ঢাকা শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ২ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ৪৮ মিনিট আগে
ডা. ফাহিম উদ্দিন

ডা. ফাহিম উদ্দিন

ইন্টার্ন চিকিৎসক

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।


১৪ জুলাই, ২০১৮ ১৫:২৪

সাধারণ মানুষ ডাক্তারের কাছে কেমন ব্যবহার আশা করে?

সাধারণ মানুষ ডাক্তারের কাছে কেমন ব্যবহার আশা করে?

আমার নিজের জীবনেই খুব বাজে একটা অভিজ্ঞতা আছে ‘ডাক্তারের ব্যবহার’ নিয়ে। তার আগে কিছু কথা বলি। আজকে সকাল বেলা এক রোগীর লোক আসলো অন্য ডিপার্টমেন্ট থেকে কলের কাগজ নিয়ে। রোগীকে নিয়ে স্যারের রুমে অনেকক্ষণ ওয়েট করলাম কল ভিজিট করার জন্য। এরপর স্যারের কাজ শেষে স্যার আসলেন, আইসিউ-তে ঢুকে আবার অন্য পেশেন্টের কাজে স্যার ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। আবার ওয়েট করলাম। 

এরপর রোগী দেখা শেষে কলের কাগজ নিয়ে স্যারসহ ৫ তলায় গেলাম, যেই ডিপার্টমেন্টের রোগী সেই ডিপার্টমেন্টের স্যারকে জানালাম। এরপর এসে রোগীর স্ত্রীকে বুঝিয়ে বললাম, একেবারে ছবিসহ দেখিয়ে খুব সহজ ভাবে (খুব ভালো মতই বুঝেছেন)। এরপর রোগীর আরেক আত্মীয়কেও বুঝালাম, খুব ভালো ভাবে বুঝেছেন। তারপর আসার পথে আবার কথা বলতে চাইলেন, আবার বুঝালাম। 

এরপর ডক্টরস রুমে এসে ফ্রেস হয়ে নাস্তা করবো এমন সময় তাদের আরেক লোক আসলেন, ওনাকেও বুঝিয়ে বললাম। কিন্তু তারপরেও রিকোয়েস্ট করলেন আবার গিয়ে ওনাদের সবাইকে একসাথে বুঝিয়ে বলতে। আবার গেলাম আইসিইউয়ের সামনে গিয়ে সবাইকে একসাথে বুঝিয়ে বললাম, কী করতে হবে, কোথায় যেতে হবে। তারপর আবার ওই লোক মোবাইল নাম্বার চাইলেন ঢাকায় গিয়ে পরবর্তীতে যোগাযোগের জন্য, তাও দিয়ে আসলাম।

রোগীর লোক স্বাভাবিক ভাবেই অনেক সন্তুষ্ট। আমি হয়ত অনেক সফ্ট মাইন্ডেড ছেলে হওয়ায় নিজের কষ্ট হলেও রোগীরা ডাকলে প্রতিবার গিয়ে দেখে আসি, একেবারে সহজ বাংলায় বুঝিয়ে দিয়ে আসি, নিজের কষ্ট হলেও কখনো বিরক্তি দেখাই না, রাগারাগি করি না। 

কিন্তু সরকারি হসপিটালে যেখানে বেডের চেয়ে তিন/চার গুণ বেশি রোগী ভর্তি থাকে, সেখানে আসলে এটা আশা করাটা ঠিক নয়। আমাদের জনবল বলেন, ওষুধ বলেন সবকিছু বেডে যতজন রোগী আছে ঠিক সেই অনুপাতেই। সুতরাং এত রোগীর চাপে ওরকম সেবা আশা করাটা ঠিক নয়। আমার মত কেউ যদি করে তবে সেটা অতিরিক্ত ধরে নিতে হবে, তবে না করলে দোষ ধরতে যাওয়ার সুযোগ/যুক্তিকতা নেই আসলে। 

আমরা ডাক্তাররা সত্যিই অনেক ঝুঁকি নিয়ে কাজ করি। আজকেই ওয়ার্ডে স্যার সতর্ক করলেন। দু’জন কুকুরে কামড়ানোর রোগী ভর্তি আছে, যদি Rabies হয় তবে মৃত্যুহার ১০০%, এই জীবাণু যার শরিরে ছড়াবে তার মৃত্যুহারও ১০০%। আরেক জন রোগী আছে ডায়াগনোস্ড টিবি। আশেপাশে যারা যাবে ছড়ানোর সম্ভাবনা অনেক। 

এছাড়া হেপাটাইটিস বি ভাইরাস, সি ভাইরাস এসব তো আছেই। আজকেই এক রোগী নিয়ে ডিল করতে এক ডাক্তারের হাতে নিডিল প্রিক হয়ে যায়! এমন সময় অনেক রোগী আসেন যাদের শরিরে পুঁজ হয়ে সেই পুঁজের গন্ধে টিকা যায় না, সেই গন্ধে তার আত্মীয় স্বজনগণ দূরে সরে যায়, কিন্তু আমরা ডাক্তারা ঠিকই প্রচন্ড দুর্গন্ধের মধ্যে রোগীর পাশে দাঁড়িয়ে থেকে পুঁজ করে দিয়ে আসি। এগুলো বলে শেষ করা যাবে না। 

তারপরেও বলবো আমাদের ডাক্তারদের আরো ধৈর্য্যশীল হওয়া উচিত। মানুষের প্রতি আন্তরিক হয়ে অন্তত রোগীর রোগ সম্পর্কে সহজ ভাষায় ভালো মত বুঝিয়ে দেয়া উচিত। অসুস্থ হলে মানুষ অনেক অসহায় হয়ে পড়ে। ওই অবস্থায় একটু আন্তরিকতা, একটু ভালো ব্যাবহার পেলেই বেশিরভাগ রোগীই অনেক খুশি হন। ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই দেখেছি, যেই রোগীর সাথে আমার কলিগ বিরক্ত হয়ে ঝাড়ি দিল, আমি তাকে ডেকে খুব শান্ত ভাবে সহজ ভাষায় বুঝিয়ে দিলাম এবং তিনি সন্তুষ্ট চিত্তে চলে গেলেন। 

আমার নিজের জীবনেই খুব বাজে একটা অভিজ্ঞতা আছে, মেডিকেলে যেদিন ভর্তি হতে গেলাম একজন ডাক্তার (স্যার) আমার সাথে এবং আমার বাবার সাথে খারাপ ব্যাবহার করেন। আমার বাসা থেকে মেডিকেল কলেজ অনেক দূর। বাবার ছুটি জনিত সমস্যার কারণে আমি শেষদিনের আগের দিন ভর্তি হতে যাই। যাওয়ার সময় জাতীয় পত্রিকায় দেয়া বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী সব কাগজপত্র নিয়ে যাই। কিন্তু সেখানে গিয়ে জানতে পারি যে, আরেকটা কাগজ লাগবে। 

কিন্তু সেই মুহূর্তে বাড়ি এসে আবার খুলনায় ব্যাক করার মত সময় ছিল না। স্যার প্রথমেই আমার সাথে রিএক্ট করলেন, কেনো কাগজটা আনি নাই। তখন আমি জানালাম যে স্যার আমি জাতীয় পত্রিকায় দেয়া বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী সব কাগজ এনেছি, কিন্তু এই কাগজের কথা ওখানে লিখা ছিল না, তাই আনা হয়নি।

এটা বলায় কী এমন দোষ হল বুঝলাম না! এবার স্যার আরো ক্ষেপে গেলেন। পাশে বসা এক স্যার এটা দেখেছেন এবং আমাকে ডেকে নিয়ে খুব ন্সেহের সাথে সুন্দর ভাবে বুঝিয়ে দিলেন। অথচ আগের ঐ স্যারকে যখন আমার বাবা রিকোয়েস্ট করতে গিয়েছিল তখন আমার বাবার সাথেও রিএক্ট করেছিলেন। আমরা চেয়েছিলাম অন্তত মুচলেকা দিয়ে হলেও ভর্তি হয়ে পরবর্তীতে বাকি কাগজটা জমা দিবো। ঠিক একই ভুল অন্য একটা মেডিকেলে চান্স পাওয়া আমার এক ফ্রেন্ড করেছে এবং মুচলেকা দিয়ে ভর্তি হয়ে এসেছে। কিন্তু ঐ স্যার অনেকে খারাপ ব্যবহার করেছিলেন।

তখন আমার ছোটো চাচা আর্জেন্ট বিশ ঘন্টা জার্নি করে কাগজটা নিয়ে এসেছিলেন এবং একেবারে শেষদিনের প্রায় শেষ সময়ে গিয়ে ভর্তি হই। না হলে হয়ত আমি মেডিকেলেই ভর্তি হতে পারতাম না! 

আমি সিউর ওই স্যার রোগীদের সাথেও এমন ব্যবহার করেন। আমি কখনো তাঁর মত ডাক্তার হতে চাই না। আমি চাই এই প্রজন্মের কোনো ডাক্তার তাঁর মত না হোক! ডাক্তাররা তাঁদের সততা আর আন্তরিকতা দিয়ে যেমন একসময় ভগবানের কাছাকাছি চলে গিয়েছিলেন, বর্তমানে এ দুটোর অভাবেই ঠিক কসাইয়ের লেভেলে নেমে গেছেন। আমরা কসাই চাই না, আমরা ডাক্তার চাই। ভালো খারাপ মিলিয়েই সব পেশা। 

সুতরাং সবাই যে খারাপ তা নয়, তবে ডাক্তারী পেশায় খারাপের সংখ্যাটা আগে অনেক কম ছিল। লোভ আর অহংকার মানুষের বিবেকবোধ লোপ করে দেয়, কসাইয়ের মত নির্দয় করে দেয়। আমার মনে হয় আমাদের ডাক্তার সমাজের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য ঠিক এ দুটোই দায়ী।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত