ঢাকা      বৃহস্পতিবার ২০, সেপ্টেম্বর ২০১৮ - ৫, আশ্বিন, ১৪২৫ - হিজরী



ডা. মোহাম্মদ ইলিয়াস

রেসিডেন্ট (নিউরোলজি), বিএসএমএমইউ


ডাক্তার বনাম সাংবাদিক: উত্তরণ অবশ্যই সম্ভব

দরকার ডাক্তার-আইনজীবী-সাংবাদিক এবং প্রশাসনের যৌথ টাস্কফোর্স এবং মাত্র পাঁচটি করণীয় বাস্তবায়ন।

ছোট্ট একটি কথা দিয়ে শুরু করছি, ‘দেশে দুটি প্রফেশান যখন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়, দুই পেশাই জিতে যায় কিন্তু হেরে যায় দেশ, হেরে যায় পুরা জাতি’ আর কাউকে পরাজিত করা অনেক সহজ কিন্তু জয় করা? খুবই খুবই কঠিন।

ডাক্তার এবং সাংবাদিক এক পেশাজীবী আরেক পেশাজীবীকে জয় করতে হবে, পরাজিত করা নয়। আমি ডাক্তার হলেও অনেক অনেক কাছের মানুষগুলো সাংবাদিক, আর আমার নিজেরও সাংবাদিকতার ছয় মাসের সার্টিফাইড কোর্স করা সেই ২০০৯ সালে।

আবার আক্রান্ত চিকিৎসক। আবার শিরোনামে ডাক্তার এবং সাংবাদিকেরা। ফেসবুকে লেখালেখি, ধর্মঘট, চায়ের টেবিলে ঝড়... আরও কয়েকদিন চলবে। অতঃপর... ধীরে ধীরে সবার আবেগ ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। উচ্ছ্বাস, ঘৃণা, ক্রোধ প্রশমিত হয়ে যাবে।

শেষমেশ, ডা. মুরাদ ভাইয়া এবং ডা. সাদিয়া আপুর নির্মম খুনের ঘটনা, কিংবা মৃত রাইফা বা অন্যান্য রোগীদের মারা যাওয়ার ঘটনাগুলো ও আমার আপনার কাছে নিছক একটি পরিসংখ্যানে পর্যবসিত হবে। কিন্তু আমাদের করণীয় কী কিছু নেই?

সাম্প্রতিক ঘটনাবলী:

চলমান সংঘাতের মূল কারণ– overall demoralization. এটি আমাদের রাষ্ট্রে বা সমাজের কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটা সমাজের সামগ্রিক demoralization এরই একটা বহিঃপ্রকাশ মাত্র। একটা সমাজ যখন ভাঙনের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে, তখনই সমাজের বিভিন্ন অংশগুলো একটি অন্যটির প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়। আমাদের সমাজে সেটাই ঘটতেছে কিন্তু।

দুই.
চলমান সংঘাতের আরেকটি কারণ হচ্ছে- বিশ্বাস করার মত আশ্বাস এবং আশ্বাস পাওয়ার মত বিশ্বাসের যে অভাব। যেটাকে আমরা poor doctor patient relationship বলি। অন্য কথায় breach of faith in doctor patient relationship। এটা হচ্ছে সমাজে বিদ্যমান মানুষে মানুষে, পেশাজীবী–পেশাজীবীতে যে সামগ্রিক আস্থার সঙ্কট চলছে সেটারই উপসর্গ।

তিন.
সাংবাদিক বা ডাক্তারদের সত্যিকারের প্রফেশনাল অর্গানাইজেশান এখনো আমাদের দেশে নেই। প্রফেশনাল অর্গানাইজেশান অন্যান্য দেশে যে ভূমিকা পালন করে সেটা আমাদের দেশে অনুপস্থিত। তথাকথিত প্রফেশনাল সংগঠনগুলো কিন্তু কম বেশি পলিটিক্স নিয়ে ব্যস্ত।

চার.
দুই পক্ষকে এই রকম অলআউট অ্যাটাকে নেমে কার লাভ হচ্ছে সেটা আমরা মোটেই খতিয়ে দেখছি না। চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির সাথে সাথে চিকিৎসার জন্য আমাদের দেশ থেকে বিদেশে রোগীদের গমন (মেডিকেল ট্যুরিজম) অনেক কমে গেছে। একান্ত যাদের হামবড়া ভাব এবং যেসব রোগের সমাধান আসলেই নেই সেটা ছাড়া বাংলাদেশের চিকিৎসা বিজ্ঞান এখন অনেক উন্নত। হেলথ ট্যুরিজম বাড়ানোর জন্য আমাদের মেডিকেল ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার সংকট তৈরি যেন না হয় সেই ব্যাপারে কিন্তু আমাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে পারছি না।

পাঁচ.
ভাল খারাপ সব পেশার মধ্যেই আছে, ডাক্তারদের মধ্যে ও খারাপ ডাক্তার আছেন, আবার সাংবাদিকদের মধ্যে ও খারাপ সাংবাদিক আছে। এক এক ঘটনার ক্ষেত্রে কেস সামারি এক এক রকম। কোথাও ঘটনার জন্য সাংবাদিক দায়ী, আবার কোথাও ডাক্তার দায়ী। আমাদের খারাপ ঘটনাগুলো ওই খারাপ দুইটা মাইনরিটির সংযুক্তির জন্যই কি না– এটা চিন্তা করছি না আমরা। একজন খারাপ মানুষ পেশার জন্য খারাপ হয় না। আগে সে খারাপ মানুষ, তারপর খারাপ ডাক্তার, খারাপ সাংবাদিক বা খারাপ পুলিশ। যে খারাপ তাকে যেই প্রফেশনেই দেন প্রফেশানের বদনাম হবেই। 

চিকিৎসা ব্যবস্থার কয়েকটি প্রধান সমস্যা:

১. মিডিয়া পলিসি একটা বড় প্রবলেম। যেমন কুকুর মানুষকে কামড় দিলে সাংবাদিকতার নিয়মানুযায়ী সেটি কোন নিউজ না, কিন্তু মানুষ কুকুরকে কামড় দিলে সেটা হেডলাইন। একইভাবে ‘ডাক্তাররা সার্ভিস দিবেন, দায়িত্বশীলতা নিয়ে কাজ করবেন, রোগী বাঁচাবেন, রাত জেগে সার্ভিস দিবেন এটা তো বাই ডিফল্ট জব, এবং এটা কোন নিউজ হবে কেন? এর উল্টা হলেই সেটাই বরং নিউজ হবে’ এই দর্শনের সংস্কার জরুরী। সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে পাবলিক ইন্টারেস্টের পাশাপাশি কমিউনিটি ইণ্টারেস্ট ও বড় ধরণের বিবেচ্য বিষয়।

২. আমাদের সাধারণ জনগণের মধ্যে রোগ সম্পর্কে সচেতনতার যথেষ্ট অভাব আছে। মিডিয়াতে আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতনতামূলক প্রোগ্রাম হলেও এখনো এটা আপ টু মার্ক না।

৩. ডাক্তার, সাংবাদিক সবাই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে বিভক্ত হয়ে যাওয়া এবং সে কারণে সত্যিকারের অ-রাজনৈতিক পেশাদার প্রতিষ্ঠান গড়ে না উঠায় চিকিৎসা ব্যবস্থার চেক এন্ড ব্যালেন্স হচ্ছে না, হচ্ছে না দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা।

অনেক ডাক্তার এবং সাংবাদিকদের সবচেয়ে খারাপ এবং নষ্ট পেশাজীবী হিসেবে আখ্যায়িত করতে চান। আমি বলব– হ্যাঁ, এই ধরনের অপবাদ দেওয়া খুব সহজ। সাংবাদিকদের মধ্যে রাজনীতি আছে, তাদের মধ্যে সংঘর্ষ আছে, হলুদ সাংবাদিকতা আছে। কিন্তু সাগর-রুনির বিচারের দাবীতে মোটামুটি সবাই একই প্লাটফর্মে চলে এসেছিল। এমনকি আমি টিভিতে এটিএন বাংলার সিনিয়র সাংবাদিক এবং এডিটর জ ই মামুনকে দেখেছিলাম- তার কর্তৃপক্ষের (এটিএন চেয়ারম্যান) বিরুদ্ধে বজ্রকণ্ঠে আওয়াজ তুলতে।

কিন্তু ডাক্তার সমাজে এই ঐক্যতা হয়ত একটু কম। আমাদেরও অনেক সাগর-রুনি ছিল, ডা. মুরাদ ভাই এবং ডা. সাজিয়া আপুরা (উত্তরায় একটি ক্লিনিকে সিলেট মেডিকেল এর যেই মেধাবী ডাক্তার আপুটাকে রেইপ করার পর হত্যা করা হয়েছিল) ছিল। কিন্তু আমরা এক হতে পারিনি। আমরা এমন কোন নন-পলিটিক্যাল প্লাটফর্ম খুঁজে পাইনি যেখান থেকে আমরা একটি অভিন্ন কর্মসূচির ডাক দিতে পারি। আর এ ক্ষেত্রে বিএমএ, স্বাচিপ, এনডিএফ বা ড্যাবের মত প্রতিষ্ঠানগুলো রিয়েক্টিভ ভূমিকা পালন করলেও প্রোএক্টিভ ভূমিকা কিন্তু রাখতে পারছে না। আর এই না পারার কারণ কার্যকর প্রফেশনাল সংগঠনের অনুপস্থিতি।

আবার সাংবাদিকদের পেশাজীবী সংগঠনগুলোও প্রফেশনাল রেস্পন্সিবিলিটি এবং দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা করতে পারছে না। জবাবদিহিতা এবং স্বচ্ছতা না থাকায়, কমুনিটি ইন্টারেস্টের চেয়ে চটকদার নিউজই প্রায়োরিটি পাচ্ছে। 

ডাক্তার এবং সাংবাদিকদের প্রফেশনাল অর্গানাইজেশান যা করবে:

১. প্রফেশানের জন্য নিজস্ব কোড অফ কন্ডাক্ট তৈরি। যেমন, ডাক্তার-রোগী, ডাক্তার–ফার্মাসিউটিক্যালস, ডাক্তার–ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ডাক্তার–হাসপাতাল সম্পর্কের সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন, এক কথায় National guideline for Medical Laws & Ethics তৈরি করা। জাতি আমাদের কাছ থেকে এই ব্যাখ্যা আজ হোক কাল হোক চাইবে। আমাদের বার্ষিক ইনভেস্টিগেশন কস্টের ৭৩০ কোটি টাকার (দৈনিক ২ কোটি টাকা) কত অংশ ডাক্তারেরা পান, আর কত অংশ ডায়াগনস্টিক সেন্টার পান আর কত অংশ রোগীরা ছাড় পান। এই টাকার যত অংশই ডাক্তারেরা পান না কেন, নিজেদের আরও transparent রাখার জন্য এই ব্যাপারগুলো জাতির কাছে ক্লিয়ার করতে হবে। 

আমাদের বার্ষিক ড্রাগ ব্যবসার (এ জাতি কর্তৃক এক বছরে কেনা ঔষধের মূল্য) ১০,০০০ কোটি টাকার কত অংশ ডাক্তারেরা পান, আর কত অংশ ফার্মাসিউটিক্যালসরা পান এটাও জাতি আমাদের কাছ থেকে জানতে চাইতে পারে। আমরা ভাল করেই জানি, হাসপাতাল ব্যবসা বলেন আর ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ব্যবসা, কোনটারই মূল সুবিধাভোগী ব্যবসায়ীরা ডাক্তারেরা নন। ডাক্তারেরা যেটা পান সেটা মূল ব্যবসার আইসবার্গ মাত্র। আর এই বিষয়গুলোই জাতির সামনে উপস্থাপন করতে পারেন দায়িত্বশীল সাংবাদিকরা।

২. ‘ডাক্তারের ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু’–এসব কথা কোনোভাবেই নন ডাক্তারেরা বুঝতে পারেন না। ভুল চিকিৎসা হয়েছে কি না, এটা যাচাই করতেই তো কমপক্ষে একাধিক ডাক্তার দরকার। হুটহাট তদন্ত ব্যতিরেকে এই ধরনের কথা যেন কেউই না বলে সে জন্য আইন দরকার। ডাক্তার–আইনজীবী–সাংবাদিক এবং প্রশাসন সমন্বয়ে যৌথ টাস্কফোর্স বা সার্ভিল্যান্স টিম গঠন করতে হবে। 

কোথাও ভুল চিকিৎসার অভিযোগ উঠলে সে ক্ষেত্রে এই যৌথ টাস্কফোর্সের তদন্ত ছাড়া কেউ যেন মতামত দিতে না পারেন সেটা নিশ্চিত করবে এই টাস্কফোর্স। টাস্কফোর্সের অফিশিয়াল বক্তব্য ছাড়া অন্যরা যাতে যাচ্ছেতাই মতামত দিতে না পারে, এটা নিশ্চিত করতে হবে। সবাইকে নিয়েই যেহেতু সমাজ, তাই মাল্টি ডিসিপ্লিনারি টিমই দরকার। সবাইকে নিয়েই আমাদের চলতে হবে, সমাজ থেকে কোন একটি পেশাজীবীকে ও আমরা ডিলিট করে দিতে পারি না। এই মাল্টি ডিসিপ্লিনারি টিমের সমন্বয় আর যৌথ বিবৃতি ভুল বোঝাবুঝি কমে আসবে শূন্যের কোটায়।

৩. ডাক্তার এবং সাংবাদিক উভয়েরই নিজস্ব প্রফেশনাল লেজিসলেটিভ বডি গঠন করা হোক– যেখানে কোন ডাক্তার Malpraxis করলে তাকে রাষ্ট্র বা সমাজ শাস্তি দেওয়ার আগে আমাদের self–correction বা নিজেদের সংশোধনের কাজ করতে হবে, প্রয়োজনে জরিমানা, শাস্তি প্রভৃতি করে আমাদেরকে সমাজের কাছে নিজেদের আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে হবে। আবার সাংবাদিকদের নিজস্ব প্রফেশনাল লেজিসলেটিভ বডি দায়িত্বহীন সংবাদের জন্য সংশ্লিষ্ট রিপোর্টারকে জরিমানা, শাস্তির মাধ্যমে সমাজের কাছে সাংবাদিকতার মহান পেশাকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে হবে।

৪. Medical Ethics, Doctor-Patient Relationship, Patient Counseling, Behavioral Science, patriotic journalism, Social journalism- এসব ব্যাপারে নিয়মিত সিম্পোজিয়াম, সেমিনার, ওয়ার্কশপ আয়োজন এবং নতুন ডাক্তার এবং নবীন সাংবাদিকদের মধ্যে নিয়মিত সচেতনতা সৃষ্টি এবং ক্লাস নিতে হবে। এই বিষয়গুলোর ওপর শর্ট বা লং কোর্স চালু করার পরিকল্পনা নিতে হবে।

৫. ডাক্তারদের নিজস্ব মিডিয়া দরকার। ডাক্তারদের টাকা কম না, অথচ নিজস্ব কোন মিডিয়া নেই। এমন কিছু ইন্টারনেট সাইট থাকতে হবে যেগুলোর মাধ্যমে জনগণের মধ্যে রোগ সমূহের ব্যাপারে জনসচেতনতা সৃষ্টি হবে। মানুষ যখন জানবে Brain stem hemorrhage এর রোগী সাধারণত survive করে না, তখন তাদের কেউ Brain stem hemorrhage এ মারা গেলে ‘ডাক্তারের ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু’ টাইপের ফালতু দাবী অন্তত করবেন না। অন্ততপক্ষে ৫ জন দাবী করলেও ১০ জন সেটার বিরোধিতা করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


সম্পাদকীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে কেন আত্মহত্যা প্রবণতা?

ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে কেন আত্মহত্যা প্রবণতা?

মুশফিক মাহবুব নামে ঢাকা ভার্সিটির এক ছাত্র সম্প্রতি ফেইসবুকে একটি স্টাটাস দেওয়ার…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর