ঢাকা      বুধবার ২১, নভেম্বর ২০১৮ - ৭, অগ্রাহায়ণ, ১৪২৫ - হিজরী

ক্লাস ফাইভে পড়ার সময়ই বাবা আমার হাতে মাস্টার্সের বই তুলে দেন: ডা. ঈশিতা

মেডিভয়েস ডেস্ক: জার্মানিতে অনুষ্ঠিত নোবেল বিজয়ীদের সম্মেলনে এবার ৩৯ জন নোবেল বিজয়ীর সঙ্গে অংশ নেন বিশ্বের প্রায় ৬০০ তরুণ গবেষক৷ এর মধ্যে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন নবীন ডাক্তার ও গবেষক ডা. ইশরাত রফিক ঈশিতা। পৃথিবীর সব দেশের খুব স্বল্প সংখ্যক অত্যান্ত মেধাবী গবেষক ও বিজ্ঞানীরা এই দুর্লভ সুযোগ পান নোবেল বিজয়ীদের সাক্ষাৎ লাভের। মেডিকেল বিষয়ক ৪৩ গবেষণাপত্রের জন্য লিন্ডাও নোবেল কাউন্সিল তাঁকে বাংলাদেশ থেকে নির্বাচিত করে।

গত ২৯ জুন শুরু হওয়া পাঁচদিনব্যাপী ৬৮তম সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়েছে ফিজিওলজি ও মেডিসিন বিষয়ের ওপর। কমিউনিটি বেজড মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রী অর্জনকারী মেধাবী চিকিৎসক ও গবেষক ডা. ইশরাতের বিশেষ সাক্ষাৎকার।

মেডিভয়েস: মেডিসিনে ক্যারিয়ার করার পেছনে আপনার অনুপ্রেরণা কী ছিল?

ডা. ইশরাত রফিক ঈশিতা: আমার প্রেরণার প্রধান উৎস হচ্ছেন আমার বাবা মা। আমার বাবা খন্দকার রফিকুল ইসলাম ঢাকা ইউনিভার্সিটির একজন গোল্ড মেডেলিস্ট, তিনি আমাকে জীববিজ্ঞানের মৌলিক বিষয়গুলো শিখিয়ে দেন। আমি যখন মাত্র ক্লাস ফাইভে পড়ি, তখনই তিনি তার মাস্টার্সের বই এবং নোট আমার হাতে তুলে দেন। এই বিষয়টা আমার কৌতুহলকে অনেক বাড়িয়ে দেয় এবং একজন বিজ্ঞানীর মত চিন্তা করতে শেখায়।

আমার বয়স ২৪ হওয়ার পূর্বেই আমার ৪৩টা গবেষণামূলক প্রবন্ধ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়। আমার তখন অনুভূতি হয় যে, আমি এমন অনেক কিছুই অর্জন করেছি যা নিজের কাছেই অসম্ভব মনে হত। মেডিকেল গবেষণা অথবা টাকা কামানো এবং প্রতিষ্ঠিত হওয়া– এমবিবিএস পাশ করার পরে আমার সামনে এই দুইটা অপশন ছিল। কিন্তু বরাবরের মতই আমি বেছে নিয়েছিলাম গবেষণাকে।

আমি সবসময় নিজেকে একজন চিকিৎসক, গবেষক ও বিজ্ঞানী মনে করি। ছোট থেকেই আমার তীব্র আগ্রহ ছিল বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও আবিষ্কারের প্রতি এবং তখন থেকেই আমার মেধা এবং পরিশ্রম দিয়ে মানুষের কল্যাণে কাজ করে যেতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলাম। সে কারণেই একজন সফল চিকিৎসক এবং বিখ্যাত গবেষক হওয়াকে আমার লক্ষ্য হিসাবে নিয়েছি।

মেডিভয়েস:   আপনার আদর্শ ব্যক্তিত্ব কারা?

ডা. ইশরাত রফিক ঈশিতা: এক্ষেত্রে আমার সুনির্দিষ্ট কোনও আদর্শ ব্যক্তিত্ব নেই। কারণ প্রতিটা মানুষই আলাদা। তবে মানবতার জন্য অসামান্য অবদান রেখে গেছেন এমন সকল বিখ্যাত ব্যক্তিদেরই আমি অনুসরণ করি। মানুষ হিসাবে আদর্শ কারা এটা বলতে গেলে বলবো, আমার কাছে আদর্শ হচ্ছেন আমার মা ও বড় বোন যিনি আমেরিকার এমআইটিতে পিএইচডি করছেন। আমার মা, হেলেন রফিক মিনু, তাঁর কর্মজীবন এবং ব্যক্তিজীবনের সবকিছু এত ভারসাম্যপূর্ণভাবে সম্পন্ন করেন যার প্রশংসা না করলেই না।

মেডিভয়েস: আপনার ক্যারিয়ারে এ পর্যন্ত কীভাবে আসলেন?

ডা. ইশরাত রফিক ঈশিতা: আমি এমবিবিএস সম্পন্ন করি বাংলাদেশের কমিউনিটি বেজড মেডিকেল কলেজ থেকে। সার্জারির প্রফেসর ডাক্তার কাজল কান্তি চৌধুরী, নাক কান গলা বিভাগের প্রফেসর ডা. এম খান, চর্ম বিভাগের প্রফেসর ডা. হাসিবুর রহমানের কাছ থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি। কমিউনিটি বেজড মেডিকেল কলেজের সকল শিক্ষকের প্রতি আমি অনেক কৃতজ্ঞ। নিপসমের প্রফেসর ডা. বিপুল কৃষ্ণা, সহযোগী অধ্যাপক ডা. মাহমুদুল হক, সহযোগি অধ্যাপক ডা. মাজহার ইসলাম ও সহকারী অধ্যাপক ডা. ফারজানা আরজুমান্দের সাথে কাজ করাটা ছিল অনেক আনন্দের ব্যাপার। আমি তাদের কাছ থেকে প্রচুর বৈজ্ঞানিক কলাকৌশল শিখেছি।

মেডিভয়েস: আপনার গবেষণার সেরা প্রজেক্ট কোনটি?

ডা. ইশরাত রফিক ঈশিতা: ‘Diving & Decompression Illness: Clinical Aspects of 100 Consecutive Cases Treated In A Single Hyperbaric Unit’ (American Journal of Clinical & Experimental Medicine).

এটা আমি Undersea & Hyperbaric Medical Society ফ্লোরিডা ইউএসএ’র বার্ষিক সায়েন্টিফিক মিটিংয়ে প্রথম বাংলাদেশি হাইপারবেরিক ফিজিশিয়ান হিসেবে করি। আমার এই গবেষণা পত্রটি ৫০০০ গবেষণা পত্রের মধ্যে ১৬ তম স্থান দখল করে।

মেডিভয়েস:  আপনার সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তটার কথা বলুন।

ডা. ইশরাত রফিক ঈশিতা: এই মুহূর্তটা হচ্ছে আমি যখন জানতে পারি যে, ‘লিন্ডও নোবেল লরিয়েট মিট’-২০১৮ (জার্মানীতে) এর জন্য আমাকে মনোনিত করা হয়েছে। আমি বুঝতে পারি যে আমি ক্যারিয়ারের সঠিক পথেই আছি। বাংলাদেশ থেকে একমাত্র আমি মনোনীত হয়েছি এই প্রোগ্রামটিতে। পৃথিবীর সবদেশের খুব স্বল্প সংখ্যক অত্যন্ত মেধাবী গবেষক ও বিজ্ঞানীরা এই দুর্লভ সুযোগ পান নোবেল বিজয়ীদের সাক্ষাত লাভের। এছাড়া আমার বইয়ের প্রচ্ছদে আমার ছবি এবং বায়োগ্রাফি যখন দেখি তখনো আমার খুবই ভাল লাগে।

মেডিভয়েস: আপনার সফলতার গল্প শুনতে চাই

ডা. ইশরাত রফিক ঈশিতা: আমি সদস্যপদ লাভ করেছি, আমেরিকান কলেজ অফ হাইপার বেরিক ফিজিশিয়ানস, আমেরিকান মেডিকেল স্টুডেন্ট, অ্যাসোসিয়েশন্স, ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশন ক্যান্সার রিসার্চ, আন্ডারসি এন্ড হারপারবেরিক মেডিকেল সোসাইটি, ওয়াইল্ডারনেস মেডিকেল সোসাইটি-ইউএসএ।

চিকিৎসা বিজ্ঞানে আমার লেখা বই ও গবেষনা প্রবন্ধের সংখ্যা ৪০টি। গবেষনাপত্র প্রকাশিত হয়েছে ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অফ সায়েন্টিফিক এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং রিসার্চ, গ্লোবাল সায়েন্টিফিক জার্নাল, ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অফ রিসেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট, আমেরিকান জার্নাল অফ হেলথ সায়েন্স, আমেরিকান জার্নাল অফ ক্লিনিক্যাল এন্ড এক্সপেরিমেন্টাল মেডিসিন।

গবেষনা প্রবন্ধের উপস্থাপনের জন্য আমন্ত্রিত হয়েছি- আমেরিকা ও ইংলান্ডে এবং নবীন গবেষক হিসেবে আমন্ত্রিত হয়েছি- ‘বায়োম্যাটেরিয়াল ইনোভেশন রিসার্স সেন্টার আয়োজিত ‘মাইক্রো ও ন্যানোটেকনোলজী ফর মেডিসিন’ক্যামব্রিজ ইউএসএ-তে। ‘ক্যান্সার ফ্যাটিগ’ নিয়ে আমার গবেষনা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছি ন্যাশনাল ক্যান্সার রিসার্চ কনফারেন্স, লিভারপুল ইংল্যান্ডে। ‘ক্যান্সার ফ্যাটিগ’ নিয়ে বাংলাদেশে কাজ এই প্রথম এবং এটিই কোন সর্বকনিষ্ঠ চিকিৎসকের প্রকাশিত প্রথম গবেষনাপত্র।

২০১৮ ফেব্রুয়ারিতে আমেরিকান হার্ট ফাউন্ডেশান আয়োজিত কনফারেন্সে গবেষনাপত্র উপস্থাপনার জন্য আমন্ত্রণ পেয়েছি, আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়াতে ও সেনেগালের রাজধানী ডাকারে।

গান, নাচ, আবৃত্তি, ছবি আঁকা ও রচনা লিখন কুইজ কনটেষ্ট অংশ নিয়ে পেয়েছি জাতীয় ও আন্তর্জাতিকসহ অসংখ্য পুরস্কার। গোল্ড মেডেল ও চ্যাম্পিয়ানশীপ গোল্ডকাপ পেয়েছি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকেও। সঙ্গীত- সাধারণ ও উচ্চাঙ্গ দুটো ক্যাটাগরিতেই প্রশিক্ষণ শেষ করেছি বাংলাদেশ শিশু একাডেমী ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী থেকে।

মেডিভয়েস: দৈনন্দিন সময় আপনি কীভাবে অতিবাহিত করেন?

ডা. ইশরাত রফিক ঈশিতা: প্রায় প্রতিদিনই একইরকমভাবে পার হয়। সকালে নামাজের মাধ্যমে আমার দিন শুরু হয়। এর পরে সকালের নাস্তা এবং এককাপ কড়া কফি। তারপরে হারমোনিয়াম আর তানপুরায় সারগাম চর্চা করি। এরপরে হাসপাতালে যাই। অধিকাংশ সময় রোগীদের সাথেই কাটে। এছাড়াও এসাইনমেন্ট রেডি করা ও পাণ্ডুলিপির কাজও থাকে। সন্ধ্যায় বাসায় ফিরি এবং পরিবারের সাথে সময় কাটাই।

মেডিভয়েস: আপনার পরিবার নিয়ে কিছু বলুন?

ডা. ইশরাত রফিক ঈশিতা: পরিবার আমার কাছে সুখ মানেই পরিবারের হাসিমুখ, আমার বাবা খন্দকার রফিকুল ইসলাম সিনিয়ার ফ্যাকাল্টি মেম্বার, বিকেবি, এমএসসি ফাস্ট ক্লাস ফাস্ট, ঢাকা ইউনিভার্সিটি। মা- হেলেন রফিক, এমএমসি ঢাকা চকরছে এমআইটি বোষ্টন আমেরিকাতে।

মেডিভয়েস: আপনার ডাক্তারি পড়াশোনা সম্পর্কে কিছু বলুন।

ডা. ইশরাত রফিক ঈশিতা: হৈ চৈ, আনন্দ, বন্ধুবান্ধব, ফেসবুক, টিভি সিরিয়াল সব কিছু থেকে নিজেকে দূরে রেখে প্রতিদিন ১৮/১৯ ঘন্টা করে পড়াশোনা করতে হয়েছে। সেজন্যই মেডিকেলের কোন পরীক্ষাই একবারের জায়গায় দু’বার দিতে হয়নি আমাকে।

মেডিভয়েস: ক্যারিয়ার নিয়ে আপনার ভবিষ্যত পরিকল্পনা কী?

ডা. ইশরাত রফিক ঈশিতা: আমি এখনো আমার ক্যারিয়ারের প্রাথমিক পর্যায়েই আছি। হারপারবেরিক মেডিসিনে ‘ডক্টর অফ মেডিসিন’ ও ‘ডক্টর অফ অস্টিও প্যাথিক মেডিসিন’ লাইসেন্স পেয়েছি আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনস থেকে (২০১৭)। বাংলাদেশ এই বিষয়ের কোন রেসিডেন্সি কোর্স এখনো চালু হয়নি। আগামী বছর থেকে পিএইচডি শুরু করবো।

আমি নিজেকে একজন সফল চিকিৎসক ও উদ্ভাবনী গবেষক হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। যাতে আমার কাজে অনুপ্রাণিত হয়ে   বিশেষ করে নারী চিকিৎসকগণ চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণা কার্যে   উদ্বুদ্ধ হয়।

মেডিভয়েস: চিকিৎসা বিজ্ঞানের নারী গবেষকদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী?

ডা. ইশরাত রফিক ঈশিতা: নারী গবেষকদের প্রতি পরামর্শ হচ্ছে- ভাল চিকিৎসক, ভালো গবেষক হওয়ার পূর্বে ভালো মানুষ হতে হবে। যে বিষয় মজা পাওয়া যায়, সেটা বাছাই করতে হবে এবং নিজের জন্য যা উপযোগী সেটাই করতে হবে। উচ্চাভিলাষী ও আত্মবিশ্বাসী হতে হবে। কঠোর পরিশ্রম করতে হবে।

মেডিভয়েস: নারী গবেষক বৃদ্ধিতে কী পদক্ষেপ নেয়া দরকার বলে মনে করেন?

ডা. ইশরাত রফিক ঈশিতা: আন্ডারগ্রাজুয়েট পর্যায়ে অনেক ছাত্রী আছে কিন্তু এই সংখ্যাটা পোস্ট গ্রাজুয়েট পর্যায়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় মূলত বয়সের কারণে। এ বয়সে মেয়েদের বিয়ে হয়, বাচ্চাকাচ্চা হয়। আমি মনে করি বিয়ে এবং বাচ্চা হওয়ার পরে মেয়েদের সাপোর্ট দিতে হবে এবং তাঁদের কাজের প্রেশারটা পুরুষদেরও ভাগাভাগি করে নিতে হবে। এছাড়া মেয়েদেকে ছোটবেলা থেকেই গবেষণায় আগ্রহী করে গড়ে তুলতে হবে।

মেডিভয়েস:  আগামী দিনে চিকিৎসা বিজ্ঞানে কোন বিষয়গুলা যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে বলে আপনি মনে করেন।

ডা. ইশরাত রফিক ঈশিতা: Gene Editing, Single Cell Assays, Personalized Medicine.

মেডিভয়েস: গবেষণায় আপনার আগ্রহের বিষয়বস্তু কী কী?

ডা. ইশরাত রফিক ঈশিতা: আমার আগ্রহের বিষয় হচ্ছে পাবলিক হেলথ, ক্যান্সার, হাইপারবেরিক মেডিসিন, দুর্যোগ প্রস্তুতি, প্রশমন ও ব্যবস্থাপনা, মানবিক দ্বন্দ্ব ও সংকট ব্যবস্থাপনা।

মেডিভয়েস: সাক্ষাৎকার দেয়ার জন্য মেডিভয়েসের পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ।

ডা. ইশরাত রফিক ঈশিতা: আপনাদেরকেও ধন্যবাদ।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


আরো সংবাদ














জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর