ডা. এম. ফরহাদ

ডা. এম. ফরহাদ

মেডিসিন ও স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ


০৩ জুলাই, ২০১৮ ১২:১৯ পিএম

ঘাড় ব্যথা করলেই কী হাই প্রেশার?

ঘাড় ব্যথা করলেই কী হাই প্রেশার?

ঘাড় ব্যথার ভুক্তভোগীর সংখ্যা অনেক যা সেই কথাকে মনে করিয়ে দেয় যে ‘ঘাড় থাকলেতো ঘাড়ে ব্যথা হবেই’। ঘাড় ব্যথা নিয়ে মানুষের দুশ্চিন্তার অন্ত নেই। কারণ মাথাই নিয়ন্ত্রণ করে পুরো শরীর, আর সেই মাথাকে ধারণ করে ঘাড়, সেই ঘাড়েই যদি ব্যথা হয়, তাহলে তো ভয়ঙ্কর ব্যাপার। 

বেশির ভাগ মানুষের ধারণা ঘাড় ব্যথা মানেই হাই প্রেশার বা উচ্চ রক্তচাপ। উচ্চ রক্তচাপ বা হাই প্রেশার মানে শরীরের রক্তনালীর ওপর রক্ত সঞ্চালনের অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হওয়া। তাহলে উচ্চ রক্তচাপে ঘাড় ব্যথা হবে কেন?

তার মানে সাধারণ মানুষ যা মনে করে তা কি ভুল? কিন্তু আমরাতো জানি যাহা রটে তাহা কিছুটা হলেও বটে, তাহলে এই রটনার সত্যতা যাচাই করা যাক। আসুন দেখে নেই কী কী কারণে ঘাড় ব্যথা হতে পারে। 

ঘাড় ব্যথার কারণ:
ঘাড় ব্যথার অনেক কারণ আছে তাদেরকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়ঃ-
১. ঘাড়ের নিজস্ব কারণে ঘাড় ব্যথা।
২. অন্য অঙ্গের রোগে ঘাড় ব্যথা।

ঘাড় ব্যথার নিজস্ব কারণঃ
১. ঘাড়ের অস্বাভাবিক পজিশনঃ ঘুমানোর সময় ঘাড়ের অবস্থান বা পজিশন স্বাভাবিক না থাকলে ঘাড়ে ব্যথা হয়। এটা সবচেয়ে বেশি হওয়া কারণ।
২. ঘাড়ে আঘাতঃ ঘাড়ে আঘাতের কারণেও ব্যথা হতে পারে।
৩. সারভাইক্যাল স্পন্ডাইলোসিসঃ বয়স বাড়ার কারণে এই রোগ হয়ে থাকে। এতে ঘাড়ের কশেরুকা বা হাড়ে অস্টিওফাইট নামক হাড় বেড়ে যায়। অস্থিসন্ধি বা গিরা সমূহে অস্টিওআর্থ্রাইটিস হয়। দুই হাড়ের মাঝখানের যে নরম অংশ থাকে, তা ক্ষয় প্রাপ্ত হয়।
৪. ইনফেকশন বা জীবাণু সংক্রমণঃ ঘাড়ের হাড়ে যক্ষ্মাসহ আরও অনেক ইনফেকশনে ঘাড় ব্যথা হতে পারে।
৫. রিউমাটয়েড আর্থাইটিসঃ এটা একটা বাত রোগ, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নিজের বিরুদ্ধে কাজ করার ফলে এই রোগ হয়ে থাকে। এতে সাধারণত হাত বা পায়ের গিরা সমূহে ব্যথা হয়, ফুলে যায়, এদের ও ঘাড় ব্যথা হতে পারে।
৬. সরিয়াসিস বাত রোগঃ এটাও রিউমাটয়েড আর্থাইটিসের মতই বাত রোগ, এতেও শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তার নিজের বিরুদ্ধে কাজ করে। এতে গিরা ব্যথার সাথে চামড়া, নখ প্রভৃতিতেও সমস্যা দেখা দেয়।
৭. স্পন্ডাইলাইটিসঃ মেরুদণ্ডের হাড়ের ইনফ্লামেশান বা প্রদাহের নাম স্পন্ডাইলাইটিস। সেরোনেগেটিভ আর্থ্রাইটিস নামক বাত রোগে এই অবস্থা হয়ে থাকে। এতে কোমর ব্যথার সাথে ঘাড় ব্যথাও হয়।
৮. ব্লাড ক্যান্সারঃ লিম্ফোমা ও মাইলোমা নামক ব্লাড ক্যান্সারে ঘাড় ব্যথা হতে পারে।
৯. মেটাস্টাসিসঃ অন্য অঙ্গের ক্যান্সার দূরবর্তী অঙ্গে ছড়িয়ে পড়লে তাকে মেটাস্টাসিস বলে। এক্ষেত্রে ঘাড়ে ছড়িয়ে পড়লে ঘাড়ে ব্যথা হতে পারে।
১০. স্নায়ুতন্ত্রের টিউমারঃ ঘাড়ের বা সারভাইক্যাল স্নায়ুতন্ত্রের টিউমারে ঘাড় ব্যথা হতে পারে।
১১. ফাইব্রোমায়ালজিয়াঃ এই রোগে সারা শরীরে ব্যথা হয় কিন্তু ব্যথার কোন দৃশ্যমান কারণ থাকে না। এই রোগে মেয়েদের আক্রান্তের হার ছেলেদের চেয়ে ১০ গুন বেশি। এতে সারা শরীরের ব্যথার সাথে ঘাড় ব্যথাও হয়।

ঘাড়ের বাইরের কারণঃ
ঘাড়ের বাইরের কিছু রোগেও ঘাড়ে ব্যথা হতে পারে। যেমন-
১. ফেরিঙ্গস বা গলবিলের প্রদাহের কারণে। 
২. লিম্ফনোড বা লসিকাগ্রন্থির প্রদাহের কারণে। 
৩. দাঁতের সমস্যার কারণে। 
৪. এনজাইনা বা হার্টের ব্যথার কারণে।
৫. এওর্টিক এনিওরিজম বা মহাধমনীর অস্বাভাবিক প্রসারণের কারণে।
৬. প্যানকোস্ট টিউমার বা ফুসফুসের এপেক্স বা উপরিভাগের টিউমারের কারণে।
৭. ডায়াফ্রাম বা মধ্যচ্ছদা যা বুককে পেট হতে আলাদা করে, তার রোগেও ঘাড় ব্যথা হতে পারে।

ঘাড় ব্যথা কী উচ্চ রক্তচাপে লক্ষণ?
আগেই বলেছি, সাধারণত হাই প্রেশারের কারণে ঘাড়ের ব্যথা হয় না, তবে যে রটনার কথা বলেছিলাম। শুধুমাত্র একটা কারণে হাই প্রেশারে ঘাড় ব্যথা হতে পারে, তবে তা অতি নগণ্য পরিমাণে হয়ে থাকে। তা হল মেলিগনেন্ট হাইপারটেনশান যাতে খুব বেশি প্রেশারে ব্রেইনের নীচের অংশ নেমে গেলে ঘাড় ব্যথা হতে পারে। আর অন্য কোন হাই প্রেশারে ঘাড় ব্যথা হয় না।

ঘাড় ব্যথায় কী কী পরীক্ষা করতে হয়?
ঘাড় ব্যথায় সাধারণ কিছু পরীক্ষা করতে হয়, যা ঘাড়ের কারণ কি না তা প্রমাণ করে। যেমন-
১. ঘাড়ের এক্সরে। 
২. ঘাড়ের এমআরআই।

তাছাড়াও উপরে বর্ণিত রোগ সমূহের মধ্যে যে রোগ হয়েছে মনে করা হয়, তার পরীক্ষা করতে হয়।

ঘাড় ব্যথার চিকিৎসা কী?
ব্যথা ঘাড়ের নিজস্ব হলে সাধারণত নিম্নোক্তভাবে চিকিৎসা করা হয়ঃ-
১. ব্যথার ঔষধে চিকিৎসা। 
২. কিছু কিছু ব্যায়ামের মাধ্যমে চিকিৎসা।

তাছাড়াও ঘাড়ের নিজস্ব কিছু কারণ ও ঘাড়ের বাইরের কারণে কিছু স্পেশাল বা বিশেষ চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।

সামান্য ঘুমানোর পজিশন ঠিক না হলে যেমন ঘাড় ব্যথা হতে পারে তেমনি ভয়ঙ্কর কিছু কারণেও ব্যথা হয়, আবার শুধু ঘাড়ের কারণেই ঘাড় ব্যথা নয়, ঘাড়ের বাইরের কারণেও হতে পারে এবং তা চিকিৎসার ক্ষেত্রে মনে রাখা জরুরী। তবে সুখের বিষয় ভয়ঙ্কর কারণ সমূহ খুবই নগণ্য পরিমাণে হয়ে থাকে। পরিশেষে এটাও লক্ষ্যণীয় যে, হাই প্রেশারে সাধারণত ঘাড় ব্যথা হয় না। এজন্য সকল রটনাই চিকিৎসা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ঘটনা নয়। 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে