আসিফ শুভ্র

আসিফ শুভ্র

Apollo Hospitals Dhaka For Community

Registrar- Critical Care Department.


০৮ জুলাই, ২০১৮ ০৫:৪০ এএম
গল্প

একজন পাগল আর শিমুল তুলার গল্প

একজন পাগল আর শিমুল তুলার গল্প

১ ফেব্রুয়ারি ২০১৪।

বুঝলেন ভাই! মানুষের দেহ হইলো খোসা। শিমুল তুলার খোসা। খোসা ফাটলে শিমুল তুলাকে কি আর ধইরা রাখা যায়? উড়তে থাকে বাতাসে। ওয় ও আমার কাছ থেকে উইড়া যায়। আমি আটকাইয়া রাখতে পারি না।

কথা বাড়াইয়েন না আর শুভ্র ভাই। রাত দশটা। ছিনতাইয়ে পড়বেন আপ্নে। তাড়াতাড়ি বাসায় ফিইরা যান।

আমি ঘড়ির দিকে তাকালাম। কাঁটায় কাঁটায় রাত দশটা।

সাদিককে সবাই পাগল ডাকে। বুয়েটে পড়তো ছেলেটা। লেভেল টুতে এসেই পাগল হয়ে গেছেl এখন antipsychotic আর antidepressant ড্রাগ খায়l আমার খুব কাছের ছোটো ভাই ছিল ওl

ছেলেটার ভবিষ্যৎবাণী অব্যর্থ হয়। ওর দাবি ভবিষ্যৎ বাণী ও নিজে করে না; কেউ তাকে দিয়ে করায়।

এই  কেউ আসলে যে কে? এটা আজ চার বছরেও বের করতে পারলাম না।

- যা কুত্তা! তাড়াতাড়ি যা,বাড়িত যা। পকেটে ২৭ ট্যাকা নিয়া ঢাকা শহরে চলস কেমনে ? '

সাদিক ভারী গলায় কথাগুলো বলছে। ওর পাগলামি বাড়ছেl

আমি কিছু না বলে ওদের বাসা থেকে বেরিয়ে গেলামl যাওয়ার সময় সাদিকের মা চোখে পানি নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন কী বুঝতেছো বাবা? ছেলেটা আমার দিনদিন অসুস্থ হচ্ছেl ইদানিং পায়ে শেকল দিয়ে রাখি।

সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় আমি মানিব্যাগে হাত দিলাম তন্ন তন্ন করে টাকা গুণে গুণে দেখলাম ২৬ টাকা আমার পকেটে! মনে মনে হাসলাম। সাদিক বহুদিন পর ভুল বললো!

রামপুরায় লোকাল বাস থেকে নেমে সিগারেটের প্যাকেটটা পকেট থেকে বের করলাম হঠাৎ পয়সা পড়ার শব্দে থতমত খেয়ে তাকিয়ে দেখি একটাকার একটা কয়েন সিগারেটের প্যাকেটে ঢুকেছিল!

অর্থাৎ, ২৭ টাকাই আমার পকেটে ছিল। আমি বোবা হয়ে গেলামl

রিকশা ভাড়া পনেরো টাকা শোধ করে বাসার খুব কাছাকাছি এসেই হিজড়া টাইপের তিন ছোকড়া আমার পথ আটকালোl একজনের হাতে একটা চাকু, জং পড়াl আমি তর্কে না গিয়ে মানিব্যাগ, মোবাইল আর ঘড়ি খুলে দিলামl

ছিনতাইকারীদের একজন চিঁকন গলায় বললো লক্ষী পোলা। না দিলে তোর পাছায় একটা জাম্বু পোঁছ দিতাম! তোর মতো ভোটকা মাইনষের পাছায় আমি চাক্কু দিয়া পোঁচ দিয়া খুব মজা পাইl কমোডে বইতে পারবি না একমাস্। হে হ…’

যা! অহনে চুপচাপ বাসায় যা চিক্কুর দিবি তো গুলি করুম তোরে। আমগো কাছে পিস্তলও আছে!

কথা বাড়িয়ে লাভ নাই

দুই.

আমি বসে আছি প্রফেসর খালিদের সামনে। নাম করা সাইকিয়াট্রিস্টl সাদিক তাঁর কাছেই ট্রিটমেন্ট নিচ্ছেl উনি বিড়বিড়িয়ে বললেন, সাদিক অব্যর্থ ভাবে ভবিষ্যত বলে দেয় শুভ্র! সে দাবি করে, সে এসব বলে নাকেও তাকে দিয়ে বলায়l This one is third person , not sadik himself . may be a dead spirit .!

আমাকে গত পরশু বলেছে, তোর বউ তোর ডানগালে থাপড়াইবো!

রাতে আমি সত্যিই বউয়ের হাতে চড় খেয়েছি! আমার ডান গালে মশা বসেছিল হঠাৎ বউ এমন জোরে এক চড় মারলো!

সাদিক নিজেকে ভাঁদল সাঁই বলে মাঝে মধ্যেl আমার যতোদূর মনে হয়, কোনো সুফিতত্ত্বে সাদিক মনোনিবেশ করেছিলো। এজন্যই পাগল হয়ে গেছে। সাধারণ মানুষ সুফিতত্ত্ব ধরতে পারে না!

-স্যার!আমার যতোদূর মনে পড়ে সাদিক লালনের আখড়ায় যেতো। ভান্ডারি গান,  লালন গানের জলসা হলেই সবার আগে ছুটতো ছেলেটা।

-আমারো তাই-ই মনে হয় শুভ্র! কোনো বিদেহী সুফির আত্মা ওর ওপর ভর করে।

-স্যার আপনি আদ্যোপান্ত বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ হয়ে এসব কি বলছেন ?

-মেডিকেল সায়েন্স সব কিছুর ব্যাখ্যা জানে না শুভ্র। চাপাবাজিও করে চিকিৎসা বিজ্ঞান। আমরা সাইকিয়াট্রিস্টরা অনেক রোগই সলভ করতে পারি না। ককটেল থেরাপি চালিয়ে দেই। কমন ওষুধ প্রেসক্রাইব করি! এতে রোগীর ক্ষতিই হয়।

তিন.

আমি লালনের মাজারে এসেছি। আজ তিনদিন ঘুরাঘুরি করছি এদিকওদিক। ভাঁদল সাঁই নামক কোনো সুফিকে কেউই চেনে না।

 

১২ জানুয়ারি২০১৫।

রাত তিনটা। কনকনে ঠাণ্ডা।

লালনের গান শুনতে পাচ্ছি। আমি একটা বটগাছের নিচে বসে আছি একা একা।

লালনের মাজার থেকে জায়গাটা একটু দূরে।

সিগারেট টানছি বিভিন্ন জায়গায় বাউলের দল গান করছে!এরা অবিবাহিত, সংসার ত্যাগী।পরমেশ্বর আর এই দেহের মধ্যে যোগাযোগের খোঁজে ব্যস্ত!সুফিতত্ত্ব আমি বুঝতে চাই না; ভয় পাই।

 

এক বুড়ো বাউল আমার পাশে এসে গান ধরলো-

পাপের পূণ্যে বোঝাই তরী, বহে নদী নিরবধি !

শিমুল তুলার খোসা ছাইড়া পাখি উড়ে শেষ অবধি। '

আমার মেরুদন্ড দিয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেলো' শিমুল তুলা!

খোসা ছাইড়া পাখি!'

আমি নিশ্চিত এটা লালনের গান না  নিজস্ব সুফী তত্ত্ব!

পাপের পূণ্যে তরী বোঝাই হয় কিভাবে? এই রহস্যের সন্ধান কে দেবে?

আমি আস্তে করে উঠে তাঁর কাছে গেলাম বয়স আনুমানিক ৭০ বছর। মাথা ভর্তি জট তাঁর!

বিড়বিড়িয়ে বললাম -চাচা!ভাঁদল সাঁইকে চেনেন আপ্নি!'

আমার দিকে তাকিয়ে চুপ করে বললো, বয় বেটা!চুপচাপ গান শোন্!

গান শুনতে শুনতে আমি ঘোরে পড়ে গেলাম  

তন্দ্রায় আছি মনে হচ্ছে।

তন্দ্রা কেটে যেতে দেখি ভোর হয়ে গেছে। বুড়ো বাউল নেই আর!পাশেই আরেকদল বাউল জটলা করে গান গাচ্ছে, লালনের গান।

আমার শরীর খুব ক্লান্ত লাগছে, এগিয়ে গিয়ে বললাম -ঐ বটগাছের নিচে বসা বুড়ো চাচা ওই যে!যিনি সারারাত গান গাইলেন . উনি কোথায়?

বাউলের দল খুব আশ্চর্য হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললো -বটগাছ!বুড়ো বাউল?

এখানে বটগাছ পাইলেন কৈ! এইটা তো মাঠ! আপ্নি সারারাত এই মাঠেই শুয়েছিলেন। এখানে কেউ গান করেনি আমরা ছাড়া!'

আমি পাশ ফিরে দেখি কোথাউ কোনো বটগাছ নাই।

আমার মাথা ঘুরছে।

আমি বিড়বিড় করে গাইছি -

পাপের পূণ্যে বোঝাই তরী বহে নদী নিরবধি,

শিমুল তুলার খোসা ছাইড়া পাখি উড়ে শেষ অবধি!

 

জুলাই ২০১৫।

আমার পায়েও লোহার শেকল

সবাই আমাকে পাগল ডাকে,

আমি পাগলের ওষুধ খাই!

কিন্তু আমি জানি!আমি পাগল না!

দেহ হলো শিমুল তুলা আমি আপনি খোসায়  

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না