ঢাকা      রবিবার ১৬, ডিসেম্বর ২০১৮ - ২, পৌষ, ১৪২৫ - হিজরী



ডা. ফাহিম উদ্দিন

ইন্টার্ন চিকিৎসক

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।


ডায়রিয়া রোগীকে কখন কলেরা স্যালাইন দেয়া হয়?

কলেরা হলো এক ধরনের সিক্রেটরী ডায়রিয়া যা Vibrio cholerae নামক ব্যাক্টেরিয়ার আক্রমনে হয়ে থাকে। এই Vibrio cholerae এর আবার ২০০ এর বেশি সেরোটাইপ আছে। কোনো রোগীর কলেরা হলে সাধারণত প্রচন্ড ডায়ারিয়া, বমি, পেটে ব্যথা ইত্যাদি সমস্যা দেখা দেয়। তখন তাদেরকে কলেরা স্যালাইন দেয়া হয়। 

আবার কলেো ছাড়াও অন্য কোনো ইনফেকশনে (ভাইরাস/ব্যাক্টেরিয়া দ্বারা) প্রচন্ড ডায়রিয়া হলেও এই কলেরা স্যালাইন দেয়া হয়। তার ব্যাখা নিচে দেয়া হবে ইনশ্আল্লাহ। তার আগে ডায়রিয়া সম্পর্কে প্রাথমিক কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করছি। 

সাধারণত একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ প্রতিদিন প্রায় ১ লিটার ফ্লুইড ইনটেক করে থাকেন। পাশাপাশি আমাদের Saliva আর Stomach, Pancreas & Liver এর সিক্রেসনের আরো ৭ লিটার ফ্লুইড। এই মোট প্রায় ৯ লিটার ফ্লুইড প্রতিদিন আমাদের ইন্টেস্টাইনে যাচ্ছে। ইন্টেস্টাইনের villi-তে প্রতিনিয়তই প্রচুর water & electrolyte এবসর্পসন হচ্ছে, আবার ইন্টেস্টাইনের crypts of Lieberkuhn থেকে প্রতিনিয়ত প্রচুর water & electrolyte সিক্রেসন হচ্ছে। 

কিন্তু ফ্লুইড সিক্রেসনের চেয়ে এবসর্পসন বেশি হওয়ায় নেট রেজাল্ট হল- ফ্লুইড এবসর্পসন। প্রায় >৯০% ফ্লুইড স্মল ইন্টেস্টাইনেই এবসর্ব হয়ে যায়। সুতরাং বাকি ১ লিটারের মত ফ্লুইড লার্জ ইন্টেস্টাইনে পৌঁছায় এবং সেখানেও ফার্দার এবসর্পসন হয়ে মাত্র ১০০-২০০ মিলি ফ্লুইড স্টুলের সাথে এক্সক্রিট হয়। 

এখন এই absorption, secretion (or,both)-এ কোনো কারণে সমস্যা হলে তখনই ডায়রিয়া দেখা দেয়। আর তখন এই ডায়রিয়া স্টুলের সাথে প্রচুর পরিমানে Sodium, Chloride, Bicarbonate & some Potassium শরির থেকে লস হয়। তাই ডায়রিয়াতে কলেরা স্যালাইন দেয়া হয়। কেননা নরমাল স্যালাইনে শুধুমাত্র Sodium Chloride থাকে। কিন্তু কলেরা স্যালাইনে এর পাশাপাশি Potassium Chloride এবং Sodium Acetate ও থাকে, যা ডায়ারিয়া রোগীর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। 

কারণ, ডায়রিয়াতে স্টুলের সাথে প্রচুর Bicarbonate লস হয় শরির থেকে। নরমাল অবস্থায় আমাদের কিডনি Bicarbonate reabsorption বাড়িয়ে দিয়ে এই বাই কার্বনেট লসকে অনেকটাই মেকআপ করে নেয়। কিন্তু ডায়রিয়া হলে Hypovolumia ডেভেলপ করে Renal Blood Flow কমে যাওয়ায় কিডনির এই কমপেনসেটরি ফাংশনও কমে যায়। যার কারণে শরিরে বাই কার্বনেটের ঘাটতি দেখা দিতে শুরু করে। 

এবার এই ঘাটতি পূরণের জন্য আমাদের শরীর CO2 & H2O থেকে HCO3 তৈরি বাড়িয়ে দেয়। (CO2+H2O > H2CO3 > H+ & HCO3- ). সুতরাং প্রতিবার HCO3- তৈরির সময় শরীরে H+(এসিড) ও তৈরি হবে। ফলে শরীরে মেটাবলিক এসিডোসিস দেখা দিবে। তাই এই মেটাবলিক এসিডোসিসকে প্রিভেন্ট করার জন্য কলেরা স্যালাইনে Sodium Acetate দেয়া থাকে। কেননা Acetate শরিরে গিয়ে (mainly in liver) Bicarbonate এ কনভার্ট হবে এবং বাই কার্বনেটের ঘাটতি পূরণ করবে। 

ডায়রিয়াতে স্টুলের সাথে কিছু পটাশিয়াম লস হয়, আবার হাইপোভলিউমিয়ার ফলে Renal Blood Flow কমে গিয়ে Renin Angiotensin Aldosterone System এক্টিভেট হয়ে Aldosterone রিলিজ বেড়ে যাওয়ায় পটাশিয়াম এক্সক্রিসন বেড়ে গিয়ে পটাশিয়াম লেভেল কমে যাবে। 
কিন্তু ডায়ারিয়ায় যেহেতু Metabolic Acidosis ডেভেলপ করে অর্থাৎ ECF এ H+ বেশি থাকে, তাই Acid Base Buffer এর জন্য H+ ECF থেকে ICF এ প্রবেশ করে(in exchange of K+). 

সুতরাং এর জন্য ব্লাডে পটাশিয়াম লেভেল কিছুটা নরমাল হয় সাময়িক সময়ের জন্য। কিন্তু পরবর্তীতে যখন Bicarbonate(in Cholera Saline) দিয়ে Metabolic Acidosis কারেকশন করা হবে, তখন এই পটাশিয়াম গুলো আবার ICF-এ যেতে শুরু করবে এবং হঠাৎ করে Hypokalemia ডেভেলপ করবে। তাই কলেরা স্যালাইনে Bicarbonate এর সাথে Potassium ও দেয়া থাকে। কেননা Potassium লেভেলে তারতম্য ঘটলে কার্ডিয়াক এরেস্ট হয়ে যেতে পারে। 

তবে যদি কোনো ডায়রিয়া পেশেন্টে ইউরিন আউটপুট খুব কম থাকে/একেবারেই না থাকে, তবে কলেরা স্যালাইন না দিয়ে নরমাল স্যালাইন দেয়াটাই উত্তম। কেননা ইউরিন আউটপুট কম থাকা/না থাকার মানে হল ডায়রিয়া জনিত হাইপোভলিউমিয়া থেকে Renal Blood Flow কমে গিয়ে Acute Renal Failure ডেভেলপ করেছে। আর এক্ষেত্রে কিডনি দিয়ে পটাশিয়াম এক্সক্রিট হতে না পেরে ব্লাডে পটাশিয়াম লেভেল বাড়ার কারণে Hyperkalemia ডেভেলপ করবে। 

সুতরাং তখন কলেরা স্যালাইন ব্যবহার করলে এই হাইপারক্যালেমিয়া আরো এগ্রাভেট করতে পারে (যেহেতু কলেরা স্যালাইনে পটাশিয়াম দেয়া থাকে)। তাই এক্ষেত্রে ডায়রিয়া রোগীকে কলেরা স্যালাইন না দিয়ে নরমাল স্যালাইন দেয়াটাই উত্তম। 

প্রাসঙ্গিক আরেকটা কথা, ওরস্যালাইন (Oral Saline) এর প্যাকেটে গ্লুকোজ কেন দেয়া থাকে? অনেকে মনে করেন শক্তির জন্য গ্লুকোজ দেয়া থাকে। আসলে গ্লুকোজ দেয়া থাকে যাতে Na-Glucose Cotransporter এর মাধ্যমে ইন্টেস্টাইনে Na এর বেটার এবসর্পসন হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

দাওয়াতে গেলে কী খাবেন

দাওয়াতে গেলে কী খাবেন

ডায়েটিং এর সময় আমাদের দাওয়াত, ফাস্টফুড এগুলো নিষেধ থাকে। কিন্তু মাঝে মাঝে…

ক্রিপটোমেনোরিয়া মাসিক যেথা লুকিয়ে রয়

ক্রিপটোমেনোরিয়া মাসিক যেথা লুকিয়ে রয়

রামিসা, চৌদ্দ বছরের টলটলে কিশোরী। ক্লাস নাইনে পড়ে। হাত পা বড় হয়ে…

স্ট্রোক প্রতিরোধে করণীয়

স্ট্রোক প্রতিরোধে করণীয়

আগে স্ট্রোকের রোগী মানেই মাথায় আসতো বুড়ো কোন রোগীর মুখ। ।কিন্তু এই…

আমি তো মরে গেছি, আমাকে গোরস্তানে রাখো

আমি তো মরে গেছি, আমাকে গোরস্তানে রাখো

আমেনা বেগম, বয়স ৪৬।  কিছু দিন পূর্বে জ্বরে ভুগেন।  ৪-৫ দিন জ্বর…

টার্নার সিনড্রোম কী, উপসর্গ ও চিকিৎসা

টার্নার সিনড্রোম কী, উপসর্গ ও চিকিৎসা

ক্রোমোসোমের সমস্যার জন্য টার্নার সিনড্রোম হয়।  মানুষের শরীরের দেহকোষে ৪৬টি ক্রোমোজোম থাকে। …

লাল মাংসের বিপদ

লাল মাংসের বিপদ

লাল মাংস সারা পৃথিবীতেই খুব জনপ্রিয়। আমাদের দেশেও লাল মাংস পছন্দ করেনা…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর