ঢাকা      মঙ্গলবার ১৭, জুলাই ২০১৮ - ১, শ্রাবণ, ১৪২৫ - হিজরী



ডা. ফাহমিদা শিরীন নীলা

এমবিবিএস, এফসিপিএস (গাইনী)

ফিগো ফেলো (ইতালি)

গাইনী কনসালট্যান্ট, বগুড়া।


ডাক্তার-রোগী সম্পর্ক 

'হ্যালো ডাক্তার সাহেব, আমাকে যে ওষুধটা দিয়েছিলেন ওটা এখনো খায়নি। ইন্টারনেটে দেখলাম ওটা খেলে নানান সমস্যা হতে পারে। ওটা খাওয়া কি আমার ঠিক হবে?'
- 'জ্বী, প্রত্যেক ওষুধেরই তো কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। আমি ভেবেই দিয়েছি। একটু কষ্ট হতে পারে। আপনি আগে ওষুধ খাওয়া শুরু করেন।'
- 'না মানে ডাক্তার সাহেব প্লিজ আমাকে একটু ভেবেচিন্তে ওষুধ দেন। যদি কোন সমস্যা হয়?'
- 'সমস্যা হলে আমাকে জানাবেন।'
- 'না মানে, আপনি যদি ওষুধের নামগুলো একবার শুনতেন।'
- 'আমি তো এখন ব্যস্ত, আচ্ছা বলেন।'
- 'দাঁড়ান, ডাক্তার সাহেব। এই বাবুর আম্মু, শুনছো, ড্রয়ার থেকে আমার প্রেস্ক্রিপশনটা একটু বের করে আনো তো। ডাক্তার সাহেব, একটু ওয়েট করেন প্লিজ।'
- 'একটু তাড়াতাড়ি করবেন।'

'এই যে, একটু ওয়েট করেন। এই আমার চশমাটা দাও না, বেকুব কোথাকার! ডাক্তার সাহেব, সরি। আপনাকে বলিনি। আমার স্ত্রীকে বলেছি। কিছু মনে করবেন না। মেয়েছেলে নিয়ে আর পারা যায় না বুঝলেন। বুদ্ধি এত কম! এই যে, ওষুধের নামগুলো খেয়াল করেন। হ্যালো ডাক্তার সাহেব শুনছেন?'
- 'হ্যাঁ, হ্যাঁ বলুন।'
- 'এই যে, ট্যাব স-লা-কা-ভ....'
- 'আচ্ছা আচ্ছা, বুঝেছি। প্রবলেম নেই।'
- 'আরেকটা আছে। এটা হল গিয়ে প-ল-চি...'
- 'প্লিজ আপনি প্রেসক্রিপশনটা নিয়ে সরাসরি দেখা করুন।'
- 'আচ্ছা আপনি বোধ হয় বুঝতে পারছেন না। আমি বানান করে বলি প্লিজ ডাক্তার সাহেব, পিএলভি আর এটা যে কী? এম না এন ঠিক বোঝা যাচ্ছে না, আরওসি...'
- 'এভাবে বুঝতে পারছি না। আপনি নিজে আসুন প্লিজ। রাখলাম।'

'ডাক্তার সাহেব, ডাক্তার সাহেব প্লিজ, আমি প্রেসক্রিপশনটা একটু ওষুধের দোকানে নিয়ে যাই? দশ মিনিট লাগবে। প্লিজ দশ মিনিট পরে আমার ফোনটা একটু ধরবেন।'
- 'দশ মিনিট না, আপনি পনের মিনিট পর ফোন দিবেন।'
- 'আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে। এই বাবুর আম্মু, দেখো তো এখন ক'টা বাজে?'

প্রযুক্তির উৎকর্ষতা সর্বপ্রথম যে জনগোষ্ঠীর উপরে আক্ষরিক অর্থে হামলা করেছে, সেটা হল ডাক্তার। মোবাইল আসার পর থেকে এমন কোন ডাক্তার নাই যে দিনে দু'চার-পাঁচটা আজাইরা ফোন পান না।

'ডাক্তার সাহেব, কখন বসবেন? আমার নামের একটা সিরিয়াল দিয়ে রাইখেন প্লিজ।'
- 'স্যার, ঘুমাইতে পারি না। একটা ঘুমের ওষুধের নাম বলে দেন।'
- 'ডাক্তার, পেট ব্যথা করে। কী খাব বল তো?'
- 'ম্যাডাম, এ মাসের পিরিয়ড বন্ধ আছে। কী খাব নামটা একটু বলে দেন।'

আমাকে কিছুদিন আগে এক রোগী ফোন করে বলল, 'ম্যাডাম, তিন বছর আগে আমি আপনার রোগী ছিলাম। আমাকে দেখলেই চিনবেন। এবার হজ্জ্বে যাব তো! পিরিয়ড বন্ধ রাখার ওষুধ খেতে চাচ্ছিলাম একটা। প্লিজ, নামটা যদি বলতেন...।'

এখন আপাত দৃষ্টিতে আপনি মনে করতে পারেন, হজ্জ্ব একটা পবিত্র কাজ, একাজে হেল্প করলেও সওয়াব হয়। ভাই, বুঝলাম। কিন্তু একটা রোগীকে একটা পিল বা হরমোন ওষুধ সাজেষ্ট করার আগে রোগীর ইতিহাস জানাওতো জরুরী। তার হাই-প্রেশার, ডায়াবেটিসসহ অনেক অসুখের কারণেইতো পিল বা হরমোন তার জন্য মারাত্মক সমস্যা ডেকে আনতে পারে।

এগুলো ছাড়াও রোগীর চেহারাও আমাদের কাছে অনেক বড় ফ্যাক্টর। এটা হয়তো নন-মেডিকেল অনেকেই জানেন না। একজন রোগীর চেম্বারে ঢোকা থেকে শুরু করে ওর বাহ্যিক রূপ, হাঁটা, এমনকি তার ফেলে দেয়া থুতু বা কফও আমাদের অনেক ইনফরমেশন দেয় (এই লাইনটা লেখার সময় আমার শ্রদ্ধেয় প্রফেসর রফিকউদ্দিন স্যারের কথা মনে পড়ে গেল, স্যারের আত্মা শান্তিতে থাকুক)। এই এতগুলো কথা তো আর প্রতিটা মোবাইলে চিকিৎসা প্রার্থী রোগীকে বলা সম্ভব না। বলতে হয়, 'চেম্বারে আসুন, লিখে দেব'। ওনারা মাইন্ড করে অন্য ডাক্তারের স্মরণাপন্ন হন। 

কেউ একজন হয়তো বিরক্ত হয়ে কিংবা ভদ্রতার খাতিরে কোন ইতিহাস বা পাতিহাসের তোয়াক্কা না করে মোবাইলে বলে দেন কোন ওষুধের নাম। সেই নাম বলেও কী আর শান্তি আছে? নামের বানান বলে দাও। বি বললে শোনে ডি, ভি বললে শোনে বি। শেষ পর্যন্ত না পেরে বলে এসএমএস করে দাও। এসএমএস দেয়ার পরেও আবার ফোন আসে, ওষুধটা তো একবার করেই খাব, তাই না? আচ্ছা, কোন সমস্যা হবে না তো? আচ্ছা, এটা তো খেতেই থাকব, না কি? যদি কোন সমস্যা হয় তাহলে কী করব?

এদেশের সব ডাক্তারকেই এরকম হাজারো অদ্ভুত আব্দারের উদ্ভট সব প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় মোবাইলে। আমি নিজে মনে করি, যেদিন থেকে মোবাইলে চিকিৎসা দেয়া শুরু হয়েছে সেদিন থেকেই বাংলাদেশে চিকিৎসক-রোগী সম্পর্ক অবনতির বীজ বপন হয়েছে। একজন রোগীর একটা দুইটা সমস্যা ফোনে শুনে উপসর্গ ভিত্তিক চিকিৎসা দিচ্ছি আমরা, রোগী সাময়িক আরাম পেয়ে রোগ পুষছে। রোগ যখন আয়ত্তের বাইরে যাচ্ছে, তখন ডাক্তারের কাছে এসে শুরু হচ্ছে উৎকন্ঠার বহিঃপ্রকাশ।

যুগ যুগ ধরে লালিত বাঙালিসুলভ আচরণে ধৈর্য্যের পরিমাণ কিঞ্চিৎ কম থাকায় আমরা সহজাতভাবেই এক ঝাড়-ফুঁকে অসুখ সারাতে চাই। সেটা তো হয়ই না, বরং ডাক্তার সাহেবরা এক গাদা পরীক্ষা-নিরীক্ষা লিখে দেন ডায়াগনোসিসের জন্য। সারাজীবন সিনেমায় দেখে এসেছি ডাক্তার হাতের নাড়ী ধরেই অসুখের নামসহ পরিণতি পর্যন্ত বলে দেয়। এই ব্যাটারা সরকারের টাকায় লেখাপড়া করেও হাত-পা ধরে রোগটা আবিষ্কার করাও শেখেনি। 

আচ্ছা, না হয় করলাম ক'টা টেস্ট। গেল, আমার হাজার কয়েক টাকা পানিতেই গেল। রিপোর্ট দেখে শালার ডাক্তার পাতা ভরে একগাদা দামী দামী ওষুধ লিখে দিল। ভেবেছিলাম, এক'দু ডোজ খেয়েই হিন্দী সিনেমার নায়কের মত বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে 'লুঙ্গী ড্যান্স' শুরু করতে পারব। তা না, বরং ডাক্তারের নাম্বারে রাত দুটোর সময় ফোন দিলে বেটা ফাজিল হাই তুলতে তুলতে বলে কিনা, 'আগে ডোজ কমপ্লিট করেন'।

'আরে কিচ্ছু না, ঐ শালারা ইচ্ছা করেই ওরকম ওষুধ লেখে যেন আরেকবার ভিজিট নিতে পারে'।

আর এক দু’ সপ্তাহের মধ্যে আরাম পেলে তো পোয়াবারো। 'ডাক্তার তো পয়সার জন্য আবার ডাকবেই ফলোআপে। আমরা কী আর কিছু বুঝি না?' আশে পাশের সবাই বলবে, 'চুপ করে থাক। রোগ কমেছে মিটে গেছে। আমাকেও সাত দিনের ওষুধ দিয়েছিল, তিনদিন খেয়েই আর খেতে হয়নি, অসুখ ভাল হয়ে গেছে।'

কিন্তু, কোনভাবে ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলে তো কথাই নাই। 'আরে হারামজাদা ডাক্তার কী ওষুধ দিল। বমি করতে করতে জান শেষ। হাজার বার ফোন করছি, তাও বলে যে, খেয়ে শেষ করেন। এ শালাকে মারার লোক নাই!'

চেম্বারে এসে সিরিয়াল দিয়েই শুরু হয় হম্বিতম্বি।
- 'আরে একটা রোগী দেখতে এত সময় লাগে নাকি? এতক্ষণ ধরে ডাক্তার কী করে? বসে বসে গল্প করছে মনে হয়।'
- 'তাড়াতাড়ি করতে বলেন। ডাক্তারের সময়ের দাম আছে, আমাদের সময়ের দাম নাই নাকি?'
- 'কত নাম্বার সিরিয়াল গেল? এত রোগী দেখলে হয়? খালি পয়সা কামানোর ধান্ধা!'

চেম্বারে ঢুকে শুরু হয় বক্তৃতা পর্ব। এদেশের রোগীরা শুনতে আসে না কিছু, শুধু বলতে আসে। তারা বলবে, আমরা শুনব এবং তাদের প্রশ্ন মোতাবেক উত্তর দিব। কিন্তু ডাক্তার যে প্রশ্ন করবেন, সেটার বেশির ভাগেরই কোন সদুত্তর দিতে পারবে না। রোগের ইতিহাস শুরু হবে ন্যাংটোকালে উঠানে আছাড় খেয়ে পড়া থেকে আর শেষ হবে ক'দিন ধরে পেটে খালি কুনকুনি ব্যথা আর পাতলা পায়খানা হচ্ছে ডাক্তার সাহেব।

চেম্বারে থেকে বের হয়েই শুরু হবে আস্ফালন।
- 'ক'মিনিট দেখল ডাক্তার সাহেব, পাঁ-চ-শোওও টাকা নিবে?'
- 'কথাই শুনল না তেমন। এতেই এত টাকা? কম নিলে হয় না?'
- হুড়মুড় করে ডাক্তারের চেম্বারে ঢুকে, 'স্যার, প্লিজ কিছু কম নেন। ছ'মাস আগেও তো এসেছিলাম, আমরা তো পুরাতন রোগী। আবার পাঁচশো টাকা দিব?'

এই যে এতক্ষণ ধরে আমার বকবকানি পড়তে পড়তেই আপনারা বিরক্ত হয়ে গেছেন। আর আমরা হতভাগারা আপনাদের এমন অহেতুক আচরণ সহ্য করছি হররোজ। এখন আপনি মনে মনে ভাবছেন, আমরা জীবনেও এমন করি না। এইবার, আসল কথাটা বললেন। আপনি করেন না, খুবই ভাল কথা। আপনার আশেপাশের আরও অনেক মানুষ করছে। ডাক্তার সাহেব বিরক্ত হচ্ছেন, বিরক্তির খানিকটা ভাগ আপনিও পাচ্ছেন। এখন আপনি বলতেই পারেন, এত রোগীর চাপ নেয়ার দরকার কী? 

প্রথম কথা, ভাইরে দেশে রোগী ও ডাক্তারের অনুপাত এখনও অনেক বেশি। চাপ না নিয়ে উপায় কী? আর যদি একক কোন ডাক্তারের কথা বলেন, তাহলে একটা প্রশ্ন করি, ডাক্তার সাহেবের সিরিয়াল আগামী দুই সপ্তাহেও পাওয়া যাবে না জেনেও ঘুরে ঘুরে সপ্তাহের ভেতরেই একটা সিরিয়াল জোগাড়ের চেষ্টা করেন না আপনারা?

বলছিলাম, ডাক্তার রোগী সম্পর্ক নিয়ে, লিখে ফেললাম এক নথি। লেখালেখি করার এই এক অভ্যাস, লেখতে শুরু করলে আর থামতে ইচ্ছা করে না। লেখালেখি প্রসঙ্গ যখন আসল, তখন প্রযুক্তির আরেকটা দিকের কথা বলেই ফেলি, ফেসবুক। শখ করে জনসচেতনতা বাড়ানোর জন্য দু'চারটা কলাম লিখি। ফেসবুকে পোষ্ট করার সাথে সাথেই শুরু হয় কমেন্টস আর মেসেঞ্জারে আমাকে পারশোনাল সমস্যা বলে পরামর্শ চাওয়ার ধুম। 

একটা মজার ঘটনা বলি, আমি ফ্রি থাকলে পারত পক্ষে উত্তর দেয়ার চেষ্টা করি। একদিন এরকম উত্তর দিতে দিতে ক্লান্ত প্রায়। এক মেয়ে এটা সেটা জানতে চেয়ে শেষে বলল, আপনার চেম্বারে আসব, কখন পাব ইত্যাদি ইত্যাদি। যখন ঠিকানা দিয়ে বললাম, ঠিক আছে, আসেন। সে আবার মেসেজ দিল, 'আর একটা কথা, চেম্বারে গেলে আপনি আবার আমাকে ইনজেকশন দিবেন না তো? এর উত্তর কী দেয়া উচিত জানিনা বিধায় চুপ করে মেসেজ না দেখার ভান করে থাকলাম। আজকাল এসব মেসেজের অত্যাচারে মেডিকেলীয় সচেতনতামূলক পোষ্টগুলো দিতে রীতিমত ভয় পাই।

এখন আসি, মূল প্রসঙ্গে। ডাক্তার-রোগী সম্পর্ক প্রতিনিয়ত শুধু খারাপ নয়, ভয়ঙ্কর হচ্ছে। রোগীরা ডাক্তারের দিকে সবসময় মারমুখী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকছে, আর ডাক্তাররা সেটা জানার পরেও রোগি বাঁচানোর জন্য প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। একটা খুব সহজ সূত্র বলে রাখি, আপনি কারিগর হয়ে যেমন কখনো চান না আপনার বানানো শিল্প খারাপ হোক, আপনি শিক্ষক হয়ে যেমন কখনো চান না আপনার ছাত্র ফেল করুক, আমরা ডাক্তার হয়েও কখনো চায় না আমাদের রোগী মারা যাক। 

এখন একটা মরণাপন্ন রোগীকে বাঁচানোর শেষ অস্ত্র আমি প্রয়োগ করলাম তখন, যখন যমদূত এসে দাঁড়িয়ে আছে রোগীর পাশে। আপনি, আমি তো আর যমদূত দেখতে পাচ্ছি না। আমার অস্ত্র প্রয়োগ শেষ হতে না হতেই যমদূত কাজ শেষ করে চলে গেল। আর অমনি আপনারা অস্ত্র তুলে মারা শুরু করলেন আমাকে। ভাই, কাহাতক আর এ সহ্য হয়! কিছু তো জ্ঞান এ ব্যাপারেও অর্জন করুন। আছেই তো আপনাদের সর্বরোগের জ্ঞানদানকারী গুগুল বাবাজী।

একটু চিন্তা করলেই বোঝা যায়, ডাক্তার-রোগী সম্পর্ক খারাপের কারণে সামগ্রিকভাবে আমরা সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। উপায় খুঁজে বের করতে হবে আমাদের সকলকেই। সারাদিন 'গাও মাতা ঘোরায়' শুনতে শুনতে আমার মাথায় ঘিলু আছে খুব সামান্যই। আমার ক্ষুদ্র মস্তিষ্কের পরিশিষ্ট থেকে অল্পকিছু উপায় বের হয়েছে। সাহস করে সেটাই লিখতে বসেছি।

রোগীদের জন্য কী হতে পারে করনীয়?

১. ডাক্তারকে যখন তখন বিরক্ত করা বন্ধ করুন। হোক সে আপনার আত্মীয় বা বন্ধু। ভদ্রতার খাতিরে সে আপনার উপরে বিরক্ত হতে না পারলেও সেই বিরক্তি আরেকজনের ওপর ঝেড়ে দিবে। এ জিনিস আটকে রাখা কষ্টকর।

২. ডাক্তারকে যথাযথ সম্মান এবং সম্মানি দুটোই দিন। আমার ইলেক্ট্রিক মিস্ত্রীও একটা সুইচ চেঞ্জ করে চা-নাস্তা খেয়ে হাসতে হাসতে তার প্রাপ্য সম্মানী আদায় করে নেয়। যাওয়ার সময় তার বাসায় আমন্ত্রণও জানিয়ে যায়, 'ম্যাডাম, আমার ছেলেটাকে দেখতে আসবেন। কবে আসবেন বলেন? আপনার চিকিৎসাতেই তো ছেলে হল, দোয়া রাখবেন। আসি, আসসালামু আলায়কুম।' উল্লেখ্য, ভিজিট দেয়ার ভয়ে সে তার স্ত্রীর চিকিৎসা আমার বাসায় করিয়েছে।

৩. অযথা ডাক্তারের চেম্বারের সামনে বসে তার রোগী আর ভিজিট গুন করে অংকের চর্চা করতে বসবেন না। আপনার বেতন কেউ জানতে চাওয়াটা ঠিক যতটুকু অভদ্রোচিত, এটাও ঠিক তাই।

৪. মারার জন্য ডাক্তারের গায়ে অস্ত্র তোলার আগে ভাবুন কিছুকাল পূর্বেই আপনার প্রিয়জনের গায়ে উনিও অস্ত্র ধরেছিলেন, তবে তা মারার জন্য নয় বাঁচানোর জন্য।

৫. যার কাছে চিকিৎসা নিবেন, তার ওপরে আস্থা রাখুন। একটা কথা সর্বদা মনে রাখবেন, যমদূতের ওপরে ফপরদালালি করার ক্ষমতা আপনারও যেমন নাই ডাক্তারেরও নাই। এতদিন তো শুনে এসেছি, 'রাখে আল্লাহ্‌ মারে কে?' এখন তো দেখি আপনারা সুর তুলেছেন, 'মারে ডাক্তার, রাখে কে?' ভাইরে, ডাক্তারের হাত এখনও অত লম্বা হয়নি।

ডাক্তার হিসেবে আমরা কী করতে পারি?

১. মোবাইলে বা অনলাইনে সব ধরনের চিকিৎসা দেয়া বন্ধ করুন।

২. রোগীদের সাথে যতোটা সম্ভব কুল আচরণের চেষ্টা করুন। রাগ-বিরক্তিকে সহজেই টুপ করে গিলে ফুস করে হজম করার টেকনিক শিখে ফেলুন।

৩. নিজের জানের অতিরিক্ত করে রোগী দেখবেন না। এভাবে রোগীর জন্য নিজের জীবন তেনাতেনা না করে, সীমিত রোগী দেখুন আপনার সাধ্যের মধ্যে। রোগী দিয়ে দিন শুরু আর রোগী দিয়েই শেষ। এই করতে করতে দেখবেন, রোগীর জীবন বাঁচাতে বাঁচাতে একদিন নিজের জীবনই ঠুস করে চলে যাবে।

৪. একমাত্র গরীব রোগী ছাড়া প্রাইভেট চেম্বারে আত্মীয়তা বা বন্ধুত্বের খাতিরে বিনে পয়সায় রোগী দেখবেন না। জানেনই তো, যার উপকার করবেন সেই আপনার দুর্নাম করবে সবার আগে।

৫. নিজের ঢোল নিজে পিটাতে শিখুন। সারাদিন যে রোগীদের জন্য এতকিছু করেন, সেকথা কি কাউকে মুখ ফুটে বলেছেন? বলুন ভাই, বলুন। মার খেয়ে ভুত হওয়ার আগে নিজের মুখ আর কলমের সদ্ব্যবহার করুন।

৬. রোগী একটু জটিল হলেই রিস্ক বন্ড নিয়ে কাজ শুরু করুন। কথায় আছে, 'চাচা আপন প্রাণ বাঁচা'।

৭. নিজেদের মধ্যে সদ্ভাব বজায় রাখুন। ছোটবেলায় পড়া 'একতাই বল' গল্পটা কেন যেন আমরা ভুলে যাই। আর যাই করুন রোগী তো দূরে থাক, ভুলেও কোন নন-মেডিকেল পারসনের সামনে আপনার কলিগের ভুল ধরিয়ে দেবার চেষ্টা করবেন না। সুধরাতে চাইলে আমরা একে অপরকে সুধরাতে পারব, বাইরের কেউ পারবে না।

সরকারের নিকট আকুল আবেদন:

১. আন্তঃক্যাডার বৈষম্য দূর করুন। একই স্কেলের অন্য ক্যাডারের লোক যখন সরকারি গাড়ি হাঁকিয়ে ঘুরে বেড়ায়, তখন ডাক্তারবাবুরা তাদের অতি প্রয়োজনীয় একখানা গাড়ি কেনার পয়সা জোগাড়ের জন্য রোগীর পিছনে ছুটে।

২. জব স্যাটিসফেকশন বলে যে একটা শব্দ আছে, সেটার সাথে বেশিরভাগ ডাক্তারেরই কোন পরিচয় নাই। কেন? কারণ খুঁজে বের করুন, সমাধান আপনাআপনিই বের হয়ে যাবে। যে কাজে আনন্দ পাওয়া যায় না, সে কাজ করতে সবাই গড়িমসি করে।

৩. নিয়মিত প্রমোশনের ব্যবস্থা করুন। নির্দিষ্ট যোগ্যতার ভিত্তিতে একটা নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে প্রমোশনের নিয়ম থাকলে স্ব স্ব স্থানে সবাই দায়িত্বের সাথে কাজ করবে। প্রয়োজনে ভাল কাজের প্রেক্ষিতে দেশে-বিদেশে ট্রেনিং বা অন্য কোন পুরষ্কারের ব্যবস্থা করুন।

৪. এই একটি সেক্টর যেহেতু জনগণের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত, এটাকে রাজনীতি মুক্ত রাখুন। প্রফেশনালিজম ব্যাপারটা টিকিয়ে রাখতে হলে ডাক্তারদের সাথে রাজনীতি বন্ধ করা জরুরী।

৫. স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ঢুকে কেরানীদের দৌরাত্বে কাজই করা যায় না আর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে তো ঢোকাই যায় না। এই দুই জায়গার দুর্নীতি সবার প্রথমে বন্ধ করুন। পেরিফেরীর দুর্নীতি পালানোর পথ খুঁজে পাবে না।

৬. কর্মক্ষেত্রে ডাক্তারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন। জীবন বাজি রেখে রোজ রোজ কেউ মানুষের জীবন বাঁচানোর খেলায় নামবে না।

৭. মেডিকেল কলেজের সংখ্যা দফায় দফায় না বাড়িয়ে যেগুলো আছে সেগুলোর মান নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করুন।

ছোটমুখে অনেক বড় বড় কথা বলে ফেললাম। আমার কোন দোষ নাই কিন্তু সবই আমার অনুর্বর মস্তিষ্কের দোষ। ভুল-ত্রুটি মার্জনা করবেন আশা করি।

পরিশেষে এটুকুই বলতে চাই, মানুষ মাত্রই ভুল হতে পারে। ডাক্তাররাও মানুষ, তাদের ঈশ্বর বা ডেভিল কোনটাই ভাবার কোন অবকাশ নেই। নিজেদের ভুলত্রুটি শুধরে নিয়ে আসুন আমরা হাতে হাত মিলিয়ে চলি। কেউ বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন না যে, আর এক মুহূর্ত পরে আপনার কোন ডাক্তারের প্রয়োজন পড়বে না। আর জরুরী প্রয়োজনে আপনার পাশে বিদেশী ডাক্তার থাকার সম্ভাবনা খুবই কম। তাই, সুস্থভাবে বাঁচতে হলে নিজের দেশের ডাক্তারদের উপর আস্থা রাখুন। ভাল থাকুন, সুস্থ থাকুন।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

‘জান্নাতের পাখি হয়ে ভালো থাকুক রাফা’

‘জান্নাতের পাখি হয়ে ভালো থাকুক রাফা’

রাফা। এ দুই শব্দের নামের প্রতি মেডিকেল শিক্ষার্থী চিকিৎসকদের কী যে টান!…

বন্ধুকে হারাতে চাই না

বন্ধুকে হারাতে চাই না

স্বপ্নের জগতে বাস করে না কিংবা স্বপ্ন দেখে না এমন মানুষ পৃথিবীতে…

ডাক্তারদের শত্রু ডাক্তাররাই

ডাক্তারদের শত্রু ডাক্তাররাই

আমদের চিকিৎসকদের সবচেয়ে বড় শত্রু আমরা নিজেরাই। আমদের মাঝে পারষ্পরিক শ্রদ্ধাবোধের তীব্র…

আর যাই হোস্ ডাক্তার হইস না

আর যাই হোস্ ডাক্তার হইস না

চিকিৎসকরা হইলো গোবেচারা সম্প্রদায়। কলুর বলদ। রোগীদের জন্য খেটে যায় দিনরাত... অথচ…

পারিবারিক কলহ যে কারণে বাড়ছে

পারিবারিক কলহ যে কারণে বাড়ছে

বিথী, বয়স ২৪। তার ভাষ্যমতে সে মা বাবার খুব আদুরে মেয়ে। অবাধ…

ভিটামিন বি১৭ এর অভাবে ক্যান্সার একটা গাঁজাখুরি কথা

ভিটামিন বি১৭ এর অভাবে ক্যান্সার একটা গাঁজাখুরি কথা

কয়েকদিন ধরে একটা ভুয়া খবর বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। সেটা হলো- ‘ক্যান্সার কোন…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর