ঢাকা      বৃহস্পতিবার ২০, সেপ্টেম্বর ২০১৮ - ৫, আশ্বিন, ১৪২৫ - হিজরী



মো. আদনান আরিফ সালিম

শিক্ষক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।


অভিশাপ কর্মে নাকি পেশায়?

ডাক্তার, পুলিশ আর শিক্ষক। এই তিন শ্রেণি পেশার মানুষকে সেই শৈশব থেকে গালি খেতে দেখছি। সত্যি বলতে বড় আপা ডাক্তার ছিলেন। পরিবারে বেশ কয়েকজন পুলিশও আছে। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আছেন হাফ ডজন। আমি ডাক্তার কিংবা পুলিশদের চেয়ে শৈশব থেকেই সবচেয়ে বিব্রত এবং বিরক্ত ছিলাম শিক্ষকদের উপর। মানুষ হিসেবে যাঁদের সবচেয়ে আন্তরিক হওয়ার কথা পরিবারে তাদের আচরণ দেখে যার পর নাই বিরক্ত ও বিব্রত হয়েছি। 

তাই শেষ পর্যন্ত নিজে ভেতরে ঢুকে দেখতে চেয়েছি কী আছে এই পেশায়, যে মানুষ এখানে গেলেই আলগা ভাব নিতে থাকে। তারা আমার মত দোপেয়ে মানুষ হলেও কী এমন ঐশ্বরিক শক্তিবলে অমন আলগা ভাব নিতে থাকে। তাদের তো আমারই মত একটা নাক, দুইটা চোখ, একটা মুখ ও দুইটা কানই আছে। তাদের কারো মাথায় তো অতিরিক্ত একটা শিং নাই যে অমন ভাব নিতে হবে।

পাবলিক বাসের ছয় সিট পেছনে থেকে যে ভদ্রলোক ড্রাইভারকে গাড়িচালনার প্রশিক্ষণ দিতে থাকেন মিনিটে মিনিটে... এই ড্রাইভার আস্তে... এই ড্রাইভার অমনে কেউ ব্রেক ধরে, এই এতো জোরে ক্যান, এমন ম্যাউ ম্যাউ করে ঠ্যালাগাড়ি টানছিস ক্যান ফইন্নির পুত। ঐ ভদ্রলোক কী জীবনেও গাড়ির স্টিয়ারিং ধরে দেখেছেন কতটা কঠিন একটা কাজ সেটা? 

তেমনি গুগল সার্চ করে আলগা বুলি কপচানো মানুষটাও জানেন না ডাক্তারি এতো সহজ হলে এতগুলো ছেলেমেয়ে নাওয়া খাওয়া ভুলে বছরের পর বছর বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজে গিয়ে পড়ে থাকতো না, তারা ডাক্তারি না শিখে আপনার মতোই একটা স্মার্টফোন কিনে শুধু গুগল সার্চ দিতো নিজ নিজ চেম্বার নিয়ে বসে। আপনারা না বুঝে আলগা মাতবরি আর ফাপরবাজি করতে যান, এগুলো করতে গেলে তার প্রতিফল হয় পৌণপুণিক। আর সেটাই একটা পর্যায়ে কারণ হয় সর্বনাশের। এর থেকে আপনি যদি নিজেকে না বাঁচাতে চান আপনি যদি নিজেই নিজের পায়ে কুড়াল চালান, আপনাকে এ বিপদ থেকে রক্ষা করে সাধ্য কার।

স্কুলে থাকতে, খুব সম্ভবত ক্লাস সেভেনে পড়ি; বিতর্ক প্রতিযোগিতায় রাজশাহী গিয়েছিলাম। সেখানে জনৈক টাকলু শিক্ষকের কাণ্ড দেখে মনে হয়েছিল জুতাপেটা করে ওর দুই গালের সবগুলো হাড্ডি গুড়ো করে দেই কিংবা ঘুষি মেরে নাকে জিওগ্রাফি পাল্টে দেই। কৈশোরের অপরিণত বুদ্ধি অপচিকির্ষা ভেবে থেমে গেছিলাম সেখানে। এরপর আরও নানা ঘটনা ঘটেছে। নামের আগে শুধু রেলগাড়ির ইঞ্জিনের মত একটা ড এ ডট (ড.) আছে তাই কী ভাব। দেখে মনে হয় উহারাই মানুষ বাকিরা এক একজন খবিশ।

মনের মধ্যে যতোই পশুর হিংস্রতা থাক হাঁটার সময় তো দুই পায়েই চলতাম তাই পরিবার কিংবা পরিবারের বাইরের এসব শিক্ষক নামের ছোট লোকগুলোকে চড়-থাপ্পড় কিংবা গুঁতো মারিনি। আমি আমার মত চুপচাপ থাকতাম, শান্তিতে লেখাপড়া করে যেতাম হয়ত। শুধু এদের কুকর্ম দেখেই একদিন, সেই ক্লাস ফাইভে থাকতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম শিক্ষক হতে হবে। এবং অবশ্যই কোনো স্কুলের শিক্ষক নয় এক্সট্রা ভাব নেয়া স্থুলবুদ্ধির ঐসব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকই হতে হবে। 

এরপর আস্তে আস্তে সময় এগিয়ে বাকিটা অগ্রন্থিত ইতিহাস হয়ে গেছে। আমি শৈশব থেকে শিক্ষকদের সবচেয়ে অপছন্দ করি বলেই শিক্ষক হতে চেয়েছি এটা যেমন সত্য তেমনি আমার কাছে সবচেয় সম্মানিত, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং বাবা-মায়ের মর্যাদায় আসীন হাতেগনা যে কয়েকজন মানুষ আছেন তাঁরা প্রত্যেকেই শিক্ষক।

একটা বিষয় ভেবে অবাক হই আমি যেমন সত্যটা স্বীকার করে দিলাম এই সৎ সাহস হয়ত কারো মধ্যে পাবেন না। এই ধরুন, যে পেটমোটা লোকটি কিংবা বাচ্চাহাতি সাইজের মহিলা হাশফাশ করতে করতে বার্ডেমের সিঁড়ি ভাঙ্গেন প্রতি সকালে তিনিও স্বপ্ন দেখেন তার ছেলে ইঞ্জিনিয়ার আর মেয়ে ডাক্তার হোক। কিন্তু তাঁর গালির তালিকার শীর্ষে থাকেন এই ডাক্তাররাই। এঁরা কোন আক্ষেপ থেকে গালাগাল করেন সেটা তাঁরাই জানেন, তবে এটা জানেন না যে দেশের কতটা সর্বনাশ ডেকে আনছেন তাঁরাই। 

ধরুন আজীবন ডাক্তারকে গালি দেয়া ঐ মোটা দম্পতির মেয়েও কোনো একটা প্রাইভেট মেডিক্যাল থেকে টাকার জোরে একটা ডাক্তারির সনদ জুটিয়েই ফেললো! সে কি আদৌ কোনো ডাক্তার হবে! শুধু একটা সনদের জোরে শুধু রোগীর সঙ্গে গুণ্ডামি করার সুযোগ পাবে। তার মা-বাবা যেভাবে অন্যদের গালি দিয়ে এসেছে সে এমন কিছু করবে অন্য সব রোগী যেন তার মা-বাবার পথ অনুসরণ করে তাকে গালি দেয়।

ইতিহাস বলছে ঔপনিবেশিক অঞ্চলে জাতীয়তাবাদ যখন প্রতিষ্ঠা লাভ করে সেখানে যে স্বেচ্ছাচার এবং স্বৈরতন্ত্র বিকাশ লাভ করে সংখ্যালঘুদের ওপর চড়াও হয় তা উপনিবেশ থেকেও ভয়াবহ। একইভাবে ডাক্তারদের গালি দেয়া এসব মানুষের সন্তান আত্মপ্রকাশ করে কসাই হিসেবে। শৈশব থেকে পুলিশকে ভয় পাওয়া কোনো মানুষ একবার পুলিশ হলে তার প্রথম স্বপ্ন থাকে মানুষকে ভয় দেখানো। আর শেষ পর্যন্ত এই ভয় দেখাতে গিয়ে সে সবই করে। 

আমি স্কুল থেকে চেষ্টা করেছি শিক্ষকদের সঙ্গে সমঝোতা করতে। আমি প্রতিবাদ করেছি স্যারদের নানা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে। কিন্তু প্রত্যেকে তাঁদের সীমাবদ্ধতার কথা বলতেন। আর বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পর ফাঁকিবাজ শিক্ষকদের কাছে একটা কথাই বারংবার শুনে এসেছি সেটা তাদের কাজের অযুহাত। পাশাপাশি এটাও তারা বলেছেন শিক্ষক হওয়া অত সোজা নয়, এর জন্য অনেক কাঠখড় পোড়ানো লাগে।

কাঠখড়ের পাশাপাশি কয়লা, কেরোসিন, অকটেন, পেট্রোল এবং যত সম্ভব জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়িয়ে একটা পর্যায়ে এসে আমিও শিক্ষক হয়ে গেলাম। ক্লাস নিতে গিয়ে হাড়ে হাড়ে টের পাই মুখে বলা যতটা সহজ, কাজ করে দেখানোটা তার চেয়ে ঢের কঠিন। আমি এতো চেষ্টা করার পরেও ৭-৮ জন শিক্ষার্থী আমার কোর্সে ডাবল জিরো পেয়েছেন। বাস্তবে উনাদের চেহারাও আমি কোনোদিন দেখিনি। একইভাবে ডাক্তাররা কোন বিশেষ পরিস্থিতিতে থেকে ক্ষেপে যান, সেটা বোঝার সক্ষমতা সাধারণ মানুষের নাই। 

সব বাদ দেন অনারারি মেডিক্যাল অফিসার নামক আপদের কথা ধরুন। প্রাণিজগতে সান্ডার পর এই বিশেষ প্রাণি আছেন যাঁদের খাওয়া লাগে না, ঘুম লাগে না, মাস শেষে বেতন লাগে না। উনারা বাই বর্ন মানুষের সেবা দিয়ে যাবেন আর একটা ডিগ্রির লোভে মানববেতর জীবন যাপন করবেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বিভিন্ন ইউনিটে।

ধরুন কিছু একটা করায় জনৈক গুগল ডাক্তারের গার্লফ্রেন্ডের পেটে বাম পাশটায় ব্যথা উঠেছে। তিনি পড়েন রাষ্ট্রবিজ্ঞানে। ডাক্তারের কাছে আসার পর কেঁউ কেঁউ শুরু করলেন... কার্ডিওভাস্কুলার আর্টারিওসিস্কো ক্যাটকুকালার কোডিওসিস, কুটাকুক্যাটকো গ্যাটকোসিন, আর্থাইটাইটসহ নানা ইতিউতি শব্দে। ডাক্তার ক্ষেপে গিয়ে কষে একটা ধমক দিলেন। তারপর ঐ গুগল ডাক্তারের বন্ধু কোনো নামী পত্রিকা কিংবা টেলিভিশনের সাংবাদিক। সে ক্ষেপে গিয়ে ডাক্তারের বিরুদ্ধে নিউজ শুরু করলো। এরপর সব ডাক্তার ক্ষেপে গিয়ে রোগীর চিকিৎসা দেয়া বন্ধ করে দিল। শুরু হয়ে গেলো পাল্টা পাল্টা অভিযোগ। একটু খেয়াল করে দেখুন এতে ক্ষতি হচ্ছে কাদের?

ভাই আপনি বড়লোক, আপনার বহুত খ্যামতা আছে, আপনার ফ্যামিলিতে আছেন প্রচুর দাদা লোক। আপনার ট্যাকে ট্যাকা আছে। আপনি আপনার পাইলস চিকিৎসা করাতে ভারত যান, আমি গরীব আমার জ্বর আসলে প্যারাসিটামল দুই বেলা গেলার পরামর্শ যাদের থেকে নিতে হয় তাঁরা আমাদের দেশেরই ডাক্তার। আমি চাই আপনার পাইলসের চিকিৎসা থেকে দেশের উপকার হোক না হোক, অন্য সবাইকে ক্ষতির মুখে ঠ্যালা বন্ধ করুন। 

দেশের সব ডাক্তার খারাপই যদি হতো এদ্দিন হাসপাতালের চেয়ে দেশে গোরস্তানের সংখ্যা বেশি হতো। আর সব ডাক্তার ভালো হবে এমন গ্যারান্টি দেয়ার সুযোগ নাই। তাই বলে গালাগালি করলেই যে সব সমাধান আপনি পেয়ে যাবেন তার গ্যারান্টিই বা দিচ্ছে কে?

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আমি পড়ি ঠিকই কিন্তু আইটেমের সময় সব ভুলে যাই

আমি পড়ি ঠিকই কিন্তু আইটেমের সময় সব ভুলে যাই

স্যার, আমি মেডিকেলের ৩য় বর্ষের ছাত্রী। মেডিকেলে ইতিমধ্যেই ১ বছর লস করেছি।…

হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার ভয়াবহতা!

হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার ভয়াবহতা!

সার্জারিতে ইন্টার্নশিপ প্রায় শেষ দিকে। এক ব্যাচমেট রিকুয়েস্ট করলো মেডিসিনে তার একটি নন-এডমিশন…

‘ডাক্তার সাব, আপনি স্টেথোস্কোপ কানে লাগাননি’

‘ডাক্তার সাব, আপনি স্টেথোস্কোপ কানে লাগাননি’

১৯৮৫ সনে যখন আমরা এমবিবিএস পাস করার পর ইন-সার্ভিস-ট্রেইনিং করতাম তখন প্রতি…

বাংলাদেশি ডাক্তারদের সেবার কথা এখনো ভুলেনি ইরানিরা! 

বাংলাদেশি ডাক্তারদের সেবার কথা এখনো ভুলেনি ইরানিরা! 

ইরানের ইস্পাহান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘জিহাদে সালামাত’ নামক একটি সংস্থার উদ্যোগে ইরানের পাহাড়ি…

মা তার মেঘে ঢাকা তারা

মা তার মেঘে ঢাকা তারা

শুভ্র মেডিকেলে ফাইনাল ইয়ারে পড়ে তখন। হঠাৎ এক সকালে বাবা তাকে ফোন…

একটা ভুত আমার সামনে দিয়ে কবরখানায় ঢুকে পড়লো!

একটা ভুত আমার সামনে দিয়ে কবরখানায় ঢুকে পড়লো!

খুব সম্ভব ১৯৮২ সনের কথা। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে থার্ড ইয়ারে পড়ি। এল…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর