ঢাকা      মঙ্গলবার ১৭, জুলাই ২০১৮ - ১, শ্রাবণ, ১৪২৫ - হিজরী



অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত

নাক কান গলা বিশেষজ্ঞ, সাবেক উপাচার্য, বিএসএমএমইউ


মোবাইল ফোনে যত স্বাস্থ্য ঝুঁকি

পৃথিবীতে বাংলাদেশের মানুষই সবচেয়ে বেশি মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। টেলিরেগুলেটরি কমিশনের মতে, ২০১০ সালে ৬ কোটি ৮৬ লাখ মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করতেন, বর্তমানে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি।

আমাদের মায়েরা এখন মোবাইল দিয়ে বাচ্চাদের খাওয়ায়। বাচ্চারা না খেলে মোবাইলটি ওপেন করে একটা কিছু লাগিয়ে দেন।  সেটা  দেখিয়ে (প্রোগ্রাম)এক ঘণ্টা ধরে খাওয়ান। আর এই একঘণ্টা ধরে সেই শিশুটি কিন্তু মোবাইলের রেডিয়েশনটাও এবজর্ভ (গ্রহণ) করছে নিজের শরীরে। যা পুষ্টি নিচ্ছে তার চেয়ে বেশি পুষ্টি আরও যাচ্ছে।

Electromagnetic radiation from base station antennas of mobile networks and mobiles phones could pose serious health hazards to people, particularly children below 16 years age. অর্থাৎ, ১৬ বছর বয়সের নিচে মোবাইল ফোন ব্যবহার করা কোনো অবস্থাতেই উচিত নয়। এটা আমার কথা না। বিজ্ঞানীদের গবেষণার ফল।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও মোবাইল ফোনের রেডিয়েশন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা বলছে, মোবাইল ফোন যে পরিমাণ রেডিয়েশন দিচ্ছে মাইক্রোওয়েভ ওভেনও ঠিক সেই পরিমাণ রেডিয়েশন দিচ্ছে। এটি কি বিপজ্জনক নয়? আমি বলি খুবই বিপজ্জনক।

মোবাইল ব্যবহারের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

যখন আমরা মোবাইলটি কানে ধরে রাখি তখন কানের পাশের চামড়াটা গরম হয়ে যায়। ১৫ মিনিট ধরে রাখার জন্য রক্ত সঞ্চালন বেড়ে গিয়ে ত্বক আগুনের মতো লাল হয়ে যায়। কান গরম হয়ে যায়। মাথা ব্যাথা শুরু হয়।

এর ফলে যা হচ্ছে, তা আরও ভয়াবহ। আপনি যদি পাঁচ মিনিট এটি ব্যবহার করেন তবে তেমন একটা তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে না। 

কিন্তু ১৫ মিনিট বা ২০ মিনিট যদি মোবাইল ফোনে কথা বলেন তখন আপনার শরীরের তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যাবে। সেটা শরীরেই নয় মাথাতে বাড়ছে। কারণ, আপনি এটা মাথার কাছে রাখছেন। আর দুই ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়া হলো, ব্রেনে ১০৩ ডিগ্রি ফারেনহাইটে বেড়ে যাওয়া।

মোবাইল ফোনের রেডিয়েশন ও মোবাইল এন্টেনার রেডিয়শন দুই ধরণের রেডিয়েশনই ব্যবহারকারীদের শরীরে ঢুকছে। 

ছোট শিশুদের ১০১ ডিগ্রি ফারেনহাইটেই কম্পন শুরু হয়। যার কারণে একটু জ্বর উঠলেই খিচুনি হয়ে যায়। সেই ক্ষেত্রে আপনার মাথার ভেতরে কী পরিমাণ খিচুনিটা হচ্ছে, টিসু মুভমেন্টটা হচ্ছে সেটা চিন্তা করে দেখেন। 

আমরা সবাই জানি, ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট হিরোশিমাতে যখন আণবিক বোমাটা পড়লো তখন ওই এলাকার সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেল। আণবিক বোমার এফেক্টটা কী? তেজস্ক্রিয়তার চেয়েও ১০০ ডিগ্রির তাপমাত্রায় পানি টগবগ করে ফুটে। ১০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সেটি মাটি পুড়ে পাথর হয়ে যাবে। মানুষকে তখন মেশিনে পুড়াইতে হবে না। সাথে সাথেই পুড়ে যাবে।

অনেকে যারা গরম দেখে পানিতে ঝাঁপাইয়া পড়েছিল তারা গরমে সিদ্ধ হয়ে গেল। কারণ, পুকুরের পানিটা তখন টগবগ করে ফুটছিল। তাই এই এনার্জি বা রেডিয়েশনের কিছু অংশ আমাদের এই মোবাইলে রয়েছে। 

মোবাইলে কতক্ষণ কথা বলবেন?

মোবাইল ফোনে কথা ২০ সেকেন্ডের মধ্যে শেষ করতে পারলে সবচেয়ে ভাল। এর বাইরে প্রয়োজনে একটানা সর্বোচ্চ ৩ মিনিট কথা বলা যেতে পারে। তবে পরবর্তী ব্যবহারের আগে ১৫ মিনিট বিরতি দিতে হবে। এতে এই সময়ের মধ্যে মস্তিষ্কের তাপমাত্রা আবার স্বাভাবিক হয়ে আসবে।

মোবাইলে যত স্বাস্থ্য ঝুঁকি:

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, অতিরিক্ত মোবাইল ফোনে কথা বললে ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

অনেক্ষণ মোবাইল ফোনে কথা বললে মাথা ব্যথা, ঘুম না আসা, সহজ বিষয়ও ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। একটানা বেশি সময় ধরে মোবাইল ব্যবহার করার কারণে তিনটা জয়েন্ট অকেজো হচ্ছে- শোল্ডার, এলবো, রিচ জয়েন্ট। 

এখন বাংলাদেশে থাইরয়েডের ক্যান্সার, প্রতিবন্ধী শিশু জন্মগ্রহণ এবং বন্ধ্যাত্ব আগের চেয়ে উল্লেখযোগ্যহারে বাড়ছে। এর সম্ভাব্য প্রধান কারণ হিসেবে তিনি তুলে ধরেন লোকালয়ে অনিরাপদ উচ্চতায় মোবাইল ফোনের টাওয়ার স্থাপন এবং মোবাইল ফোনের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার।

বর্ণ, গন্ধ, শব্দহীন এবং অদৃশ্য মোবাইল টাওয়ারের রেডিয়েশন বা তেজস্ক্রিয় নির্গত বিকিরণ মানবদেহ ও জীব জগতের জন্য ভয়াবহ ক্ষতিকর।বিশেষজ্ঞদের মতে , শিশুদের থেকে কমপক্ষে ৫ ফুট দূরে মোবাইল রাখতে হবে। রাতে ঘুমানোর সময় মোবাইল কমপক্ষে ৭ ফুট দূরে রাখতে হবে। আবাসিক এলাকা থেকে দূরে লোকালয়ের বাইরে কমপক্ষে ৪০ তলা ভবন সমান উঁচুতে মোবাইলের টাওয়ার স্থাপন করতে হবে।

আইসিও ওটিতে মোবাইল ব্যবহার করা উচিত নয়:

সার্জনরা যখন অপারেশন করেন তখন ওটির ভেতর মোবাইল ব্যবহার করা ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, ওই মোবাইলের রেডিয়েশনটা রোগীকে দিচ্ছেন। আর অপারেশনকালীন যেসব মেশিন আমরা ইউজ করি তার ম্যালফাংশনিং হতে পারে। অনেকেই অপারেশন করছেন, ওই সময় অনেকের মোবাইল আসছে। ওই সময় যদি এমন কোনো সংবাদ আসে যে, আপনার ছেলে এক্সিডেন্ট করছে, তখন তিনি কীভাবে অপারেশন কন্টিনিউ করবেন? অথবা আপনার বাবা মারা গেছেন। তখন এ সংবাদ শোনার পর আপনি কীভাবে অপারেশন কন্টিনিউ করবেন? 

পরামর্শ:
১. ২০ সেকেন্ডের মধ্যে কথা শেষ করার চেষ্টা করতে হবে। 

২. একটানা ৩ মিনিটের বেশি কথা না বলা।

৩. ৩মিনিট কথা বলার পর ১৫ মিনিট বিরতি দিয়ে আবার কথা বলা যেতে পারে।

৪. মোবাইল ফোন বাচ্চাদের নাগালের বাহিরে রাখা। কমপক্ষে ৫ ফুট দূরে মোবাইল রাখতে হবে।

৫. রাতে ঘুমানোর সময় মোবাইল কমপক্ষে ৭ ফুট দূরে রাখতে হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


ফিচার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম হওয়া নারী চিকিৎসকের গল্প

পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম হওয়া নারী চিকিৎসকের গল্প

ডা. সুবর্ণ শামীম আলো। একজন মেধাবী চিকিৎসক। লাখ লাখ প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে…

‘জান্নাতের পাখি হয়ে ভালো থাকুক রাফা’

‘জান্নাতের পাখি হয়ে ভালো থাকুক রাফা’

রাফা। এ দুই শব্দের নামের প্রতি মেডিকেল শিক্ষার্থী চিকিৎসকদের কী যে টান!…

রাফার জীবনের শেষ স্ট্যাটাসে তার বাবা!

রাফার জীবনের শেষ স্ট্যাটাসে তার বাবা!

মেডিভয়েস ডেস্ক: মেডিকেল শিক্ষার্থী ও চিকিৎসক সমাজকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেছে…

বিশ্বকাপে সুযোগ পাওয়া এক বাংলাদেশি চিকিৎসকের গল্প

বিশ্বকাপে সুযোগ পাওয়া এক বাংলাদেশি চিকিৎসকের গল্প

বিশ্ব ফুটবল সংস্থা ফিফার বিশ্বকাপ ডোপিং নিয়ন্ত্রক দলের সদস্য হিসেবে দায়িত্বপালন করছেন…

টিভি উপস্থাপিকা ডা. মলির সাফল্যগাঁথা

টিভি উপস্থাপিকা ডা. মলির সাফল্যগাঁথা

ডা. এসএম মলি রেজা। পেশায় চিকিৎসক এই নারী টিভি পর্দার সামনে ও পেছনে কাজ…

গৌরবের ৭৩ বছরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ

গৌরবের ৭৩ বছরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ

মেডিভয়েস ডেস্ক: আজ ১০ জুলাই, ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৭৩ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী।…

আরো সংবাদ














জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর