ঢাকা      মঙ্গলবার ২৩, অক্টোবর ২০১৮ - ৮, কার্তিক, ১৪২৫ - হিজরী



মাহবুব কবির মিলন

সদস্য (যুগ্ম সচিব) বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ


দুই মহান চিকিৎসকের কথা

আশির দশকের শেষের দিকে ক্রনিক পেটের সমস্যা (পেট ব্যথা, ক্ষুধামন্দা) নিয়ে অনেক কষ্টে সিরিয়াল পেলাম জাতীয় অধ্যাপক ডা. নুরুল ইসলাম স্যারের কাছে। অনেকক্ষণ শুনলেন, পেট টিপাটিপি করলেন। কিছু না দিয়ে একটি ব্লাড টেস্ট দিলেন (টি জাতীয় কিছু)। সেই সময় ওই টেস্ট চার্জ দিলাম প্রায় চার হাজার টাকার ওপর।

মনটা খুব খারাপ। কনফার্ম টাকা কামাইয়ের ধান্দা! রিপোর্ট আনতে গেলাম। কাউন্টারে জিজ্ঞাস করলাম এটা কিসের টেস্ট ভাই। ক্যান্সার সনাক্তের টেস্ট। মাথা ঘুরে পড়ে যাবার আগে বললাম, রিপোর্টে কী বলেছে? নেই, সব ভাল।

রিপোর্ট দেখালাম ডা. নুরুল ইসলাম স্যারেকে। তিনি লিখে দিলেন, প্রতিদিন দুই চামুচ ইসবগুলের ভুসি পানির সাথে খেতে হবে। এত টাকা পয়সা, এত কষ্ট করে ভুসি! এই উনি নামকরা ডাক্তার!

বের হবার আগে বললেন, কোন অসুখ নেই। টেস্ট করে সন্দেহ দূর হয়েছে। বাকি জীবন এই সমস্যা থাকলেও চিন্তার কিছু নেই। এখনো আছে তা। চিন্তা আর করি না। কারণ টেস্ট করে খারাপ কিছু পাওয়া যায়নি। এখন বুঝি, তার নাম আইবিএস। তিনি আমার চিকিৎসায় ভুল করেননি।

১৯৯২/৯৩ সালের দিকে হঠাৎ চোখে স্পট দেখা শুরু করলাম। ফ্লোটারস, কালো কালো, আঁকাবাঁকা রেখা। অনেক কষ্টে অনেকদিন ঘুরে সিরিয়াল নিলাম নামকরা চক্ষু রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. হারুন স্যারের কাছে। হারুন আই ফাউন্ডেশনে। ভাল করে দেখে তাঁর ওখানেই চোখের এক্সরে করাতে দিলেন।

এক্সরে করার আগে দেখি ইনজেকশন দিচ্ছে, আবার কয়েকটা ট্যাবলেট খেতে দিল। হাত-পা কাঁপা শুরু করে দিল। এরা করছেটা কি! টাকা খাওয়ার ধান্দাবাজি! রিপোর্ট দেখলাম। চোখের গোলকের ভিতর হাজার হাজার শিরা উপশিরা। আবার কেমন যেন ঘা ঘা ভাব।

ডা. হারুন স্যার দেখে বললেন, জরুরী দুই চোখে লেজার দিতে হবে। না হলে চরম বিপদ হতে পারে। ইন্টারনাল ব্লিডিং যে কোন সময় শুরু হয়ে অন্ধ হয়ে যেতে পারেন।

ইনি তো দেখি টাকা কামাবার গুরু! লেজার চার্জ দেখলাম প্রতি চোখে বোধহয় চার হাজার ছিল। বাহ! বাহ!

লেজার কী জিনিস বা কেমন তা বুঝিনি। চোখে আবার বাইরে থেকে কিভাবে দেয়, সেটাও জানি না। দুই সিটিংয়ে দুই দিন দিতে হবে। প্রথম দিন দিতে গিয়ে মেশিন দেখে হাত পা ঠান্ডা। উনি মেশিনের একদিকে। আমাকে অপর দিকে বসিয়ে ঠেসে চোখ লাগিয়ে রাখতে বলল। এরপর আর বর্ণনা করব না। প্রায় অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম।

পরের বার আবার একই কাজ। এবার ওনার মেশিনগান টেপার সময় আর থাকতে পারিনি। চিৎকার করে মাথা বের করলাম। আর যায় কোথায়! উনিও প্রচন্ড রেগে দাঁড়িয়ে গেলেন। যান, আপনার আর করব না।

অনেক অনুনয় বিনয় করে তাঁকে বসালাম। এরপর বহুদিন মন খারাপ ছিল তাঁর ওপর। এক তো টাকা কামানো, তার ওপর বিনা প্রয়োজনে এত কষ্ট দিয়েছেন আমাকে। উনি বলেছিলেন, তুমি তো চট্টগ্রাম থাক। ওখানে সময় পেলে মাঝে মাঝে ওই ডাক্তারকে (নাম বললেন) দিয়ে পরীক্ষা করাবে।

ভুয়া চিকিৎসার আবার পরীক্ষা! উনি মারা যাবার পর কী মনে করে একদিন গেলাম ওই ডাক্তার সাহেবের কাছে। উনি শুনে কিছু না বলে, অনেক্ষণ ধরে চোখ পরীক্ষা করে বললেন, হারুন স্যারের জন্য দোয়া করবেন। উনি লেজার দিয়ে এমনভাবে কাজ করেছেন বাকি জীবনে আর কোন সমস্যা হবে না। আর কিছুদিন দেরি করলে চিরতরে অন্ধ হয়ে যেতেন।

সম্ভবত রেটিনাল ভাসকুলাইটিস বা মেকুলার ইডিওমা টাইপের কিছু হবে।

এরপর অনেকবার অন্য ডাক্তার সাহবের দ্বারা চোখ পরীক্ষা করেছি। সবাই বলেছেন অন্ধত্ব থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন আপনাকে হারুন স্যার। এই রোগে অন্ধ হয়ে যাবার সংখ্যা অনেক বেশি। অটো ইমিউন ডিজিজ। কজেজ আননোন।

আমি আজও দেখতে পাই। আজও পেটের ব্যথা নিয়ে বেঁচে আছি। কোন চিন্তা নেই আল্লাহর রহমতে। টাকার ধান্দায় থাকা সেই ডাক্তারেরা আর কেউ নেই এ ধরায়। আল্লাহ্‌ তাঁদের জান্নাত নসীব করুন।

ভোরের আলোর স্নিগ্ধতা ফোঁটাতে অনেক কিছু লাগে। আকাশ, সুর্য, বাতাস, পাখির কলতান। সবার সাহায্য লাগে। একটির অভাবে অন্যগুলো অনুভব করা যায় না।

আমরা খুব খারাপ পথের দিকে ধাবিত হচ্ছি। খুব খারাপ। পরচর্চা, পরনিন্দা, অসম্মান, হেয় করা নিয়ে যে প্রতিযোগিতায় নেমেছি, আমাদের কিছু হবে না। ধ্বংস হবে আমাদের বাচ্চাদের মন আর মানসিকতা।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

মুলারিয়ান এজেনেসিস: প্রকৃতির অবিবেচক খেয়াল ও প্রমিতির কান্না

মুলারিয়ান এজেনেসিস: প্রকৃতির অবিবেচক খেয়াল ও প্রমিতির কান্না

প্রমিতি, বয়স- ১৬। এইচএসসি ১ম বর্ষে পড়ে। প্রাণবন্ত, উচ্ছ্বল প্রজাপতির মতো। যখন কথা…

ইন্টার্ন ডাক্তারদের আবার কষ্ট আছে নাকি?

ইন্টার্ন ডাক্তারদের আবার কষ্ট আছে নাকি?

আপনার বেতন কত? ছোটবেলায় শুনেছিলাম এ প্রশ্ন করা নাকি বেয়াদবি! সেই ভয়ে…

সব মৃত্যুই দুঃখের, সুখের কোন মৃত্যু নেই!

সব মৃত্যুই দুঃখের, সুখের কোন মৃত্যু নেই!

তখন আমি সিওমেক হাসপাতালের ইন্টার্ন। মেডিসিন ওয়ার্ডে রাউন্ড দিচ্ছেন প্রফেসর ইসমাইল পাটোয়ারি…

‘কেটা ফের জানতোক যে, পিঁপিয়া খাল্যে ছ্যালা ধলো হয়?’

‘কেটা ফের জানতোক যে, পিঁপিয়া খাল্যে ছ্যালা ধলো হয়?’

এক সদ্য গর্ভবতী রোগীকে কাঁচা পেঁপে খেতে নিষেধ করলাম। - আনারস আর কাঁচা…

ইন্টার্ন চিকিৎসকদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা

ইন্টার্ন চিকিৎসকদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা

ফাঁকিবাজির মহান ব্রত নিয়ে ইন্টার্নি শুরু করেছিলাম। আমি জন্মগত ভাবেই ফাঁকিবাজ। সবাই…

‘বুকের ভিত্রে চ্যাংনা চ্যাঁও চ্যাঁও করে’

‘বুকের ভিত্রে চ্যাংনা চ্যাঁও চ্যাঁও করে’

ডাক্তার- আপনার সমস্যা কী? রোগী- বুকের ভিত্রে চ্যাংনা চ্যাঁও চ্যাঁও করে। ডাক্তার-…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর