ডিউটি ডাক্তারদের যত সমস্যা


ডিউটি ডাক্তারদের একটি নির্দলীয় শক্তিশালী সংগঠন দরকার। বেসরকারি ক্লিনিক/হাসপাতালের ঘটনায় বলির পাঁঠা হন ডিউটি ডাক্তারেরা। তাদের কথা বলার কেউ নেই। দেখার কেউ নেই। ডিউটি ডাক্তার থেকে ভাল সেবা পেতে চাইলে তাকে ভাল রাখতে হবে। সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। টক্সিক করলে চলবে না। মালিকপক্ষ তা সামান্য কেয়ার করে। এদেশে বঞ্চিত, নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর অন্য নাম ডিউটি ডাক্তার। বহুমুখী নির্যাতনের কিছু নমুনা হল-

১. মালিক পক্ষ থেকে:
- ৮ ঘন্টা ডিউটির সুবাদে বিনিময় ৭০০/৮০০/৯০০/১০০০ টাকা মাত্র। রিকশা চালালে বেশি ইনকাম করা যায়।
- মাস শেষে পেমেন্ট দিতে নানা অজুহাত। ১০-১২ তারিখের আগে পাওয়ার সম্ভাবনা নাই।
- মালিক পক্ষ কোথাও এডমিনিস্ট্রেটিভ লোকজন সর্বসের্বা। হম্বিতম্বির উপর রাখে। 
- ১ জন ডাক্তারের বিপরীতে ১৫-২০ জন রোগী। চাইলেও সবার কাছে সময়মত পৌঁছা সম্ভব নয়। ম্যাক্সিমাম খারাপ রোগী। আবার নতুন কোন রোগী ভর্তি হলে তাকে দেখে ট্রিটমেন্ট অর্ডার দিতে কমপক্ষে ৩০ মিনিট সময় লাগে। 
- ডিউটি ডাক্তারের অন্যান্য প্রণোদনা কম বা দেয় না। (যেমন নাস্তা-পানি, যাতায়াত সুবিধা, থাকার পরিবেশ সুবিধার না ইত্যাদি)

২. আরেক ধরণের নির্যাতন করে কনসালটেন্ট বা প্রফেসর স্যারেরা:
- রোগী বা রোগীপক্ষের সামনেই যা তা বলে গালিগালাজ, অসৌজন্য আচরণ করে মুড নষ্ট করে দেয়। অধিকাংশই বেহুদা। কারণ ছাড়া বা সিলি কারণে। যেমন- কোন কারণ না পেলে বলবে তোমার এপ্রন নাই কেন? চুল বড় কেন?
- বুঝাবে কম। বলবে কম। লো ভয়েসে। আউটপুট চাইবে তার লেভেলে। ডিউটি ডাক্তার এত কিছু বুঝলে বা জানলে তো প্রফেসরই হয়ে যেত। এখানে ডিউটি করতে আসত না। 
- ফোনে রোগীর ফলো আপ, রিপোর্ট শুনবে। এসএমএস চাইবে হোয়াটস এপে দিতে বলবে। এত কিছু করতে চাইলে ডিউটি ডাক্তার কাজ করবে কখন? রোগী খারাপ হলে বা প্রয়োজনে আবার ফোনে পাওয়া যাবে না। ব্যস্ততার জন্য ধরবেন না। মেসেজ দিলে রেস্পন্স করবেন না। 
- ভিজিটের জন্য সুনির্দিষ্ট সময় অনেকে বলেন না। আবার অনেকেই মধ্যরাতে চেম্বার শেষ করে রাত ১/২ টার পরে ক্লিনিকে ঢুঁ মারেন। বেচারা ডিউটি ডাক্তারকে ততক্ষণ ঝিমাইতে হয়।

৩. রোগী/রোগীপক্ষ:
- প্রাইভেট ক্লিনিকে আসছেন তাই ভাবসাব একটু বেশি। বড় স্যারকে দেখাইছেন। পুঁচকে ডাক্তারকে পাত্তাই দেন না। কিছু জানতে চাইলে বলবে ফাইলে লেখা আছে। অমুক স্যার যা লিখে দিছে তাই করেন।
- ডিউটি ডাক্তারকে মানুষ না ভেবে মেশিন ভাবা হয়। অস্থির। তর সয় না। 
- অনেক সময় ডিউটি ডাক্তারকে চিনতে পারে না। যেমন- এসে অভিযোগ দিল আজ সারাদিন কেবিনে কোন ডাক্তার যায়নি। অথচ ফাইলে দেখা গেল সকাল-সন্ধ্যা ডাক্তার গিয়ে ফলো আপ দিয়ে আসছে। 
- অযথা কারণ ছাড়া বা অতিসচেতনতার কারণে ডাক্তারকে বারবার নক করা। পরে রাখাল ও বাঘের অবস্থা হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
- দিনে বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজন দেখতে আসে রোগীকে। তারা প্রত্যেকেই ডাক্তারের সাথে কথা বলা, অভিযোগ করাকে নিজেদের জন্য ফরজ মনে করে। ফলে ডিউটি ডাক্তারের নাজেহাল অবস্থা।
- কনসালটেন্ট/প্রফেসর কখন আসবে? আবার ফোন দেন। সমস্যার কথা জানাইছেন কিনা? একবার বললেও বারবার বোঝাতে হয়।

৪. নার্স/ওয়ার্ড বয়/এমএলএসএস:
- এরা ট্রেইন্ড আপ না হলে আরেক বিপদ। এককথা একশবার বললেও কাজ হয় না। হু বলতেই ফোন করে। ঠু বলতেই ফাইল নিয়ে আসে। 
- ওয়ার্ড বয়/এমএলএসএসরা ম্যানার বা এটিকেট না জানলে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দেয়। ডিউটি করে শান্তি পাওয়া যায় না।

এগুলো খুবই স্থুল কিছু নমুনা। অভাবের কারণেই সুখ ত্যাগ করে, পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে সময় বের করে জুনিয়র ডাক্তাররা ডিউটি করে। ডিউটি ডাক্তারদের সম্মানী বাড়ানো, সম্মান দেয়াটা অতীব জরুরি। সময় মতো ভালো সেবা পেতে চাইলে ডাক্তার ও রোগীর রেশিও ১:৫ করতে হবে। রোগী/রোগীপক্ষকে বাস্তবতা বুঝতে হবে।