেগেটিভ প্রচারণা দেখে মনে হয়েছে এগুলো অনেকাংশেই পরিকল্পিত এবং সুযোগের অপেক্ষায় থেকে তার সদ্ব্যবহার।

পঞ্চমতঃ সাধারণ ও বিশেষায়িত হাসপাতালে/ক্লিনিকে, ডায়াগনস্টিক ল্যাবে, চিকিৎসা ও আনুষঙ্গিক পরিষেবার মান অতি নিম্ন।

আমাদের দেশে মা ও শিশু মৃত্যু রোধে সাফল্য আছে। শিশুদের বেশ কিছু রোগের টিকা দেওয়ার কর্মসূচীতেও সাফল্য আছে। ব্যাক্তিগত ভাবে সেবা মনোভাবাপন্ন ও যোগ্যতাসম্পন্ন অনেক চিকিৎসকও আছেন। তা সত্তেও সুচিকিৎসার আশায় হাজার মানুষ দেশের বাইরে চলে যাচ্ছেন। সাথে চলে যাচ্ছে আস্থা, বিশ্বাস, ভাবমুর্তি আর হাজার হাজার ডলার। এবিষয়ে সরকার কি আন্তরিক? রাষ্ট্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সামান্য চিকিৎসায় বিদেশে গমন তাদের অঙ্গীকার হীনতায় প্রমাণ করে।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত