ডা. মোঃ মাকসুদ উল্যাহ্‌

ডা. মোঃ মাকসুদ উল্যাহ্‌

চিকিৎসক, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল


০৭ জুলাই, ২০১৮ ১১:৫১ এএম

সব দোষ চিকিৎসকের কেন?

সব দোষ চিকিৎসকের কেন?

পৃথিবীর অনেক দেশেই প্রতি ২৫০ জন লোকের জন্য একজন ডাক্তার। আর আমাদের দেশে প্রায় আড়াই হাজার লোকের জন্য একজন রেজিস্টার্ড ডাক্তার রয়েছেন। এ দেশে স্বাস্থ্যখাতে সরকারি বাজেট খুবই কম।  সরকারি বাজেটের অন্ততপক্ষে ১৫% স্বাস্থ্যখাতের জন্য বরাদ্দ থাকতে হয়। আমাদের বরাদ্দ ৫%।

তবুও আন্তর্জাতিক সংস্থার গবেষণায় বাংলাদেশের চিকিৎসার মান ভারত-পাকিস্তানের চাইতে উন্নত। এসবই সম্ভব হয়েছে কম বাজেটে এদেশের অল্পসংখ্যক ডাক্তারের কার্যত রুদ্ধশ্বাস পরিশ্রমের কারণে। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে না।
দুই. আগে যখন সিজার অপারেশন ছিল না, তখন অনেক মা মারা যেত। গ্রাম এলাকায় যে ডাক্তার রোগীকে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা করতে দেয় না, সে ডাক্তারের কাছে রোগীকে যেতে দেয় না ফার্মেসি ব্যবসায়ীরা আর ক্লিনিক মালিকেরা! 

রোগী আর সৎ ডাক্তার উভয়েই ক্লিনিক মালিক আর ফার্মেসি ব্যবসায়ীর কাছে জিম্মি। তাদের বলার লোক নেই। তাই সৎভাবে ডাক্তারি করার সুযোগ কই? আর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে টাকা না দিলে আয়া ওয়ার্ডবয় জরুরি প্রয়োজনেও রোগীর হুইল চেয়ার আর ট্রলি আটকে রাখে। তাদের ব্যাপারে কিছু বলার লোক নেই।

কিছু ডাক্তারের অন্যায়ের জন্য লোকেরা ডাক্তারদের সবাইকে গালিগালাজ করে। গালিগালাজ কি সওয়াবের কাজ? তাছাড়া একটি পেশার কিছু লোকের অন্যায়ের জন্য সেই পেশার সবাইকে দোষারোপ করা কি ঠিক? কুরআনেতো আল্লাহ বলেছেন, একে অন্যের বোঝা বহন করবে না! তাহলে? এসব ব্যাপারে কিছু বলুন।

উপজেলার সরকারি হাসপাতালে যদি সব ধরনের চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকতো, তাহলে তো মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের দরকার হতো না! তাহলে গুরুতর অসুস্থ রোগীকে যখন বাস্তবতার খাতিরে যথাযথ চিকিৎসার জন্য পরবর্তী উচ্চতর হাসপাতালে রেফার করা হয়, তখন লোকেরা অনেক সময়ই ডাক্তারের ওপর হামলা করে। তারা বলে, ‘কী … ডাক্তার অইছেন, এই চিকিৎসা দিতে পারেন না!" এভাবেই তারা ডাক্তারের ওপর হামলে পড়ে! 

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, মিথ্যা সার্টিফিকেট না দিলে লোকেরা ডাক্তারকে লাঞ্ছিত করে। জরুরী রোগী হাসপাতালে ভর্তি হলে দেখা যায় এক ঘন্টা পর তার যন্ত্রণা অনেকটাই কমে এসেছে। কিন্তু তখনো তারা অনেকেই বলে, "আমি এখনো কোনো চিকিৎসাই পাইলাম না’।

রোগীর সব কাজ করে দেয়াতো ডাক্তারের দায়িত্ব নয়। হাসপাতালে ভর্তি রোগীরা কোন ওষুধ দিনে কতবার ব্যবহার করবে, কিভাবে ব্যবহার করবে; এগুলো বুঝিয়ে দেয়াতো নার্সদের কাজ! রোগী অভিযোগ করে, তার কষ্ট কমছে না! যাচাই করে দেখা যায়, যে ওষুধ দিনে চারবার সেবন করার কথা ছিল, সেটা রোগী সেবন করছে মাত্র একবার! তাহলে নার্সদের দায়িত্বে অবহেলা নিয়ে কিছু বলুন!

সরকারি হাসপাতালেতো সব সময় সব ওষুধ থাকে না। রোগীরা অনেক মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ফার্মেসি ব্যবসায়ী আর কবিরাজের কাছে সব টাকা বিলিয়ে রোগকে জটিল করে পরে খালি হাতে সরকারি হাসপাতালে এসে কিছু কেনার প্রয়োজন হলে ডাক্তারকে দোষারোপ করে! তাছাড়া রোগ জটিল হওয়ার কারনে ডাক্তারদের তরফ থেকেও আর বেশি কিছু করার থাকে না! অথচ শুরুতেই যদি ডাক্তারের কাছে আসতো, তবে তারা নিজেরাই উপকৃত হতো! এসব বিষয়ে মানুষকে সচেতন করা উচিত।
এসব না করে, অন্য দশজনের মতো সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য একতরফাভাবে ডাক্তারকে দোষারোপ করা উচিত নয়।

ডাক্তার খুনী, এ কথাটা সভ্য সমাজের মানুষের মুখে মানানসই নয়। কেননা ডাক্তার কখনো খুন করার জন্য চিকিৎসা করে না; বরং একজন ডাক্তার সবসময় চায় তার চিকিৎসায় রোগী দ্রুত সেরে উঠুক। কেননা এতে করে তার সুনাম সুখ্যাতি বাড়বে। একই কারণে সে কখনোই চাইবে না যে, তার দ্বারা কোনো ভুল চিকিৎসা হোক, তার কারণে রোগীর কোনো বড় ক্ষতি হোক। পেশাগত সুনাম নষ্ট করতে কে চায়? 

বাস্তবতা হচ্ছে রোগীর অবস্থা যদি শুরু থেকেই মরণাপন্ন থাকে, তবে সঠিক চিকিৎসা দিলেও রোগী মারা যাবে। আর কোনো ওষুধ প্রয়োগ করার পর রোগীর নতুন কোনো উপসর্গ বা লক্ষণ দেখা দিলে বা অবস্থা আরো খারাপ হওয়ার মানেই এই নয় যে, সেটা ওই ওষুধের কারণে হয়েছে।

রোগের নিজের গতিপ্রকৃতির অংশ হিসেবেও নতুন উপসর্গ বা লক্ষণ দেখা দিতে পারে এবং অবস্থা খারাপ হয়ে মারা যেতে পারে। কিন্তু এসব পরিস্থিতিতেই নিয়মিত প্রভাবশালী লোকেরা তাৎক্ষণিকভাবে ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তুলে ডাক্তারকে শারীরিক বা মানসিকভাবে লাঞ্ছিত করছে। ডাক্তারকে হাজতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। গত কয়েক মাস আগে ঢাকা মেডিকেলে ডাক্তারকে আঘাত করে হাত পর্যন্ত ভেঙে ফেলা হয়েছে। 

তদন্তে ভুল প্রমাণিত হলে ডাক্তার ন্যায্য ক্ষতিপূরণ দেবেন। তদন্ত করে যখন দেখা যাবে ডাক্তার সঠিক চিকিৎসাই দিয়েছিলেন, তখন কিভাবে তার ক্ষতিপূরণ হবে? সবচাইতে বড় কথা হচ্ছে, লোকেরা ভুল চিকিৎসার অভিযোগ করে নিজের ধারণার ভিত্তিতে। তারা তো আর ডাক্তার নন, তাই তাদের ধারণা সব সময়ই সত্যি হয় না।

এ সপ্তাহে ৪২তম বিশেষ বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি 

আরও ২০০০ চিকিৎসক নিয়োগের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত