ঢাকা      বৃহস্পতিবার ২২, অগাস্ট ২০১৯ - ৭, ভাদ্র, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. মোঃ মাকসুদ উল্যাহ্‌

চিকিৎসক, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল


ভুল চিকিৎসা কি গাছে ধরে?

চট্টগ্রামে শিশু মৃত্যুর ঘটনাকে ডাক্তার কর্তৃক খুন আখ্যা দিয়ে মানুষ বিভিন্ন পাবলিক পোস্টে যেভাবে ডাক্তারদেরকে গালিগালাজ করতেছে, সেটার নিন্দা জানানোর মতো কোনো ভাষা আমি জানি না। একজন মুমিন-মুসলিমের উচিত, নিজে কী বলতেছি, কী করতেছি, সেটা একটু ফিরে দেখা। পুর্নবিবেচনা করা। 

তারা যা করতেছেন, তা মুসলিম সমাজের জন্য শোভনীয় নয়। কেউ কেউ নিজের মতো করে ডাক্তারি শেখাতে চাচ্ছে সবাইকে। 

ডাক্তার খুনী, এ কথাটা সভ্য সমাজের মানুষের মুখে মানানসই নয়। কেননা ডাক্তার কখনো খুন করার জন্য চিকিৎসা করে না। বরং একজন ডাক্তার সবসময় চায় তার চিকিৎসায় রোগী দ্রুত সেরে উঠুক। এতে করে তার সুনাম সুখ্যাতি বাড়বে। 

একই কারণে সে কখনোই চাইবে না, তার দ্বারা কোনো ভুল চিকিৎসা হোক এবং সে কারণে রোগীর কোনো বড় ক্ষতি হোক। কেননা এতে তার পেশাগত সুনাম নষ্ট হবে, তারও ক্ষতি হবে। 

মানুষ কখনোই একটু ভালো করে ভেবে দেখে না। বাস্তবতা হচ্ছে রোগীর অবস্থা যদি শুরু থেকেই মরনাপন্ন থাকে, তবে সঠিক চিকিৎসা দিলেও রোগী মারা যাবে। 

আর কোনো ওষুধ প্রয়োগ করার পর রোগীর নতুন কোনো উপসর্গ বা লক্ষণ দেখা দিলে বা অবস্থা আরো খারাপ হওয়ার মানেই এই নয় যে, সেটা ওই ওষুধের কারণে হয়েছে। রোগের নিজের গতিপ্রকৃতির অংশ হিসেবেও নতুন উপসর্গ বা লক্ষণ দেখা দিতে পারে এবং অবস্থা খারাপ হয়ে মারা যেতে পারে। 

কিন্তু এসব পরিস্থিতিতেই নিয়মিত প্রভাবশালী লোকেরা তাৎক্ষনিকভাবে ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তুলে ডাক্তারকে শারীরিক বা মানসিকভাবে লাঞ্ছিত করতেছে। অথবা ডাক্তারকে হাজতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। 

তদন্তে ভুল প্রমাণিত হলে তিনি ন্যায্য ক্ষতিপূরণ দিবেন। তদন্ত করে যখন দেখা যাবে ডাক্তার সঠিক চিকিৎসাই দিয়েছিলেন, তখন কিভাবে তার ক্ষতিপূরণ হবে? মুসলিম হয়ে মানুষ যে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করতেছে, তা রীতিমতো ভয়ংকর। 

সবচাইতে বড় কথা হচ্ছে, লোকেরা ভুল চিকিৎসার অভিযোগ করে নিজের ধারণার ভিত্তিতে আর তাদের ধারণা সব সময়ই অবাস্তব, কেননা তারা ডাক্তার নয়। ডাক্তার অনিচ্ছাকৃতভাবে ভুল করতে পারে। কিন্তু সেটা তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হলেই তাকে তিরষ্কার করা যাবে। ক্ষতিপূরণ আদায় করা যাবে। কিন্তু দোষ প্রমাণের আগে ডাক্তারকে লাঞ্ছিত বা হাজতে যেতে হবে কেন? 

মারে ডাক্তার, রাখে কে? নাউজুবিল্লাহ! এ ধরণের কথা উচ্চারণ করা পরিষ্কার শিরক! ডাক্তারের প্রতি অন্ধ ঝাল ঝাড়তে গিয়ে মানুষ কত বড় বড় পাপ করতেছে, তা একবারও ভেবে দেখে না। 

একজন যুবক একটি বাজারে যাওয়ার পথে কিছু লোক তাকে ধরে চোর সাব্যস্ত করলো। চোর চোর বলেলে চিৎকার দিতে থাকল। দেখা গেল চিৎকার চেঁচামেচি শুনে অন্য আরো অনেক লোক এসে তাকে মারতে মারতে এক সময় যুবকটির মৃত্যু হলো! অথচ কেউ একবারের জন্য প্রথমে উপস্থিত লোকদেরকে জিজ্ঞাসা করলো না, কী কারণে আপনারা তাকে চোর বলছেন? সে কী চুরি করেছে? চুরি করা সেই জিনিসটাইবা কই? পরে জানা গেল যুবকটি চোর ছিল না। 

আল কুরআনে সুরা হুজরাতে ৬ নং আয়াতে আছে, ‘কোনো ফাসেক লোক যদি তোমার কাছে কোনো খবর নিয়ে আসে, তা তুমি যাচাই করো। কেননা অন্যথা তোমার দ্বারা অপরাধ হতে পারে, যে কারণে পরে তুমি লজ্জিত হতে পারো।’ 

চট্টগ্রামেও ডাক্তারের সাথে এমন আচরণই করা হয়েছে। হাসপাতালে প্রায়ই ওষুধ প্রয়োগের পর পান থেকে চুন খসলেই রোগীরা সেটাকে রিঅ্যাকশন হিসেবে ভেবে সন্দেহের দৃষ্টিতে আমাদেরকে জিজ্ঞাসা করে, খুব খারাপ লাগে তখন। 

সবাই মনে করে ডাক্তার মানে অনেক টাকা। তাই ডাক্তার হওয়ার চেষ্টা করেও তারা যখন ডাক্তার হতে পারে না, তখন তারা এ ধরণের সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। কিন্তু সভ্য সমাজে কী এগুলো মেনে নেয়া যায়? 

আপনাদের এ ধরণের মন্তব্যের জন্য আল্লাহর কাছে কি জবাবদিহি করতে হবে না?

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


সম্পাদকীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

ডেঙ্গু রোগীদের ব্যবস্থাপনায় মশারীর বিকল্প প্রস্তাব

ডেঙ্গু রোগীদের ব্যবস্থাপনায় মশারীর বিকল্প প্রস্তাব

ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য সব সরকারি হাসপাতাল এবং কিছু কিছু বেসরকারি হাসপাতাল…

ডেঙ্গু নিয়ে ব্যবসা করার চেষ্টা করবেন না 

ডেঙ্গু নিয়ে ব্যবসা করার চেষ্টা করবেন না 

গুজবে কান দেয়া হুজুগে মনুষ্য জাতির এক সহজাত প্রবৃত্তি। এই সুযোগটাকেই কাজে…

বেসরকারি মেডিকেলে ভর্তি প্রক্রিয়া ও কিছু প্রস্তাবনা

বেসরকারি মেডিকেলে ভর্তি প্রক্রিয়া ও কিছু প্রস্তাবনা

কিছুদিন পরেই সকল সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজসমূহে ভর্তি পরীক্ষা। শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের সাথে সাথে…

আরো সংবাদ
























জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর